বুর্জোয়া গণমাধ্যমের বয়ান ও গ্রহণযোগ্যতা

Posted: 31 আগস্ট, 2025

খবর কিংবা তথ্য মানুষের মাঝে তুলে ধরার জন্য শুধু এখন না–বহুদিনের অভূতপূর্ব আবিষ্কার হচ্ছে সংবাদমাধ্যম, বুলেটিন, ম্যাগাজিন কিংবা প্রকাশনা। আধুনিক সংবাদপত্র একটি ইউরোপীয় আবিষ্কার। ১৫ শতাব্দিতে হাতে লেখা নিউজ শীটগুলির কথা জানা যায়। ১৬০১ শতকে তার প্রচলন বাড়ে। বিশ্বের এসব সংবাদপত্রগুলো পরিবেশ, রাজনীতি, বিশ্ব পরিস্থিতি, শাসনব্যবস্থা, সংস্কৃতি, ভবিষ্যৎ, বিনোদন, খেলাধুলা, জাতিভেদ, ধর্মীয় বিষয়াদিসহ ইত্যাদি ক্যাটাগরির আলোচনা-সমালোচনা তুলে ধরতো। আমাদের উপমহাদেশে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ছিল–এখনো আছে। দেশভাগ থেকে জাতীয় মুক্তির আন্দোলন শুরু করে গণতান্ত্রিক সকল আন্দোলন-সংগ্রাম-সফলতায় গণমাধ্যম সবার শীর্ষে। সংবাদপত্রকে দলিল বলে সম্বোধন করা হয়। মানুষ যা ভাবছে যা ভাবার চেষ্টা করছে বা আগামীতে কী ঘটতে চলেছে তারই বার্তা তুলে ধরেন সংবাদকর্মীরা। সাংবাদিকতার গুরুমশাই বলতেন- ‘যা ঘটেছে তা সংবাদ নয়, যা ঘটবে বা ঘটতে চলেছে তাই সংবাদ’। কিন্তু বুর্জোয়া সংবাদমাধ্যামের একটা নিজস্ব সংস্কৃতি আছে তা হচ্ছে, যা ঘটে নাই বা ঘটবেও না তাই ঘটনা হিসেবে প্রকাশ করা। দ্বন্দ্ব সৃষ্টির পেছনে কাজ করে সেসকল বুর্জোয়া প্রকাশনাসমূহ। ‘দিল্লির বাবরি মসজিদ কাণ্ড’, ‘চীনা অর্থনীতি ধ্বংসের পথে’, ‘বিশ্ব রাজনীতিতে কমিউনিস্টদের ধস’, ‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ’–এরকম হলুদ সাংবাদিকতার খবরসহ জাতীয় গণআন্দোলনে ভিন্ন খবর প্রকাশ কিংবা স্বাধীনতাকামী জনতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজস্ব ব্যবসায়িক স্ট্যান্ড-এজেন্ডা নিয়ে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে বুর্জোয়া গণমাধ্যমসমূহের প্রধান কাজ। ধর্মীয় দাঙ্গা তৈরি করতে বুলেট হিসেবে মুখরোচক সংবাদ ও অতিউৎসাহী বক্তব্য প্রচার করার প্রবণতাও দেখা গেছে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোকে। জনগণ, জনমত কিংবা রাষ্ট্রীয় বাধ্যকতায় বিভিন্ন সময়ে অতি উৎসাহী সংবাদ প্রকাশ করলে অনেক সময় তাকে টক্কর দেওয়ার মতো কলাম কিংবা বার্তা ছাপিয়ে ঝিমিয়ে রাখা হয় জনগণকে, জনমতে ওঠে আসা খবরগুলোকে। নিয়ম বলে, পত্রিকায় কর্মরত সংবাদকর্মীরা হচ্ছেন স্বাধীন। তাদের কঠোর পরিশ্রম ও উপস্থাপনায় উঠে আসে সমাজের চিত্র, গণমানুষের কথা, রাষ্ট্রের সংকট-সমাধান ও জাতীয়-স্থানীয় খবর। মুক্ত গণমাধ্যমকর্মী, সংবাদকর্মী, লেখক কিংবা প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট সকলে বন্দি সংবাদপত্রের মালিকানাধীন ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটির কাছে। সাহসিকতার বলে প্রাণ হারিয়েছেন বহু সাংবাদিক ও লেখক। এসবের পরেও যারা ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন, তাদেরও চাকরি হারাতে হয়েছে। প্রতিবাদকারীদের ভাষায়–সাংবাদিকদের অস্ত্র কলম। অথচ সেই কলম দিয়ে যখন একজন সাংবাদিক অধিকারের জায়গা থেকে কর্ম সময় ও ওয়েজ বোর্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলে–তখন চাকরি হারানোর ভয় কিংবা সাংবাদিকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে মালিকপক্ষ। বিশেষ ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতারা মিডিয়া হাউসের কর্মক্ষেত্রে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। স্থানীয় ও জাতীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুরবৃত্তির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, মাঝেমধ্যে সরকারি সুবিধা ভাগবণ্টন কোন্দলে সংগঠনে ভাঙন সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে কিছু স্বাধীন সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে পেশাদার সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার্থে। কিছু গণমাধ্যম তার অবস্থান থেকে চালিয়ে যাচ্ছে প্রগতির লড়াই। সাংবাদিক পরিচয়দানকারী কিছু ব্যক্তি নিজের স্বার্থ রক্ষা ও আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়ার লক্ষ্যে অসৎ ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের মনোলালসা চরিতার্থে সংবাদ পরিবেশন-প্রকাশ করে। যার ফলে প্রথম সারির পেশাদার ও দায়িত্ববান সাংবাদিকরাও প্রশ্নের সম্মুখীন হন। যোগ্যতা নিয়ে ‘প্রশ্ন’ এইজন্যই উঠে। তাই শুধু সংবাদপত্র নয় যেকোন প্রকাশনা প্রকাশ করতে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, জ্ঞান ও চৌকষ সাংবাদিকতা। এই স্তম্ভকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন যোগ্য, শিক্ষিত ও সচেতন এবং দায়িত্ববান সৎ মানুষকে বসানো। অথচ আজ তার সংখ্যা খুবই কম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধ কিংবা দাঙ্গা সৃষ্টির বুলেট হিসেবে কাজ করে বুর্জোয়া সংবাদমাধ্যমগুলো। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সর্মথনকে কাজে লাগিয়ে মনগলা হেডলাইন ব্যবহার করে বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে হাজারো পশ্চিমা গণমাধ্যম ও সংবাদ সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত কাজে করে যাচ্ছে। বিশ্বে পুঁজিবাদী আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য অনবরত মানুষের মেধাকে কলুসিত করার চেষ্টা করছে তারা। সহজ ভাবনাকে কঠিন করে উপস্থাপনা করছে সংবাদ এর মধ্য দিয়ে। শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলো নয়, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে সাম্রাজ্যবাদের অংশীদারত্ব মিডিয়াগুলোসহ অসংখ্য নামে বেনামে পত্রিকা এজেন্ট হয়ে কাজ করছে আমাদের দেশের মধ্যে। এছাড়াও দেশীয় ভূঁইফোড় নামে-বেনামে অনেক প্রিন্ট-অনলাইন পত্রিকা ‘সোর্স-সূত্র-জানা গেছে-তথ্য বলছে’ এসব দোহাই দিয়ে মনগড়া খবর প্রকাশ করছে। বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে উস্কে দেওয়া হচ্ছে মানুষকে। আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব পত্রিকা এখন ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে। দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমসমূহ জনগণের আকাঙ্ক্ষা, দুর্নীতি কিংবা সরকারি দলের অপকর্মকে প্রাধান্য না দিয়ে তুলে ধরছে পরিবেশ ধ্বংস করা উন্নয়ন ও আধুনিকতাকে। ব্যক্তি প্রচারের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে মাধ্যমগুলো। গণমাধ্যমগুলো নতুন নতুন বয়ান তৈরি আর ‘সূত্র’ শব্দের অন্তরালে সংবাদ প্রকাশ করে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি করছে। দেশে ‘বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা’ (বাসস) থাকলেও তারা সরকারি এবং রাষ্ট্রীয় কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাকে প্রায় সময়। যখন যে দল ক্ষমতায় তখন সে দলের প্রচার-প্রচারণাও দেখা গেছে তাদের ওয়েবে। গ্রামীণ জনজীবন কিংবা মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামের কোনো খবর নেই তাদের কাছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পত্রিকাটা হাতে নিয়ে সংবাদ পড়াটা আমাদের শিক্ষিতজনদের নিত্যদিনের কাজ। আর এই সময়কে কাজে লাগিয়ে বুর্জোয়া সংবাদমাধ্যমগুলো তুলে ধরছে তাদের খবর। সংবাদের তথ্যে রয়েছে ভিন্নতা। রয়েছে সত্যতারও ঘাটতি। ইন্টারনেট তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় চোখের ডিসপ্লেতে যা ভাসছে তা-ই তুলে ধরছেন সাংবাদিকরা। পর্দার পেছনের খবরগুলো জানছে না মানুষ। ইন্টারনেটের এলগরিদম আর এসইও-এর চাপে ঢাকা পড়ছে প্রকৃত খবর। সঠিক ও নির্ভুল তথ্য নিশ্চিতে রিউমার স্ক্যানারের মতো সাইটগুলো থাকলেও তার ব্যবহার সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারেনি দেশে। সামাজিক যোগাযোগ নির্ভর মাধ্যমগুলোতে জনমত কিংবা জনগণের চাহিদার কথা তুলে না ধরে উঠিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে–ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের রাজনীতি ও ব্যক্তিদের প্রচারণা। একটা সময় ছিল যখন জ্যৈষ্ঠ সাংবাদিক কিংবা লেখক, শিক্ষকরা বের করতেন প্রকাশনা-পত্রিকা। মানুষের কাছে বিশ্বাস আস্থার স্থান ছিল পত্রিকা সংবাদমাধ্যমগুলো। অথচ সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় বড় পুঁজিপতি ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা কিংবা আমলারা প্রকাশ করছেন পত্রিকা। দেশের প্রথমসারির বেশিরভাগ পত্রিকা, মিডিয়া হাউস, অনলাইন ও টিভি চ্যানেলের মালিক ব্যবসায়ী এবং বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল বহুজাতিক কোম্পানি। এমন অ-রাজনীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হারাতে বসেছে বিশ্বাস। অথচ, একসময় পত্রিকা যা প্রকাশ করছে সাধারণ মানুষ তা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করেছে। ডিজিটালতার ছোঁয়ায় নতুন পত্রিকা বেড়েছে। কমেছে সার্কুলেশন। দৈনিক-সাপ্তাহিক-পাক্ষিক-মাসিক-অনলাইন মিলে কয়েক হাজারের অধিক পত্রিকা রয়েছে দেশে। সংবাদের মান ও ব্যক্তি-দলীয় রাজনীতির সার্পোটে সংবাদের গুরুত্ব না থাকার কারণে গণমানুষের কাছে পত্রিকাগুলো হয়ে উঠেছে সেইফ কাগজ মাত্র। যদিওবা এসবের ঊর্ধ্বে, অনলাইন পত্রিকাগুলো অনেকাংশে প্রিন্ট মিডিয়া ধ্বংসের পেছনে দায়ী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আবারো সুদিন ফিরে আসুক পত্রিকার। মানুষ ঘুম থেকে উঠে খুঁজুক পত্রিকা। অনুসন্ধানী সংবাদ উঠে আসুক পত্রিকায়। সদা সত্য বলা গণমাধ্যম হয়ে উঠবে গণমানুষের চাহিদার ফসল। এটাই প্রত্যাশা। লেখক : সহ-সম্পাদক, সাপ্তাহিক একতা