রাজনীতির একতা আর একতার রাজনীতি
Posted: 10 আগস্ট, 2025
রাজনৈতিক পত্রিকার কাজ কি? তাও আবার সেটা যদি হয় বামপন্থি পত্রিকা? এই প্রশ্নে যে উত্তর আসবে তাতে সবার একমত হওয়া কঠিন। পুঁজিবাদ সমর্থক এবং রাষ্ট্র শক্তি বলবে এই সব পত্রিকা বিভেদ তৈরি করে। আর যারা সমাজতন্ত্রের পথে সমাজ পরিবর্তন চান তাঁরা বলবেন পত্রিকা বিভেদ তৈরি করে না। শোষণের ফলে সৃষ্টি হয় বৈষম্য আর তৈরি হয় বিভেদ। এর রাজনৈতিক দিক যেমন আছে তেমনি আছে অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। বামপন্থি পত্রিকা তুলে ধরে সেই বিভেদের স্বরূপ আর তার কারণ। ফলে মানুষ খুঁজে পায় পরিবর্তনের পথ, পরিবর্তনকামী মানুষ পত্রিকার মাধ্যমেই নিজেদের মধ্যে সংহতি গড়ে তোলে। ফলে পত্রিকা হয়ে উঠে সংগঠক। একতা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পালন করে চলেছে সেই দায়িত্ব। একতার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জানাই শুভেচ্ছা।
রাজনীতির বাইরে কেউ নেই, রাজনীতির বাইরে কেউ থাকতে পারে না। যেমন- প্রকৃতির মধ্যে থেকে বাতাসকে অস্বীকার করা যায় না, তেমনি সমাজে থেকে রাজনীতিকেও অস্বীকার করা যায় না। গ্রীকরা বলতেন, যারা রাজনীতি করে না তাঁরা বর্বর। এক্ষেত্রে বর্বর বলতে যা আমাদেরকে বোঝানো হয়েছে তা নয়। বর্বর যুগ হলো মানব ইতিহাসের একটা পর্ব। যখন সমাজ গঠনের পর্যায়ে কৃষি কাজের স্তরে প্রবেশ করছে, মাটির পাত্র নির্মাণ থেকে ধাতব দ্রব্য তৈরি, পশু শিকার থেকে পশু পালনের যুগে মানুষ প্রবেশ করেছে। এই যুগের পরেই মানুষ এসেছে সভ্যতার স্তরে। প্রকৃতির সম্পদ কে শ্রম শক্তি ব্যবহার করে নিজের আয়ত্বে আনার দক্ষতা অর্জন করায় মানুষ শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির চর্চায় আগের চেয়ে সময় দিতে পেরেছে ফলে সমাজ ও তার রীতিনীতি প্রণয়নের দিকে মনোযোগী হয়েছে। ফলে সমাজের রীতিনীতি নিয়ে না ভাবাকে বর্বর যুগের বৈশিষ্ট্য বলে মনে করা হতো।
রাজনীতি হলো সমাজের পরিচালিকা শক্তি। কিন্তু এই কথাটা ভুলিয়ে দেয়ার কত আয়োজন চলে প্রতিনিয়ত। যে চর্চা চলছে এবং যেসব উদাহরণ তৈরি করা হয়েছে তার ফলে সাধারণ মানুষের ধারণা রাজনীতি সম্পর্কে একদম নেতিবাচক। সাধারণভাবে জিজ্ঞেস করলে গবেষক, শিক্ষক যাদেরকে আমরা বুদ্ধিজীবী বলে থাকি তাঁরা ছাড়া প্রায় সকল মানুষই বলবেন রাজনীতি হলো ক্ষমতায় যাওয়ার পথ। আর ক্ষমতা মানেই মনে করা হয় দুর্নীতি-লুটপাট করা, দমন-পীড়ন চালানো, অন্যায় করা আর নিয়ম না মানার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা দেখানোর রাজনীতি থেকে মুক্তি চায় মানুষ। সে কারণেই সেনাঅভ্যুত্থান নয় গণঅভ্যুত্থানে জনতা অংশ নেয়। গণঅভ্যুত্থানে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল বৈষম্য থেকে মুক্তির আকুতিতে। এক বছর পর চাওয়া পাওয়ার হিসেব নিকেশ যেমন করছে তেমনি রাষ্ট্র ক্ষমতা কিভাবে হস্তান্তরিত হবে, কার হাতে যাবে সেই প্রক্রিয়া চালুর অপেক্ষায় আছে দেশের জনগণ।
নির্বাচন ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের আর কোন সেরা বিকল্প নেই- সেটা সবাই মানেন। নির্বাচনকে শুধু সুষ্ঠু করার জন্য প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার টাকার খেলা, দলীয় পেশী শক্তির ব্যবহার আর ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করা। ইতোমধ্যে বেহেশতে যাওয়া এবং দোজোগের ভয় দেখানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। টাকা ওয়ালাদের আগ্রহ ও তৎপরতা শুরু এবং এলাকায় প্রভাব প্রতিপত্তি প্রদর্শন শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন কিভাবে এসব নিয়ন্ত্রণ করার পদক্ষেপ নেবেন তা দেখার বিষয়। নির্বাচনের প্রচারণা, নির্বাচনের দিন ভোট প্রদান করা, ভোট গণনা করা এবং ফল প্রকাশ করা আর নির্বাচনের পরে হেরে যাওয়াদের নিরাপত্তা প্রদান করা সব মিলেই নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ। এসব নিশ্চিত করাটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আরও একটি বিষয় খুব উল্লেখযোগ্য তা হলো, প্রবাসীদের ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করা। করোনাকালে, বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয়ের মধ্যে, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার কালে নীরবে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করেছেন যারা সেই প্রবাসীরা ভোটে যেন অংশ নিতে পারেন সেই দাবি দীর্ঘদিনের। দেশের জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী। শ্রম শক্তির বিরাট অংশ নারী যারা ঘরে, বাইরে এমনকি দেশের বাইরেও কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত। তাদের বঞ্চনা ও লাঞ্চনার শেষ নেই। মজুরির আন্দোলন থেকে শুরু করে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সকল আন্দোলনে তাই নারীরা এগিয়ে আসেন প্রাণের তাগিদে। এবারের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল সাহস জাগানিয়া। নির্বাচনে যেন তাঁরা আড়ালে চলে না যান। বলা হয়েছে, কেন্দ্রে কেন্দ্রে নারী ভোটারদের ঢল নামে, সেই লক্ষ্যে সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে যে যুবশক্তি দেশের বর্তমান নির্মাণ করে, ভবিষ্যৎ রচনা করে তাঁরা গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলে দেশে গণতন্ত্র চর্চা হবে কেমন করে? গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার কারণে যাদের বয়স ৩০ এর মধ্যে তাঁরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরেই ছিল। এবারের নির্বাচনে সেই যুবক শক্তিসহ নতুন ভোটাররা যেন স্বাভাবিকভাবে ভোট দিতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা একটি অন্যতম দায়িত্ব।
এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২ টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বলে দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যতগুলো বড় সংঘাত, সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তার সব কটির নেপথ্যের কারণ ছিল ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন। তবে এর পাল্টা শিক্ষাও আছে। প্রহসনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণকে প্রতারিত করে যদি গায়ের জোরে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে এবং ক্ষমতা আঁকড়ে থাকে তার চূড়ান্ত পরিণতি কী হতে পারে, তা জুলাই অভ্যুত্থান দেখিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসের বেদনাময় পুনরাবৃত্তি যেমন কেউ চায় না তেমনি আবার ক্ষমতার মোহে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতেও কেউ চায় না। ফলে নির্বাচন হলেই যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে তা বলা যায় না। তার পরও অনির্বাচিত সরকারের চাইতে নির্বাচিত সরকার ভালো। তবে সবচেয়ে ভাল জবাবদিহি করে এমন সরকার এবং জবাবদিহিতে বাধ্য করা যায় এমন ব্যবস্থা। ক্ষমতায় থাকলে আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করা না গেলে সংসদ আইন প্রণয়নের সংস্থার চাইতে ভাগ বাটোয়ারার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া বন্ধ করা যাবে না। সংসদে প্রতি মিনিটে দুই লাখ টাকা খরচ করে মাত্র ১২ শতাংশ সময় কাজে লাগানো হয় আইন নিয়ে আলোচনায়। তারপরও যে আইন প্রণয়ন করা হয় তা যায় জনগণের বিপক্ষে। সরকার প্রধানের প্রশংসা আর বিরোধী দলের নিন্দার খরচও দেয় জনগণ। এই খরচ শতকোটি টাকার বেশি। এসব বন্ধ হবে না জবাবদিহির ব্যবস্থা ছাড়া।
একদিকে নির্বাচনের সময় ঘোষণা অন্যদিকে আশঙ্কা প্রকাশ করা এই দুই মিলে একটা সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করেছে। বাইরে থেকে যারা ষড়যন্ত্র করছে তাদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে কিন্তু দেশের ভিতরে থেকে যারা অপচেষ্টা করছে তাঁরা কারা? ইতোমধ্যে নারীর ওপর আক্রমণ, স্বাধীনতা যুদ্ধকে বিতর্কিত করা, সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও আক্রমণ গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে দুর্বল করছে। যারা অনির্বাচিত সরকার থাকলে সরকারি সকল সুবিধা ভোগ করতে পারেন অথচ কোন দায় নিতে হয় না, তাঁরা নির্বাচন চাইবেন না এটাই স্বাভাবিক। আবার কেউ কেউ উদগ্রীব হয়ে আছেন নির্বাচন হলেই ক্ষমতা এবং তারপর সবকিছু হবে তাদের, এটাও জনগণ দেখছে। কিন্তু নির্বাচনের পর দেশ যেন আর স্বেচ্ছাচারের পথে না হাটে জনগণের সেটাই আপাতত চাওয়া। পুঁজিবাদী পথে হেঁটে বৈষম্য থেকে মুক্তি আসবে না এই কথা অনেকেই বুঝতে চাইছেন না, অনেকে চাইবেনও না। সেটা রাজনৈতিক সংগ্রামের বিষয়। মানুষ অনেক কিছু বিচার করে তত্ত্বে, অনেক কিছু বুঝতে পারে অভিজ্ঞতায়। ফলে তা নিয়ে বিতর্ক চলুক। মানুষ চায় একটা গণতান্ত্রিক সহনশীলতা যেন থাকে।
ঘরপোড়া গরু লাল রঙের মেঘ বা সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। সংবিধান বিতর্ক, মুলনীতি বিতর্ক এবং নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ ও ভয়ের উদ্রেক হলে তাকে দোষ দেয়া যাবে না। মূলনীতি পালটে দেয়ার জন্য এত তৎপরতা কেন? সেই প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে। কারণ জনগণ লড়াই করে যা অর্জন করে তা বেহাত হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত কম নয়। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই আর শোষণমুক্তির লক্ষ্যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে জনগণ। কিন্তু দেখে যে মাথাপিছু আয় বাড়ছে, জিডিপি বাড়ছে, বাড়ছে রপ্তানি আয় আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধনীদের সম্পদ আর সমাজের বৈষম্য। ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধি আর শ্রমজীবীদের দুর্দশা বৃদ্ধি যেন হাত ধরাধরি করেই চলছে। এর অবসান হবে কোন পথে? পুঁজিবাদী পথে যে সমাধান নেই সেটা সত্য কিন্তু ন্যূনতম নিশ্চয়তা পাওয়ার পথ কি নেই? নির্বাচন হলে গণতন্ত্র আসবে না কিন্তু গণতান্ত্রিক চর্চা করার জন্য নির্বাচন দরকার। ফলে অভ্যুত্থানের চেতনা সন্নিবেশিত থাকুক জুলাই সনদে আর গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত থাকুক সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে এটাই মানুষের আপাতত চাওয়া। এই চাওয়ার একটা সাধারণ ঐক্য আছে সেসব তুলে ধরবে বুর্জোয়া পত্রিকাগুলো। কিন্তু শ্রেণি বিভক্ত সমাজে শ্রমিক-কৃষকসহ নিপীড়িত মানুষের চাওয়া আর সমাজের অধিপতি শ্রেণির চাওয়া যে এক নয় সেটা ধরিয়ে দেবে কে? শ্রমজীবী মানুষ চায় শ্রমের ন্যায্যমূল্য পেয়ে শান্তিতে জীবনযাপন আর ধনীরা চায় শান্তিপূর্ণ শোষণ। ফলে শান্তি কথার অর্থ দুই শ্রেণির কাছে দুই রকম। এই দুই শ্রেণিকে চিনিয়ে দেয়া আর শোষিত শ্রেণির লড়াইকে শক্তিশালী করার কাজ একতা করছে। একতার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক এই শুভকামনা রইলো।
লেখক : সহকারী সাধারণ সম্পাদক, বাসদ ও সম্পাদক, ভ্যানগার্ড