মানবজমিনে চাষাবাদ নজরুল ও স্বাধীন বাংলাদেশ

Posted: 10 আগস্ট, 2025

বাংলাভাষায় ‘মানবজমিন’ শব্দটির ব্যবহার আগেও ছিল কি না জানি না, তবে আঠারো শতকের সাধক কবি রামপ্রসাদ যে শব্দটিকে অসাধারণ তাৎপর্যমণ্ডিত করে তুলেছিলেন সে-কথা জানি। ‘মানবজমিন রইলো পতিত’ বলে রামপ্রসাদ হাহাকার করেছিলেন। তিনি জানতেন যে এ জমিনে আবাদ করলে সোনা ফলতে পারে। অথচ, কৃষিকাজ না জানার দরুনই মানুষ সে সোনা ফলানোর কাজটি করতে পারলো না। রামপ্রসাদ, তাই নিজে মানুষকে সেই কৃষিকাজ শেখানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। মানবজমিনে ভালোভাবে চাষবাস করার জন্য তাঁর উপদেশ: গুরুদত্ত বীজ রোপন করে; ভক্তিবারি তার সেঁচো না; কালী নামে দাও রে বেড়া; তার কাছে তো যম ঘেঁষবে না। অর্থাৎ মানবজমিনকে দেখলেন তিনি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে, আধ্যাত্মিকতা দিয়েই চাইলেন আধিভৌতিক সমস্যার সমাধান করতে। শুধু রামপ্রসাদ একা নন। আউল বাউল দরবেশ বৈরাগী-সকলেরই একই দৃষ্টি, একই পদ্ধতি। মানবদেহকেই তাঁরা মানবজমিন বলে গ্রহণ করলেন, দেহভাণ্ডেই সারা ব্রহ্মা-কে অবলোকন করলেন। সেই দেহরূপ জমিনের আবাদ করতে হলে যা যা দরকার তার সবই তো এই মাটির পৃথিবী থেকেই সংগ্রহ করতে হয়, পৃথিবীর বাইরের কল্পিত কোনো অধ্যাত্মলোকে যে এসবের কিছুই পাওয়া যাবে না, সে কথা রামপ্রসাদ যেমন জানতেন, তেমনই জানতেন আউল বাউল দরবেশ বৈরাগীরাও। তবু, জেনেও না জানার ভান করা ছাড়া তাঁদের অন্য উপায় ছিল না। কারণ ওই মাটির জমিনের অধিকার থেকে তারা ছিলেন বঞ্চিত। বঞ্চিত হয়েছিলেন ‘মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ’ সেই ‘মাটির মালিক’দের হাতে। জবরদস্তি করেই ওরা মাটির মালিক-জমিদার। আর সন্তানসম পালে যারা জমি তারা জমিদার নন।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওই বঞ্চিতদের তাই বলতে হয়- ‘পরের জায়গা পরের জমিন/ঘর বান্ধিয়া আমি রই। আমি তো সেই ঘরের মালিক নই।’ মাটির জমিনের জমিদারি থেকে ছলে বলে যাদের উৎখাত করা হয়েছে, মানবজমিন নিয়ে নানা অধ্যাত্ম-বিলাসে মজে থাকা ছাড়া আর কীই-বা তারা করতে পারতো? রামপ্রসাদ সেনের অনেক পরে জন্মেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। সেই নজরুল ইসলামকেও জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই হাতে নিতে হলো দুঃখের পেয়ালা। ‘দুখু মিয়া’ অভিধা নিয়েই তাঁকে যাপন করতে হলো শৈশব-কৈশোর; যৌবন-প্রৌঢ়ত্বেও দুঃখ তাঁর ঘুচলো না; দুঃখই তাঁকে একসময় করে দিলো ‘নিশ্চল নিশ্চুপ’। ‘আপনার মনে পুড়িব একাকি গন্ধবিধূর ধুপ- এ-কথাই নির্মম সত্য হয়ে রইলো তাঁর জীবনে। মাটির জমিনের চাষাদের দুঃখ আর বঞ্চনা নিয়ে শৈশবেই তাঁকে রচনা করতে হয়েছিল ‘চাষার সত্ত্ব’। দুঃখ আর বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তির কোনো আধিভৌতিক পথ শিশু নজরুলের সামনে খোলা ছিল না, তাই দশ/বারো বছরের এই শিশুটিও রামপ্রসাদের পথ ধরেই মানবজমিনে চাষবাসের আধ্যাত্মিক পদ্ধতি খুঁজতে লাগলেন, রামপ্রসাদের মতোই তিনিও লিখলেন- চাষ কর দেহ জমিকে।; হবে নানা ফসল এতে।।; নামাজে জমি ‘উপালে,’; রোজাতে জমি ‘সামালে’,; কলেমায় জমিতে মই দিলে; চিন্তা কি হে এই ভব্যেতে।; লা ইলাহা ইল্লাল্লাতে; বীজ ফেলা তুই বিধি মতে; পাবি ‘ঈমান’ ফসল তাতে; আর রইবি সুখেতে।। আমরা দেখেছি, আঠারো শতকের প্রবীণ সাধক কবি রামপ্রসাদ আর বিশ শতকের প্রথম দশকে বালক কবি নজরুলের ভাবনায় কোনো তফাৎ ঘটেনি। ভাষাতেও মৌলিক কোনো তফাৎ নেই, দু’জনেই ধর্মের পরিভাষায় কথা বলেছেন। একজনের কাছে যা ‘গুরুদ- বীজ’ বা ‘ভক্তবারি’ বা কালিনামের বেড়া’, অন্যজনের কাছে তা-ই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লা’, ‘কালেমা’, ‘নামাজ’। আঠারো উনিশ শতকেও মাটির জমিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত কৃষকরা কেবল যে মানবজমিনের আধ্যাত্মিক চাষবাস করেই সান্ত¡না পেতে চেয়েছে, ‘তা নয়। শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির আধিভৌতিক পথের সন্ধানও যে তারা করেছে, সে সময়কার বড়ো বড়ো কৃষক বিদ্রোহগুলোই তার প্রমাণ। সন্ন্যাস-ফকিরদের বিদ্রোহ, ফরাজিদেহ আন্দোলন, বাঁশের কেল্লা বানিয়ে তিতুমীরের সংগ্রাম- এ সবই আসলে ‘সন্তান সম পালে যারা জমি’ সেই কৃষকদের মাটির জমিনের উপর অধিকার লাভের জন্য বিদ্রোহ-আন্দোলন-সংগ্রাম। ময়মনসিংহের টিপু পাগলা তো সেই অধিকারকে একেবারে ইশ্বরদত্ত অধিকার বলেই ঘোষণা করলেন। স্বার্থহীন ভাষায় তিনি জানিয়ে দিলেন। মাটির জমিনের আসল মালিক আল্লাহ, আর সেই জমিনে চাষ করে যে কৃষক, সেই কৃষকেরই অধিকার আল্লাহ প্রদত্ত জমি আর ফসল ভোগের, আল্লাহর জমি থেকে খাজনা আদায়ের কোনো অধিকার নেই তথাকথিত জমিদারের। কিন্তু এ-রকম সব একান্ত ন্যায্য দাবি ও দাবি আদায়ের জন্য বিদ্রোহ আন্দোলন-সংগ্রাম সবই দানবদের হাতে নির্মমভাবে দমিত হয়, ‘মানবের তরে মাটির পৃথিবী, দানবের তরে নয়’- এ-রকম সব বাণী নীরবে নিভৃতে কেবলই অশ্রুপাত করে চলে। আর জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত হয়ে যাওয়া অগণিত মানুষ সংগ্রামের বদলে আপস বিদ্রোহের বদলে বিনতি ও আন্দোলনের বদলে আত্মসমর্পণকেই নিরাপদ পন্থা বলে বিবেচনা করে। সেই বিবেচনা থেকেই তাদের আধ্যাত্মবাদের আশ্রয় গ্রহণ অধ্যাত্মের এক স্বপ্নমায়া দিয়েই তারা ‘মানবজমিন’ আবাদ করতে কিংবা ‘দেহজমি’তে চাষ করতে চায়, তাদের দেহতত্ত্বে কিংবা মারফতি-মুর্শিদী গানে সেই চাওয়াটাই মূর্ত হয়ে ওঠে গাঁয়ের কৃষক-ক্ষেতমজুর-ভাগচাষিদের জন্য এগুলোই হয়ে থাকে সাহিত্যের তথা জীবনরস আস্বাদনের প্রধানতম উৎস। আসানসোলের চুরুলিয়া গাঁয়ের বালক কবি নজরুলকেও সেই একই উৎসে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছিল, লেটোর দলে যোগ দিয়ে রামপ্রসাদের মানবজমিন আদায়ের লাইন ধরেই দেহজমি চাষের ফন্দি ফিকিরের কথা গাঁয়ের কৃষক-ক্ষেতমজুর-ভাগচাষিদের শোনাতে হয়েছিল। তবে, বাঙালি জাতির পরম সৌভাগ্য, বালকত্বের সীমানা পার হয়েই নজরুল মানবজমিন পতিত থাকার প্রকৃত হেতুটি ধরে ফেরতে পেরেছিলেন। ধরে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন। লেটো গানের ‘চাষার সঙ’ এর কবি মানবজমিনে ফসল ফলানোর তাগিদেই ‘বিদ্রোহী কবি’ হয়ে গেলেন। লক্ষ কোটি মানুষের মানবজমিন পতিত থাকার জন্য দায়ী যারা তাঁর ‘রক্তলেখায়’ তাদের সর্বনাশ সাধনের সংকল্প ঘোষণা করলেন। ‘দেহজমি’ চাষ করার মারফতি ভাবনা নয় আর, এবার মাটির জমির চাষির প্রতিই তাঁর বজ্রকণ্ঠের আহ্বান- ‘ওঠরে চাষী, জগদ্বাসী ধর ক’সে লাঙল’। মাটির জমিনে লাঙল চালিয়ে চাষি যে ফসল ফলায় সে-ফসল তার নিজের অধিকারে থাকে না বলেই তো তার ‘দেহজমি’ মরুভূমি হয়ে যায়। এই চরম অবাঞ্ছিত অবস্থার প্রতিকারের লক্ষ্যে তিনি শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ই হলেন না, বিদ্রোহ বিপ্লবের রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করে দিলেন। ‘শ্রমিক-প্রজাত-স্বরাজ-সম্প্রদায় নামক রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলে এর মুখপত্রের নাম দিলেন ‘লাঙল’। কারণ লাঙলই তো মাটির জমিন চাষ করে, সেই চাষ করা জমিনে ফলে যে খাদ্যশস্য তাই দিয়ে উদরপূর্তি করেই পুষ্ট হয় দানবের ‘দেহজমি’। নজরুলের পত্রিকার ‘লাঙল’ নামটি, তাই, গভীর তাৎপর্যের দ্যোতক। এই ‘লাঙল’- এই শ্রমিক-রাজা-প্রজা, স্বরাজ-সম্প্রদায়ে’র উদ্দেশ্য ও ‘চরম দাবি’ বিস্তৃত করে প্রকাশিত ইশতেহারে নজরুল বলেন,- ‘নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা-সূচক স্বরাজ্য লাভই এই দলের উদ্দেশ্য। আধুনিক কলকারখানা, খনি, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, ট্রামওয়ে, স্টিমার প্রভৃতি সাধারণের হিতকারী জিনিস, লাভের জন্য ব্যবহৃত না হইয়া, দশের উপকারের ব্যবহৃত হইবে এবং এতৎসংক্রান্ত কর্মীগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তিরূপে পরিচালিত হইবে। ভূমির চরম স্বত্ব আত্ম-অভাব-পূরণক্ষম স্বায়ত্তশাসন বিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রের উপর বর্তিবে- এই পল্লীতন্ত্র ভদ্র শুদ্র সকল শ্রেণির শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে। নজরুল ‘পূর্ণ স্বাধীনতা-সূচক স্বরাজ্য লাভ’কেই লক্ষ্য রূপে ঘোষণা করেছিলেন। তখনকার রাজনীতিবিদদের দ্বারা কথিত ‘স্বরাজ’-এর ওপর তাঁর কোনো আস্থা ছিল না। তিনি জানতেন, ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চাই দুটো ভাত একটু নুন’। তাই সামান্য ভাত-নুন থেকে বঞ্চিত থাকার ফলেই দেশের অধিকাংশ মানুষের দেহজমি বিরান হয়ে আছে, সেই বিরান জমিকে শস্যশ্যামলা করে তোলার জন্যই চাই ‘স্বরাজ্য’। স্বরাজ্য লাভ করলেই স্বাধীনতা লাভ হয় না, স্বাধীনতা লাভের সূচনা হতে পারে মাত্র। পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য আরো অনেক পথ হাঁটতে হয়, দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য উপযুক্ত খাদ্যের যোগান দিতে হয়, খাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে বস্ত্র শিক্ষা-স্বাস্থ্য-আশ্রয়-নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানবজমিনকে চাষের উপযোগী করে তুলতে হয়। সেই মানবজমিন আবাদ করলে সত্যি সত্যিই সোনা ফলে। ‘লাঙল’ পত্রিকায় নজরুল ‘পূর্ণ স্বাধীনতা-সূচক-স্বরাজ্য লাভ’-এর ইশতেহারটি প্রকাশ করেছিলেন ১৯২৫ সালের ষোলোই ডিসেম্বর। এবং কী আশ্চর্য, এর ছেল্লিশ বছর পরে, আরেক ষোলোই ডিসেম্বরেই বাঙালি জাতি ‘স্বরাজ্য’ লাভ করলো, প্রতিষ্ঠিত হলো বাঙালির স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র। পরাধীন আমলেই নজরুল বাঙালিকে শিখিয়েছিলেন এই মন্ত্রটি- ‘এই পবিত্র বাংলাদেশ; বাঙালির- আমাদের।; দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়; যত পরদেশী দস্যু ডাকাত; ‘রামা’দের ‘গামা’দের।’ নজরুলই কামনা করেছিলেন- ‘বাংলা বাঙালির হোক। বাংলার জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।’ রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে বাঙালি জাতি নজরুলের শেখানো মন্ত্রকে সফল করে তুলতে পেরেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু এরপরও কি নজরুলের কামনার পুরো বাস্তবায়ন ঘটেছে? আমরা কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানে নজরুলের কামনার বাস্তবায়ন ঘটানোরই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলাম। আমাদের সংবিধানে ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে নজরুলের ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়;- এর ইশতেহারটিরও একটুও অমিল নেই। সেই সংবিধানের প্রতি অনুগত থেকে চাষাবাদ করলে আমাদের মানবজমিন যে পতিত থাকতো না, সে-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কিন্তু সেই আনুগত্য প্রত্যাহার করে আমরাই শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা সংবিধানটিকে অসভ্য রকমে কাটাছেঁড়া করেছি। সে রকম করে করে শহীদদের যেমন আমরা অপমান করেছি, তেমনি ব্যর্থ নমস্কারে ফিরিয়ে দিয়েছি কবি নজরুলকেও। অথচ এই আমরাই নজরুলকে আমাদের ‘জাতীয় কবি’ বলে ঘোষণা করেছি। ভণ্ডামি আর কাকে বলে! লেখক : বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী