ফের শ্রমিক হত্যা, বেড়ে চলছে শোষণ-নির্যাতন

Posted: 06 জুলাই, 2025

গত ২৭ জুন ২০২৫ দিবাগত রাতে গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানায় অবস্থিত গ্রীনল্যান্ড গার্মেন্ট লি. এর ভেতরে রিদয় মিয়া নামক ২০ বছর বয়সী একজন শ্রমিককে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ মাধ্যমে সমগ্র দেশবাসী তো বটেই এমনকি সারা দুনিয়ার মানুষ দেখছে কারা হত্যা করছে? কার নির্দেশে হত্যা করেছে তাও স্পষ্ট। কিন্ত অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হত্যাকাণ্ডের পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ নির্দেশদাতা মালিকপক্ষের কাউকে অদ্যাবধি হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা হয়নি। মালিকপক্ষের[P নির্দেশে হত্যার সুস্পষ্ট ভিডিও থাকার পরেও তাদের কাউকে মামলায় আগামী করা হয়নি। বিধায় সকলের মাঝেই প্রশ্ন যে, এবারও কি শ্রমিক হত্যার বিচার হবে না? কেননা এযাবতকালের কোন শ্রমিক হত্যার বিচার হয়নি। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের পক্ষ নিয়ে স্থানীয় পুলিশ অতীতের ন্যায় ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। এমনকি স্থানীয় সংবাদ কর্মীরা থানার অফিসার ইনচার্জের সাথে কথা বলতে গেলে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করেছেন বলেও সংবাদ বেরিয়েছে। আমাদের অভিঙ্গতা এটাই প্রমাণ করে যে, পুঁজিপতি মালিকরা শ্রমিকদের মানুষই মনে করেননা। তারা মেশিন, কাঁচামাল ইত্যাদি টাকা দিয়ে, কিনে। শ্রমিকের শ্রমকেও তারা টাকা দিয়ে কিনে। বিধায় শ্রমিককেও অনেকটা পণ্য হিসেবে গণ্য করে। তাই তারা শ্রমিকদের প্রয়োজন বিবেচনায় মজুরি না দিয়ে সস্তায় মজুরি ক্রয় করার হিসাব নিকাশকে প্রাধান্য দেয়। সস্তা শ্রম দিয়ে না খাওয়ায়ে মেরেই ক্ষান্ত হয়না। পুঁজিপতি মালিক শ্রেণি মানবতা মূল্যবোধের তোয়াক্কা না করে। তারা বিভিন্নভাবে মজুরি চুরি করে, আইনানুগ পাওনা দিতেও অস্বীকৃতি জানায়। তাই তারা না খাওয়ায়েই ক্ষান্ত হয়না। তারা সন্ত্রাসী দিয়ে, পুলিশ দিয়ে হত্যা করে এমনকি নিজেরাও সরাসরি হত্যা করে। নির্মমতার সীমা কিভাবে অতিক্রম করছে তা গ্রীণল্যান্ডের ঘটনাবলী থেকেই স্পষ্টভাবে বুঝা যায়। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রিদয়ের মরদেহ কোনাবাড়ীতে আনতে দেয়নি রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনী। অতীতেও এমনটি করেছে। চলতি বছরেই বকেয়া মজুরির আন্দোলনের সময় শ্রম ভবনের সামনে মৃত্যুবরণ করেছিলেন স্টাইল ক্রাফট এর শ্রমিক রাম প্রসাদ সিং। তার মরদেহটি শ্রম ভবনে আন্দোলন অবস্থানরত শ্রমিকদের মাঝে আনতে দেওয়া হয়নি। প্রিয় সহকর্মীর মরদেহ দেখতে দেওয়া হয়নি তখনো। রানাপ্লাজা হত্যাকাণ্ডের ১২ বছর পেরিয়ে গেছে অথচ এখনো তার বিচার কাজ সম্পন্ন করা হয়নি। শুধু রানাপ্লাজা নয় তাজরিন ফ্যাশন, স্পেকট্রাম, কেটিএস, চৌধুরী নিটওয়্যার, শান নিটিং, হামীম, গরীব এন্ড গরীব, মাইকো সোয়েটার, সারাকা গার্মেন্ট এবং সেজান জুসসহ অর্ধশতাধিক কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক হত্যার বিচার আজও হয়নি। বিচারহীনতা কি হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করে না? হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া একটা গুরুতর সংকট। আরেকদিকে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের ফলে আদর্শ, চেতনা, অনুভূতি ধ্বংস হয়ে গেছে। ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলোও যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। একদিকে রাজনৈতিক সংকট ও বিচ্যুতি আরেকদিকে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলোর বিচ্যুতি দিন দিন বেড়েই চলছে। উৎপাদন ব্যবস্থা, উৎপাদন যন্ত্র এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক শ্রেণির অগ্রগতির যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে তা ধ্বংস করতে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন কায়দায় পুঁজিপতি শ্রেণি অর্থ বিনিয়োগ করেছে। সুবিধাবাদ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এমন পরিস্থিতির তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বিধায় গার্মেন্ট সেক্টরে শতাধিক ফেডারেশন থাকা সত্ত্বেও শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার পর মাত্র দুটি সংগঠন প্রতিবাদ করে আন্দোলনে নামলেও আর কোন সংগঠন প্রতিবাদ পর্যন্ত করেনি। গ্রীনল্যান্ডের শ্রমিক রিদয় হত্যার পরেও যারা নীরব তাদের কি শ্রমিক সংগঠন করার নৈতিক অধিকার আদৌ আছে? এমনি নানান পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা সংগঠন করতে উৎসাহ হারাচ্ছে। শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমিকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। মালিকরা আরও বেশি সংগঠিত হচ্ছে। অতীতের সব সরকারের আমলেই তারা একচেটিয়া দাপট এবং ক্ষমতার বলে শ্রমিকদের উপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে। বর্তমানেও তাই বহাল আছে। এখনো বেআইনিভাবে চাকুরিচ্যূতি, পাওনা না দেওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। অহরহ শ্রমিকদের নামে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাগারে আটক রাখা হচ্ছে। এমনকি মালিকরা নিজেরা হামলা করে, হত্যা করে! অথচ মালিকপক্ষের প্রকৃত হত্যাকারী শাস্তি পায়না। কিন্ত সেইসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে শ্রমিক, শ্রমিকনেতা এবং শ্রমিক সংগঠন দমন করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরছি- গত ২ জুন ২০২৫, সকালে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলাধীন গাজীপুর ইউনিয়নের ধনুয়া নতুন বাজার এলাকায় ডিবিএল গ্রুপের জিন্নাত নিটওয়্যার পোশাক কারখানার শ্রমিক জাকির হোসেন কারখানার আটতলা ভবন থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে মালিকপক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। ২৫ বছর বয়সী নিহত শ্রমিক জাকির হোসেন নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বাদেচিরাম গ্রামের মোক্তার উদ্দিনের ছেলে। তিনি জিন্নাত নিটওয়্যার লিমিটেড পোশাক কারখানায় বেশ কিছু দিন যাবত কারখানার ৭ম তলায় ইমপোর্টার পদে চাকরি করতেন। নিহত জাকির হোসেন কারখানার একটু পাশেই আব্দুল জলিলের বাসায় এক রুম ভাড়া নিয়ে স্ত্রীসহ বসবাস করতেন। নিহত জাকির হোসেনের স্ত্রী ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। জাকির হোসেন নিহত হওয়ার কিছুদিন আগে স্ত্রী গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। জাকির হোসেনের সঙ্গে তার স্ত্রীর সম্পর্ক অত্যন্ত সুন্দর ছিল। পারিবারিক বিষয় নিয়ে জাকির হোসেনের কোন হতাশা ছিল না। অথচ কারখানার মালিকপক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, ‘পারিবারিক বিষয় নিয়ে জাকির কয়েকদিন যাবত হতাশায় ছিলেন। নিহত শ্রমিক জাকির হোসেন পারিবারিক হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন।’ এহেন মিথ্যাচার করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বরতদের ম্যানেজ করে পার পেয়ে যায় ক্ষমতাসীন ব্যবসায়ীরা। শ্রমিকরা অভিযোগ করেন কারখানাটিতে আগে থেকেই কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে কারণে-অকারণে চরম দুর্ব্যবহার করে। শ্রমিকদের মারধর করা। অসম্মানজনক ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। ফ্লোরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে রাত্রি ১০ টা পর্যন্ত শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। শ্রমিকদের ভাষ্যমতে, ২ জুন সকালে জাকির হোসেন লেবেল লাগাতে ভুল করার কারণে তাকে অসম্মানজনক ভাষায় গালিগালাজ করা হয়, ফ্লোরে দাঁড়করিয়ে রাখা হয়। সবার সামনে কান ধরে উঠবস করিয়ে অপমান করা হয় জাকিরকে। পরে সেই অপমানে সইতে না পেরে কারখানার আটতলা ভবন থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে ধারণা তাদের। ছাদ থেকে পড়ে আহত হলে- পরে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়। জাকির হোসেনকে অপমান ও আত্মহত্যার ঘটনার প্রতিবাদে গত ৩ জুন সকাল থেকে শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করলে পুলিশ প্রথমে তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে অহেতুক মারধর করে। পুলিশ অনেক নারী শ্রমিককেও বেধড়ক পিটিয়েছে। অনেকে প্রাণ বাঁচাতে আশপাশের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। পরে পুলিশ খুঁজে খুঁজে শ্রমিকদের পিটিয়েছে। পুলিশের ওপর হামলা সরকারি কাজে বাঁধা দেওয়া ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় শিল্পপুলিশ বাদী হয়ে গত ৩ জুন ২০২৫ রাতে ৬৪ জনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাত ১৫০০ জনকে আসামি করে গাজীপুরের শ্রীপুর মডেল থানায় মামলা দায়ের করে। মামলায় ২৩ জন শ্রমিককে আটক করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। গত ১৬ জুন শ্রমিকরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অন্য আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান চলছে। বর্তমানে শ্রমিকরা গ্রেপ্তার আতঙ্কে দিন পার করছেন। জানা যায়, মালিকদের সাথে সাথে সন্ত্রাসী ও পুলিশ একাকার হয়ে এই দমননীতি চালাচ্ছে। তেমনি এক ঘটনা বাঘের বাজার মেম্বার বাড়ী এলাকা নতুন ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ায় গত দুই বছরে চারটি শ্রমিক সংগঠন অফিস নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর এলাকার মালিকরা পুলিশ এবং সন্ত্রাসী বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে হামলা-মামলা-নির্যাতন চালিয়ে অফিস ভেঙে দিয়ে উৎখাত করে। গত ২৬ মে গভীর রাতে ঐ এলাকার টিইউসি অফিসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। শ্রমিক পক্ষের মামলা গ্রহণ করেনি প্রশাসন, অথচ মালিক পক্ষের স্থানীয় ঝুট সন্ত্রাসীর দায়ের করা মিথ্যা মামলায় শ্রমিক পক্ষকে হয়রানী করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন মালিকদের বাহিনী হিসেবে শ্রমিক দমনের কাজ করছে। রাষ্ট্র যখন অসংগঠিত অসহায় নিরীহ শ্রমিক দমনে মালিকদের হয়ে কাজ করেন তখন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সম্ভাবনা। মহান মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক সংগ্রামে শ্রমিক-কর্মচারী বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও তার সুফল পুঁজিপতিরাই ভোগ করছে। পুঁজিপতিদের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পালাবদল হয় মাত্র, মৌলিক কোন পরিবর্তন হয় না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক যুক্ত হয়েছিলেন। জীবন দিয়েছে, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন শত শত শ্রমিক। অথচ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শ্রমিক কল্যাণে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সাম্প্রতিক ঘোষিত বাজেটে শ্রমিকদের জন্য কোন বরাদ্দ নাই উপরন্তু শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের সহায়তা থেকে দশ শতাংশ কর কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এমতাবস্থায় শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক শক্তির উত্থান প্রয়োজন। শ্রমিক শ্রেণির পক্ষের সমাজ নির্মাণ করতে সমাজ বদল ঘটাতে হবে। আসুন সে কাজটিই অগ্রসর করি। লড়াই করি। লেখক : সম্পাদক, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি