পশ্চিম আফ্রিকায় নয়া-উপনিবেশবাদ

Posted: 06 জুলাই, 2025

ফরাসিভাষী আফ্রিকা কখনোই সম্পূর্ণভাবে উপনিবেশবাদ থেকে মুক্ত হয়নি। নিজের সাবেক উপনিবেশগুলিতে ফরাসি সম্পত্তি রক্ষার অজুহাতে সেই সমস্ত দেশগুলিতে ফ্রান্স নিজস্ব সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখার জন্য জেদ ধরে থাকে এবং পূর্বতন উপনিবেশগুলি সেই দাবি মেনেও নেয়। ফলস্বরূপ সাবেক উপনিবেশগুলির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার বিশাল সুযোগ পায় ফ্রান্স। এর সঙ্গে এইসব দেশগুলিকে সিএফএ ফ্রাঁ নামক মুদ্রা প্রচলনে বাধ্য করা হয়। সিএফএ ফ্রাঁ-র সঙ্গে ফরাসি ফ্রাঁ-র নির্দিষ্ট বিনিময় হার ধার্য করা ছিল। আর সেই নির্দিষ্ট বিনিময় হার বজায় রাখার জন্য এইসব দেশের মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণ করত ফরাসি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেহেতু মুদ্রানীতিকে সাধারণভাবে অর্থনৈতিক নীতি থেকে পৃথক করা যায় না, তাই এই সমস্ত দেশের অর্থনৈতিক নীতিও ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করত ফ্রান্স। ফ্রান্সের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির পরেও এই ব্যবস্থা টিকে আছে। সুতরাং এইসব সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলির স্বাধীনতা সবসময়েই ছিল খুব সীমাবদ্ধ। ঘটনাচক্রে ক্ষমতায় চলে আসা কোনো বিপ্লবী নেতা এই ব্যবস্থা থেকে বেরোনোর চেষ্টা করলে, ফ্রান্স আমেরিকার সহায়তায় সেই অবাধ্য সরকারের বিরুদ্ধে নয়া-ঔপনিবেশিক অত্যাচার নামিয়ে আনত। বুরকিনা ফাসোয় ক্ষমতায় আসা বিপ্লবী নেতা থমাস সাঙ্কারা চেয়েছিলেন ফরাসি সেনাদের দেশ থেকে বের করে দিতে। ফ্রান্সের প্ররোচনায় ও সহযোগিতায় ঘটানো এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁরই দলের এক সদস্য তাঁকে হত্যা করে। তবুও এইসব দেশগুলিতে নয়া-উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারি আছে। স্থানীয় সশস্ত্র বাহিনীগুলির মধ্যে থেকেই প্রায়শ এই প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতৃত্ব তুলে আনা হয়। ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে হলেন ২০২২-এর শুরুতে বুরকিনা ফাসোতে তৈরি হওয়া প্রতিরক্ষা ও পুনর্গঠনের জন্য দেশাত্মবোধক আন্দোলন (প্যাট্রিওটিক মুভমেন্ট ফর সেফগার্ড অ্যান্ড রিস্টোরেশন, পিএমএসআর) দলের একজন নেতা। ২০২২-এর ৩০ সেপ্টেম্বরে দেশের ক্ষমতায় আসার পর দেশ থেকে ফরাসি সৈন্য সরানোর জন্য তিনি জোরদার দাবি তোলেন। আর সেটা করতে তিনি সফলও হন। এর পাশাপাশি তিনি সিএফএ ফ্রাঁ ব্যবস্থার বাঁধন থেকেও নিজের দেশকে মুক্ত করেন। প্রতিবেশী দুই দেশ–মালি ও নাইজারকে সঙ্গে নিয়ে ত্রাওরে গঠন করেছেন সাহেল রাষ্ট্রসমূহের সংস্থা (অ্যাসোসিয়েশন অফ সাহেল স্টেটস, এইএস)। পার্শ্ববর্তী ওই দুই দেশেও উপনিবেশবাদ থেকে প্রকৃত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল অত্যন্ত প্রবল। ফরাসি ও মার্কিন সেনাবাহিনীকে নাইজার থেকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়। আর সেখানে অবস্থিত পেন্টাগনের ড্রোন স্টেশনটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলটিতে এইএস সাম্রাজ্যবাদের একটা স্থায়ী সমস্যা হিসেবে উদ্ভূত হতে শুরু করেছে। এই সমস্ত সম্পদগুলির মধ্যে সোনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বুরকিনা ফাসো হল আফ্রিকার বৃহৎ সোনা উৎপাদনকারী দেশগুলির একটি। ২০২৪ সালে সেখানে উৎপাদিত সোনার পরিমাণ ৫৭ টন। কিন্তু দেশের মানুষ এই সোনা উৎপাদন থেকে খুব কম মাত্রায় লাভবান হন। সোনা থেকে আয়ের সিংহভাগই চলে যায় বিদেশি সংস্থাগুলির হাতে, যারা এই সোনার খনিগুলির মালিক। পিএমএসআর সরকার ২০২৪ সালে সোপামিব নামের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা স্থাপন করেছে। এর মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে বিদেশি মালিকানাধীন সোনা উত্তোলনকারী সংস্থাগুলিকে অধিগ্রহণ করা শুরু হয়েছে। সোনার খনিগুলি জাতীয়করণের ফলে সরকারের কাছে অপেক্ষাকৃত বেশি পরিমাণে রাজস্ব জমা হচ্ছে। এই রাজস্ব ব্যবহার করা হচ্ছে দেশকে শিল্পায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে, আর তার সঙ্গে বুরকিনা ফাসোর জনগণের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিসেবার প্রসার ঘটাতে। সম্প্রতি ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় সোনার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে অনেক ডলারের মালিকই সোনা মজুত করার দিকে ঝুঁকেছেন। বুরকিনা ফাসোর সরকার এই সুবিধাজনক পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারলে ফরাসি সেনাবাহিনী বহিষ্কারের ফলস্বরূপ তাদের ওপর পশ্চিমি শক্তিগুলির চাপানো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক অবরোধের প্রভাবকে অনেকাংশে মোকাবিলা করতে পারবে। এখানেই শেষ নয়। ত্রাওরের সরকার সোনার কারিগরি শিল্পেও নিয়ন্ত্রণ এনেছে। দেশে একটি সোনা শোধনাগার স্থাপন করেছে। বুরকিনা ফাসোর অন্যান্য প্রাথমিক পণ্যগুলি দেশেই প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের সহায়তা করেছে এবং খাদ্যশস্যে স্বয়ম্ভর হবার পদক্ষেপ নিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলি প্রত্যাশিতভাবেই আমেরিকাকে ক্ষুব্ধ করেছে। আমেরিকান সেনেট কমিটির একটি শুনানিতে ইউএস আফ্রিকা কম্যান্ডের (আফ্রিকম) প্রধান জেনারেল মাইকেল ল্যাংলি বিদ্বেষপূর্ণ অভিযোগ এনেছেন ইব্রাহিম ত্রাওরের বিরুদ্ধে–ত্রাওরে নাকি সোনা থেকে আয় করা রাজস্ব তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করছেন, নির্দিষ্টভাবে নিজের নিরাপত্তা বাড়াতে ব্যবহার করছেন। ল্যাংলির এই বক্তব্য সারা আফ্রিকা জুড়ে সম্প্রচারিত হয়। এবং গোটা মহাদেশের মানুষের কাছেই অত্যন্ত সমালোচিত হয়। মনে করা হচ্ছে, ত্রাওরের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের জন্য একটা মঞ্চ প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যেই ল্যাংলি এসব বলেছেন। পশ্চিমের দেশগুলিতে অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হতে থাকে– প্রায়ই অসমর্থিত সূত্র মারফত প্রকাশিত এসব লেখায় উল্লেখ করা হয় ত্রাওরে সরকারের ‘স্বৈরাচারী’ ধরনের কথা এবং বুরকিনা ফাসোতে ঘটে চলা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা। এসবের মধ্যে ১৬ এপ্রিল সত্যিই একটা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করা হয়। অভ্যুত্থানের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ষড়যন্ত্রকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর ফলে নিশ্চিতভাবে ত্রাওরে সাঙ্কারার মতো পরিণতি থেকে রক্ষা পান। উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তিকামী আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এই অভ্যুত্থানের চেষ্টাগুলি সাম্রাজ্যবাদের এতটাই পরিচিত প্রত্যুত্তর, যেন মনে হবে কেউ একটা পুরনো একঘেয়ে চিত্রনাট্য পড়ছে। ফরাসিভাষী আফ্রিকা সহ গোটা আফ্রিকা মহাদেশে উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তির সংগ্রাম যে বিপুল বাধার সম্মুখীন হয়–তা এই ঘটনাগুলি থেকে বোঝা যায়। এই জটিলতাগুলির একাধিক উৎস আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে– বুরকিনা ফাসো সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গেই মুখোমুখি হয়েছে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীদের–যারা দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ ভূখণ্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। পাশাপাশি এই অঞ্চলে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদের অর্থে পরিপুষ্ট পশ্চিমপন্থী শাসনব্যবস্থাগুলি–যারা ক্ষমতায় আসে এমন নিয়মিত ছকবাধা নির্বাচনের মাধ্যমে–যেখানে মানুষ অংশগ্রহণ করলেও আদৌ তার কোনো কার্যকর প্রভাব নেই। সাম্রাজ্যবাদ এই সরকারগুলিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে। এদের দিয়ে ভিন্নমতাবলম্বী সরকারগুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অথবা ওই সরকার-বিরোধী অভ্যুত্থানের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলির অর্থনৈতিক সম্প্রদায়কে (দ্য ইকোনমিক কমিউনিটি অফ ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস, ইসিওডব্লিউএএস) বুরকিনা ফাসোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। গণতন্ত্র রক্ষার অজুহাতে এরা বুরকিনা ফাসোকে অর্থনৈতিক অবরোধের হুমকি দেয় (কারণ সেখানকার বিপ্লবী সরকার নাকি ক্ষমতায় এসেছে ‘গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত’ পশ্চিমি-ঘেঁষা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে)। কিন্তু এই প্রচেষ্টা বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেনি। কারণ, বুরকিনা ফাসোর মানুষের সমর্থন রয়েছে তথাকথিত ‘অগণতান্ত্রিক’ ইব্রাহিম ত্রাওরের উপরে। আর তাঁর সরকারের সমর্থনে তারা রাস্তায় বিশাল সব মিছিল আর সমাবেশ করেন। ইসিওডব্লুএএস থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি হল এইএস। প্রতিবেশী দেশ আইভরি কোস্টকে ফরাসিরা ব্যবহার করে এসেছে বুরকিনা ফাসোতে অভ্যুত্থান সংগঠিত করার ঘাঁটি হিসেবে। থমাস সাঙ্কারার বিরুদ্ধে ঘটানো অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রকারীরাও পালিয়ে গিয়েছিল এই আইভরি কোস্টেই এবং এখনও তারা সেখানে বহাল তবিয়তে আছে। এমনকি চলতি বছরের এপ্রিল মাসের ব্যর্থ অভ্যুত্থানও আইভরি কোস্টকেই ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে পরিচালনা করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। এই সমস্ত বাধার বিপরীতেই পশ্চিম আফ্রিকায় শুরু হওয়া উপনিবেশবাদ থেকে মুক্তির প্রক্রিয়া গোটা আফ্রিকা মহাদেশেই বিপুল উৎসাহী সমর্থন পেয়েছে। সমস্ত আফ্রিকা জুড়ে হাজারো মানুষ প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ইব্রাহিম ত্রাওরের সমর্থনে। বুরকিনা ফাসো থেকে সাম্রাজ্যবাদীদের হাত গোটানোর আহ্বান তারা জানিয়েছে। যে আদর্শের জন্য প্যাট্রিক লুমুম্বা, অ্যামিলকার ক্যাব্রাল, এদুয়ার্দো মন্ডলেন এবং থমাস সাঙ্কারা নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন; যে কারণে কোয়ামে এনক্রুমা ও জুলিয়াস নিয়েরেরে সারাটা জীবন সংগ্রাম করেছেন, সেই আদর্শ আফ্রিকার মানুষের মধ্যে গভীরভাবে অনুরণিত হচ্ছে। বর্তমান সময়ে আফ্রিকার মুক্তির সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। আগামীর দিনগুলোতে সাম্রাজ্যবাদ এই লড়াইয়ের বিরুদ্ধে আরো হিংস্র হয়ে উঠবে। ফরাসিদের পুরাতন স্বার্থের পাশাপাশি সারা পৃথিবী জুড়ে কাঁচামালের খোঁজে উঠেপড়ে লেগেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার–তাতে আফ্রিকা অতি অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বলা বাহুল্য, ইতোমধ্যেই ট্রাম্প কঙ্গোর খনিজ সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণের একটা পরিকল্পনা নিয়েছেন কঙ্গোর সরকারের পরোক্ষ সম্মতিতেই। বিশ্বের খনিজ সম্পদ, মূলত নিত্য নতুন উদীয়মান প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য সম্পদগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে ট্রাম্প যে তৎপরতা দেখাচ্ছেন– তা একটি ভিন্ন প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব। তাঁর এই গরজ আরও প্রকট হয়েছে ইউক্রেনের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে, গ্রিনল্যান্ড দখলের আকাঙ্ক্ষায়, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১-তম অঙ্গরাজ্য বানানোর পরিকল্পনায়, এমনকি সমুদ্রতল নিয়ন্ত্রণের মত লোলুপ প্রকল্পে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধে ‘নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে তাঁর ভূমিকা গ্রহণের ইচ্ছাও ওই দুই দেশের বিপুল খনিজ ভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার পাওয়ার আগ্রহের থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। এটা স্পষ্ট যে, আগামী দিনে আফ্রিকা এক তীব্র সংঘাতের রঙ্গমঞ্চে পরিণত হবে–যেখানে একদিকে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদ আর তার বিপরীতে রয়েছে উপনিবেশবাদের থেকে মুক্তিকামী শক্তিগুলো। সাম্রাজ্যবাদ চায় আফ্রিকার এই বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে, আর অন্যদিকে উপনিবেশবাদবিরোধী শক্তিগুলি সাধারণ মানুষের জীবনের মান উন্নত করার জন্য এই সম্পদ অধিকার করতে চায়। ভাষান্তর: শুভ্রজ্যোতি দে মূল লেখা: পিপলস ডেমোক্রেসি