বোম্বে দাঙ্গার একশ বছর

Posted: 21 নভেম্বর, 2021

একতা প্রতিবেদক : ভারতে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার অসংখ্য উদাহরণ যেমন আছে, তেমনি আছে হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে মিলে খ্রিস্টান-শিখ-পার্সি-জৈন-ইহুদিদের মেরেছে এমন দাঙ্গারও নজির। একশ বছর আগে ঔপনিবেশিক বোম্বেকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল তেমনই এক দাঙ্গা। ১৯২১ সালের ওই দাঙ্গা পরে ‘প্রিন্স অব ওয়েলস দাঙ্গা’ নামে পরিচিতি পায়। কারও কারও কাছে অবশ্য কেবলই ‘বোম্বে দাঙ্গা’। শহরটি সেসময় বোম্বে নামে পরিচিত ছিল, এখন সবাই একে মুম্বাই হিসেবে চেনে। ওই দাঙ্গার ইতিহাস ঘাঁটলে চরিত্র হিসেবে অনেকের নাম আসবে। আসবে মহাত্মা গান্ধী, অটোমান সুলতান, ব্রিটিশ রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের নাম। স্বরাজ, স্বদেশী, সত্যাগ্রহ আর প্যান-ইসলামিজমের কথাও বাদ পড়বে কী করে। ওই বছরের নভেম্বরে, প্রিন্স অব ওয়েলস যিনি ভবিষ্যতে রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড হিসেবে পরিচিতি পাবেন, তার রাজকীয় সফরকে কেন্দ্র করেই বেঁধেছিল গোল। ভারত তখন গান্ধীর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে টগবগ করে ফুটছে; ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর এ অসহযোগই ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ওইবার ‘হিন্দু-মুসলমান একতা’র ব্যানারে গান্ধী ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন ভারতীয় মুসলমানদের খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে অটোমান সাম্রাজ্য তখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে, ভারতের মুসলমানদের ভয়-যুদ্ধে জেতা ব্রিটিশরা সুলতানকে গদিচ্যুত করবে, যে সুলতান তাদের দৃষ্টিতে ইসলামী দুনিয়ার বৈধ খলিফা। ভারতের ইতিহাসে হিন্দু-মুসলমানের এই একতা, সাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্বের অসাধারণ এক মুহূর্ত হিসেবে হাজির হলেও সেসময় তা সংখ্যালঘু খ্রিস্টান, শিখ, পার্সি ও ইহুদিদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছিল। গান্ধী অবশ্য তাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “হিন্দু-মুসলমান মৈত্রীর অর্থ এই নয় যে বড় সম্প্রদায়গুলো ছোট সম্প্রদায়গুলোর উপর প্রাধান্য বিস্তার করবে।” অন্যদিকে প্রিন্স অব ওয়েলসের অনুমান ছিল, ভবিষ্যৎ রাজাকে দেখে ভারতীয়রা গদগদ হয়ে যাবে, রাজভক্তির জোয়ার বইবে, সেই সুযোগে গান্ধীর আন্দোলনও নিস্তেজ হয়ে যাবে। ঘটল উল্টোটা। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রিন্সকে বোম্বেতে স্বাগত জানাল হরতাল ডেকে, বিদেশি কাপড় পুড়িয়ে। বিদেশি কাপড় তখন আন্দোলনকারীদের চোখে ছিল ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের প্রতীক। ১৭ নভেম্বর, বোম্বের অনেকে বিশেষ করে পার্সি, ইহুদি ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা প্রিন্সকে স্বাগত জানাতে হরতাল উপেক্ষা করে বোম্বে বন্দরে ছুটে যান। এটা কংগ্রেস আর খেলাফত আন্দোলনের কর্মীদের মাথায় রক্ত তুলে দিয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে পরের দিনগুলোতে বোম্বের রাস্তায় রাস্তায় দেখা গেল তুমুল সংঘর্ষ। সেবারের দাঙ্গা অন্তত ৫৮ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, বোম্বের প্রতি ছয়টি দোকানের মধ্যে অন্তত একটি হয়েছিল হামলার শিকার। আর প্রিন্স অব ওয়েলসের জন্য সেই দাঙ্গা এসেছিল অশুভ সংকেত হয়ে। এরপর ভারতের যেখানেই তিনি গেছেন, পেয়েছেন হরতাল কিংবা হুমকি। সহিংসতা বন্ধে তড়িৎ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন গান্ধী, শান্তি প্রতিষ্ঠায় সব সম্প্রদায়ের নেতাদের একত্রিত করেছিলেন তিনি। ১৯ নভেম্বর তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রথম অনশন করেন। তার কৌশল কাজে লেগেছিল। ২২ নভেম্বরই তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের পাশে নিয়ে তার অনশন ভাঙেন। অবশ্য দাঙ্গা তার মনও ভেঙে দিয়েছিল। অনেকটা টিটকারির সুরেই বলেছিলেন, “স্বরাজের নমুনা দেখলাম।” সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ নিয়ে সংখ্যালঘুদের ভয়ের যে ভিত্তি আছে, দাঙ্গা যে তা-ই দেখিয়েছে, কষ্ট নিয়েই তা স্বীকার করতে হয়েছিল গান্ধীকে। এ কারণেই বোম্বে যখন দাঙ্গার তাণ্ডব পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো শুরু করল, গান্ধীকে তখন দেখা গেল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনে দৌড়ে বেড়াতে। তিনি কংগ্রেস ও খেলাফত কর্মীদেরকে সংখ্যালঘুদের অধিকারের গুরুত্ব এবং ভুলের প্রায়শ্চিত্ত নিয়ে কাজ করার নির্দেশনা দিলেন। গান্ধী বললেন, সংখ্যালঘুদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখা সংখ্যাগরিষ্ঠদের ‘পবিত্র দায়িত্ব’। বিভিন্ন বৈঠক এবং কংগ্রেসের প্রকাশনাগুলোতে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিদের গুরুত্ব দেওয়া শুরু হল। নেতারা গান্ধীবাদী কৌশল সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ নিয়ে সন্দেহের ব্যাপারগুলো তুলে ধরতে লাগলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, গান্ধী তার ‘হিন্দু-মুসলমান একতা’ স্লোগান বদলে ফেলে তুললেন ‘হিন্দু-মুসলিম-শিখ-পার্সি-খ্রিস্টান-ইহুদি একতা’র কথা। খুব একটা জনপ্রিয় না হলেও এই স্লোগানে কাজ হয়েছিল; সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আশ্বস্ত হয়েছিল- স্বাধীন ভারতেও তাদের জায়গা থাকবে। গান্ধীর ওই তড়িৎ পদক্ষেপের কারণেই ১৯২১ এর ওই দাঙ্গা এখন বিস্মৃতির অতলে চলে গিয়েছে। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের অপচ্ছায়াকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, নিশ্চিত করেছিলেন দাঙ্গা যেন বোম্বেতে ‘স্থায়ী দাগ না ফেলে’। শতবর্ষ আগে দূরদর্শী এক সতর্কবাণীও দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি; বলেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠরা যদি আজ অন্যদের নিপীড়ন করতে একত্রিত হয়, তাহলে কাল সেই ঐক্য লোভ-লালসার কারণে বা মিথ্যা ধর্মান্ধতায় ভেঙে যাবে।