বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মৃত্যুফাঁদ

Posted: 12 সেপ্টেম্বর, 2021

তথ্যের আঁকড় নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত একজন হিসেবে আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা বিষয়ে আমার একান্তই ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার বয়ান এই লেখাটি। শুরু করেছিলাম ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর, ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল ও কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার পরে। উল্লেখ্য, পরীক্ষার হলে অরিত্রীর কাছে একটি মোবাইল ফোন পাওয়া গেলে সেটিকে নকল হিসেবে সাব্যস্ত করে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং পরদিন অভিভাবকদের সামনে তাকে বহিষ্কারের হুমকি দেয়া হয় এবং অভিভাবকদের অপমান করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অপমানিত অরিত্রী এরপর বাসায় গিয়ে ফ্যানে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে মর্মে জানান অরিত্রীর বাবা। ঘটনাটি আমাকে ভীষণ আলোড়িত করে এবং অরিত্রীরা কেনো আত্মহত্যা করে সেই বিষয়টি নিয়ে আমার ভাবনাগুলো লিখতে শুরু করি। লেখাটি শেষ হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক এবং রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা- এই তিন স্টেক হোল্ডারের মিথষ্ক্রিয়া এবং তার সারাৎসার অরিত্রীদের জন্য কীভাবে মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠেছে সেটিই এই প্রবন্ধের মূল উপজীব্য। এটাই ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন স্বয়ংসম্পূর্ণ লেখার মাধ্যমে খণ্ড খণ্ড ভাবে একতার পাঠকদের জন্য তুলে ধরার ইচ্ছা রইল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমার প্রথম স্কুল ছিলো বেথেলহাম প্রাইমারি স্কুল, বরিশাল। বেতন দিতে হতো না। মাঝেমধ্যে সাদা মিশনারি কেউ এলে এক কাপ দুধ বা খান কয়েক বিস্কুট বরং পাওয়া যেত। নিচু বেঞ্চ, প্রায় মাটির সাথে মিশে থাকা। বড় দিদিমনি খুব কড়া ছিলেন। খুব ভয় পেতাম। খ্রিস্টান ধর্ম-ক্লাসে পেছনের বেঞ্চে বসে যিশুর অলৌকিক গল্প শুনতাম। অ-খ্রিস্টান ছেলেমেয়েরা তখন ক্লাসের বাইরে খেলে বেড়াতো। আমি খেলায় দক্ষ ছিলাম না। তেমন দৌঁড়াতে পারতাম না। কোনো ক্ষোভও ছিল না মনে। গল্প শুনে অনির্বচনীয় আনন্দে থাকতাম। ক্লাস শুরুর অনেক আগে গিয়ে গেটের সামনে দাঁড়াতাম, গেট খুললে হুড়মুড় করে ঢুকতাম। দশ পয়সার বাসি চালতার আচার অমৃতসমান ছিলো। ক্লাস ফোরে উঠতে উঠতে দেখলাম ক্লাস শেষে কোচিং শুরু হয়েছে। আমি করিনি। টাকা দিয়ে কোচিং করানোর আর্থিক সামর্থ্য যেমন ছিলো না পরিবারের, দরকারও ছিলো না। তখন ক্লাসে পড়ানোর সাথে সাথে মাথায় গেঁথে যেতো। বাসায় এসে গল্পের বই পড়ায় তাই কোনো সমস্যা হতো না। আমার ক্লাসের পেছন দিকে আমার চেয়ে বয়সে বড় কিছু মেয়েও পড়ত। ক্লাসে পড়া না পারলে দিদিমনিরা ডাস্টার দিয়ে তাদের ঠাস ঠাস করে মারতেন। অনিবার্য বকুনি ছিলো: ‘বুনো জানোয়ারগুলো কোথাকার’, ‘অসভ্য ধাড়ি’, ‘স্কুলে না এসে মাকে সাহায্য করলেও তো পারো’, ‘এরা আসে ক্যান স্কুলে অ্যাঁ? এরা আসে ক্যান? খালি খালি বেঞ্চের জায়গা নষ্ট’...ইত্যাদি। এই স্কুল ছেড়ে, কেঁদে-কেটে ক্লাস ফাইভের মাঝামাঝি রাঙ্গামাটি চলে গেলাম বাবার বদলির সুবাদে। দুই : ভাঙা বছরে সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব না। বাসার কাছে কাঁঠালতলি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন বাবা। ভাঙা বেড়ার সেই স্কুলে প্রায় মাটিতে বসে স্কুল করতাম। দিদিমনিরা উল বুনতেন। স্যাররা মাঝেমধ্যেই ছেলেমেয়েদের ঠাস-ঠাস করে বাড়ি দিতেন ডাস্টারের। আরেকটি শাস্তি ছিল, যে পড়া পারতো তাকে দিয়ে যে পড়া পারতো না তার কান টানানো। এই স্কুল থেকে বৃত্তি পরীক্ষায় আমি প্রথম বৃত্তি পাই, এমনকি তিন পার্বত্য জেলায় প্রথম হই। কী তাঁরা পড়িয়েছেন, আমি কী শিখেছিলাম মনে নেই। কোনো ক্ষোভ, দুঃখ, বেদনা কিছুই হয়নি। বছর শেষে ভর্তি হলাম রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ভালো স্কুল। সবার সাথে হেঁটে প্রথমে গিয়ে উঠতাম সাম্পানে। লেক পার হয়ে পাহাড় ভেঙে উঠতাম। ফের মাইলখানেক হেঁটে স্কুলে ঢুকতাম। কোনদিন ক্লান্তি লাগেনি। এই স্কুলে মাঝেমধ্যে এক-আধটু ডাস্টারের বাড়ি খেয়েও থাকতে পারি। মার খেয়েছি পণ্ডিত স্যারের কাছে। শিক্ষার্থীদের মারার ব্যাপারে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। মুখও চলতো সমানে। একটা মেয়ের পদবি ছিলো পুরকায়স্থ। তিনি বলতেন, ‘দাঁড়া, আজ তোরে আধা কায়স্থ বানাই’। তিনি আমাকে পাঠাতেন ক্লাসের অন্যদের মারার জন্য গাছের ডাল ছিঁড়ে আনতে। আমি খুব অনিচ্ছায় গিয়ে অনেক সময় নিতাম সবচেয়ে দুর্বল ডালটা বাছার জন্য। মার খেতাম সেজন্য। একবার ধর্ম ক্লাসে যারা কথা বলেছে তাদের নাম তাঁর কাছে না দেবার জন্য তিনি আমাকে চাবির গোছা দিয়ে খুব মেরেছিলেন। বাসায় ফেরার পথে সেদিন সাম্পানের মধ্যে আমি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাই। আমার মনিদা যাচ্ছিলেন তবলছড়ির লাইব্রেরিতে। আমাদের সাম্পান লেকের এপাড়ে ভিড়লে সেই সাম্পানে তিনি যাবেন। বেহুঁশ আমাকে কোলে করে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার মা একটু রাগ করেছিলেন। গানের শিক্ষক ভূপতি ধর স্যার তখন বাসায় এসে গান শেখাতেন। তাঁকে মৃদুস্বরে বলেওছিলেন কিছু হয়তো। কিন্তু আমার সামনে নয়। আমার ভেতর কোনো বাড়তি ক্ষুব্ধতা সেজন্য তৈরি হয়নি। স্কুলযাপনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই ভেবেছি। কষ্ট পেয়েছিলাম অন্য এক ঘটনায়। স্বাধীনতা দিবসের রচনা প্রতিযোগিতায় আমি রচনা জমা দিয়েছিলাম একা। কিন্তু দিনশেষে স্টেডিয়ামে পুরস্কার নিয়েছিলেন লেখা জমা না দেয়া আমার এক সিনিয়র আপা। তিনি স্কুলের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের মেয়ে ছিলেন। এ ঘটনা জেনে আমাদের প্রধান শিক্ষক প্রতিমা চৌধুরী শুনেছি শুধু বলেছিলেন তাঁকে, ‘ছিঃ! এটা আপনি কী করেছেন? কীভাবে পারলেন!’ আমার মা-বাবা সালিশে যাননি। আমার বাবা শুধু অবাক হয়ে বলেছিলেন, একজন শিক্ষক এমন কাজ করতে পারলেন! এই পর্যন্তই। তিন : সেই স্কুল ছেড়ে, বন্ধুদের ছেড়ে পাবনায় এলাম ক্লাস সেভেনে। আমার মেজদা তখন ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্র। এস্কারশন থেকে একটা কাফতান কিনে এনেছিলেন। তখন শুক্রবারে স্কুল ড্রেস না পড়লেও চলতো। তাই সাদা পাজামার উপরে ওই কাফতানটা পরে গিয়েছিলাম। আমাদের এক শিক্ষক (নাম বলছি না) খুব কর্কশ ভাষায় বকেছিলেন স্কার্ফ না পড়ার জন্য। তিনি বলেছিলেন, ‘ওড়না পরার উপযুক্ত তুমি হওনি। কিন্তু একটা স্কার্ফ না পরে স্কুলে আসতে তোমার মা দিলো ক্যামনে? কেমন ঘরের মেয়ে তুমি?’ তারপর তিনি কাঠের স্কেল দিয়ে সামান্য দু’টো বাড়ি দিয়েছিলেন হাতে আর দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন ক্লাসে। সেই প্রথম খুব খারাপ লেগেছিলো। হাতে মারের ব্যথার জন্য নয়, অপমানের জন্য। বাসায় এসে বলিনি, কিন্তু কোনদিন আর ক্লাসে স্কুল ড্রেস না পরে যাইনি। আমাদের এক আক্কাস স্যার ছিলেন। তিনি নবম-দশম শ্রেণির মেয়েদের বোধহয় খুব খারাপ কথা বলতেন। দু-একটা সে সময়েও কানে এসেছে। এখন বুঝি তিনি আসলে খুব অশোভন কথা বলতেন। একবার ক্লাসে এক শিক্ষক দওংষধহফদ-এর উচ্চারণ আইসল্যান্ড করায় সেকথা বলেছিলাম বলে তিনি তেড়েমেরে বলেছিলেন, ‘চেয়ারে বস তুই। আর এই নে চশমা। আমার চশমা তুই পড়।’ তারপর সারা ক্লাস দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। আমাদের প্রধান শিক্ষক আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আসলে ভীষণ ভালোবাসতেন। কিন্তু তিনি কড়া নজর রাখতেন মেয়েদের ওপর। কাউকে বকতেন, ‘পা লম্বা হইছে?’ কাউকে বলতেন, ‘লেটার বক্স’। এখন বুঝতে পারি, কী কর্কশ কী অপমানজনক ছিলো সেইসব ডাক! এইসব গল্পের কোনো শেষ নেই। আমাদের স্কুলে নির্যাতন, গালি, অপমান কোনো নতুন কথা নয়। ভিকারুন্নেসা স্কুলের প্রিন্সিপ্যালই একমাত্র অপমানকারী নন। ভিকারুন্নেসা স্কুলই কেবল খারাপ স্কুল নয়। স্কুলে স্কুলে এইসব কাহিনি। আমি বরং অবাক হয়েছি অরিত্রীর আত্মহত্যায় জাতির প্রতিক্রিয়া দেখে। তারা কি আসলেই জানেন না কী ধরনের অপমান করা হয় স্কুলগুলোতে? ভালো ছাত্রছাত্রী প্রথম বেঞ্চে বসবে আর খারাপরা শেষ বেঞ্চে। শিক্ষকরা ক্লাসটেস্টের খাতা দেন প্রকাশ্যে, কখনো বা দুর্বল খাতার শিক্ষার্থীর নম্বর উচ্চস্বরে পড়ে শুধু নয়, সেসব নিয়ে উপহাস, অপমান, কখনো বা মৃদু প্রহারের মাধ্যমে। ক্লাসের অন্য সবাই সেই লাঞ্ছনা উপভোগ করে। সেখানে নকল ধরা পড়লে ইজ্জত শিরোমণি স্কুলে টিসি দিতে চাইবে- এটাই কি স্বাভাবিক নয়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক ম্যাজিস্টেট প্রিলিমিনারিতে ভর্তি হয়েছিলেন আমাদের বিভাগে। ফাইনাল পরীক্ষায় তাকে দেখেছি গো-গ্রাসে নকল করতে। অথচ সেই তাকে একদিন বলতে শুনলাম, পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রথমেই তিনি যে কাজটি করেন সেটি হল, কেউ নকল করছে দেখলেই প্রথমে তিনি ঘুষি মারেন নাক বরাবর। তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ! চার : অরিত্রী আর অরিত্রীর মা-বাবার সাথে স্কুল প্রশাসনের সাক্ষাতের সিসিটিভি ফুটেজ দেখলাম। শব্দ না থাকার কারণে কী কথা হয়েছে, বোঝা যায়নি। তবে বিভিন্ন রিপোর্টে এসেছে যে, অরিত্রী এবং তার বাবা অধ্যক্ষর পা ধরে ক্ষমা চেয়েছেন। তেমন কিছু ওই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়নি। দেখলাম এবং শুনলাম অরিত্রীর বাবার বক্তব্যের ক্লিপ। তিনি বলেছেন, অধ্যক্ষকে বারে বারে তিনি অনুরোধ করেছিলেন সেদিনের পরীক্ষাটি যেনো নিয়ে নেয়া হয়। তিনি বলেন, পরিচালনা বোর্ডের প্রভাবশালী সদস্যদের কাছে তিনি কথা বলতে শুরু করেছিলেন। অরিত্রীকে উদ্ধৃত করে তিনি জানান যে- অরিত্রী বলেছে, ‘বাবা, তোমার তো এতো ক্ষমতা, তবু তুমি আমাকে আজ পরীক্ষাটা দেয়াতে পারলে না?’ অনেক শোকের ভেতরেও অরিত্রীর বাবা যখন এ-কথা জানান, তখন এক মুহূর্ত থামি। কেনো, সে বিষয়েই আমি লিখছি, তবে ঝুঁকি নিয়ে। (চলবে) লেখক : শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাবি