প্রসঙ্গ ভাস্কর্য এবং মৌলবাদী আস্ফালন

Posted: 10 জানুয়ারী, 2021

সম্প্রতি ধর্ম ব্যবসায়ী মৌলবাদী গোষ্ঠী ভাস্কর্যবিরোধী মিথ্যা প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে এবং বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যসহ সকল ভাস্কর্য অপসারণের হুমকি প্রদান করছে। তাদের দাবি, ইসলামে ভাস্কর্য নাজায়েজ। তাদের অতীত বয়ানে গণতন্ত্র এবং শুধু মানুষেরই নয়, যে কোনও প্রাণীর ছবি উঠানো, নারী নেতৃত্ব নাজায়েজের কথা দেশবাসী জেনেছিলো, যদিও আজ তারা এগুলির সবটাই অনুসরণ করছে। ভাস্কর্য এক ধরনের নান্দনিকতা, যা শহর-নগর এবং জনগণের সমাগম হয় এমন স্থানে স্থাপন করা হয়, যা শহর ও নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে থাকে। পৃথিবীর সংস্কৃতিবান সভ্য ও সচ্ছল সমাজে অনেক পূর্ব থেকেই ভাস্কর্য নির্মিত হয়ে আসছে, সভ্যতা সংস্কৃতি আর পরাশক্তিতেই অগ্রসরমান দেশেই শুধু নয় মুসলিমপ্রধান দেশ ইরান, তুরস্ক, সৌদি আরব, মিশর, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ভাস্কর্য রয়েছে। সেই সকল দেশের ইসলামী বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বা ইসলামী চিন্তাবিদেরা ভাস্কর্য স্থাপনের কারণে ‘ইসলাম গেলো ইসলাম গেলো’ বলছেন না। কিন্তু এদেশের ধর্ম ব্যবসায়ী মৌলবাদী গোষ্ঠী এ নিয়ে জান কোরবানি করার অবস্থায় পোঁছেছে। ধর্ম ব্যবসায়ী মৌলবাদী এই গোষ্ঠীই বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। নারীদের বাইরে কাজ করার বিপক্ষে বলেছে। গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত মেয়েদের বিরুদ্ধে ন্যাক্কারজনক ভাষা প্রয়োগ করেছে। বিভিন্ন সময়ে সরকারের নীরবতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এ চক্রই দেশের স্বাধীন ও মুক্তচিন্তার মানুষগুলির বিপক্ষে প্রতিনিয়ত মনগড়া মন্তব্য করে আসছে, পাকিস্তান আমল থেকে অদ্যাবধি। ২০০৮ সালে বিমানবন্দরের সামনে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাধক ফকির লালন শাহের ভাস্কর্য এবং ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত ন্যায় বিচারের প্রতীক হিসেবে নির্মিত গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য অপসারণে মৌলবাদীদের পরামর্শে সরকার পিছু হটার কারণেই মৌলবাদী চক্র আজ বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনকের ভাস্কর্যসহ সকল ভাস্কর্য অপসারণের হুঁশিযারি দেয়ার হিম্মত দেখাচ্ছে। মৌলবাদীদের ঐ বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কুষ্টিয়ায় নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর পশ্চাদপদ সমাজ ও পরিবেশই হলো মৌলবাদ এবং ফতোয়াবাজদের উর্বর বিচরণক্ষেত্র। উন্নয়ন ও প্রগতির শত্রু মৌলবাদ তার পশ্চাদপদ অবস্থানকে টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন রঙে, ঢঙে অপতৎপরতাকে সদা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে এবং সেই চেষ্টা স্বাধীন বাংলাদেশেও অব্যাহত রেখেছে। সে তখনই তার ফতোয়ার বিষদাঁতের প্রয়োগ ঘটায়, যখন তার স্বার্থে আঘাত লাগে অথবা লাগবে কিংবা যখন নতুনভাবে কোনো স্বার্থ আদায়ের প্রয়োজন হয়। তাই ‘ইসলামের দেশ’ বলে খ্যাত সৌদি আরবে রাজতন্ত্র চললেও কিংবা অইএস-এর নামে তথাকথিত ইসলাম কায়েমের জন্য মানুষ হত্যা করলেও এই ফতোয়াবাজদের বিবেকে কোনো ইতিবাচক নাড়া জাগে না। আফগানিস্তানে ক্ষমতার লোভে মুসলমান হত্যাকাণ্ড ঘটলেও এরা চুপ থাকে। অথচ কাশ্মিরে ভারত-পাকিস্তানের সীমান্ত দ্বন্দ্বে সৃষ্ট হত্যাকাণ্ডে মুসলমান মরলেই এদের নাচানাচির সীমা থাকে না, কিন্তু মুসলিম ছাড়া অন্যরা মরলে এরাই নীরবতা পালন করে। একজন মানুষ হিসেবে সব ধরনের হত্যাকাণ্ডকে নিন্দা করা উচিত নয় কি? পাকিস্তানে শিয়া-সুন্নীদের মধ্যে হত্যাকাণ্ড লেগেই আছে। অথচ ১৯৭৯ সালে আফগান সরকারের আহ্বানে রুশ সৈন্য আসলে এই ফতোয়াবাজ মৌলবাদীরা ‘ইসলাম গেলো’ বলে ফতোয়াবাজী করেছিলো। ফতোয়াবাজদের এ ফতোয়া নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ হওয়ার বিপক্ষে এরা যেমন ফতোয়া দিয়েছে, তেমনই ফতোয়া দিয়ে সিলেট ও ফরিদপুরের নুরজাহানকে আগুনে ও পাথর ছুঁড়ে হত্যা করতে প্ররোচিত করেছে। হাইকোর্টে মহিলা বিচারপতি নিয়োগ হলে তার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছিলো বিপদগামী এই চক্র। এনজিও’র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে অনেক পূর্ব থেকেই, নারীদের সচেতন করায় মৌলবাদী চক্র ক্ষেপেছিলো। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলীম লীগকে ভোট না দিলে বিবি (স্ত্রী) তালাক হয়ে যাবে- এমন ফতোয়াও কারো অজানা নয়। পাকিস্তান না থাকলে মুসলমান থাকবে না, ইসলাম থাকবে না, এ ধরনের ফতোয়া জারি করা হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের সময়, কেউ তাদের কথা শোনেনি। পাকিস্তান হতে স্বাধীনতা পাওয়ার ৪৯ বছর পর বাংলাদেশে মুসলমান ও ইসলাম অক্ষত অবস্থাতেই শুধু নেই বরং মসজিদ-মাদ্রাসার সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। তাদের মনগড়া ফতোয়া ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯০ এর সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘নারী নেতৃত্ব মানা যাবে না’ বলে চিৎকার করেছিলো এরা, কিন্তু নিজেরাই পরে সে শৃঙ্খলে আটকা পড়ে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণের ঘটনায় ফতোয়াবাজদের নতুন ফতোয়া দেয়া শুরু হয়েছিলো। মৌলবাদী পত্রিকাগুলো তাদের প্রকৃত স্বভাব অনুযায়ীই সেই ফতোয়া প্রচারে ভূমিকা নিয়েছিলো। মৌলবাদীরা মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণকে মূর্তি নির্মাণ বলে প্রপাগান্ডা চালিয়েছিলো, আজকেও চালাচ্ছে। মূর্তি পূজা আর ভাস্কর্য কি এক জিনিস? তাছাড়াও পবিত্র কোরআন শরীফে মুসলিম চিত্রশিল্প এবং ভাস্কর্য সম্বন্ধে প্রত্যক্ষভাবে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। যে সমস্ত আয়াত উদ্ধৃত করা হয়েছে তা পৌত্তলিকতাকে নির্মূল করার জন্য। চিত্রকলার প্রতি ইসলামের বৈরিতার মূলে ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মের প্রভাব প্রণিধানযোগ্য। জীবন্ত প্রাণীর প্রতিকৃতি অংকনের তীব্র বিরোধিতায় ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত মৌলবাদীদের ওপর ইহুদিদের প্রভাবই আপাত দৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত বলে ধারণা করা হয়। মক্কা শরীফের প্রাচীন ইতিহাস রচয়িতা আজরাফীর মতে, ‘রসুল করীম (সঃ) ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয় সমাধা করে কাবা গৃহে গমন করেন এবং ঘোষণা করেন “সত্যের জয় হইয়াছে এবং মিথ্যা অপসারিত হইয়াছে”। তাঁর নেতৃত্বে ৩৬০ টি দেবদেবীর মূর্তি ধ্বংস করা হয়; কিন্তু প্রাচীর অথবা স্তম্ভে অঙ্কিত বিবি মরিয়মের অর্থাৎ মাতা মেরীর ক্রোড়ে উপবিষ্ট শিশুপুত্র যিশুর প্রতিকৃতি তিনি হস্ত দ্বারা ঢাকিয়া অপরাপর সমস্ত চিত্রাবলী মুছে ফেলতে আদেশ করেন। ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে হযরত ওমর (রাঃ) জেরুজালেম হতে ফেরার সময় জীবন্ত প্রাণীর প্রতিকৃতি খোদিত একটি আতরদানী মদিনা মসজিদের জন্যে সংগ্রহ করে আনেন। চিত্রকলা ও ভাস্কর্য সম্পর্কে ইসলামের প্রথম যুগেও বিরূপ মনোভাব প্রকাশিত হয়নি। তা না হলে ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে সদ ইবনে আবি আক্কাস তেসিফোন অধিকার করে। মুসলিম সৈন্য বাহিনীসহ বিভিন্ন জীবজন্তুর চিত্রের অলংকৃত তাফ-ই-কিসরার অনিন্দ্য সুন্দর প্রাসাদে নামাজ পড়তে পারতেন না। ৬৯৫ খ্রিষ্টাব্দে আরবি মুদ্রা প্রচলনের পর বালবেরে মুদ্রিত ফলস অর্থাৎ তাম্র মুদ্রায় খলিফার প্রতিকৃতি অঙ্কিত ছিলো, সামনের দিকে (অবভার্স) খলিফার প্রতিকৃতি ও নাম এবং পেছনের (বিভার্স) দিকে একটি প্রতীক কলেমা শাহাদৎ এবং টাকশালের নাম থাকতো। শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত ফাতেমী এবং সাফাভী বংশের শাসনকালে চিত্রকলার উৎকর্ষ সাধিত হয়। পুতুল নাচ, ছবির প্রতিকৃতি আঁকা হাদিসের ব্যাখ্যায় জায়েজ। আসলে ধর্মতত্ত্ববিদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি একরূপ নয়। রক্ষণশীল আলেমাগণ মুসলিম সাম্রাজ্যের আধিপত্য বিস্তারের জন্য কুরআন এবং হাদিস হতে উদ্ধৃতি দিয়ে চিত্রকলার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছেন। শিল্পী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে রং ও তুলির মাধ্যমে আপন সত্তাকে তার সৃজনশীল শিল্পকর্মে খুঁজতে থাকেন। এর সঙ্গে ধর্মীয় অনুশাসনের কোনো সম্পর্ক নেই। এরপরও ফতোয়াবাজরা ফতোয়া দেয়। এই ফতোয়াবাজরাই একদিন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ, ছাত্রীভর্তি, ডিস এন্টিনা, ফুটবল খেলোয়াড়দের হাফ প্যান্ট পরার বিরোধিতা করেছিলো ফতোয়া দিয়েছিলো। কিন্তু এ ধরনের সব কাজই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত আছে এবং ঐসব কিছুর সঙ্গে ঐ সমস্ত মৌলবাদীরা সম্পর্কিত। মহান মুক্তি সংগ্রামে ৩০ লক্ষ শহীদ, দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত হরণের সাথে যুক্ত রাজাকার, আলবদর, আল শামস আর শান্তি কমিটির ঘাতকদের শাস্তির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেয়া শুরু হলে এই সকল যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে অরাজনৈতিক নামে, স্বাধীনতাবিরোধী চক্র হেফাজতের ব্যানারে সংগঠিত হয়। রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং জাতীয় পাটির সমর্থনে হেফাজতের শাপলা চত্বরে সমাবেশ, ঢাকাতে নারকীয় কাণ্ড দেশবাসী সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিলো। তাদের মিথ্যা এবং কৌশলী বক্তব্যে সাধারণ ধর্মভিরু এবং কিছু ধর্মান্ধ লোক এবং কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা তাতে সম্পৃক্ত হয়। কিন্তু মূল নেতৃত্বে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রই থাকে, তার উদাহরণ হেফাজতে বিভক্তি। জামাত-শিবির রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হলে মৌলবাদী অন্যান্য সংগঠনগুলি কিছুটা হলেও হালে পানি পেয়েছে। অন্যদিকে সাবেক ক্ষমতাসীন দলটি বাছ-বিচার না করেই ক্ষমতার স্বাদ পেতে সব মৌলবাদীদের অন্ধভাবে সমর্থন করায় মৌলবাদীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্বের বিপক্ষে কথা বলে চলেছে। শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু- এই তত্ত্বকে পরিহার না করলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়া যাবে না। আর এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সরকার থেকে প্রতিরোধের মুখোমুখি না হওয়ায় নীরব সমর্থন পাওয়ায় বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যের ওপর আক্রমণ করে বসেছে। তবে বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে তাদের অবস্থান এবারই নতুন নয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের স্থপতি এবং বাঙালি জাতির জনক বললেই এই মৌলবাদী গোষ্ঠী মুসলমানদের জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আঃ) এর প্রসঙ্গ সামনে এনেছে। অথচ পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলার সময় মুসলমানদের জাতির পিতার প্রসঙ্গ সামনে আনেনি। তবে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেক মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য প্রসঙ্গে তাদের সুর কিছুটা নরম মনে হচ্ছে, যদিও ভুলে গেলে চলবে না, কারণ এরা কখন কোন ফতোয়া নিয়ে হাজির হয় তা বলা কঠিন। সে কারণে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী কোনো ষড়যন্ত্র ধর্ম ব্যবসায়ী মৌলবাদী গোষ্ঠী যেন করতে না পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার এখনই সময়। লেখক : কলেজ অধ্যক্ষ, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাকবিশিস, কেন্দ্রীয় কমিটি