পণ্যের বিশ্লেষণই পুঁজিবাদের রূপ পরিচয়

Posted: 11 অক্টোবর, 2020

পুঁজিবাদ এমন এক সমাজব্যবস্থা যেখানে পুঁজির সর্বময় কর্তৃত্ব বিরাজিত। সমাজব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদ বর্তমানে পৃথিবীর বৃহত্তর অংশ দখল করে আছে। পৃথিবীতে ইতোপূর্বে আবির্ভূত সমাজব্যবস্থাগুলোর তুলনায় পুঁজিবাদ সংক্ষিপ্ত সময় পার করেছে। তবে পুঁজিবাদ শক্তিশালী উৎপাদিকা শক্তির জন্ম দিয়েছে ও তার বিকাশ ঘটিয়েছে। আবার সাথে সাথে শ্রমিকশ্রেণির সাথে আপসহীন দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছে। অতি উৎপাদন, বেকারি ও মদ্র্রাস্ফীতির অর্থনৈতিক সংকট, নির্মম সমরবাদ, বর্ণবাদ, উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য অভিশাপ যেমন- আল-কায়দা, আইএস ইত্যাদির সৃষ্টিতে মদদ যুগিয়েছে। ১৯শ শতাব্দির শেষভাগে পুঁজিবাদ চলে গিয়েছিলো তার চূড়ান্ত পর্ব সাম্রাজ্যবাদে, অর্থাৎ ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদে। স্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছিলো তার ঐতিহাসিকভাবে অবসানের প্রকৃতি। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক মহাবিপ্লবের বিজয় সাম্রাজ্যবাদের শিকলে প্রথম ভাঙন ঘটিয়েছিলো। এই বিপ্লব পুঁজিবাদের সাধারণ সংকটের সূচনা করে। তখন পৃথিবীর প্রায় সমস্ত মহাদেশে বহু দেশ পুঁজিবাদকে না বলে সমাজতন্ত্রের পথে পা বাড়িয়েছিলো। কিন্তু বর্তমানে রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে বিপর্যয় দেখা দেয়ায় বুর্জোয়া মতাদর্শবিদরা এ কথা প্রমাণ করতে চাইছে যে সমাজতন্ত্রের দিন শেষ, প্রমাণিত হয়ে গেছে যে পুঁজিবাদই একমাত্র সমাজব্যবস্থা যা চিরস্থায়ী। তারা জোর দিয়ে প্রচার করছেন, মার্কসের ‘পুঁজি’ গ্রন্থে বর্ণিত পুঁজিবাদী বিশ্লেষণ আর লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ক মতবাদ দুটোই সেকেলে হয়ে গেছে। তবে তাদের যদি জিজ্ঞেস করা যায়, শ্রমিকের শ্রম-শক্তি শোষণই যে পুঁজিবাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় সেটার কি পরিবর্তন হয়ে গেছে? উত্তরটা না হবে। তা হলে পরিষ্কার হলো যে শোষণহীন সমাজের দাবি ফুরিয়ে যায়নি বরঞ্চ দিনদিন আরো তেজি হচ্ছে। তারপর যে প্রশ্নটা আসে পৃথিবীতে সমাজতন্ত্রের এই বিপর্যয় হলো কেনো? এটি প্রায়োগিক ব্যাপার, বিনির্মাণের ত্রুটি। আমলাতান্ত্রিক বিচ্যুতি। সারা পৃথিবী ঘেরা পুঁজিবাদের পাশে সমাজতন্ত্রের সামান্য ভুল যে ধস নামাতে পারে এটা তার উদাহরণ। হতাশার কিছু নেই, বস্তুর ধর্ম সামনের দিকে এগিয়ে চলা, পেছনের দিকে নয়। সমাজতন্ত্রের বিনির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়নি। চীন, ভিয়েতনাম, ল্যাটিন আমেরিকার কিছু দেশ, কিউবা, উত্তর কোরিয়া প্রভৃতি দেশসমূহ তাদের ভুলত্রুটি সারিয়ে সমাজতন্ত্রের পথেই এগুচ্ছে। একথা সত্যি পুঁজিবাদ বর্তমান বিশ্বে টিকে আছে দাপটের সাথে। সে অগ্রসরমান বৈজ্ঞানিক ও কৃৎকৌশলগত দিক, কর্পোরেট পুঁজির ব্যবহার, পারমাণবিক অস্ত্রের জোরে এবং দেশে দেশে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অন্যায্য অমানবিক যুদ্ধ বাঁধিয়ে। পুঁজিবাদের নির্মম দিকগুলো আজ সে ঢাকতে পারছে না। এতোসবের পরেও পুঁজিবাদ নিজেকে নিরাপদ করতে পারছে না। সারা পৃথিবীতে আজ মেহনতি মানুষের লড়াই জোরদার হয়ে ওঠছে। নতুন সূর্যের উদয় হবেই পুরোনোকে বাতিল করে আর এটাই বিজ্ঞান। পণ্য উৎপাদন : প্রথম শর্ত সামাজিক শ্রম-বিভাজন : পুঁজিবাদের বিশ্লেষণে আমাদের জানতে হবে পণ্য উৎপাদন বিষয়ে। মানবজাতির বিকাশের আদি পর্যায়গুলোতে প্রাকৃতিক অর্থনীতির প্রাধান্য ছিলো। যেমন গোষ্ঠীপতিপ্রধান-কৃষক-গৃহস্থালি, দাস-মালিক সমাজের হস্তশিল্পীদের উৎপাদন এবং সামন্ততান্ত্রিক তালুকগুলো ছিলো মূলের দিক থেকে প্রাকৃতিক উৎপাদন। এই প্রাকৃতিক উৎপাদনকে, পণ্য উৎপাদনে রূপান্তরিত হতে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়েছিলো। এর প্রথম শর্ত হলো সামাজিক শ্রম-বিভাজনের বিকাশ। তখনো শ্রম বিভাজন ছিলো যেমন ভারতীয় লোকসম্প্রদায়গুলোতে ভূস্বামী, কর্মকার, মৃৎশিল্পী, সুতার ইত্যাদি। কিন্তু সেটা পণ্য উৎপাদনে যথেষ্ট ছিলো না কারণ তারা যা উৎপাদন করতো তা ক্রয়-বিক্রয় ছাড়াই সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে সমতাবাদী নীতির ভিত্তিতে বণ্টিত হতো। এরকম হওয়ার কারণ শ্রমের প্রডাক্ট বা উৎপাদনে ব্যক্তিগত মালিকানা ছিলো না, এর মালিক ছিলো সামগ্রিকভাবে সম্প্রদায়। দ্বিতীয় শর্ত ব্যক্তিগত মালিকানা : শ্রম-বিভাজনের পরে প্রাকৃতিক উৎপাদনকে পণ্য উৎপাদনে রূপান্তরিত হতে ব্যক্তিগত মালিকানার দ্বিতীয় শর্তটি পূরণ করতে হয়েছিলো। হস্তশিল্পী যখন উৎপাদনের উপকরণের মালিক হলো নিজে, তখন সে তার শ্রমে উৎপাদিত দ্রব্যটি বিক্রি করতে সক্ষম হলো। এর ফলে দুটো জিনিসের মিলন হলো, যথা - সামাজিক শ্রম-বিভাজন এবং ব্যক্তিগত মালিকানা। এই দুই শর্ত একত্রে মিলে পণ্য উৎপাদনের জন্ম দিলো। পণ্য উৎপাদনের ঐতিহাসিক দুই রূপ : পন্য উৎপাদনের আছে ঐতিহাসিক দুই রূপ। এর একটি সরল পণ্য উৎপাদন আর অন্যটি পুঁজিবাদী পণ্য উৎপাদন। কৃষক, হস্তশিল্পী প্রভৃতির পণ্য উৎপাদন হচ্ছে সরল পণ্য উৎপাদন। আর পুঁজিপতির আওতায় পণ্য উৎপাদন হলো পুঁজিবাদী পণ্য উৎপাদন। তবে উভয়ের ভিত্তি হলো উৎপাদনের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা। দুয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য : তবে সরল ও পুঁজিবাদী পণ্য উৎপাদনের মধ্যে সারগত পার্থক্য বিদ্ধমান। সরল পণ্য উৎপাদনে, উৎপাদনের উপকরণ ও উৎপাদিত সামগ্রীর মালিক উৎপাদক নিজে। সেখানে মানুষের উপর মানুষের শোষণ নেই। অন্যদিকে পুঁজিবাদী পণ্য উৎপাদনে, যে মজুরি-শ্রমিক উৎপাদনটি করে সে উৎপাদনের উপকরণের মালিক না, এমন কি উৎপাদিত সামগ্রীটিরও মালিক না। উৎপাদনের উপকরণ এবং উৎপাদিত সামগ্রীটির মালিক পুঁজিপতি। পুঁজিবাদী উৎপাদনে এই ব্যক্তিগত মালিকানার জোরে পুঁজিপতি মজুরি-শ্রমিককে শোষণ করে। সুতরাং এখানে মানুষ মানুষের দ্বারা শোষিত। পুঁজিবাদী সমাজের সম্পদের একক হচ্ছে একটি পণ্য : পুঁজিবাদে, বেশিরভাগ সামগ্রীই উৎপাদিত হয় বেচার জন্য, লাভের জন্য। আর সেগুলো তখন হয়ে ওঠে পণ্যসামগ্রী। পুঁজিবাদে কেনা-বেচা হয় সবকিছু, যেমন - কল-কারখানা, জমি, ভোগ্যপণ্য ইত্যাদি সবই। সেখানে মজুরি-শ্রমিকের শ্রম-শক্তিও কেনাবেচা হয়। সুতরাং পুঁজিপতি ও মজুরি-শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্কটি আর মানবিক থাকে না, হয়ে ওঠে লাভ-লোকসানের সম্পর্ক। অর্থাৎ মজুরি-শ্রম পণ্যে পরিণত হয়। মার্কসের বক্তব্য হচ্ছে, পুঁজিবাদী সমাজের সম্পদ হচ্ছে পণ্যসামগ্রীর এক বিপুল সঞ্চয়ন। একটিমাত্র পণ্য হচ্ছে এর একক। সুতরাং পণ্যের বিশ্লেষণই হচ্ছে সে সমাজের রূপ পরিচয়। পণ্যের বিশ্লেষণ দিয়েই পুঁজিবাদের সারমর্ম ও তার বিকাশের রূপগুলো জানতে হবে। পণ্য : পণ্য হলো শ্রমের একটি প্রডাক্ট বা উৎপাদন। পণ্য ব্যক্তিগত ভোগের চেয়ে বিক্রির জন্য, বিনিময়ের জন্য উৎপাদিত হয়। শ্রমের একটি উৎপাদকে একটি পণ্য হতে হলে প্রথমে তা কোনো না কোনো মানবিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হতে হবে। সে চাহিদা হতে পারে ব্যক্তিগত বা সামাজিক। এই চাহিদা পূরণ করার যোগ্যতাকেই পণ্যটির ব্যবহার-মূল্য বলে। পণ্যের ব্যবহার-মূল্য নির্ধারিত হয় তার পদার্থগত, রাসায়নিক, যান্ত্রিক ও অন্যান্য গুণ-ধর্মের দ্বারা। এভাবে একটি জামা বা একজোড়া জুতার ব্যবহার-মূল্য রয়েছে কারণ এগুলো মানুষের পোশাক ও পাদুকার ব্যবহারে প্রয়োজন মেটায়। রুটি, মাংস, দুধ ও সব্জি মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন মেটায়। বই মানুষের আত্মিক চাহিদা মেটায় আর যন্ত্র বিভিন্ন সামগ্রী উৎপাদনে মানুষের সামাজিক প্রয়োজন মেটায়। একটি উৎপাদের একটি পণ্য হওয়ার জন্য এর উৎপাদকের চাহিদার পরিবর্তে অন্য মানুষদের চাহিদা পূরণ করতে হয়, অর্থাৎ এর একটি সামাজিক ব্যবহার-মূল্য থাকতে হবে। উৎপাদটি তখনই পণ্য হিসেবে গণ্য হবে যখন বিনিময়ের জন্য, ক্রয় ও বিক্রয়ের জন্য সেটি উৎপাদিত হবে। পণ্যসামগ্রী একটি অপরটির বদলে বিনিময় হয় নির্দিষ্ট পরিমাণগত অনুপাতে। যেমন এক বস্তা চাল বিনিময় হতে পারে একটি শাড়ির বদলে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণগত অনুপাতে একটি পণ্যের আরেকটি পণ্যের বদলে বিনিময় হওয়ার ক্ষমতাকে বলা হয় বিনিময়-মূল্য। সুতরাং একটি উৎপাদকে পণ্য হতে হলে অবশ্যই দুটো গুণ থাকতে হবে। একটি হচ্ছে উৎপাদটির ব্যবহার-মূল্য এবং অন্যটি এর বিনিময়-মূল্য। পণ্যের এই দুটি গুণ পরস্পরের সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত। তার একটি যদি না থাকে তবে সেটি পণ্য হবে না, যে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রকাশ করে। পণ্যসামগ্রীর যে পরিমাণগত অনুপাতে একটির বদলে অন্যটি বিনিময় হয় সেই অনুপাতগুলো নির্ধারিত হয় কী দিয়ে ? স্বভাবত এই প্রশ্নটি আসে। দেখা যায় সোনার দাম রুপার দামের চেয়ে বেশি, এবং রুপার দাম লোহার চেয়ে বেশি। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদরা এই প্রশ্নটির উত্তর দেন নানাভাবে। কেউ বলেন, একটি পণ্যের বিনিময়-মূল্য নির্ধারিত হয় যোগান ও চাহিদার সম্পর্ক দিয়ে। চাহিদার চেয়ে যোগান বেশি হলে দাম নিম্নগামী হয় আর যখন চাহিদা যোগানের চেয়ে বেশি হয় তখন পন্যটির দাম ঊর্ধ্বগামী হয়। কিন্তু যোগান ও চাহিদা যদি সমান হয় তা হলে একটি পণ্যের দাম কিসের দ্বারা নির্ধারিত হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এই ধরনের যুক্তি প্রদানকারীদের নিকট থেকে পাওয়া যায় না। সোনা কেনো রুপার চেয়ে বেশি ব্যয়সাপেক্ষ এবং রুপা কেনো লোহার চেয়ে বেশি ব্যয়সাপেক্ষ, সে প্রশ্নের উত্তরও সেখান থেকে পাওয়া যায় না। বহু বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ পণ্যসামগ্রীর বিনিময়ে অনুপাতগুলোর ব্যাখ্যা করেন পণ্যসামগ্রীর উপযোগিতা দিয়ে। তাদের মতে একটি পণ্যের উপযোগিতা যতো বেশি, তার ব্যবহার-মূল্য ততো বেশি এবং তার দামও ততো বেশি। কিন্তু গুণগতভাবে পৃথক ব্যবহার-মূল্যগুলো তুলনা করা যায় কীভাবে ? এই প্রশ্নের উত্তর তাদের বক্তব্যে নেই। পণ্য-মূল্য : পণ্যসামগ্রীর পরিমাণগত তুলনার একটি নিগূঢ় বিষয় আছে। সেটি হচ্ছে পণ্যসামগ্রীর মধ্যে অভিন্ন একটা কিছু যা সেগুলোকে তুলনা করতে পারে। পণ্যসামগ্রীর ব্যবহার-মূল্যগুলোর মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। তবে সেগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন বিষয়ও আছে আর সেটি হচ্ছে শ্রম। সবগুলো পণ্য উৎপাদিত হয় শ্রম দিয়ে। এই পণ্যসামগ্রী উৎপাদনে যে শ্রম ব্যয় হয় তা সেগুলোর বিনিময়ে অনুপাত ঠিক করে। আর একমাত্র এই শ্রমই অনুপাত নির্ধারণ করার সম্ভাব্য ভিত্তি। কিন্তু বিভিন্ন উৎপাদক একই রকমের পণ্য উৎপাদনে সমান পরিমাণ শ্রম ব্যয় করে না। সেটা কৃৎকৌশলগত কারণে, শ্রমের উৎপাদনশীলতার পার্থক্যের কারণে, দক্ষতার মান ও শ্রমের নিবিড়তার পার্থক্যের কারণে। একটি পণ্যের মূল্য যদি প্রতিটি একক উৎপাদকের ব্যয়িত শ্রম-সময়ের পরিমাণের উপর নির্ভর করতো তা হলে সেটির উৎপাদনে উৎপাদক বেশি সময় ব্যয় করতো বেশি মূল্য পাওয়ার জন্য। কিন্তু তা হয় না। একটি পণ্যের মূল্য, সামাজিক-মূল্য নির্ধারিত হয় গড়পড়তা সামাজিকভাবে ব্যয়িত শ্রম-সময়ের পরিমাণ দিয়ে। উৎপাদনের সময়ে প্রচলিত শ্রম দক্ষতা ও নিবিড়তার গড়পড়তা মাত্রা দিয়ে। এই ধরণের শ্রম-সময়কে সামাজিক আবশ্যকীয় শ্রম-সময় বলা হয়। এই সামাজিক আবশ্যকীয় শ্রম-সময়ই পণ্যের সামাজিক মূল্য নির্ধারণ করে। শ্রমের দুই রকম চরিত্র : পণ্যের দুই গুণ, ব্যবহার-মূল্য এবং বিনিময়-মূল্য। পণ্যের মধ্যে আছে শ্রম। শ্রমেরও তাই দুই রকম চরিত্র রয়েছে। সমাজে বহু রকমের শ্রম বহু রকমের ব্যবহার-মূল্য সৃষ্টি করে। প্রতিটি ব্যবহার-মূল্যে এক নির্দিষ্ট ধরনের শ্রম মূর্ত থাকে। খাদ্যশস্যে মূর্ত থাকে একজন চাষির শ্রম, পোশাকে একজন দর্জির শ্রম, আর হাতুড়িতে একজন লোহা শ্রমিকের শ্রম। মূর্ত শ্রম নির্দিষ্ট ব্যবহার-মূল্য সৃষ্টি করে। খাদ্যশস্য ও পোশাকের মতো পণ্যসামগ্রী বিনিময় করতে গিয়ে আমরা নজরের মধ্যে রাখি না যে মূর্ত শ্রম এগুলো সৃষ্টি করে। এখানে খাদ্যশস্য ও পোশাক হলো শুধু নির্দিষ্ট শ্রমে নয়, আরো মানুষের কায়িক ও মানসিক প্রচেষ্টার প্রডাক্ট, সাধারণভাবে শ্রম ব্যয়ের উৎপাদ। এখানে দুটো পণ্যের পার্থক্য বিবেচিত হয় সেগুলোতে সাধারণভাবে ব্যয়িত শ্রমের পরিমাণে, গুণে নয়। বিনিময়ের সময় মূর্ত ধরনের শ্রমকে গণ্য করা হয় না, গণ্য করা হয় সাধারণভাবে ব্যয়িত শ্রমকে। সাধারণভাবে, সামাজিকভাবে ব্যয়িত শ্রমকে বলা হয় বিমূর্ত শ্রম। এই শ্রম একটি পণ্যের মূল্য সৃষ্টি করে। সুতরাং একজন পণ্য উৎপাদকের শ্রম হলো একদিকে মূর্ত যা ব্যবহার-মূল্য সৃষ্টি করে। অন্যদিকে তারই শ্রম হলো সাধারণভাবে ব্যয়িত শ্রমের, সামাজিক শ্রমের অংশ বিমূর্ত শ্রম যা পণ্যটির মূল্য সৃষ্টি করে। আরো সহজ করে বললে দাঁড়ায়, একজন পণ্য উৎপাদকের শ্রমের দুটি দিক আছে, তা হলো একাধারে মূর্ত ও বিমূর্ত। সারসংক্ষেপ করে এই সিদ্ধান্ত টানা যেতে পারে যে একটি পণ্যের মূল্য হলো সেটির উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রম ও পণ্যটিতে মূর্ত সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় বিমূর্ত শ্রম। সুতরাং একটি পণ্যের মূল্যের মোট পরিমাণ মূখ্যত নির্ধারিত হয় শ্রম-সময়ের স্থায়িত্বকাল দিয়ে। একটি পণ্যের উৎপাদনে সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় শ্রম-সময়ের ব্যয় যতো বেশি, তার মূল্যও ততো বেশি। শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলে, একটি পণ্য-এককের মূল্য হ্রাস পায় কারণ তখন শ্রম-সময় কম লাগে। মার্কসই সর্ব প্রথম শ্রমের দুই রকম চরিত্র আবিষ্কার করেছিলেন। পুঁজিবাদী উৎপাদনের সারমর্ম ও তার বিকাশের নিয়মগুলো উদ্ঘাঁন করার ক্ষেত্রে তা ছিলো অতিব গুরুত্বপূর্ণ। মার্কস মনে করতেন যে শ্রমের দুই রকম চরিত্রকে কেন্দ্রবিন্দু করে আবর্তিত হচ্ছে অর্থনীতির সুস্পষ্ট উপলব্ধি। ব্যক্তিগত ও সামাজিক শ্রমের মধ্যে দ্বন্দ্ব : পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সব দ্বন্দ্ব পণ্যসামগ্রীর মধ্যে ভ্রুণাবস্থায় থাকে। আমরা জেনেছি, মূল্য হলো পণ্যে মূর্ত সামাজিক শ্রম। সেই সঙ্গে জেনেছি, ব্যক্তিগত সম্পত্তি-মালিকানাভিত্তিক অর্থনীতিতে পণ্য উৎপাদকের শ্রমের একটা ব্যক্তিগত চরিত্র থাকে। সে ইচ্ছেমতো নানা রকম পণ্য উৎপন্ন করতে পারে যেমন- পাদুকা, ধান, ফল, পোশাক, খেলনা ইত্যাদি। দেখে মনে হতে পারে উৎপাদক এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে। কিন্তু আসলে বিষয়টা মোটেই এরকম না। পণ্য উৎপাদক মূলত সামাজিক শ্রম বিভাজনে বাঁধা। যেমন- পোশাক তৈরি করার জন্য একজন দর্জির এমন অনেক কিছু প্রয়োজন পড়ে যা সে নিজে উৎপাদন করে না। তাই সে আরো অন্যান্য পণ্য উৎপাদকের উপর নির্ভরশীল যারা তারই মতো ব্যক্তিগত সম্পত্তি-মালিক। সরাসরি একটা ব্যক্তিগত চরিত্র থাকার পরও একজন পণ্য উৎপাদকের শ্রম সামাজিক শ্রমের দলাটিরও একটা অংশ। কিন্তু সেই সামাজিক শ্রম গোপন থাকে, প্রকাশ পায় শুধু বাজারে পণ্য বিনিময়ের প্রক্রিয়ায়। উৎপাদক যখন তার পণ্যটি বাজারে বিক্রয়ের জন্য নিয়ে আসে, একমাত্র তখনই সে দেখতে পায় সেই পণ্যটি সমাজের দরকার কিনা। অর্থাৎ তার শ্রম সামাজিক শ্রমের অংশ কিনা। সমাজের দরকার নেই এমন একটি পণ্য যদি সে উৎপাদন করে থাকে তাহলে সেটি বিক্রি হবে না। সহজ ভাষায় বলা যায় সেটির ব্যবহার-মূল্য সমাজের দ্বারা স্বীকৃত হবে না। সেটির উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রম হবে প-শ্রম। তবে কখনো এর উল্টোটাও ঘটে, যেমন- পণ্যটির সামাজিক ব্যবহার-মূল্য থাকলেও জনসাধারণের দারিদ্র্যতার কারণে তাদের কেনার সামর্থ না থাকায় পণ্যটি বিক্রি নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যয়িত শ্রমেরও অপচয় হলো। এই ব্যাপারগুলো হলো পণ্যের ব্যাবহার-মূল্য ও মূল্যের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব। মূর্ত ও বিমূর্ত শ্রমের মধ্যে দ্বন্দ্বের এক বহিঃপ্রকাশ। এই দ্বন্দ্বগুলো প্রকাশ করে সরল পণ্য উৎপাদনের মূল দ্বন্দ্বকে। প্রকাশ করে ব্যক্তিগত ও সামাজিক শ্রমের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে। তাই পণ্য উৎপাদকের শ্রমের আছে একাধারে নিজস্ব বা ব্যক্তিগত চরিত্র এবং লুকোনো এক সামাজিক চরিত্র। সামাজিক চরিত্রটি প্রকাশ পায় শুধু পরোক্ষভাবে বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্য দিয়ে। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদরা পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষের সাথে বস্তু বা পণ্যসামগ্রীর সম্পর্ক ছাড়া অন্য কিছু দেখেননি। মার্কস সেখানে উদ্ঘাটন করেছিলেন এক বস্তুগত বাইরের আবরণে ঢাকা মানুষে মানুষে সম্পর্ককে।