এইচএসসি নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত ‘মন্দের ভালো’

Posted: 11 অক্টোবর, 2020

এ এন রাশেদা : বর্তমানে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বলা যায়– তা মন্দের ভালো। তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যদি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায় সব মানুষের জন্য সুশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগিয়ে যেত, তাহলে হয়তো হতো। এই মুহূর্তে ‘ও’-লেভেল পরীক্ষা ১ অক্টোবর থেকে যেভাবে বাংলাদেশে নেয়া শুরু হয়েছে সেভাবে নিতে পারত। তবে তারাও করোনার ভয়াল উপস্থিতির জন্য মে-জুনের পরীক্ষা নিতে পারেনি। আর মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার যে-শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা হলো, তা হলো– দেশের সব মানুষের জন্য সুশিক্ষা, একটা স্তর পর্যন্ত সবাই রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে সম্পৃর্ণ নিঃখরচায় মানবিক শিক্ষা পাবে। যে শিক্ষার মধ্য দিয়ে কোনো দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, নারী নির্যাতনকারী, নদী-নালা, খাল-বিল দখলকারী, হত্যাকারী, অমানুষ তৈরি হবে না। কোথাও কোনো মন্দ স্কুল থাকবে না। সব স্কুলই প্রায় সমান মানসম্মন্ন হবে। এলাকার শিশুরা এলাকায় পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে পারবে। গাড়ির ধোঁয়া ছেড়ে পরিবেশ দূষণ করে কাউকে আসতে হবে না। আর শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ক্লাসেই সম্পন্ন হবে। বইপত্র স্কুলেই থাকবে। শিক্ষার্থী শিক্ষক অনুপাত ৩০ঃ১ হবে। এই নিয়ম অনেক দেশেই আছে। তবে অনুপাত আরও কম। তাহলে করোনাকালে দূরত্ব বজায় রেখে পরীক্ষা নেয়া যেতে পারত। কিন্তু তা কোনো কিছুই আমারে দেশে স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরেও অর্জিত হয়নি। এমনকি শিক্ষকের সম্মান টুকুও নেই। প্রয়োজনীয় শিক্ষকও নেই। তার উপর আছে অনেক প্রতিষ্ঠানে মাসিক বেতনহীন অবস্থা। আছে নিপীড়ন, নির্যাতন, আর আছে মন্ত্রণালয়ের মিথ্যাচার, অসাধুতা, কপটতা ইত্যাদি নানা উপকরণ। একটু উদাহরণভ না দিলেই না। যেমন ২৯ জুলাই ২০১৮ দৈনিক সংবাদ রিপোর্ট করেছিল “শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিও–ভুক্তিতে ঘুষ দুর্নীতি আরও বেড়েছে। এমপিও ভুক্তির আবেদন উপজেলা থেকে জেলা শিক্ষা অফিস পর্যন্ত অনুমোদন পেতে ঘুষ দিতে হয়–৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগের অনুমোদন পেতে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। শিক্ষক নিয়োগে মহাপরিচালকের প্রতিনিধি পেতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।” তাহলে শিক্ষা আর থাকল কোথায়? এরকম অনেক উদাহরণ আছে দুর্নীতির। তবে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পদ খালির সামান্য উদাহরণ দিতে চাই। ১০ জুন ২০১৮ তারিখে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছিল– ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৪১ হাজার ৮৬৯টি পদ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ১২ হাজার ৮৩৭টি এবং কারিগরি বিভাগের পদও খালি আছে। তাহলে লেখাপড়াটা কিভাবে হবে? আমরা আজ যারা এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি– সারা বছর তারা যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান, মূল্যায়ন, শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত, শিক্ষকের মাসিক বেতন, শিক্ষকের মর্যাদা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এলাকার মাস্তান, শিক্ষামন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের-অন্যায় অধিকারের বিষয়-নিয়ে কথা আমরা বলতাম, তাহলে সমাজে এত অক্ষয় অনাচার, ব্যাভিচার সংঘটিত হতো না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের শিক্ষাদান প্রক্রিয়া, মাসিক বা ক্লাস-পরীক্ষা, অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা, বার্ষিক পরীক্ষাসমূহ সুষ্ঠুভাবে নিয়মিত নিতে পারত। এবং এইগুলো সব না নিলেও প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই এইচএসসি পরীক্ষার আগে টেস্ট পরীক্ষা তো অবশ্যই নিয়ে থাকে। তাই শিক্ষামন্ত্রণালয়, কলেজের এই পরীক্ষার ফলাফলটুকু জেএসসি ও এসএসসি’র সঙ্গে যুক্ত করে অনুপাত করতে পারলে আরও ভাল হতো। আর শিক্ষার্থীদের উচ্চতর শিক্ষায় ভর্তির বিষয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করত তাহলে এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার যে প্রবল আকাঙ্ক্ষা শিক্ষার্থীদের ছিল তা কিছুটা স্বস্থি পাবে। আর এই ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিতভাবে যেন নেয়া যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে জরুরি ভিত্তিতেই করা দরকার বলে আমি মনে করি। লেখক : সাবেক শিক্ষক, নটরডেম কলেজ; সম্পাদক, শিক্ষাবার্তা