প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাওয়ে পুলিশের হামলা

Posted: 11 অক্টোবর, 2020

একতা প্রতিবেদক : বন্ধ সকল রাষ্ট্রীয় পাটকল চালু ও আধুনিকায়ন করার দাবিতে ৫ অক্টোবর বাম গণতান্ত্রিক জোটের উদ্যোগে সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঘেরাও এর উদ্দেশ্যে এক বিশাল মিছিল শাহবাগ মোড়ে পুলিশ বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হলে শেরাটন মোড়ে ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ পুনরায় ব্যারিকেড দিয়ে দুই দিক থেকে মিছিলকে ঘিরে ফেলে। মিছিলটি ব্যারিকেড ভেঙে যাওয়া চেষ্টা করলে পুলিশ হামলা ও লাঠিচার্জ এবং নারী কর্মীদের লাঞ্ছিত করে। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় আগামী ১৯ অক্টোবর রাজপথ অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঘেরাও মিছিলের পূর্বে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জোটের কেন্দ্রীয় নেতা সিপিবি’র সহকারী সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির চন্দন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা আকম জহিরুল ইসলাম, লতিফ জুট মিলের শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা সুলতান মৃধা ও করিম জুট মিলের শ্রমিক মো. গোফরান। সমাবেশ পরিচালনা করেন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির নেতা শহিদুল ইসলাম সবুজ। সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন, মানস নন্দী, আকবর খান, মনিরুদ্দিন পাপ্পু, নজরুল ইসলাম। সমাবেশে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজ যখন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচির সমর্থনে খুলনার শ্রমিকরা ভুখা মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেই সময় গতকাল খালিশপুরে বাসদ ও শ্রমিক ফ্রন্ট কার্যালয়ে পুলিশী তল্লাশী ও ভুখা মিছিলের লিফলেট কেড়ে নেওয়া ও পরে আন্দোলনরত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। যা রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী চরিত্রকেই প্রকাশ করে। বক্তারা বলেন, দমন-পীড়ন-নির্যাতন ও গ্রেপ্তার করে, ভয় দেখিয়ে জনগণের আন্দোলনকে স্তব্ধ করা যাবে না। বক্তারা বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার পাটকল বন্ধ করেছে, ১৫টি চিনিকল বন্ধের পাঁয়তারা করছে। রাষ্ট্রায়ত্ব সকল প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছে। এই সরকারের আমলে দুর্নীতি, লুটপাট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, নারী-শিশু নির্যাতন-ধর্ষণ সকল রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ আজ দুর্নীতিলীগ-লুটেরালীগে এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগ ধর্ষক লীগে পরিণত হয়েছে। ফলে বর্তমান সরকারের কাছে দেশ-জাতি ও জনগণ নিরাপদ নয়। দুর্নীতি-দুঃশাসন এর অবসানের লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো ছাড়া কোন বিকল্প নাই। সরকারের পদত্যাগ এর দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য দেশের সকল গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি আহ্বান জানান। সমাবেশে বক্তারা বলেন, করোনা মহামারিতে পুরো দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন। ঠিক এ সময়েই বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ করে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে প্রায় ৫১ হাজার শ্রমিককে বেকার করে দিয়েছে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার। এই দুর্যোগে সারা দুনিয়ায় যেখানে নানা প্রণোদনা দিয়ে মানুষের জীবিকা রক্ষার চেষ্টা চলছে, সেখানে বাংলাদেশে করোনা মহামারির এই দুর্যোগের মধ্যে সোনালী আঁশের ঐতিহ্যবাহী পাটকল বন্ধ করে দিয়েছে। জনগণের পাটকল দেশি-বিদেশী লুটেরাদের কাছে বিক্রি করার পাঁয়তারা করছে সরকার। তারা আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে বিপুলভাবে। বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের পেছনে সরকারের বড় অজুহাত লোকসান। কিন্তু কেন লোকসান, কাদের কারণে লোকসান, লোকসান বন্ধ করতে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল? সে সব প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। সরকার মাথা ব্যথায় ওষধ না দিয়ে মাথা কেটে ফেলার ব্যবস্থা করছে। বক্তারা বলেন, আমরা বার বার বলেছি লোকসানের জন্য দায়ী সরকারের ভুলনীতি, দুর্নীতি এবং লুটপাট। সময়মত পাট কেনার টাকা না দেয়া, পরবর্তীতে বেশি দামে নিম্নমানের পাট কেনা, ৫০/ ৬০ বছরের পুরনো তাঁত দিয়ে উৎপাদন করা, বিজেএমসি’র মাথাভারি প্রশাসনের ব্যয় ইত্যাদি হলো লোকসানের প্রধান কারণ। বক্তাগণ বলেন, ২৫টি পাটকলের ১০ হাজার তাঁতের মধ্যে অর্ধেকই অচল, ফলে অচল ও পুরনো যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন না করে পাটকল লাভজনক করা যাবে না। বাম জোট ও স্কপের পক্ষ থেকে হিসেব করে দেখানো হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ করে আধুনিক তাঁত স্থাপন করলে উৎপাদন বাড়বে তিনগুণ, শ্রমিকদের গড়ে ২৫ হাজার টাকা বেতন দিয়েও পাটকল লাভজনক করা সম্ভব। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করে দেশী-বিদেশী লুটেরাদের স্বার্থে কারখানা বন্ধ করে শ্রমিক ছাঁটাই করার পদক্ষেপ নিয়েছে। বাম নেতারা বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে ৫১ হাজার পাটকল শ্রমিক, ৪০ লাখ পাটচাষি, পাট ও পাটশিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় ৪ কোটি মানুষ। বন্ধ হওয়ায় সরকারি পাটকল আর পাট কিনবে না। এ সুযোগে বেসরকারি পাটকলগুলো সিন্ডিকেট করে ইচ্ছেমতো পাটের দাম নিয়ন্ত্রণ করবে। এতে পাটচাষীরা পাটের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হবে। পাটকল বন্ধ হওয়ায় ভারতে কাঁচা পাট পাচার আরও বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। পাট বাংলাদেশের একটি স্থায়ী শিল্পের ভিত্তি রচনা করেছিল, যার কাঁচামাল দেশে উৎপাদিত হয়, সস্তা শ্রম শক্তিও দেশের, উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা পূরণ করার পরও রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। সেই শিল্প অর্থনীতি ও শ্রমিক কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় পাটকল বন্ধের গণবিরোধী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে অবিলম্বে চালুর দাবি জানান নেতৃবৃন্দ। তারা আরও বলেন, এই সরকার আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। ভোট ডাকাতির সরকারের দেশ ও জনগণের প্রতি কোন দায় নাই, ফলে দেশ ও জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে। নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্রীয় পাটকলসহ সকল রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার্থে গণবিরোধী ভোট ডাকাতির সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ঘেরাও মিছিল থেকে বন্ধ সকল রাষ্ট্রীয় পাটকল চালু ও আধুনিকায়ন করা, শ্রমিকদের সকল বকেয়া পরিশোধ, লোকসানের জন্য দায়ী মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসির কর্মকর্তাদের বিচার, সরকারি-বেসরকারি সকল পাটকলে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার দাবিতে আগামী ১৯ অক্টোবর সারাদেশে রাজপথ অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।