স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবি না মানলে ১৬ অক্টোবর লংমার্চ

Posted: 11 অক্টোবর, 2020

একতা প্রতিবেদক : ঢাকার শাহবাগে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগসহ নয় দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত মোর্চা ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’। গত ৯ অক্টোবর বিকাল ৩টা থেকে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশ থেকে ৯ দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হল- সারা দেশে অব্যাহত ধর্ষণ-নারীর প্রতি সহিংসতার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণ, নিপীড়ন বন্ধ ও বিচারে ‘ব্যর্থ’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে; পাহাড়-সমতলে আদিবাসী নারীদের ওপর সামরিক-বেসামরিক সব ধরনের যৌন ও সামাজিক নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে; হাই কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে নারী নির্যাতন বিরোধী সেল কার্যকর করতে হবে। সিডো সনদে স্বাক্ষর ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক সব আইন ও প্রথা বিলোপ করতে হবে; ধর্মীয়সহ সব ধরনের সভা-সমাবেশে নারীবিরোধী বক্তব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। সাহিত্য, নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে বিটিসিএলের কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চায় সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে; তদন্তকালীন সময়ে ভিকটিমকে মানসিক নিপীড়ন-হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ভিকটিমের আইনগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; অপরাধ বিজ্ঞান ও জেন্ডার বিশেষজ্ঞদের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়িয়ে অনিষ্পন্ন সব মামলা দ্রুত নিষ্পন্ন করতে হবে; ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-১৫৫ (৪) ধারা বিলোপ করতে হবে এবং মামলার ডিএনএ আইনকে সাক্ষ্য প্রমাণের ক্ষেত্রে কার্যকর করতে হবে; পাঠ্যপুস্তকে নারীর প্রতি অবমাননা ও বৈষম্যমূলক যে কোনো প্রবন্ধ, নিবন্ধ, পরিচ্ছেদ, ছবি, নির্দেশনা ও শব্দ চয়ন পরিহার করতে হবে এবং গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। সমাবেশে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা বলেন, ‘আমরা ধর্ষণের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি করব সারা দেশে। ধর্ষণকে উচ্ছেদ করে ছাড়ব এ দেশ থেকে।’ ১৬ অক্টোবরের আগে দাবি মেনে না নেওয়া হলে সেদিন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ অভিমুখে ধর্ষণবিরোধী লংমার্চের ঘোষণা দিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায় টানা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিৎ করার দাবিতে প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান চলবে। এছাড়া ১১ অক্টোবর ধর্ষণবিরোধী আলোকচিত্র প্রদর্শনী, ১২ অক্টোবর সাংস্কৃতিক সমাবেশ, ১৩ অক্টোবর চলচ্চিত্র উৎসব, ১৪ অক্টোবর নারী সমাবেশ ও ১৫ অক্টোবর সারা ঢাকায় ধর্ষণবিরোধী সাইকেল র?্যালির কর্মসূচি ঘোষণা করেন অনিক। পূর্বঘোষিত এই মহাসমাবেশের শুরুতে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। এই পর্বটি সঞ্চালনা করেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন। ‘পুলিশ যেদিন জনতার কাতারে দাঁড়াবে সেদিনই ধর্ষণ, সন্ত্রাস দূর হবে’: সারাদেশে অব্যাহত ধর্ষণ, নারী নিপীড়ন এবং ছাত্র নেতাদের উপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। গত ৪ অক্টোবর সচিবালয়ের সামনে ঘেরাও মিছিল পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে পড়লে সেখানেই বিক্ষোভ সমাবেশ করে ছাত্র ইউনিয়ন। বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে পুলিশের কাছে একটি শুভেচ্ছা কার্ডে পুলিশকে সুস্থ হয়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা। এদিন ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে যায়। সচিবালয়ের সামনে পুলিশি বাধা দিলে সেখানেই বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেলের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়ের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক রেশমী সাবা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক আসমানি আশা, ঢাকা মহানগরের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক সাদাত মাহমুদ, নারায়ণগঞ্জ জেলা সংসদের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক চিত্রা ঘোষ পরমা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক নাজিফা জান্নাত। সমাবেশে বক্তারা বলেন, যে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ধর্ষণ একটি স্বাভাবিক ঘটনা সেই দেশের পুলিশের কাছ থেকে নিপীড়নর ব্যতিত অন্য কোনো কিছু আশা করাটাই দিবাস্বপ্নের সামিল। ভোট চুরির সরকার এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করেছে যে ব্যবস্থায় পুলিশসহ সকল প্রতিষ্ঠানে শুধুমাত্র অসুস্থ লোক তৈরি করছে। ফলে এই অসুস্থ লোকদের সাথে আমাদের কোনো সংঘাত নেই। আমরা আশা করব বাংলাদেশ পুলিশ খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে এবং সরকারের আজ্ঞাবহ দাস থেকে জনতার কাতারে এসে দাঁড়াবে সেইদিন বাংলাদেশ থেকে শুধু ধর্ষণ-সন্ত্রাস নয়, যে স্বৈরাচারি সরকারি ব্যবস্থা বিদ্যমান তাকেও উপড়ে ফেলা সম্ভব। ফলে আজকে আমরা পুলিশের সুস্থতা কামনা করার জন্য এসেছি। সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির এই দেশে নারীদের ওপর সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তনু, আফসানাসহ অধিকাংশ ধর্ষণের মামলাতেই এই বিচারহীনতার কারণে ধর্ষকরা শাস্তি পাওয়ার পরিবর্তে মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একের পর এক ধর্ষণ ও খুনের বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা বিকৃত অপরাধীর মানসিকতার মানুষদেরকে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটাতে অভয় দিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে নারী নিপীড়ন, ধর্ষণ বেড়েই চলছে। এই রাষ্ট্র নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। ধর্ষণবিরোধী গ্রাফিতি আঁকার দায়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের পুলিশি হয়রানি ও গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। নেতৃবৃন্দ বলেন, এই পুলিশি হয়রানির নামই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। জনগণের সেবক হিসাবে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এহেন আচরণ সরকারি দল সুরক্ষার রক্ষাকবচ ব্যতীত অন্যকোন সংজ্ঞায় আখ্যায়িত করা যায় না। যে হাতিয়ার দলীয় ক্যাডার হিসাবে ব্যবহৃত হয় সরকারি দলের স্বার্থ হাসিল করতে। এই হাতিয়ারই হয়রানি, গুম, খুন-ধর্ষণের মতো হাজারটা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মদদ জোগায় এবং তারা পুলিশকে ধর্ষণ-নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনে সংহতি ও সামিল হওয়ার আহ্বান জানান। অবিলম্বে এমসি কলেজে সংঘঠিত হওয়া ঘটনাসহ সকল নারী সহিংসতা, গুম, খুন ও ধর্ষণের যথোপযুক্ত বিচার এবং ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ছাত্র ইউনিয়ন সারাদেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে নারী নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলবে এবং সব ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ডের উপযুক্ত জবাব দেবে। ধর্ষকদের মদদদাতাদেরও ধরতে হবে: দেশব্যাপী একের পর এক নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে, হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাশিম কবিরের উপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন। গত ৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টায় পুরানা পল্টন মোড়ে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। বক্তব্য রাখেন গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্্েরদর সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার, হকার্স ইউনয়িনের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ, সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জসিমউদ্দিন, প্রচার সম্পাদক মিজানুর রহমান, কেন্দ্রীয় নেতা শাহিনা আক্তার, মাহবুবা নার্গিস। সমাবেশে বক্তারা বলেন, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গৃহবধূর ওপর নির্মম নারকীয় বীভৎস্য, সিলেটের এমসি কলেজের নববধূ, খাগড়াছড়িতে আদিবাসী নারীর সম্ভ্রমহানিসহ সারাদেশ ধর্ষণের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ধর্ষণ বন্ধ করতে চাইলে শুধুমাত্র ধর্ষকদের ধরলে ধর্ষণ কমবে না, ধর্ষকদের পেছনে গডফাদার আছে, তাদের ধরতে হবে। মদদদাতাদের ধরতে হবে। ধর্ষক ও মদদদাতাদের ফাঁসি দিতে হবে। বক্তারা হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাশিম কবিরের ওপর হামলাকারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের গ্রেফতার ও শাস্তির পাশাপাশি সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের লালন-পালনকারী গডফাদারদেরও গ্রেপ্তার করার দাবি জানান। সমাবেশের পূর্বে বিক্ষোভ মিছিলটি বায়তুল মোকাররম লিংক রোড স্টেডিয়াম-গুলিস্তান-গোলাপশাহ মাজার-জিরো পয়েন্ট-মুক্তাঙ্গন হয়ে পল্টন মোড়ে বিক্ষোভ করেন।