মহামারি-বিপর্যয় এবং বামপন্থিরা

Posted: 11 অক্টোবর, 2020

বিশ্ব আজ ভয়াবহ সংকটের মুখে। করোনা মহামারি সারা বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। অতীতেও প্লেগ, বসন্তসহ নানা ধরনের মহামারি বিশ্বকে বিপর্যস্ত করেছিল। বহু মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। আমাদের এই উপমহাদেশও এর বাইরে ছিল না। মহামারি দুর্ভিক্ষ ও খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এই ভূ-খণ্ডেও বিভিন্ন সময়ে মানব জীবনকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। এগুলোর বিরুদ্ধেও মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছে, মোকাবেলা করেছে, ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্যোগ-মহামারিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কারা? শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশ। বিপন্ন এই মানুষের পাশে যুগে যুগে যারা দাঁড়িয়েছে তারা কারা? তারা হলে– বিল্পবী মানবতাবাদী দেশপ্রেমিক মানুষ। বিপ্লবী মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে এগিয়ে আসে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা। আমাদের দেশে অতীতেও তাই হয়েছে। কমিউনিস্টরা যেমন শোষণ মুক্তি, সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে ঠিক তেমনিভাবে বিপন্ন মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একদিকে যেমন বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে ঠিক তেমনিভাবে রাজনৈতিকভাবেও সকল প্রকার অনিয়ম দুর্নীতি লুটপাট এবং স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বর্তমান সরকারের ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও রাজপথে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। ‘করোনাকালে’ শুরু থেকেই মানুষকে সচেতন করা, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে যতটুকু সামর্থ্য ছিল পুরোটাই কাজে লাগিয়েছে। তরুণ কমিউনিস্ট কর্মীরা ‘করোনার’ ঝুঁকি নিয়েও শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের খাবার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, নগদ অর্থ, চিকিৎসা সেবা– নানা ধরনের সহযোগিতা করেছেন। ছাত্র-যুবকরা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক তৈরি করেছে। কমিউনিস্ট পার্টি সারাদেশে লক্ষ লক্ষ হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক বিতরণ করেছে। প্রায় লক্ষাধিক পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। ফুড কোর্ট স্থাপন করে দীর্ঘ প্রায় ৪ মাস রান্না করে নিরন্ন মানুষকে খাবার খাইয়েছে। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছেও রাতের আঁধারে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে। কেননা করোনাকালীন সময়ে অনেক মধ্যবিত্তের ঘরেও খাবার ছিল না। কমিউনিস্টদের এই নিয়ে নানা বিদ্রƒপও শুনতে হয়েছে। অতীতেও এটা ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির চিকিৎসকরা ২৪ ঘণ্টা নানাভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীদের পরামর্শ দেয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। সবার জন্য স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত কর এই দাবিতে লড়াই সংগ্রাম গড়ে তোলার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। বিভিন্ন দুর্যোগ মহামারিতে অনেকেই সাধারণভাবে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসে। কিন্তু কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের এগিয়ে আসাটা ভিন্ন ধরনের। কমিউনিস্টরা দুর্যোগ-মহামারির মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত এবং তা প্রতিরোধ করে এবং শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের মুক্তি-সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত করে অগ্রসর করে নেয়। শুধু আমাদের দেশে নয় প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখা যায় ভারতের কমিউনিস্টরাও একদিকে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে তেমনি কৃষক-শ্রমিকের অধিকার নিয়েও রাজপথে সংগ্রাম করছে। শুধু ভারত নয় সারা পৃথিবীর কমিউনিস্টরাও একই ধারাই অগ্রসর হচ্ছে। কেননা এই করোনা সারা বিশ্বের মানুষের সামনে পরিষ্কার করে দেখিয়ে দিয়েছে পুঁজিবাদ বিশ্ব মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে না। একমাত্র সমাজতন্ত্রের পথই পারে একটি বিপ্লবী মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাত-কাপড়-জমি-কাজের লড়াই এবং ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন-হঠানোর সংগ্রামকে এক মোহনায় নিয়ে আসতে হবে। ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ধৈর্যের সাথে এই কর্তব্য সস্পন্ন করতে পারলে ভবিষ্যৎ কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদেরই হবে, এ বিষয়ে কোন সংশয় নেই। যে কোনো মহামারি বিপর্যয়ের সময় আমাদের দেশের কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরা মানুষের সামনে ও পাশে থেকে যে ভূমিকা রেখেছে তেমনিভাবে রাজনৈতিক দৃঢ়তায় নীতি ও আদর্শ নিয়ে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও অনুরূপ ভূমিকা পালন করতে হবে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে এই ভূমিকা রাখতে পারলেও ফসল ঘরে তোলা যায়নি। এবার এই সম্ভাবনাকে কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না। কেননা সাম্প্রতিক সময় এই করোনা বিপর্যয়ে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ দেখেছে তাদের দুঃখ দুর্দশার সময় কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরাই ছিল, অন্য কেউ ছিল না। কমিউনিস্ট ও বামপন্থিরাই কিছু করলে করতে পারবে এই ধরনের মনোভাবও সাধারণ মানুষের তৈরি হয়েছে, এটাই বাস্তবতা। এই বাস্তবতা ও সম্ভাবনাকে নিয়ে অগ্রসর হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের নেই।