ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা

Posted: 28 জুন, 2020

১৯৬৮ সালের ১৬ই জুন ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা পৃথিবীর প্রথম নারী মহাকাশচারী হিসেবে মহাশূন্যে গিয়েছিলেন এবং ২ দিন ২ ঘণ্টা কাটিয়ে এসেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভস্তক-৬ মহাকাশযানে। ভালেন্তিনা তেরেস্কোভা মধ্য রাশিয়ার ইয়ারোস্লাভ ওব্লাস্তের অধীনে তুতায়েভস্কি জেলার মাসলেনিকোভো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন ট্রাক্টর ড্রাইভার, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শহীদ হন। যখন ভ্যালেন্তিনার বয়স মাত্র ২ বছর। ভ্যালেন্তিনার মা ছিলেন সুতাকলের শ্রমিক। রাষ্ট্র যেহেতু সমাজতান্ত্রিক তাই ভ্যালেন্তিনাসহ ৩ ভাইবোনকে চালাতে মায়ের শ্রমিক হিসেবে টেনশন নিতে হয়নি। সোভিয়েত মহাকাশ প্রোগ্রামের জন্য নির্বাচিত হবার আগে তেরেস্কোভা ছিলেন টেক্সটাইল কারখানার কর্মী এবং অপেশাদার স্কাইডাইভার। তিনি কসমোনাট কর্পসের অংশ হিসাবে সোভিয়েত বিমান বাহিনীতে যোগদান করেছিলেন এবং প্রশিক্ষণ শেষ করে অফিসার হিসাবে কমিশন লাভ করেছিলেন। পরে তিনি ঝুকভস্কি এয়ার ফোর্স ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমি থেকে স্নাতক হন এবং মহাকাশে যাত্রার জন্য তিনি যোগ্যতা অর্জন করেন। মহাকাশ পরিভ্রমণ শেষে তিনি এ প্রকল্প ত্যাগ করেন। এরপর ৩ নভেম্বর, ১৯৬৩ তারিখে আন্দ্রিয়ান জি. নিকোলায়েভ নামের একজন নভোচারীকে বিয়ে করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি মেজর জেনারেল পদমর্যাদা অর্জন করে বিমান বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে তেরেস্কোভা স্থানীয় কমসোমল বা যুব কমিউনিস্ট লীগে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সুপ্রিম সোভিয়েতের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। সোভিয়েত নারী সমিতির পরিচালক নিযুক্ত হন ১৯৬৮ সালে। ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সুপ্রিম সোভিয়েত প্রেসিডিয়ামের সদস্যরূপে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে তিনি ইয়ারোস্লাভ প্রদেশের সংসদের ইউনাইটেড রাশিয়া দলের সদস্যরূপে সহ-সভাপতি নিযুক্ত হন। তেরেস্কোভা ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের বীর’ এবং দুইবার অর্ডার অব লেনিন পুরস্কারে ভূষিত হন। ভ্যালেন্তিনার বয়স যখন ২০-২২, তখন তিনি আগ্রহী হয়ে উঠেন স্কাই ডাইভিং ও প্যারাগ্লাইডিংএ। পুঁজিবাদী কোনো রাষ্ট্রে এই সময়ও কি চিন্তা করা যায় একজন শ্রমিকের সন্তান তাও কন্যা সন্তান স্কাই ডাইভিং, প্যারাগ্লাইডিং করতে পারে? সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় বলেই একজন শ্রমিকের সন্তানও পারে তার মেধা ও যোগ্যতার বাস্তব প্রয়োগ ঘটাতে। অথচ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে মধ্যবিত্তও পারে না তার মেধা ও ইচ্ছা অনুযায়ী ক্যারিয়ার বেছে নিতে। ১৯৬৮ সালে শ্রমিকের সন্তান ভ্যালেন্তিনা যখন প্রথম নারী হিসেবে মহাকাশে গেলেন তখন ইউরোপের অনেক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রেই নারীদের ভোটাধিকার ছিল না আর এদিকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে নারীরা পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে ফাইটার জেটের পাইলট, ট্যাংক ডিভিশনের কমান্ডার, আটলান্টিকের তলদেশে গবেষণারত বিজ্ঞানী। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেহেতু মানুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করে তাই নর ও নারী উভয়েরই সমান সামাজিক সুযোগ ও অবস্থান নিশ্চিত করা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি। ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের বাস্তব দৃষ্টান্ত। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিক্ষা মানুষের অধিকার আর পুঁজিবাদে শিক্ষা মানুষের সুযোগ- মানে যার সুযোগ আর সামর্থ্য আছে সেই পাবে শিক্ষার সুযোগ। সকলের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করে সমাজতন্ত্র, তাই শ্রমিকের সন্তানও মহাকাশচারী হবার স্বপ্ন দেখতে পারে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যা একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে মধ্যবিত্তের জন্যও কল্পনাতীত। সোভিয়েত ইউনিয়ন আজ নেই কারণ সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই ডেকেছে কিন্তু আমাদের সামনে কিছু দৃষ্টান্ত রেখে গেছে, যে সমাজতন্ত্রের যথাযথ প্রয়োগ কিভাবে শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে হয়। শুধু তাই নয়, আজ যে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রেও নারীরা মাতৃকালীন লম্বা ছুটি পায় সাথে বেতনও পায় সেটা কমরেড লেনিন সোভিয়েত ইউনিয়নে সবার আগে শুরু করেন। ১৬ই জুন ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভার মহাকাশে শুধু প্রথম নারী হিসেবে প্রবেশই নয়, এই দিনটিতে তিনি তারাদের রাজ্যে গিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে কোনো সমাজব্যবস্থায় নারীরা নিজেদের সীমানা অতিক্রম করতে পারবে সত্যিকারভাবে। (ফাহিম পবনের ফেসবুক ও উইকিপিডিয়া থেকে)