শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রপাগান্ডা, সরকারের সফলতা

Posted: 28 জুন, 2020

নজির আমিন চৌধুরী জয়: মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল এবং সাসটেনেইবল ডেভেলপমেন্ট গোলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিক্ষায় জাতীয় বাজেটের ১৫%-২০% বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বৈশ্বিক অঙ্গীকার থাকলেও ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার শিক্ষায় বরাদ্দ দিয়েছে ১১.৬৯%। সত্য কথা হচ্ছে, বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীদের বিশেষ প্রভাব থাকায় দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ১,০৩,০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থাকলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অংশীজন, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও ছাত্র সংগঠনগুলো বহু বছর ধরেই শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসলেও কোনো সরকারই বাজেটে তাদের দাবি আমলে নেয়নি। বর্তমান সরকারের আমলেও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১১-১২ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের ২ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। টাকার অঙ্কে ও হারে বরাদ্দ বাড়লেও আশান্বিত হওয়ার মতো কিছু দেখা যাচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উত্থাপিত বাজেটে শিক্ষা খাতে ৮৭ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবনায় আছে শুভংকরের ফাঁকি। তিনি বলছেন, সরকারের ২৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু এর মধ্যে শিক্ষাবহির্ভূত খাতের বরাদ্দও আছে। যেহেতু বাজেটে মন্ত্রণালয় ধরে খাতওয়ারি বরাদ্দ হয়ে থাকে, সেহেতু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থই মূলত শিক্ষা খাতের বরাদ্দ হিসেবে ধরতে হবে। কিন্তু গত অনেক বছর থেকে সরকার বাজেট বরাদ্দে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগকে যুক্ত করে বরাদ্দের হিসাব দিচ্ছে, যা অযৌক্তিক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দটি আলাদাভাবেই হিসাব করা উচিত কারণ, এই খাতের খরচটা শিক্ষায় দেখানো হলেও এর খরচটা আসলে একাডেমিক স্পেসে না হয়ে রুপপুর পারমাণবিক প্রকল্পসহ বিভিন্ন ভিশনারি প্রকল্পের পেছনে যায়। বরাবরের মতো এবারও অন্যান্য বিভাগ বা মন্ত্রণালয় যুক্ত করে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেশি দেখানোর প্রয়াস হিসেবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ১৭,৯৪৬ কোটি টাকা এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ১,৪১৫ কোটি টাকাসহ শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ৮৫,৭৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখিয়েছে সরকার। বর্তমানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দুই-তৃতীয়াংশই ব্যয় হয় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানে, আর এক-তৃতীয়াংশ হয় শিক্ষার উন্নয়নে। সরকার সত্যি সত্যি শিক্ষার উন্নয়ন চায় কিনা তা বোঝার জন্যে বেতন-ভাতার চেয়ে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের পরিমাণ কম না বেশি সেদিকে নজর রাখতে হবে। এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে প্রায় ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ মানব সক্ষমতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বলে ঢোল পেটালোও, বাজেট ঘোষণার পর দেখা গেলো বরাবরের মতোই এবারও শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেশি দেখানোর জন্য অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের বাজেটকে সম্পৃক্ত করে শিক্ষা ও প্রযুক্তি মিলিয়ে ৮৫,৭৬০ কোটি টাকা অর্থাৎ মোট বাজেটের ১৫.১০% বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে খুশি হলেও একটু ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় প্রকৃত চিত্রটি ভিন্ন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ মিলিয়ে মোট ৬৬,৪০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষা খাতে প্রকৃতপক্ষে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১১.৬৯ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ০.০১% বেশি। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধির বিবেচনায় প্রকৃত অর্থে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ কমে গেছে। মন্ত্রণালয় বা বিভাগওয়ারী বরাদ্দ পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় অপারেটিং ব্যয় হিসেবে ১৫,৫৩৬ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় হিসাবে ৯,৪০৪ কোটি টাকাসহ মোট ২৪,৯৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের ৪.৩৯%। অনুরূপভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে অপারেটিং ব্যয় হিসেবে ২১,২৫২ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় হিসাবে ১১,৮৬৫ কোটি টাকাসহ মোট ৩৩,১১৭ কোটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের ৫.৮৩%। এরই ধারাবাহিকতায় কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে অপারেটিং ব্যয় বাবদ ৬,২৬৮ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় বাবদ ১,৯৭৮ কোটি টাকাসহ মোট ৮,৩৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১.৪৭%। অর্থাৎ শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৬,৪০১ কোটি টাকা, যার মধ্যে অপারেটিং ব্যয় ৪৩,১৫৬ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ২৩,২৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট বাজেটের ১১.৬৯%, যা ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ছিল ১১.৬৮%, নিট পরিবর্তন ০.০১%। বাজেট বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সকল ক্ষেত্রেই মজুরি ও বেতন এবং প্রশাসনিক ব্যয় খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে প্রশিক্ষণ বাজেট বৃদ্ধি পেলেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে প্রশিক্ষণ ব্যয় পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা এবং বরাদ্দ জরুরি ছিলো। ইউনেস্কো এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড ১৯-এর ফলে সৃষ্ট পারিবারিক অর্থ সংকট, শিশুশ্রম, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি, ঝরে পড়া, অপুষ্টিজনিত প্রতিবন্ধকতা ও বাল্যবিবাহের কারণে বিশ্বব্যাপী শিক্ষা খাতে বিগত দুই দশকের অগ্রগতি বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে। এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদা এবং অধিকারের কথা বিবেচনা করে মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি হলেও সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে গৃহিত সিদ্ধান্ত দেখে শিক্ষার উল্টো যাত্রা বা অগ্যস্ত যাত্রা বলে বোধ হয়। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অংশের চেয়ে ব্যবসা সংশ্লিষ্ট অংশের সংখ্যাধিক্য থাকায় শিক্ষায় বিনিয়োগের চেয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ব্যবসা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পাশেই সরকারের আগ্রহ অধিক লক্ষ্যনীয়। ব্র্যান্ডিং, মার্কেটিং, গুজব ছড়িয়ে দর উঠা-নামা নিয়ে কারবার করা এই গোষ্ঠীটি উন্নয়নের ধোঁয়ার রঙ্গিন প্রপাগান্ডা ছড়াতেও বেশ পটু। মহা সাড়ম্বরে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনের ঢোল পিটিয়ে নাগরিক মগজে উন্নয়ন এবং অর্জনের ফেক একটা লেয়ার তৈরি করা সম্ভব হলেও বাস্তবতা হচ্ছে এমডিজিজির অন্যতম প্রধান শর্ত শিক্ষায় বরাদ্দের নূন্যতম অঙ্গীকারটুকুও না রেখে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণের বৈশ্বিক অঙ্গীকারে সাইন করে এসেছে সরকার। এমডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না করেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রপাগান্ডা ছড়ানোয় প্রচণ্ড সফল বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতে বিরাট বরাদ্দের প্রপাগাণ্ডা ছড়ানোতেও ব্যাপক সফল। সরকারের বড় সফলতাটাই হচ্ছে শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রপাগান্ডা।