করোনা ভাইরাস : জীবঘাতক এবং কাজাখস্তানের মার্কিন গবেষণাগার

Posted: 24 মে, 2020

চীন প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে করোনা ভাইরাস তথা ‘কোভিড-১৯’-এর বিস্তারের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার বিষয়ে সন্দেহ ঘোষণা করলো। এই প্রসঙ্গে বেইজিং সরকারিভাবে ঘোষিত তারিখে হুবেই প্রদেশে এই ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়ে সুস্পষ্ট আলামত পাওয়ার অনেক আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ভাইরাসের উপস্থিতি ও সংক্রমণ বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য উল্লেখ করে। ‘আমেরিকান ট্রেইল’ সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাওয়াটা উন্মত্ততার মতো মনে হলেও, এই প্রতিবেদনগুলো কিন্তু জোড়ালো প্রমাণ প্রকাশ করে। সম্প্রতি, কাজাখস্তানি একটি সূত্র ‘ওয়াই ভিশন’-এর প্রতিবেদন তুলে ধরেছে যে, “আলমাতিতে অবস্থিত ‘সেন্ট্রাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি’ (সিআরএল)-এর কর্মীদের মধ্য থেকে একটা সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই মরণঘাতি ‘করোনা ভাইরাস’ উক্ত প্রতিষ্ঠানেই বিকশিত করা হয়েছে।” এই গবেষণাগারটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অর্থায়নে সৃষ্ট এবং এখনও সেটা ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সিআইএসভুক্ত (কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্ট স্টেটস) দেশগুলোতে জীবাণুযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ সোভিয়েত উত্তর দেশগুলোতে বিপজ্জনক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে উচ্চমাত্রার (থার্ড) সুরক্ষা সম্বলিত ও সেই মোতাবেক নকশাকৃত অনেকগুলো জীব গবেষণাগার তৈরি করে। এই গবেষণাগারগুলো আলমাতি, তিবলিসি (Tbilisi) এবং খারকভে ক্রিয়াশীল রয়েছে। এসব গবেষণাগারগুলোর সরকারি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এলাকায় সম্ভাব্য জীবাণু যুদ্ধের জন্য মারাত্মক জীবাণুর সংক্রমণকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়ার কার্যকর প্রস্তুতি গ্রহণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের দ্বারা এবং তাদেরই অর্থায়ন ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এসব গবেষণাগারে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকর্ম পরিচালিত হয় এবং প্রায়ই মার্কিন সামরিক ওষুধ সংস্থা’র (Institute of Military Medicine) গবেষকরা বিভিন্ন গবেষণায় অংশগ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী’র (মেরিল্যান্ড) ওয়াল্টার রিড প্রায়ই এ অঞ্চলে আসে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, লেফটেনেন্টে কর্নেল জেমি ব্লো, যিনি দীর্ঘদিন যাবৎ তিবলিসিতে অবস্থিত টিএসআরএল-এ আফ্রিকান সুয়াইন ফ্লু নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন, তার নেতৃত্বে একদল চাকরিচ্যুত সামরিক জীববিজ্ঞানীকে নিয়ে গঠিত একটি দল সম্মিলিতভাবে সেই ভাইরাস সংক্রমণ বিষয়ে কাজ করেন। এই দলটি কাজ শুরু করার স্বল্পকাল পরেই ২০১৩ সালে রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে ঐ রোগটি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা নথিভুক্ত আছে। যাহোক, নীতিগত বিধিনিষেধের কারণে, সিআরএল-সমূহ আর অতি গোপনীয়তার পর্যায়ে নেই। কর্মীরা এখন অবাধে গবেষণামূলক প্রবন্ধ এবং প্রতিরোধবিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করতে পারেন; যা থেকে আপনারা তাদের কর্মকাণ্ডের খোলামেলা উৎসগুলো অনুসরণ করতে পারবেন। প্রকাশনা সাক্ষ্য ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত ভাইরাস সাময়িকীতে (ভাইরাসেস, ২০১৯, ১১, ৩৫৬, ডিওআইঃ ১০.৩৩৯০/ ভি১১০৪০৩৫৬) একদল মার্কিন ও কাজাখ বিজ্ঞানীর কাজের নির্যাস হিসেবে করোনা ভাইরাসের সমগোত্রীয় নববংশধরের জন্ম-সংক্রান্ত এক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেখানে উল্লেখ আছে যে, ভাইরাসটির বাহক হবে স্থানীয় বাদুরেরা। প্রকল্পটি পরিচালিত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের আলমাতিতে অবস্থিত আলমাতি সেন্ট্রাল ডিফেন্স লীগের ঝুঁকি প্রশমন এজেন্সির প্রকল্প কেজেড-৩৩ নকশানুসারে (Tropical Medicine and Infection Disease, 2019, 4, 136, doi: 10.3390 / tropicalmed4040136). এই প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গেভিন জেমস স্মিথ। যিনি জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধ কেন্দ্রের (National Institute of Health and the Center for Disease Control and Prevention of the US Department of Health) সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িত। অধ্যাপক গেভিন জেমস স্মিথ কাজাখ প্রকাশনার সূত্রমতে ২০২০ সালের শীত মৌসুমে সিআরএফ-কে ‘করোনা ভাইরাস’ সম্বলিত জীবনমুনা সরবরাহ করা হয়েছিল, যা ছিল আণবিক উচ্চতার এবং তারা একই বংশগতির জীবনমুনাকে সম্পূর্ণরূপে সমাপতিত করে। গবেষণাগারে দু’বছর আগে এর গবেষণা শুরু হয়েছিল এবং যাকে তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনভাবেই এই সময়ে টিএসআরএল থেকে পৃথক করা উচিত ছিল না। এটি বিকশিত হয়েছিল যৌথভাবে,-যার নেতৃত্বে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিরাময় এবং প্রতিরোধ কেন্দ্রের কয়েকজন বিজ্ঞানী, যাতে একটা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির চূড়ান্ত পর্যায়ে কাজাখ মহামারি বিজ্ঞানীদের বৃহৎসংখ্যক একটি দলকে এর সাথে সমন্বিত করা হয়েছিল। উক্ত প্রকাশনা অনুযায়ী (Viruses, 2019, p.2), গবেষণাকর্মটি সম্পন্ন হয়েছে ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে যার মানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেমনটা সূত্র প্রকাশ করেছে। উপরন্তু, ২০১৭ সালে পরিচালিত গবেষণা উদ্ভূত প্রজাতি এবং ‘কোভিড-১৯’ উভয়ই বাদুরবাহিত করোনা ভাইরাস। এইভাবে একটি “অজ্ঞাতনামা সম্মিলন” বর্ধিতহারে একজন ব্যক্তির বার্তার মিল দেখাতে শুরু করলো যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে করোনা ভাইরাসের কাজের প্রকৃতি সবচেয়ে ভালোভাবে জানে। এইসব সমাপতনসমূহ ডাক্তারদের দ্বারা খুঁজে পাওয়ার মতো সকল সম্পর্কিত রোগের বৈশিষ্ট্যগত সাদৃশ্যের মারাত্মক প্রমাণ বহন করে এবং আমরা আরো বহু দূর এগিয়ে যেতে পারবো-সেইসব মানুষ যারা এই গবেষণা কার্যক্রম চালিয়েছিল তাদের উন্মোচিত করা যাবে। বাদুরকে অনুসরণ করা কাজাখস্তানে আমেরিকার সিআরএল-এর গবেষণাপত্রসমূহের নিবিড় পর্যবেক্ষণ অনেক প্রশ্নই জাগিয়ে তুলে। ‘কে জেড-৩৩’ প্রকল্পটির শিরোনাম ‘মধ্যপ্রাচ্য শ্বাস-প্রশ্বাস সম্বন্ধীয় করোনা ভাইরাস লক্ষণ’, এটা খুবই অস্পষ্ট কেন তা মধ্য এশিয়ার বাদুরদের ওপর প্রয়োগ করতে হলো। ততোধিক অবাক করার মতো বিষয় হলো ২০১৭ সালেই উপরোল্লিখিত অধ্যাপক গেভিন স্মিথের খুঁজে পাওয়ার সক্ষমতা যে, বাদুরই সর্বত্র করোনা ভাইরাসকে বয়ে নিতে সমর্থ। ওই বছরই তিনি সিঙ্গাপুরে ‘করোনা ভাইরাস-বাদুর’ শিরোনামে একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন (Transboundary Emerg Dis, Dec; 64 (6): 1790–1800. Doi: 10.1111/tbed.12568) কাজাখস্তানে পৌঁছেও তিনি দেখলেন যে সেখানেও তার গবেষণার বিষয় একই, যদিও এই প্রজাতন্ত্রটা এ ধরণের রোগের জন্য মোটেও পরিচিত ছিল না। আপনারা ভেবে নিতে পারেন যে তার নিজস্ব ইঁদুরের দলই তার নিজস্ব করোনা ভাইরাস হয়ে তার পিছু পিছু ছুটে এসেছে। এটা রহস্যময় যে, জীব নিরাপত্তার জন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় উৎসসমূহ কাজাখস্তানের ঝাম্বাইল অঞ্চলের কোর্দাই জেলায়ই পাওয়া যায়। এই অঞ্চলেই আবার বসবাস করে চীনা ভাষাভাষী এক বিশাল ডাঙ্গান জনগোষ্ঠী, যারা পণ্যপাচার ব্যবসাসহ চীন দেশের অপরাপর ব্যবসার সাথে জড়িত। আরো সন্দেহের অবকাশ রয়েছে যে, কাজাখস্তানে বাদুরদেরকে কৃত্রিমভাবে করোনা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত করা হয়েছিল; যাদেরকে সংগ্রহ করা হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে যেটা এই রোগের প্রাকৃতিক সংস্থান অঞ্চল। জেনেটিক্যালি একটি উচ্চতর নমুনা যা পরবর্তীতে ‘কোভিড-১৯’ নামে পরিচিত হয়েছে, দুর্ঘটনাক্রমে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে সুকৌশলে সীমানা অতিক্রম করতে পেরেছিল। সা্ম্প্রতিককালে কোরদাই অঞ্চলে ডানগান গ্রামগুলোতে সংগঠিত গণজমায়েতগুলোকে বিবেচনা করা যেতে পারে ২০১৭-২০২০ সালের ভেতরে আমেরিকার জীববিজ্ঞানীদের দ্বারা কৃত কাজ করার সময়ে ‘কোভিড-১৯’ প্রেরণকালীন অবহেলাজনিত বা ইচ্ছাকৃতভাবে কাজের প্রমাণ লোপাট করার প্রচেষ্টা হিসেবে। কেউ-ই হয়তো ভুলে যায়নি প্রফেসর স্মিথকে বা ডিউক ইনস্টিটিউটকে, তিনি এখনও যেটার একজন কর্মচারী অথচ তিনি নিজেই এর অস্তিত্ব ভুলে বসেছেন। একটা বিজ্ঞান কেন্দ্রে করোনা ভাইরাসের মহামারি আকারে সংক্রমণ বিষয়ে অনেক অনেক গবেষক মন্তব্য করলেও যিনি দীর্ঘ চার বছর ধরে পূর্ব ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলে একই ধরনের একটি রোগের বিস্তার নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানী গেভিন স্মিথ কোনও মন্তব্য করেননি।… কেন এই গোপনীয়তা? সম্ভবত আলমাতিতে সংঘটিত বিস্ফোরণের স্মৃতি পুনরায় স্মরণ না করার উদ্দেশ্যেই। সন্দেহের ভিত্তি জীবসন্ত্রাস একটি মারাত্মক অভিযোগ। কিন্তু সংগৃহীত সকল তথ্যই প্রমাণ করে যে, চীনে করোনা ভাইরাসের বিস্তারের সাথে একদল মার্কিন ও কাজাখ জীববিজ্ঞানীর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা রয়েছে। কাজাখ কর্তৃপক্ষের কাছে ডব্লিওএইচও এবং পিআরসি ও সিআইএস-এর প্রতিনিধি নিয়ে ঝামবাইল অঞ্চল ও মেডিকেল সেন্টারে আমেরিকার অণুজীববিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের কৃতকর্মের বিষয়ে একটি অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে একটা কমিশন গঠন করার জন্য দাবি জানাই। আমরা আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ ও জাতিসংঘকেও মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের তত্বাবধানে ও অর্থায়নে কাজাখস্তানে সংঘটিত জীব গবেষণার প্রকৃতি সম্পর্কে জানানোর জন্য অনুরোধ করতে দাবি জানাই। অনুবাদকের ই-মেইলঃ mrittu.en.joy@gmail.com মূল লেখার লিংকঃ- https://www.fort-russ.com/2020/03/coronavirus-bioterror-and-the-us-military-laboratory-in-kazakhstan-investigation/