সাবাশ সুন্দরবন তুমিই বাংলাদেশের প্রাণ

Posted: 24 মে, 2020

ডা. মনোজ দাশ : সিডর-আইলা-বুলবুলের দুঃস্বপ্নের স্মৃতি এখনও ম্লান হয়নি। ক্ষত শুকিয়ে যায়নি। এরই মধ্যে সুপার সাইক্লোন আম্পানের আঘাত। এবারও বাংলাদেশকে বাঁচাতে বুক পেতে দিল সুন্দরবন। সিডর-আইলা-বুলবুলের মতো আবারও সুপার সাইক্লোন আম্পানের সামনে জীবন ও সম্পদ বাঁচাতে প্রাকৃতিক রক্ষাপ্রাচীর হয়ে দাঁড়ালো সুন্দরবন। শুধু সিডর-আইলা-বুলবুল-আম্পান নয়, পঞ্চদশ শতক থেকে আজ পর্যন্ত ২০টি বড় বড় সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষকে বাঁচিয়েছে সুন্দরবন। আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে সুন্দরবনের এমন একটি ভূমিকার বর্ণনা আছে। ১৫৮৫ সাল। সমগ্র বাংলাদেশ তখন মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত। সম্রাট আকবর দিল্লীর সিংহাসনে। তার রাজত্বের ২৯শ বর্ষে এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ে সুন্দরবনে। সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হয় তখন। কিন্তু তীব্র গতির ঝড়ের সামনে মায়ের মতো বুক চিতিয়ে বাঁধার প্রাচীর গড়ে সুন্দরবন সুরক্ষা দেয় উপকূলীয় মানুষজনকে। পৃথিবীর বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন প্রাণ-বৈচিত্র্যে বাংলাদেশের অফুরন্ত সম্পদের উৎস, এক অতুলনীয় ইকো সিস্টেম, পরিবেশ শোধনের সবচাইতে বড় প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, বাংলাদেশের শুধু ফুসফুসই নয়; ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ইতিহাস প্রমাণ করে, সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচাইতে শক্তিশালী প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম। সুন্দরবন ধ্বংস হওয়া মানেই উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষকে মৃত্যু ও ধ্বংসের হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই সুন্দরবন মানেই বাংলাদেশের প্রাণ, সুন্দরবন বাঁচানো মানেই আমাদের প্রাণ বাঁচানোর সংগ্রাম। সুন্দরবন ছিল সুপার সাইক্লোন আম্পানের গতিপথ। প্রবল গতিতে ছুটে আসা সুপার সাইক্লোন আম্পানের সামনে এবারও বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় সুন্দরবন। সুন্দরবনে আঘাত হানার আগে আম্পানের গতিবেগ ছিল ২২০ কিমি। সুন্দরবনের বাঁধা পেয়ে আম্পানের গতিবেগ ৭০ কিমি কমে যেয়ে গতিবেগ দাঁড়ায় ১৫০ কিমি। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা হয়ার কথা ছিল ১৫- ১৮ ফুট। সুন্দরবনের কারণে জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা হ্রাস পায় ৬ ফুট। পূর্ণ শক্তি নিয়ে সুপার সাইক্লোন আম্পান বাংলাদেশের স্থলভাগে আঘাত হানতে পারেনি। তা না হলে গ্রাম ও শহরগুলিতে জীবন ও সম্পদের আরো ব্যাপক ক্ষতি হতো বাংলাদেশে। সিডরের সময় জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি ৪৮৫ মিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাঁচিয়েছিল সুন্দরবন। আম্পান শেষ সাইক্লোন নয়। জলবায়ুর পরিবর্তনের আঘাত মোকাবিলায় সুন্দরবনই আমাদের প্রধান ঢাল। অথচ একদিকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে এই অনবায়নযোগ্য বিশাল আশ্রয় সুন্দরবনকে ধ্বংসের আয়োজন চলছে, অন্যদিকে অরিয়নের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিপইয়ার্ড, সাইলো, সিমেন্ট কারখানাসহ নানা বাণিজ্যিক ও দখলদারী অপতৎপরতার মধ্য দিয়ে প্রকৃত অর্থেই সুন্দরবনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে বর্তমান সরকার। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে এবারও সুন্দরবন তার দায়িত্ব পালন করেছে মায়ের মতোই। প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে বুক পেতে দিয়ে সুন্দরবন আমাদের বাঁচিয়েছে। ক্ষয়-ক্ষতি কমিয়েছে। সুন্দরবন আমাদের রক্ষা করেছে বারবার। এখন আমাদের দায়িত্ব সুন্দরবনকে বাঁচানো। সব গবেষণা-পরামর্শ-আন্দোলন উপেক্ষা করে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি শক্তির লুণ্ঠন-আগ্রাসন-ষড়যন্ত্রে সুন্দরবনকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংসের আয়োজন চলছে। বাগেরহাটের রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চুক্তি হয় ২০১৩ সালে। যৌথ উদ্যোগে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানির মাধ্যমে সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে মোংলা সমুদ্র বন্দরের কাছে রামপালে এ তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এই চুক্তি ও উদ্যোগ অর্থনৈতিক-পরিবেশগত ও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিরোধী। এ ধরনের প্রকল্প ভারতে বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু যে যুক্তিতে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প ভারতে বাতিল করা হয়েছে বাংলাদেশে তা মানা হচ্ছে না। কৃষিজমি, নিকটবর্তী জনবসতি ও শহর থাকা, নদীর পানি স্বল্পতা, পরিবেশগত প্রভাব ইত্যাদি নানা বিবেচনায় যে থার্মাল পাওয়ার কোম্পানির মধ্যপ্রদেশে প্রস্তাবিত কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয় বাতিল করে দিয়েছে, ভারতের সেই থার্মাল পাওয়ার কোম্পানিই বাংলাদেশের সাথে কথিত যৌথ বিনিয়োগে একই রকমের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাগেরহাটের রামপালে নির্মাণ করছে। ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল পার্কটি বাঘ, পাইথন এবং হাতির জন্য বিখ্যাত এবং একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। বনাঞ্চলটির বিস্তৃতি ৬৪৩ বর্গকি.মি. জুড়ে যা সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তনের দশ ভাগের এক ভাগ। ২০০৭ সালে এই রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল পার্ক থেকে ২০ কিমি দূরে কর্ণাটক রাজ্যের মাইসুর জেলায় চামালপুর গ্রামে ১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার পরিকল্পনা করা হয়। রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল পার্কের ২০ কি.মি. এর মধ্যে কৃষিজমি নষ্ট করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাটি জনগণের প্রবল বিরোধিতার মুখে ভারত সরকার ২০০৮ সালে বাতিল করতে বাধ্য হয়। ভারত তার নিজ দেশে সুন্দরবনের চেয়ে দশ ভাগের এক ভাগ আয়তনের একটি বনাঞ্চলের ২০ কি.মি. এর মধ্যে ১ হাজার মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারেনি। সেই ভারত এবার বাংলাদেশে সুন্দরবনের মতো একটি বিশ্বঐতিহ্য, জীব বৈচিত্র্যের অফুরন্ত আধার, রামসার সাইট এবং ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ বলে ঘোষিত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের মাত্র ১৪ কি.মি. এর মধ্যে কৃষিজমি ও পরিবেশ ধ্বংস করে, হাজার হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়টের একটি বিশাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে! এখন প্রশ্ন হলো, যে যে বিবেচনায় খোদ ভারতে ভারতীয় কোম্পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারলো না, বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের বেলায় কেন সেই বিষয়গুলো বিবেচনা করা হলো না? এখনো যুক্তি দেখানো হচ্ছে, এখানে সুপার ক্রিটিক্যাল, আল্ট্রা ক্রিটিক্যাল যন্ত্র ব্যবহার করা হবে যাতে সুন্দরবনের কোনও ক্ষতি হবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে ভারত কেন তার দেশে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার সাপেক্ষে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমতি দেয়নি। প্রকৃত সত্য হলো, ১ শতাংশ দক্ষতা বাড়লে ২ শতাংশ পরিবেশ দূষণকারী পদার্থ কম নির্গত হয়। সাবক্রিটিক্যাল কেন্দ্রের চাইতে সুপারক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহারকারী কেন্দ্রের দক্ষতা ২ শতাংশ বেশি, আল্ট্রা ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহারকারী কেন্দ্রের দক্ষতা ৫ শতাংশ বেশি। তা হলে আল্ট্রা ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহারকারী কেন্দ্রে ১০ শতাংশ কম দূষণ সৃষ্টি করবে। কিন্তু দূষণতো ঘটবেই। সরকার পরিবেশ সমীক্ষাতেই রয়েছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দৈনিক ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড, ৮৫ টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, বার্ষিক ৯ লাখ টন ছাই উৎপাদন হবে। এটা সুন্দরবনের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাবে, ধ্বংস করে দেবে সুন্দরবনকে। সকলেই বিদ্যুৎ চায়। কিন্তু সুন্দরবনকে ধ্বংস করে নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে। সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নাই। খোদ ভারতও বিকল্প পথে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবছে। কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজের দেশে তারা বন্ধ করে দিচ্ছে। তাই সুন্দরবন বাঁচাতে হলে আমাদের বিকল্প পথে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবতে হবে। প্রগতি ও সমতামুখি প্রবৃদ্ধি, প্রাণ-প্রকৃতি ও মানববান্ধব উন্নয়ন চিন্তার গণতান্ত্রিক কাঠামোতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকার দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দূর করার কথা বলে, দেশি বিদেশি লুটপাটকারীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে জনগণ ও দেশের জন্য সর্বনাশা পথ গ্রহণ করছে এবং এই প্রক্রিয়ায় সুন্দরবন ধ্বংসের সব আয়োজন এগিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু মানুষ সুন্দরবন ধ্বংসের প্রচেষ্টা মেনে নেবে বলে মনে হয় না। কারণ সুন্দরবন তার অস্তিত্বের শর্ত। সিডর-আইলা-বুলবুলের মতো আবারও সুপার সাইক্লোন আম্পানের সামনে মায়ের মতো বুক পেতে দিয়ে বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছে সুন্দরবন। সুপার সাইক্লোন আম্পানই শেষ ঝড় নয়। সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচাইতে শক্তিশালী প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম। সুন্দরবন বাংলাদেশের ফুসফুস। সুন্দরবন ধ্বংস হওয়া মানেই আমাদের মৃত্যুকে আহ্বান করা। ১৯৮ বছরের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর আমেরিকান এসএসএ কোম্পানির কাছে লিজ দেয়ার চক্রান্ত, বিবিয়ানার গ্যাস ভারতে পাচারের ষড়যন্ত্র, বিনিয়োগের নামে ভারতের টাটার লুণ্ঠন, ফুলবাড়ির জমির পরিবেশ ও কৃষি ধ্বংস করে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া জনগণ রুখে দাঁড়িয়েছে। সুন্দরবন ধ্বংসের পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী লুণ্ঠন ও ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে মানুষ তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে না আসলে তাকে একদিন অস্তিত্বের সংকটে পড়তে হবে। সুন্দরবন রক্ষার সংগ্রাম মানে আমাদের জীবনরক্ষার সংগ্রাম। এ সংগ্রামে মানুষকে জিততেই হবে।