করোনাকালের অর্থনীতি: মানুষ বাঁচানোই মূখ্য কাজ

Posted: 17 মে, 2020

আবদুল্লাহ আল ক্বাফী : দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান করোনা পজিটিভ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। গত ২৭ এপ্রিল থেকে তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে তিনি যে দুই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তার যে কোনো একটা থেকে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। স্যারের বিষয়টি উল্লেখের কারণ হচ্ছে দেশে করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য। সরকারের অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকার দেশের বড় বড় হাসপাতাল প্রত্যাখ্যাত হয়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। দেশের একজন ক্ষমতাবান মানুষ তদপুরি তার কন্যা স্বয়ং একজন চিকিৎসক হওয়া স্বত্ত্বেও তার যদি চিকিৎসা না জোটে তবে সাধারণ রাম-রহিমের কি অবস্থা তা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেন হিসাব করে দেখিয়েছেন এই করোনা মহাবিপর্যয়কালে গ্রাম, শহর মিলিয়ে ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে নেমে যাবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, আর্থিক অবস্থা সব দিক থেকেই দেশ এক চরম অরাজক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। মানুষ মরণভয়ে ভীত, ভরণপোষণ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকরা কি ততোটা চিন্তিত যতটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন দেশবাসী। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য শুনলে মনে হয় করোনা তেমন কোনো মারাত্মক সমস্যা নয়। সরকারের বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা যখন দাবি করছেন করোনা সনাক্তের চেয়ে ৪০ গুণ বেশি করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি দেশে রয়েছেন। তখন নীতিনির্ধারকরা ইউরোপ-আমেরিকার করোনা মোকাবেলার সক্ষমতাকে কটাক্ষ করে নিজেদের সাফল্য প্রচারে ব্যস্ত রয়েছেন। পাগলের সুখ মনে মনে। করোনায় বিপর্যস্ত দেশের গ্রাম ও শহরাঞ্চলের শ্রমজীবী গরিব মানুষ। আমাদের দেশে প্রায় ৭ কোটির উপরে শ্রমজীবী মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত রয়েছে।এসব শ্রমিক হলেন বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। তাদের হাড়ভাংগা পরিশ্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার। আমাদের আজকের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান কৃতিত্বের দাবিদার হচ্ছে গার্মেন্ট শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক ও কৃষক-ক্ষেতমজুররা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০১৯ সাল শেষে বাংলাদেশ জাতীয় দরিদ্রের হার ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। অতিদারিদ্রের হার সাড়ে ১০ শতাংশ। দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৬ লাখ। সেই হিসাবে দেশে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ গরিব এবং তাদের মধ্যে পৌনে ২ কোটি মানুষ অতিদরিদ্র বা হত দরিদ্র। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তার প্রধান উপকারভোগী হচ্ছে ধনিকশ্রেণি। সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা কৃষিখাতে বরাদ্দ দিয়েছে চার শতাংশ সুদে। একজন খোদ কৃষক জমির দলিল বন্ধক দিয়ে ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা ঋণ পাবে। সেখানে চাতাল মালিকরা পাবে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা। কৃষিখাতের জন্য বরাদ্দ পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রায় সবটাই ব্যাংকের বদৌলতে চলে যাবে চাতাল মালিকের অ্যাকাউন্টে। সরকার গার্মেন্ট শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধের জন্য মালিকদের দুই শতাংশ সুদে পাঁচ হাজার কোটি টাকা অনুদান ঘোষণা করেছে। মালিকরা ভেবেছিলেন সরকার তাদের এ টাকা মুফতে দিয়ে দিবে। তা না হওয়ায় এবং সরাসরি শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে দেয়ার দাবি ওঠায় গার্মেন্ট মালিকরা সরকারের সহযোগিতায় শ্রমিকদের ৬০% মজুরি অর্থাৎ শুধুমাত্র বেসিক দেয়ার আব্দার জানিয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ি সাধারণ ছুটিতে থাকাকালে শ্রমিকরা সকল বেতন-ভাতা প্রাপ্য হন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরাসহ অন্যান্যরা যখন সকল বেতন-ভাতা পাচ্ছেন তখন শ্রমিকদের বঞ্চিত করার অপতৎপরতা চলছে। সরকারের হিসাবেই দেশে হতদরিদ্রের সংখ্যা পৌনে দুই কোটি। দারিদ্রসীমার প্রান্তিকতায় যারা রয়েছেন তারাও দারিদ্রসীমার নীচে নেমে আসবে। সরকারি গবেষণা সংস্থার হিসাবে আড়াই কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে নেমে যাবে। সরকার আড়াই হাজার টাকা করে পঞ্চাশ লাখ ব্যক্তিকে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। টাকার পরিমাণটা অপ্রতুল। এ দিয়ে চার জনের একটা পরিবারের প্রতিদিন প্রতিব্যক্তির ন্যূনতম আঠারো’শ ক্যালরি হিসাবে এক মাসের প্রয়োজনীয় ক্যালরি অর্জন সম্ভব নয়। সংখ্যাটা প্রাপ্যযোগ্য ব্যক্তিদের মাত্র চার ভাগের এক ভাগ। পঞ্চাশ লাখ ব্যক্তিকে দিতে এক হাজার দুই’শ পঁচিশ কোটি টাকা লাগবে। আর দুই কোটিকে দিতে লাগবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা যা আমাদের পাঁচ লাখ পঁচিশ হাজার কোটি টাকার বাজেটের মাত্র এক শতাংশ। করোনাকাল এবং করোনাত্তোর পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশকেও মন্দা পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। মন্দা পরিস্থিতি বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটা মূখ্য অস্ত্র হচ্ছে অর্থব্যয়। সরকার মন্দা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাবলিক এক্সপেন্ডিচার বৃদ্ধি করতে হয়। অর্থনীতিবিদরা মন্দাকালে আমানত প্রবাহ চালু রাখা ও অর্থব্যয় বৃদ্ধি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সরকারি অর্থ ব্যয় বৃদ্ধি করে শুধুমাত্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীকে সহযোগিতা করে অর্থনীতির মুখ ফেরানো যাবে না। কারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টাকা পেলে উৎপাদনে যাবে। কিন্তু মানুষের হাতে টাকা না থাকলে তারা কোনো ক্রেতা পাবে না। উৎপাদিত পণ্য গোডাউনে মজুদ হয়ে নতুন সংকট তৈরি করবে। ফলে পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নতুন নতুন সংকটে পতিত হবে। ব্যয় বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকসহ পেশাজীবীদের বেতন কর্তন করা যাবে না। এ জন্য সরকারের নগদ সহায়তা কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের মালিকদের প্রদত্ত কর্মী তালিকানুসারে সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্টে প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের দুই কোটিরও বেশি হতদরিদ্রদের চিহ্নিত করে তাদের অ্যাকাউন্টে মাস চলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জমা করতে হবে। এই করোনাকালে কৃষকরা বোরো ধান ঘরে তুলেছে। বাম্পার ফলনের ফলে কৃষকরা দুই কোটি টনের উপর ধান পাবে। সরকার আগে ঘোষিত ধান ক্রয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে আট লাখ টন করেছে। আর চাল ক্রয়ের পরিমাণ ১১ লাখ টন ঠিক রেখেছে। খোদ কৃষকরা সরকারের গোডাউনে দিতে পারবে মাত্র আট লাখ টন ধান, যা মোট উৎপাদনের চার শতাংশ মাত্র। এ চার শতাংশ একটা বড় অংশ আগে থেকে সাজানো কিন্তু তথাকথিত লোক দেখানো লটারির মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দল ও শ্রেণির একটি কায়েমি গোষ্ঠী সরকারি গোডাউনে বিক্রি করে খোদ কৃষকদের বঞ্চিত করে। করোনাকালে কৃষকদের হাতে টাকা যোগানের জন্য খোদ কৃষকের কাছে থেকে তার উদ্বৃত্ত ধান যখনই কৃষক বিক্রয় করতে চাইবে তখনই ক্রয় করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।এর জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে ক্রয় কেন্দ্র ও অস্থায়ী গুদাম তৈরি করতে হবে। এছাড়া ধান ক্রয় করে কৃষকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মজুদ রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন করে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ ব্যবসায়ি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহকে তাদের নিজস্ব গোডাউনে মাল রেখে ট্রাস্ট রিসিটের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করে। সরকার সেভাবে কৃষকদের ট্রাস্ট রিসিটের মাধ্যমে ধানের দাম প্রদান করতে পারে। সরকার দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য দেশের উদ্যোক্তা শিল্পপতি, ব্যবসায়িদের প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদান করেছেন তা সর্বাংশে ব্যর্থ হবে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাতে ব্যয় করার জন্য অর্থাৎ উৎপাদিত পণ্য ক্রয় করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না থাকে। জনগণের হাতে টাকা দেয়ার বিষয়টির অর্থায়ন কীভাবে হবে? বর্তমান অর্থ বছর প্রায় শেষের দিকে, এ বছর বাজেটে যে বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ প্রস্তাবিত ছিল তার অধিকাংশই অবাস্তবায়িত থেকে যাওয়ার কথা।বাজেটের পুনর্বিন্যাস করে সে অর্থ মানুষের জান বাঁচানোর জন্য ব্যয় করা দরকার। লকডাউন শিথিল করার মধ্য দিয়ে সরকার সম্ভবতঃ হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্ব প্রয়োগের চেষ্টা করছে। সার্ভাইভেল ফর দ্য ফিটেস্ট। নইলে যখন মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা তখন সাধারণ ছুটির নামে লকডাউন কার্যকর করার চেষ্টা ছিল। কিন্তু এখন যখন মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তখন সব কিছু তথাকথিত সীমিত আকারে খুলে দিয়ে দেশের মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা যখন চলমান সময়কে দেশে করোনা বিস্তারের পিক টাইম বলছেন। তখন লকডাউন শিথিল করা অনুচিত হবে। সরকারের এখন প্রধান কাজ হবে মানুষের জান বাঁচানো। পাশের দেশের প্রধানমন্ত্রী যতই খারাপ হোন না কেন এটুকু তিনি অন্ততঃ মুখে স্বীকার করেছেন ‘জান হ্যায়তো জাহান হ্যায়’। সুতরাং করোনাকালে আমাদের অর্থনীতির প্রধান কাজ হবে মানুষ বাঁচানো। সে কারণে বর্তমান অর্থ বছরের বাজেট পুনর্বিন্যাস করতে হবে এবং আগামী অর্থ বছরের বাজেটকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে বর্তমান সময়ের প্রধান কাজ করোনা চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো নির্মাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা যায় এবং মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকে তার জন্য যথেষ্ট অর্থের সংস্থান করা যায়। কারণ করোনাকালের অর্থনীতি হচ্ছে মানুষ বাঁচানোর অর্থনীতি।