অন্তত দুইটা সপ্তাহ নিজেকে কোয়ারেন্টিনে রাখুন

Posted: 22 মার্চ, 2020

হাবীব ইমন : সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রয়োজনে এ বন্ধ আরো বাড়বে বলে সরকার জানিয়েছে। এই বন্ধ দেয়া হয়েছে আপনারা যেনো আইসোলেশনে বাসায় থাকেন, নিরাপদে থাকেন এবং আপনাদের দ্বারা যেনো কোনো সংক্রমণ না ঘটে বা আপনারাও যেনো সংক্রমিত না হোন। এই বন্ধ ট্যুরের জন্য না, সাজেক-বিছানাকান্দির জন্যও না কিংবা ক্রিমসন কাপ বা গুলশান-ধানমন্ডিতে আড্ডার জন্যও না। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও বলেছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা মানে এই নয় যে এখন সর্বত্র তারা ঘুরে বেড়াবে এবং বেড়াতে যাবে’। প্লিজ এটা করতে যাবেন না। অভিভাবকরা এ ব্যাপারে সতর্ক হোন। কোচিং বন্ধ করা হয়েছে। প্রাইভেটও বন্ধ করে দিন। আপনার ও আপনার সন্তানটির সুরক্ষা আগে দরকার। বাসায় যতটুকু পারেন সন্তানটিকে পড়াশোনা করান। আইসোলেশনে রাখুন। দুই. যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক ব্যাধিবিষয়ক প্রধান ডা. অ্যান্থনি ফাউচি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মানুষ বিপদের মাত্রা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি’। তিনি দুই সপ্তাহ বয়োবৃদ্ধ এবং ক্যান্সার, ডায়েবেটিস ও অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তদের কাউকে ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। ৭৯ বছর বয়স্ক ফাউচি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো ভিড়ের মধ্যে যাবো না, রেস্তোরাঁয় যাবো না। আমি এমন কিছু করবো না, যার ফলে দুই সপ্তাহের জন্য নিজেকে কোয়ারেন্টিনে যেতে হয়’। একজন ইতালিয়ান ডাক্তার লিখছেন, ‘আমাদের দেশে এখন ঘটে চলছে ভয়াবহ এক ট্রাজেডি। বৃদ্ধ রোগীরা মারা যাবার আগে চোখের পানি ফেলছেন’। এই ডাক্তারের লেখার মাধ্যমে সেখানকার কী মর্মান্তিক দৃশ্য কেবল চোখের সামনে ভাসছে–কী ভয়াবহ অবস্থা আমাদের বিশ্বকে গ্রাস করে ফেলেছে। কোয়ারেন্টিন চরম আধুনিকতার উৎকৃষ্ট উদাহারণ! পণ্য যত না ব্যক্তিকে নিঃসঙ্গ করেছে, করোনা ব্যক্তিকে আরো বেশি নিঃসঙ্গ করেছে! করোনা যুগ ব্যক্তিকে নিঃসঙ্গ থেকে আরো চরম একাকী করে তুলছে! মানুষ বস্তুত নিদারুণ অসহায়। তিন. পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নাগরিকদের জরুরি অবস্থা ঘোষণা দিয়ে সার্বক্ষণিক বাসায় অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যতদূর জানি ইতালিতে প্রয়োজনীয় কাজ, যেমন খাদ্য সংগ্রহ ছাড়া বাইরে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। পৃথিবীর অনেক দেশেই নাগরিকদের ঘরের মধ্যে আইসোলেশন করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে কেবলমাত্র মসজিদে আযান দেওয়া হবে, নামাজ বাসায় পড়বে। কাজেই আমাদের দেশেও এ ব্যাপারে সকলের আত্মসচেতনতা দরকার। প্রয়োজনে সরকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে নামাতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারসহ সকলকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। যাদের অফিসের কাজ সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, বাসায় থেকে অফিসের কাজ সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে, তারাও সতর্ক থাকুন। নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব নিজের। অন্তত দুইটা সপ্তাহ নিজেকে কোয়ারেন্টিনে রাখুন। সরকার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বার বার বলছে এসব কথা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশনা দিয়েছে, মুখোমুখি বৈঠক এড়িয়ে টেলিফোন কনফারেন্স বা অনলাইনে করা যেতে পারে। ডেস্ক, টেবিল, টেলিফোন, কিবোর্ড ইত্যাদি জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুন। নিজেদের ঘর, ঘরের চারপাশকে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। এক পোশাক একদিনের বেশি পরবেন না। হাত ধোয়ার মতো পোশাকও প্রতিদিন ধুয়ে ফেলতে হবে। যারা স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন বা দেওয়ার কথা ভাবছেন, আপনি কি নিজে সুরক্ষিত? অথবা সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা রাখছেন? সাধারণ সতর্কতা, পরিকল্পনা ও তৎপরতাই প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ কর্মী এবং পুরো প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। মনে রাখবেন, আপনি একা সংক্রমিত হচ্ছেন না, আপনার সাথে এদেশটা সংক্রমিত হচ্ছে। চার. বাংলাদেশে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এর কারণ জনসংখ্যার ঘনত্ব, সাধারণ মানুষের মধ্যে অসচেতনতা ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো। সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মশিউল আলম লিখেছেন, ‘হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে আমরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাব না’। কথাটা একদমই সত্য। পাশাপাশি চিকিৎসক-নার্সদেরও রোগীদের সেবা দেওয়ার মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। এর মধ্যে চীনসহ আক্রান্ত দেশ ও অঞ্চল ১৫৯টি। তাই বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারকে আগাম ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাতে পরিস্থিতি সামলানো কিছুটা সহজ হবে এবং ঝুঁকি কমবে। তবে শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ও দরকার। এই ভাইরাসে আক্রান্ত জনগণকে শনাক্ত বরার প্রয়োজনে আগ্রহী সকল নাগরিক যাতে বিনামূল্যে টেস্টিং এবং চিকিৎসার সুযোগ পায় সেই দাবি জানাচ্ছি। প্রথম আলো-র সংবাদে জানা যায়, করোনাভাইরাস শনাক্তের জন্য যে টেস্টের প্রয়োজন তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। আগামী কয়েকদিনে এই পরীক্ষার সুযোগ বাড়লে মোট আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে। প্রিয়জনকে সময় দিন, প্রিয়জন এর কাছেই থাকুন। নিশ্চয় সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় আমরা এ মহামারী থেকে রক্ষা পাবো। পাঁচ. করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ এতো বেশি এখন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যে লকডাউন করার জন্য সরকারের প্রতি সুপারিশ করেছে। এখন দেখা যাক সরকার এ ব্যাপারে কী ভাবছে। কী পদক্ষেপ নেয়। তবে সরকারকে আরো সিরিয়াস হতে পারে। আমরা সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারছি করোনা আক্রান্ত সংক্রান্ত ক্রমাগত বাড়ছে। এটা আমাদের জন্য উদ্বেগের। প্রবাস ফেরত ৩৫ শতাধিক, শুধুমাত্র এদের এবং এদের ফ্যমিলি গুলোকে লক করে দিলেই করোনার বিস্তার অনেকটা রোধ হয়ে যায়। এটা সরকার কেন্দ্রীয় ভাবে করতে পারবে না, বরং স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন-সহ সাধারণ মানুষকেই করতে হবে। এদেরকে দরকারি সব জিনিস স্থানীয়ভাবে নিরাপদ পদ্ধতিতে বাড়িতে সরবরাহ করতে হবে এরা মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে বিল দিবে। কিন্তু নিশ্চিত করতে হবে এদের এবং এদের পরিবার এর কেউ যাতে বাড়ীর বাহিরে না যায়। ইতালি, ফ্রান্সের মতো আমাদের দেশেও এ দুর্যোগ মুহূর্তে সেনাবাহিনীকে সরকার নামাতে পারে। তানাহলে লকডাউন কঠিন হয়ে পড়বে। ছয়. করোনাভাইরাস নতুন সংকট বা নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে যাবে ভবিষ্যতের বাস্তবতা! ব্যয় সঙ্কোচন করুন। করোনা ভাইরাস প্রভাব এতোটা শোচনীয় হবে, অর্থনীতিতে এর প্রভাব সারাবিশ্বে ইতিমধ্যে পড়ছে এবং পড়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধের দামামার প্রভাব এতোটা পড়ে না, যতোটা এ রোগের প্রভাব পড়তে যাচ্ছে সমগ্র বিশ্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন সর্বাত্মক প্রতিরোধ প্রস্তুতি দেখেনি বিশ্ব। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, যিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদের মনোনয়নের জন্য প্রতিয়োগিতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, এই মহামারীর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই আসন্ন মন্দা অর্থনীতিকে কিভাবে মোকাবিলা করা যায়, তাও ভাবতে হবে। মন্দা অর্থনীতিকে পূঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা সংগঠিত হচ্ছে। এদের রুখে দিতে হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশে এখন জরুরি প্রয়োজন পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়া। সারাদেশে পণ্যের সরবরাহ যথাযথ রাখা। পণ্যের দাম মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা। বাজার তদারকির ব্যবস্থা করা! এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ! লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর