গণমানুষের ভালোবাসার মানুষ স্টিফেন হকিং

Posted: 22 মার্চ, 2020

ঋদ্ধ অনিন্দ্য গাঙ্গুলী : “মৃত্যু মাথার ওপর ঝুলছে জীবনের তিন ভাগের দুই ভাগ ধরে। প্রতিদিনই ভাবি, আজই হতে পারে জীবনের শেষ দিন। আর তাই তো, ভেতরে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয় প্রত্যেক মুহূর্ত পুরোটা উজাড় করে কাজ করার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা। “-একাত্তর বছর বয়সী প্রফেসর স্টিফেন হকিং যখন এই কথাগুলো “বলে” ফেলেন, তখন একটু নড়েচড়ে বসে সামনে বসে থাকা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একঝাঁক ছাত্রছাত্রী। কর্মঠ এক দল বিজ্ঞানীর খেটেখুটে বানানো বিশেষায়িত হুইলচেয়ারে ঘাড় কাত করে বসে আছেন প্রফেসর। ঝুলে পড়া চোয়ালের ভেতর থেকে নিচের পাটির দাঁত বেরিয়ে এসেছে বেশ খানিকটা, পরনে পরিষ্কার স্যুট, পাটি করে আঁচড়ানো চুল। দেহের বাকি অংশের একটুও না নড়লেও চোখের মণি ঘুরে বেড়াচ্ছে সকলের ওপর। সমকালীন পৃথিবীর সবথেকে ভালোবাসার শিক্ষক। একজন বিজ্ঞানীকে যতটুকু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা-বার্ধক্য কাজ থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে, তার সবটুকুর স্বীকার হয়েও জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাজ করে গিয়েছেন হকিং। বর্ণাঢ্য জীবন, শিক্ষকতা, গবেষণা অথবা পুরস্কার- হকিং’এর যে কোনো একটা নিয়ে আলাপ করতে গেলেই হয়তো তা ছেপে বের হওয়া কোনো পত্রিকার এক পাতায় আঁটবে না। পদার্থবিজ্ঞান আর সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গোটা জীবন পার করে দেয়া এই মানুষটির ছিলো গণমানুষের জন্য অপরিসীম ভালোবাসা। জীবনের পঞ্চাশটি বছর তাই মানুষের জন্য সম্প্রীতি আর ভালবাসার বার্তা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীময়। কথা বলেছেন সহজ-কৌতুকময় ভঙ্গিতে। বিজ্ঞানকে ছাত্রছাত্রীদের জন্য সহজ করেছেন, ভেঙে দিয়েছেন হাজারো কুসংস্কারের বেড়াজাল। বদলে বিশ্বাস করতেন স্টিফেন হকিং। বলতেন, “বুদ্ধিবৃত্তি মানেই হলো বদলকে গ্রহণ করতে শেখা।” যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন হকিং, কাকতালীয়ভাবে গ্যালিলিও’র ঠিক তিনশোতম মৃত্যুবার্ষিকীতে! লন্ডনে বেড়ে ওঠা হকিং যৌবন থেকেই ছিলেন মানবমুক্তির আন্দোলনের পক্ষে। আর এ কারণেই হয়তো, হয়ে ওঠেন লেবার পার্টির একজন সমর্থক। অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জীবন ভীষণভাবে প্রভাবিত করতো তাঁকে। আইনস্টাইনের নানা গবেষণার সফল উত্তরসূরী স্টিফেন হকিং, সেই সাথে আইনস্টাইনের রাজনৈতিক দর্শনটারও। এর প্রমাণ পাই যখন তিনি বলে ওঠেন, “পুঁজিবাদকে ভয় পাও, রোবটকে নয়”। বিশ্বাস করতেন, ভাগ্য কারও দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। মানুষই বানায় তার নিজের ভাগ্য। আর তাই তো, মানবসভ্যতার নিজ ভাগ্য গড়ে নিতে একটি ধর্মনিরপেক্ষ-মানবতাবাদী বিশ্বদর্শনে দীক্ষিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো তাঁর। আধুনিক গবেষণা আর বিজ্ঞানের অবাধ চর্চার জন্য বলে গেছেন আন্তর্জাতিক একতার কথা। ব্রেক্সিটের মতো ঘটনা কী করে প্রভাব ফেলবে গবেষণা খাতে, তা বুঝিয়ে গেছেন আমৃত্যু। জীবনভর কথা বলেছেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর বাঘা বাঘা সব রাষ্ট্রপ্রধানদের রীতিমতো যুদ্ধাপরাধী আখ্যা দিয়ে বসলেন হকিং! ইজরাইলের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে গলা উঁচু করেছেন প্যালেস্টাইনের জনগণের মানবাধিকারের পক্ষে। নিজের সমৃদ্ধ জীবনে কোনো আফসোস আছে কি না, জানতে চাইলে কৌতুক করে বলতেন, জীবনে তাঁর একটাই আফসোস। আর তা হলো, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের পায়ের ওপর দিয়ে নিজের হুইলচেয়ারটা চালিয়ে দেয়ার সুযোগ পাননি কখনো! শেষ জীবনে কথা বলতে হয়েছে সম্ভবত এর থেকেও উদ্ভট রাজনীতিবিদদের নিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছেন। স্টিফেন হকিং স্বপ্ন দেখতেন, বিজ্ঞান হবে সব মানুষের। একই সাথে স্বপ্ন দেখতেন অধিকার আদায় করে নেবে গণমানুষ। দাবি জানিয়ে গেছেন প্রত্যেক শ্রমিককে দিতে হবে বাৎসরিক তিন মাসের ছুটি। যন্ত্র নিয়ে বিজ্ঞানীর কারবার, তাই বিশ্বাস করতেন যন্ত্রেরও থাকতে হবে স্বাধীনতা। যে দিন থেকে যন্ত্রের বানানো পণ্য ভাগাভাগি করে নেবে সারা বিশ্বের মানুষ, সে দিন থেকেই যন্ত্র স্বাধীন, আর যে দিন পর্যন্ত যন্ত্রের মালিকের হাতে থাকবে উৎপাদিত পণ্য বিতরণ বা বিক্রির চক্র, সে দিন পর্যন্ত স্বাধীন হবে না যন্ত্র। বলতেই হয়, চিকিৎসাব্যবস্থা আর ওষুধ উৎপাদন নিয়েও যথেষ্ট চিন্তিত ছিলেন হকিং। বারবার নিজ দেশের সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা আর ওষুধ উৎপাদনে বেসরকারিকরণ বন্ধ করতে। বিশ্বাস করতেন, যত বেশি হবে বেসরকারিকরণ, তত বেশি হবে মানুষের খরচের বোঝা। পুঁজিবাদ নানা সময়ই হকিং’কে অস্ত্র বানাতে চেয়েছে। চেষ্টা করেছে তাকে বিশ্বের সামনে একটা বিজ্ঞাপন হিসেবে তুলে ধরতে। চুপচাপ হুইলচেয়ারে বসে থেকেও হকিং সেই সুযোগ দেননি কখনো। বলেছেন, “একটা জনপ্রিয়তা আমাকে পেয়ে বসেছে নিঃসন্দেহে, তবে বুঝি না কীসের জন্য আমি বেশি জনপ্রিয়- আমার কাজগুলো, নাকি এই হুইলচেয়ার আর আমার অক্ষমতা!” শারীরিক প্রায় সমস্ত সক্ষমতা হারিয়েও যেন সমকালীন সময়ের সবথেকে শক্ত “মেরুদণ্ড”- সম্পন্ন মানুষটির নাম স্টিফেন উইলিয়াম হকিং। হুইলচেয়ারে বসে দিন কাটানো ছোটখাটো মানুষটির শক্ত সমস্ত “কথা”-র প্রভাবে নড়ে যেতে বসতো শাসকের গদি, চিন্তার ঝড় উঠতো মানুষের মগজে। হকিং’এর চিকিৎসকরা তাঁর জীবনীশক্তি দেখে বিস্মিত হতেন। অনেক চিকিৎসকেরই ধারণা ছিলো হকিং বাঁচবেন খুব অল্পকাল। কিন্তু সব ধারণাকে মিথ্যে করে দিয়ে তিনি বাঁচলের অনুমানিত সময়ের পরেও আরো বেশ কয়েক দশক। শরীর অচল হলেও, মস্তিষ্ক কখনো থেমে থাকেনি মানুষটির। আর তাই তো বলতেন, “একটা সচল মস্তিষ্কই হলো আমার বেঁচে থাকার একমাত্র রহস্য।” হকিং’এর সব চিকিৎসকরাও যেন তাঁদের বিস্ময়ের উত্তর পেয়ে যান তাঁর এই কথায়। হকিং’এর শার্টের কবজিতে প্রায়ই একটা ব্যাজ লাগানো দেখা যেতো। সেটিতে লেখা থাকতো দুটি শব্দ -“সুস্থির থাকো”। আমাদের অগোছালো আর বিশঙ্খল এই পৃথিবীর জন্য এর থেকে ভালো উপদেশ আর কিছু হতে পারে কি? হকিং বলতেন, “মৃত্যুকে আমার ভয় নেই, কিন্তু মৃত্যুর জন্য তাড়াও নেই।” -শুধুমাত্র মগজটুকু চালু থাকলেও যে বেঁচে থাকার, কিছু করে যাবার আকাঙ্ক্ষাটা থাকতে পারে তা এই চিন্তাসৈনিক পৃথিবীকে শিখিয়েছেন। ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ, ৭৬ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান গণমানুষের ভালোবাসার এই প্রফেসর। লেখক : সাংস্কৃতিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ