বিবর্তিত হয়ে আসা নভেল করোনা ভাইরাস

Posted: 22 মার্চ, 2020

এ. এন. রাশেদা : ভাবা যায়! যাদের চোখে দেখা যায় না, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না– তারা কত ভয়ংকর! যাদের পরিমাপ করা হয় মিলি মাইক্রন মিউ (m) বা অ্যাংস্ট্রম (A°) দ্বারা। অর্থাৎ ১ মি. মি. হচ্ছে ০.১ সে. মি.। আর মাইক্রন (m) হচ্ছে ০.০০১ মি. মি.। আর মিলি মাইক্রন (mm) হচ্ছে ০.০০১ মাইক্রন (m)। আবার A° = ০.১ mm –এটি করোনা ভাইরাস এর বেলায় নয়, প্রায় সব ভাইরাসের বেলায়। এদের গঠনে আছে শুধুই প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিড। এই নিউক্লিক অ্যাসিড হচ্ছে De-Oxy ribonucleic acid ডিএনএ (DNA) তারা ডাবল সূতার এবং আরএনএ (RNA) অর্থাৎ ribonucleic acid –একক সূতার। তাও আবার তারা একসঙ্গে থাকে না। হয় DNA ভাইরাস, নয়ত RNA ভাইরাস। সাধারণত প্রাণিকূলের মধ্যে DNA ও উদ্ভিদকূলে RNA। আবার ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যেও ভাইরাস বংশবৃদ্ধি ঘটায় এবং ব্যাক্টেরিয়াকে ধ্বংস করে। পোষকের কোষের বাইরে ভাইরাস জড় এবং কোষের ভেতরে জীবন্ত। আগেই বলা হয়েছে ভাইরাস নিউক্লিক অ্যাসিড ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত এবং জৈব অভিব্যক্তি বা বিবর্তনের (evolution) এর পথেই এদের উৎপত্তি হয়– এ কথা নতুন না। শুধু ভাইরাস কেন –সমগ্র জীব জগতই কয়েক কোটি বছর ধরে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত হতে হতে আজকের এই জীবজগতের উৎপত্তি হয়েছে– বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তা পরিমাপ করা যায়। কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে কেউ কেউ তুরি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলেন– না, এ কথা ঠিক না। পৃথিবীর উৎপত্তি এবং জীবকূল ধীরে ধীরে কোটি কোটি বছর ধরে হয়নি। বিজ্ঞানীদের সকল আবিষ্কার মিথ্যা। এ ক্ষেত্রে বেচারা বিজ্ঞানী চার্লস রবার্ট ডারউইনের ওপর বেশি রাগ তাদের। চার্লস ডারউইন এবং বিজ্ঞানী ওয়ালেস-এর পর্যবেক্ষণ ছিল– ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ নিয়ে। তাঁরা সাক্ষ্য-প্রমাণের দ্বারা প্রমাণ করে দেখান যে, জীব জগৎ স্থিতিশীল নয়– বিবর্তন ঘটছে। কোটি কোটি বছর ধরে ক্রমে ক্রমে বিবর্তনের মাধ্যমেই জীবের পরিবর্তন ঘটছে এবং তা প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই। একযোগে সকল প্রজাতির সৃষ্টি হয়নি বা থেমে থেমে এদের সৃষ্টি করা হয়নি – বর্তমানে এটিই একটি মূল তত্ত্ব। বিবর্তনের মাধ্যমে যেমন জীবের পরিবর্তন ঘটছে তেমনি পরিবর্তন ঘটছে আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশেরও। এক সময়ে পৃথিবীর বাতাসে অক্সিজেন ছিল না। প্রায় তিনশ কোটি বছর আগে সালোক সংশ্লেষণকারী উদ্ভিদের বিবর্তন ঘটে– যার ফলে তারা কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানি গ্রহণ করে কার্বোহাইড্রেট তৈরি করে এবং অক্সিজেন ছেড়ে দেয়– পৃথিবীর বায়ুম-লে অক্সিজেনের উপস্থিতির ফলেই মানুষসহ অক্সিজেন গ্রহণকারী সকল প্রাণীর উৎপত্তি ঘটে এবং বিবর্তন শুরু হয় ধীরগতিতে। ডারউইন ওয়ালেসের ব্যাখ্যা ছিল –শুধু প্রজাতির উৎপত্তি বা উদ্ভব নিয়েই; যা বিবর্তনের মূল বিষয়। তবে তা ‘প্রাণের উৎপত্তি’ নিয়ে ছিল না। কারণ তখন নিউক্লিক অ্যাসিড অর্থাৎ DNA ও RNA সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না। তা আবির্ভূত হয় ১৯৫৩ সালে জেমস ডি. ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের DNA অনুর মডেল বর্ণনার মধ্য দিয়ে। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারে আরো অনেকেই সহায়তা করেছেন। যারা ‘বিবর্তন’ শব্দটি শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন এবং ‘৮০-র দশকে কলেজ পর্যায়ে জীববিজ্ঞানের সিলেবাস থেকে ‘জৈব অভিব্যক্তিবাদ’ বা বিবর্তনতত্ত্ব বাদ দিয়েছেন, তারা এখন কী বলবেন– করোনা ভাইরাসের দ্রুত বদলে যাবার ব্যাখ্যায়? বর্তমান নোভেল কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস –সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম) ভাইরাসের মত এবং মার্স ভাইরাস (মিডল ইস্ট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোম)–এর সঙ্গে এদের বিস্তর মিল রয়েছে। সংক্রমিত হওয়ার পরে অন্তত ৩৭ দিন এরা বেঁচে থাকে রোগীর শ্বাসযন্ত্রে। সেখান থেকে খাদ্যনালী দিয়ে বাহিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে রক্তে। ধীরে ধীরে এদের আক্রমণের শিকার হয় শরীরের কোষ-কলা। ১৩.৩.২০২০ কালের কণ্ঠের এক ফিচারে বলা হয়েছে ‘সিঙ্গেল বা একক সূতার RNA ভাইরাস সেই ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু ভাইরাসের মত নয়। এটি প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে।’ বলা হচ্ছে ৩১১ বার বিবর্তিত হয়েছে। এখানে খুব সংক্ষেপে DNA ও RNA সম্পর্কে বলা প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে। এই যে DNA ডাবল সূতা এবং RNA একক সূতা বলা হচ্ছে –বিষয়টি একটু সহজ করে বলা দরকার। সুতাটি তৈরি হয় ‘চিনি ও ফসফেট দ্বারা। মইয়ের সঙ্গে তুলনা করে বলা যায় সূতা দুটি দুই দিকে থাকবে আর মাঝের সিড়িগুলো হবে নাইট্রোজেনযুক্ত ক্ষার –অ্যাডেনিন-থাইমিন এবং গুয়ানিন-সাইটোসিন। এবং এরা যুক্ত থাকবে দুর্বল হাইড্রোজেন বন্ড দ্বারা। এই হাইড্রোজেন বন্ড ভেঙে এরা দু-দিকে যায় এবং নতুন করে একটি সূতা তৈরি করে নেয়। এরা নিজেরাই নিজেদের তৈরি করে এবং শুরু হয় পথচলা। বলা হয় এখানেই জীবনের রহস্য। RNA-এর বেলায় থাইমিনের পরিবর্তে থাকে ইউরাসিল-এর এক সূত্রক, মাঝেমধ্যে পেঁচিয়ে যায় এবং এর ৫ কার্বনযুক্ত রাইবোজ সুগারে থাকে DNA-এর চাইতে ১টি O2 অনু বেশি। যে ভাইরাসের কথা বলা হচ্ছে। তাদেরও RNA প্রতিনিয়ত ভাঙছে আবার দ্রুতগতিতে নতুন RNA তৈরি হচ্ছে এটি একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। তবে করোনা ভাইরাস বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। ‘চীনা একাডেমি অব মেডিক্যাল সায়েন্সের ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা বলছেন– সংক্রমণ দ্রুত ধরা পড়ে না। শ্বাসযন্ত্রে দ্রুত থাবা বসায়। প্রথমে সাধারণ সর্দি কাশি হয়। এরপর বাড়তে থাকে তাপমাত্রা, শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। ৩৭ দিন ধরে দুর্বল করে শ্বাসযন্ত্র। তখন আস্তে আস্তে খাদ্যনালী দিয়ে নেমে এসে সোজা রক্ত কণিকাগুলোকে আক্রমণ করে এবং ভেঙে চুরমার করে শ্বাসযন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়’– মার্স, সার্স থেকে নভেল কোভিড-১৯ তো বিবর্তনেরই ফল। নভেল মানে নতুন, করোনা মানে মুকুট। ১৭৯৬ সালে ভাইরাস যে বসন্ত রোগের কারণ তা উল্লেখ করেছিলেন বিজ্ঞানী জেনার। ১৮৮০ সালে লুই পাস্তুর কুকুর ও শেয়ালের দংশনে র্যাবিস রোগের কারণ যে ভাইরাস–তা উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে উদ্ভিদেও যে ভাইরাসের আক্রমণ হয়, তা আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানী এডলফ মেয়ার ১৮৮৬ সালে। ভাইরাস একটি জৈব অনু, যা কেবল সজীব কোষে প্রজননে লিপ্ত থেকে বংশবৃদ্ধি করে আর প্রাণিকূলের বিনাশ ঘটায়। ভাইরাস মিউটেশনের মাধ্যমে অর্থাৎ DNA ও RNA এর মধ্যে অবস্থার পরিবর্তন করে নতুন ধারার ভাইরাস জন্ম দেয়। বিজ্ঞানীরা তাই বলেন, ‘পৃথিবীর সব প্রাণীই একই আদি জীব বা পূর্ব পুরুষ থেকে কোটি কোটি বছরের বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপত্তি হয়েছে। যে জীব যত পরে আরেক জীব থেকে বিবর্তিত হয়ে অন্য প্রজাতি বা জীবে পরিণত হয়েছে; তার সাথে ঐ জীবের তত বেশি মিল খুঁজে পাওয়া যায়। শিম্পাঞ্জীদের সাথে আমাদের DNA প্রায় ৯৮.৬%, ওরাং ওটাঙের সাথে ৯৭%, আর ইঁদুরের সাথে ৮৫% মিল দেখা যায়। এ কারণে ইঁদুর বা অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে, বিভিন্ন ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে তা পরবর্তীতে মানুষের দেহে প্রয়োগ করা হয়। বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস-কীভাবে ওষুধ প্রয়োগের সাথে সাথে বিবর্তিত হয়ে আরও শক্তিশালী ও পরিবর্তিত রূপ ধারণ করে – তা না-বুঝলে আজকে ওষুধ কোম্পানিগুলোর ঠিক অসুখের জন্য ঠিক ওষুধ তৈরি করা সম্ভবই হতো না– যদি না তারা জীবের বিবর্তন না বুঝতো। ভাইরাস নিয়ে আজকাল অনেকে বলছেন –ভাইরাস ঠান্ডায় বেঁচে থাকে কিন্তু গরমে না। তাই সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমাদের দেশে গরম পড়লে এর প্রাদুর্ভাব কমবে। কিন্তু কলেজ পর্যায়ের জীববিজ্ঞান বইতেই পড়ানো হয়– ‘ভাইরাস অত্যাধিক উষ্ণতা ও অত্যাধিক ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে।’ আবার জৈব অভিব্যক্তিবাদ বা বিবর্তন সিলেবাস থেকে বাদ দিলেও ভাইরাস পড়াতে যেয়ে বলা হচ্ছে ‘জৈব অভিব্যক্তির (বিবর্তন) পথেই ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে’ এবং ‘পরিব্যক্তির (Mulation) মাধ্যমে নূতন ধারা উদ্ভবে ভাইরাস সক্ষম’। – অর্থাৎ এখানে ঐ বিবর্তনকেই স্বীকার করা হচ্ছে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও উদাহরণ আছে। বর্তমানে জীবাণু অস্ত্র বানানোর সময় ভাইরাস বেরিয়ে পড়েছে বলে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রেঞ্চে অবস্থানকারী অজেয় ফরাসী সৈন্যদের হত্যার জন্য জার্মানরা সেদিন নাইট্রোজেনযুক্ত গ্যাস ব্যবহার করেছিল– যা ছিল পরিব্যক্তিক দ্রব্য (Mutagenic agent)। এটি বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৫,২৫০,০০০ পরমাণু বিশিষ্ট মৃদু ভাইরাস থেকে ৩টি পরমাণু অপসারিত করে ঘাতক ভাইরাসে পরিণত করা হয়েছিল। এই মিউট্যান্ট ভাইরাসের আক্রমণে ৬০% ফরাসী সৈন্য মারা গিয়েছিল এবং পরবর্তীতে ২০ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। এবার করোনা ভাইরাসের কারণে মৃত্যুবরণ কম হলেও বিশ্বব্যাপী ব্যবসা-বাণিজ্যে যে স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে, তা বিশ্বকে কোথায় নিয়ে যাবে– তা অশনি সংকেত বলেই মনে হচ্ছে। লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক একতা