জিওর্দানো ব্রুনো
Posted: 23 ফেব্রুয়ারী, 2020
তুহিন কান্তি ধর :
১৭ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসের এক কলঙ্কময় দিন। আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে ১৬০০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রচলিত ধর্মের বিরোধিতার (heresy) অপরাধে ইতালির রোমে জনসমক্ষে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় সত্যসন্ধানী জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিওর্দানো ব্রুনোকে। এজন্য তাঁকে চিন্তার মুক্তির লক্ষ্যে ‘বিজ্ঞানের জন্য একজন শহীদ’ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিওর্দানো ব্রুনো একাধারে ছিলেন একজন দার্শনিক, বিশ্বতত্ত্ব বিশারদ, গণিতবিদ এবং ওকাল্টিস্ট (গূঢ় রহস্যাদিতে বিশ্বাসী ব্যক্তি)। ব্রুনো তাঁর স্মৃতিবর্ধন পদ্ধতির জন্য বিখ্যাত যা সংগঠিত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ‘মহাবিশ্ব সম্পূর্ণ সুষম এবং অসীম নয়’- তার প্রাথমিক প্রস্তাবকদের মধ্যে তিনি একজন। ব্রুনো কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদকে সমর্থন করেছিলেন, যা ছিল খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থের ‘সূর্য পৃথিবীর চার পাশে ঘোরে’-এই মতবাদের বিপরীত। তিনি কোপার্নিকাসের মতবাদকে সমর্থন করে দৃঢ় প্রত্যায়ে বলেছিলেন- ‘সূর্য নয়, বরং পৃথিবীই সূর্যের চারপাশে ঘুরে’। চার্চের প্রচণ্ড চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে হাসিমুখে মৃত্যুকেই বরণ করে নিয়েছিলেন মহান দার্শনিক ব্রুনো।
জিওর্দানো ব্রুনো ১৫৪৮ সালে ইতালির ভিসুভিয়াস পর্বতমালার অদূরে নেপলস এর (সেই সময়ের কিংডম অব নেপলস) ‘নোলা’ নামক ছোট্ট এক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম জিওভান্নি ব্রুনো, আর মা ফ্রলিসা সভোলিনো। একটু বড় হলে তাঁকে শিক্ষাগ্রহণের জন্য নেপলসে পাঠানো হয়। প্রথমে তিনি অগাস্টিনিয়ান মঠে শিক্ষাগ্রহণ করেন। বয়স ১৩ বছর হওয়ার পর ব্রুনো নেপ্লেসর সেন্ট ডোমিনিকান স্কুলে ভর্তি হন। ১৭ বছর বয়সে তিনি San Domenico Maggiore মঠে যান এবং সেখানেই তিনি ‘জিওর্দানো’ নাম গ্রহণ করেন। এ নামটি তিনি রাখেন মঠে তাঁর মেটাফিজিক্সের শিক্ষক জিওদার্নো ক্রিস্পোকে সম্মান দেখিয়ে। ১৫৭২ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি পাদ্রী হিসেবে মনোনীত হন। ব্রুনো তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তির জন্য সবার কাছেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর মুক্ত ও অনুসন্ধানী চিন্তা এবং সে যুগে গির্জা কর্তৃক বাজেয়াপ্ত বই পড়ার কারণে তিনি অনেক কঠিন কঠিন সমস্যায় পড়ে যান। ১৫৭৬ সাল থেকে ব্রুনো ইতালির বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। এসময়েই তিনি তাঁর রচনা ‘ঙহ ঞযব ঝরমহং ড়ভ ঃযব ঞরসবং’ প্রকাশ করেন। তাঁর জন্মের সময়টা এমন ছিল যে, মধ্যযুগের ধর্মীয় ও দার্শনিক প্রতিক্রিয়াশীলতাও শেষ হয়নি, আবার যুক্তিভিত্তিক আধুনিক যুগেরও সূচনা ঘটেনি। সে হিসেবে তাঁর জন্ম এক মহা সন্ধিক্ষণে। এমন সময়েই বিপ্লবী মতবাদ নিয়ে উপস্থিত হন ব্রুনো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ব্রুনোর জন্মস্থান ইতালিতেই ১৩৫০ সাল থেকে ইউরোপীয় পুনর্জাগরণ তথা রেনেসাঁ শুরু হয়েছিল। প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের উত্থান ঘটছিল এবং ক্যাথলিক চার্চ সমাজে নিজেদের প্রভাব রক্ষার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
সেই সময়ে প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল- “পৃথিবী স্থির এবং সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে”। এ বিষয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপারনিকাস এর পর্যবেক্ষণ ছিল- “সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে না, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে”। জিওর্দানো ব্রুনো কোপারনিকাসের তত্ব বিশ্বাস করতেন। তাঁর বই লুকিয়ে পড়তেন। সকল বিপদকে অগ্রাহ্য করে সাধারণ মানুষের অন্ধবিশ্বাস তিনি ভাঙ্গতে শুরু করেছিলেন। ব্রুনো বলতেন- নিকোলাস কোপারনিকাস ভ্রান্ত নন, সত্যিই পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। এ কারণে ব্রুনো গির্জার কুনজরে পড়ে দেশান্তরি হন। নানা জায়গা ঘুরে যাজকের ছদ্মবেশে পাহাড়ি পথ দিয়ে ১৫৭৯ সালে তিনি সুইজারল্যান্ড এর জেনেভাতে পৌঁছান। জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক ‘অহঃড়রহব ফব ষধ ঋধুব’ এর লেখার প্রতিবাদ করে একটি লেখা প্রকাশ করার অপরাধে ব্রুনোকে আটক করা হয়। তাঁকে ক্ষমা চাইতে বলা হয় ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পবিত্র হতে বলা হয়। তিনি এর কোনোটিই করতে রাজি না হয়ে জেনেভা ছেড়ে ফ্রান্স চলে যান। সেখানে তিনি ধর্মতত্ত্বের উপর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। সেখানকার ছাত্ররা তাঁকে দর্শন শাস্ত্রের লেকচারার হিসেবে মনোনীত করে। প্যারিসে থাকাকালীন ব্রুনো অনেকগুলো বই লিখে প্রকাশ করেন। তারপর ইংল্যান্ড আর জার্মানিতে গিয়ে তিনি সাধারণ মানুষকে সত্যের ধারনা দিতে ঈশ্বর ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে নানা স্থানে বক্তৃতা করতে থাকেন। তিনি তাঁর বাগ্মিতা ও অসাধারণ স্মৃতিশক্তির জন্য প্রচুর খ্যাতি লাভ করেন। ১৫৯১ সালে তিনি ইতালি ফিরে আসেন। এখানে আসার কিছুদিন পরই জিওভাননি মচেনিগো নামে এক ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ম ও ঈশ্বরে বিরোধিতার অভিযোগ আনেন। ১৫৯২ সালের ২২ মে ব্রুনোকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি বিচারের মুখোমুখি হন। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত প্রধান অভিযোগগুলো ছিল- (১) ক্যাথোলিক ধর্মমত ও ধর্মীয় গুরুদের মতের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ, (২) খ্রিস্টীয় ধর্মমত অনুসারে স্রষ্টার ত্রি-তত্ত্ববাদ, যিশুর মৃত্যু ও পরে আবার শিষ্যদের কাছে দেখা দেওয়ার বিষয়গুলো বিশ্বাস না করা, (৩) যিশু ও তাঁর মা মেরিকে যথাযথ সম্মান না করা এবং (৪) এই মহাবিশ্বের মতো আরো মহাবিশ্ব আছে, পৃথিবী গোল, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে, সূর্য এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয় এবং এটি একটি নক্ষত্র ছাড়া আর কিছু নয়”- এই ধারণা পোষণ করা। ১৬০০ সালের ২০ জানুয়ারি পোপ ৮ম ক্লেমেন্ট ব্রুনোকে একজন ধর্মদ্রোহী বলে রায় দেন ও তাঁকে বিনা রক্তপাতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়; অর্থাৎ জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার আদেশ দেয়া হয় ৫২ বছর বয়সী জিওর্দানো ব্রুনোকে। রায় শুনে ব্রুনো বিচারকদের বলেন, “আপনারা হয়তো আমার সাথে হেরে যাবার ভয়ে আমার বিরুদ্ধে এই রায় দিয়েছেন। আমি এটি গ্রহণ করলাম।”
১৬০০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে রোমের কেন্দ্রীয় বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাত-পা শিকলে বেঁধে তাঁকে সবার সামনে লোহার একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়। ধর্মের বিপক্ষে যাতে আর কিছু বলতে না পারেন, সেজন্যে পেরেক ফুটিয়ে তাঁর জিভ ঠোঁটে আটকিয়ে রাখা হয়। যাজকরা তাঁকে শেষ সুযোগ দিয়ে ধর্মের পক্ষে যেতে বলে। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাষ পর্যন্ত তিনি নত হননি। ছাই হয়ে যায় লোহার স্তম্ভে বাঁধা সত্যসন্ধানী ও সাহসী এই বিজ্ঞানীর দেহখানি। পরে তাঁর দেহভস্ম টিবের নদীতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ব্রুনোর মৃত্যুর প্রায় ৪০০ বৎসর পর গির্জাকে ভুল স্বীকার করতে হয়। ব্রুনোর স্মৃতির প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাঁকে ‘বিজ্ঞানের জন্য শহীদ’ বলে সম্মান জানানো হয়। গির্জাকে মেনে নিতে হয়- “সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে না, পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘুরে”। ব্রুনো বিজ্ঞান, দর্শন এবং যুক্তিবাদ নিয়ে এমন সব চিন্তা করেছিলেন যা বিংশ শতাব্দিতে এসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এজন্যই বলা হয়- ব্রুনো অসময়ে জন্ম নিয়েছিলেন, তাঁর জন্ম আরও অনেক পরে হওয়া উচিত ছিল। মহান ব্রুনো চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন মুক্তচিন্তা চর্চার ইতিহাসের সাথে। জিওর্দানো ব্রুনো, কোপার্নিকাস, হাইপেশিয়াসহ সকল অকুতোভয় সত্যসন্ধানী, যারা সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন বিজ্ঞানের তরে মানুষের কল্যাণে, তাঁদের সবার স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক : সম্পাদক, শাহপরান থানা শাখা, সিপিবি