পদ্মা ব্যারেজ
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি রক্ষায় এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট দূর করতে সাড়ে ৩৪ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। গত ১৩ মে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির নাম হবে পদ্মা ব্যারেজ। এটি বাংলাদেশের রাজবাড়ী ও পাবনা জেলায় অবস্থিত একটি প্রস্তাবিত বাঁধ।
বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটি দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। যার প্রথম অংশে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ, মধুমতি নদী ও হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদীর নিয়ন্ত্রণ ও গতিপথ পুনরুদ্ধার, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুর অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং কৃষি কাজের জন্য সেচ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি সুন্দরবনের পরিবেশ পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করা হবে। প্রথম অংশটি ২০৩১ সালের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় অংশের কাজ ২০২৮ সালে শুরু করে ২০৩৪ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই অংশে, দক্ষিণ অঞ্চলের অবশিষ্ট নদী অববাহিকাগুলি ড্রেজিং এবং সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করা হবে। এটি নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার মূল কারণ ফারাক্কা বাঁধ।
ভারতের গঙ্গা নদীর উপর অবস্থিত ফারাক্কা বাঁধ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এই বাঁধটি অবস্থিত। ১৯৬১ সালে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। সেই বছর ২১ এপ্রিল থেকে বাঁধ চালু হয়। ফারাক্কা বাঁধ ২,২৪০ মিটার (৭,৩৫০ ফুট) লম্বা যেটা প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় বানানো হয়েছিল। বাঁধ থেকে ভাগীরথী-হুগলি নদী পর্যন্ত ফিডার খালটির দৈর্ঘ্য ২৫ মাইল (৪০ কিলোমিটার)। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে কলকাতা বন্দরের কাছে হুগলি নদীতে পলি জমা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই পলি ধুয়ে পরিষ্কার করার জন্য ফারাক্কা বাঁধ তৈরি করা হয়। শুষ্ক মরসুমে (জানুয়ারি থেকে জুন) ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গার ৪০,০০০ ঘনফুট/সে (১,১০০ মি৩/সে) জল হুগলি নদীর অভিমুখে চালিত করে। তবে এই বাঁধের কারণে গঙ্গা থেকে অপসারিত ৪০,০০০ কিউসেক পানি ফিডার খাল কিম্বা হুগলী-ভাগরথী ধারণ করতে পারছে না।
গঙ্গা এবং ভাগরথীর প্রবাহ রেখার উচ্চতার তারতম্যের কারণে পানি সঞ্চালন কষ্টকর হয়। ফলে গঙ্গা নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য অন্য পথ খুঁজতে হচ্ছে। এই কারণের জন্য মুর্শিদাবাদ এবং মালদা জেলা জুড়ে দেখা দেয় মাঝে মাঝে জলাবদ্ধতা। ব্রক্ষপুত্রের তুলনায় গঙ্গা কম গতি শক্তি সম্পন্ন নদী। এ ধরনের নদীর গতিপথ হয় আঁকা-বাঁকা। এক বাঁক থেকে আরেক বাঁকের দূরত্বকে বলে মিয়ান্ডার দৈর্ঘ্য এবং একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে কয়টা বাঁক রয়েছে তাকে বলে মিয়ান্ডার ফ্রিকোয়েন্সি। হঠাৎ করে মৃতপ্রায় হুগলী-ভাগরথীর মধ্য দিয়ে কৃত্রিমভাবে বিপুল পরিমাণে পানি প্রবাহিত করলে হুগলী-ভাগরথী ও উজানে বিহার অবধি সব নদীর মিয়ান্ডার ফ্রিকোয়েন্সির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ফলে ঐ সমস্ত নদীতে জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন এবং চর সৃষ্টি ত্বরান্বিত হয় এখন।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে ভাটি অঞ্চলের সকল নদীর নাব্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ভাটি এলাকায় শুষ্ক মওসুমে পানিপ্রবাহ কম হওয়ার কারণে দেখা দিচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তন। ভারতের একতরফা গঙ্গার জল সরাবার কারণে যে শুধু বাংলাদেশের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে তা নয়–বরং এর ফলে বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, বন ও নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। এ বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে ২৯ অক্টোবর, ১৯৫১ সালে তখন তৎকালীন পাকিস্তান সরকার গ্রীষ্মকালে গঙ্গা নদী হতে বিপুল পরিমাণ পানি পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী নদী পুনরুজ্জীবিত করার জন্য অপসারণ করার ভারতীয় পরিকল্পনার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভারত জবাব দেয় তাদের এই পরিকল্পনা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে এবং এর ফলাফল সম্পর্কে পাকিস্তানি উদ্যোগ শুধুমাত্র তত্ত্বীয় ব্যাপার। সেই থেকে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে লম্বা আলাপ-আলোচনার জন্ম দেয়।
১৯৭০ সাল পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান এই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক আলোচনা করে। কিন্তু এই আলোচনা যখন চলছিল তখন ভারত ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণকাজ অব্যহত রাখে এবং ১৯৭০ সালে এর কাজ সমাপ্ত করে। বাঁধটির অবস্থান বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় ১৬.৫ কিলোমিটার (১০.৩ মাইল) দূরে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর গঙ্গার জল বণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে আলোচনা শুরু করে। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানি বণ্টন বিষয়ে এক যৌথ বিবৃতি দেন। এই সম্মেলনে এ সিদ্ধান্ত হয় যে, উভয় দেশ একটি চুক্তিতে আসার আগে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করবে না। যদিও বাঁধের একটি অংশ পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৫ সালে দশ (২১ এপ্রিল ১৯৭৫ থেকে ২১ মে ১৯৭৫) দিনের জন্য ভারতকে গঙ্গা হতে ৩১০-৪৫০ কিউসেক পানি অপসারণ করার অনুমতি দেয়।
১৯৭৫ সালের পট পরির্বতনের পর ভারত সকল প্রকার আলোচনায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত গঙ্গা নদী হতে ১১৩০ কিউসেক পানি অপসারণ করে পশ্চিমবঙ্গের ভাগরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করে। বর্তমানে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ভারতে দেখা দিয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবে গৌড়ার মধ্যে ফারাক্কায় গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল শুষ্ক মৌসুমে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে) দুই দেশের মধ্যে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা। চুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল- ১. চুক্তিটি ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয় এবং এর মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। ২. ফারাক্কায় পানির প্রাপ্ততার ওপর ভিত্তি করে চুক্তিটি প্রণয়ন করা হয়।
নদীর প্রবাহ ৭০,০০০ কিউসেক বা তার কম হলে বাংলাদেশ ও ভারত সমানভাবে ৩৫,০০০ কিউসেক করে পানি পাবে বলে চুক্তিতে নির্ধারিত হয়। পানির প্রবাহ যদি ৭৫,০০০ কিউসেক হয়, তবে বাংলাদেশ ৩৫,০০০ কিউসেক এবং ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পানি পাবে। ৩. গঙ্গার পানি প্রবাহ ৫০,০০০ কিউসেকে নেমে এলে দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে। ২০২৬ সালে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। তাই বাংলাদেশের নদীর নাব্যতা রক্ষায় সরকার পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
তবে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে পানি বিশেষজ্ঞদের নানা মত রয়েছে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ থেকে জানা যায় যে, প্রথমত, ব্যারাজের উজানে নদীতে পলি পতনের ফলে তলদেশ ভরাট হয়ে যাবে এবং ব্যারাজের প্রস্তাবিত স্থান পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার নদীর দুই তীরে বন্যা এবং পাড়ভাঙন বৃদ্ধি পাবে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতা তারই সাক্ষ্য দেয়। ফারাক্কার ফলে সেখানে উজানে বিহারের পাটনা পর্যন্ত গঙ্গার তলদেশ প্রায় ২০ ফুট উঁচু হয়ে গেছে এবং তার ফলে বন্যা এবং পাড়ভাঙন তীব্র হয়েছে। সে কারণে বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের নেতৃত্বে ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেওয়ার দাবিতে সেখানে প্রবল আন্দোলন গড়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে এই নদীর শুষ্ক মৌসুমের যতটুকু পানি দক্ষিণ-পশ্চিমে অপসারিত হবে দেশের মধ্যাঞ্চল এবং মেঘনা মোহনার জন্য ঠিক ততটুকু পানিই হ্রাস পাবে। এর ফলে আড়িয়াল খাঁসহ অন্যান্য নদীর প্রবাহ কমে যাবে এবং মেঘনা মোহনা দিয়ে লবণাক্ততা দেশের আরও ভেতরে প্রবেশ করবে।
তৃতীয়ত, এই প্রকল্পের ফলে ভারতের কাছে গঙ্গার হিস্যা আদায়ের প্রচেষ্টার আর সুযোগ থাকবে না। কারণ, ভারত জানাবে যে পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। সে কারণে আশ্চর্যের নয় যে ভারত পদ্মা ব্যারাজের বিষয়ে খুবই উৎসাহী। বস্তুত, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই প্রকল্প ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে করার চিন্তা করা হয়েছিল।
ওপরের বিষয়গুলোর আলোকে পরিবেশবাদী সংগঠন বাপা ও বেন মনে করে যে, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়া একটি হঠকারী পদক্ষেপ হবে। বাপা ও বেন বরং মনে করে যে সরকারের উচিত–প্রথমত, আন্তর্জাতিক নদ-নদীর ব্যবহারবিষয়ক জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের চুক্তি স্বাক্ষর এবং ররেটিফাই (অনুসমর্থন) করে তার ভিত্তিতে ভারতের কাছ থেকে গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহে বাংলাদেশের হিস্যা বৃদ্ধির জন্য জোর প্রচেষ্টা চালানো এবং এই দাবির প্রতিফলন ঘটিয়ে আসন্ন গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করা। দ্বিতীয়ত, গঙ্গার সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের সব শাখা নদীর সংযোগ অবারিত করা এবং এসব নদীর ওপর নির্মিত প্রবাহ বিঘ্নকারী সব প্রতিবন্ধকতা দূর করা। তাহলে গঙ্গার বর্ষাকালীন প্রবাহ এসব নদী দিয়ে প্রবাহিত হবে।
আর যদি পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ করতে হয় তা করতে হবে রাজশাহীর বাঘা ও কুষ্টিয়া দিয়ে। তা তাহলে এই দীর্ঘ ১৪৫ কিলোমিটার নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
লেখক: কলামিস্ট
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন