প্রগতির সাহিত্য আন্দোলন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এম. এ. আজিজ মিয়া : বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপে ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান ঘটে। ১৯১৯ সালে বসন্তকালে ইতালিতে ফ্যাসিবাদীদের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন মুসোলিনি। তার লক্ষ্য ছিল, যে কোনো উপায়েই হোক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা। ১৯২২ সালের প্রথম দিকেই মুসোলিনি ইতালির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নেন। ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘ফ্যাসি-বিরোধী মৈত্রী’ নামে একটি ফ্রন্ট গঠিত হয়। এই ফ্রন্টের আহ্বানেই আগস্ট মাসে ফ্যাসি-বিরোধী ধর্মঘট পালিত হয়। ১৯২২ সালের ২৮ অক্টোবর ফ্যাসিবাদীরা রোম অভিযান করে এবং মুসোলিনিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। ১৯২৩ সালে ব্যাপকভাবে কমিউনিস্টদের গ্রেফতার ও নিপীড়ন-নির্যাতন শুরু করা হয়। সেখানে একটি যুদ্ধান্মাদনা শুরু করা হয়। এসময় থেকে বিশ্বের শান্তিকামী কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদেরা শান্তির সপক্ষে জনমত গড়ে তোলার প্রয়াস গ্রহণ করেন। ১৯২৭ সালে ফরাসি লেখক অ্যাঁরি বারবুস বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের নিকট ফ্যাসিবাদ বিরোধী একটি সাধারণ আবেদন জানান এবং তাতে জনসাধারণকে ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে ফ্যাসিবাদের তরঙ্গকে রোধ ও ধ্বংস করার আহ্বান জানান। সে বছর ব্রাসেলসে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী লীগ-এর কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৩২ সালের ১৭–২৯ আগস্ট আমস্টারডামে আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরোধী কংগ্রেসে অ্যাঁরি বারবুস একটি প্রতিবেদন পেশ করেন। ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি জার্মানিতে হিটলার ক্ষমতা দখল করে নেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি রাইখস্ট্যাগে অগ্নিসংযোগ করে কমিউনিস্টদের ওপর দোষ চাপানো হয় এবং চরম জুলুম ও নির্যাতন শুরু করা হয়। সে বছর ১০ মে বার্লিনের রাজপথে নাৎসি বাহিনী বিশ্ববিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যকর্মের বহ্নুৎসব করে। ১৯৩৩ সালের আগস্ট মাসে যুদ্ধ ও ফ্যাসিবিরোধী লীগ-এর কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৩৫ সালে মুসোলিনি ইথিওপিয়া আক্রমণ করে। হিটলার-মুসোলিনির সাম্রাজ্য-লালসা, মানববিধ্বংসী নীতি ও যুদ্ধপ্রস্তুতি ক্রমশ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ফ্যাসিবাদের দানবীয় ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে ইউরোপের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানান রোমাঁ রোঁলা, বারবুস, ম্যাক্সিম গোর্কি ও অন্যান্যরা। ১৯৩৫ সালের ২১ জুন প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় শিল্পী, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন– শান্তি রক্ষায় লেখকদের বিশ্ব কংগ্রেস। তাতে যোগদান করেছেন আঁন্দ্রে জিদ, ইএম ফস্টার, মরলিন মারলো, হাক্সলি স্ট্রাচি প্রমুখ মনীষীরা। সেখান থেকেই তাঁরা ফ্যাসিবাদী বর্বরতার বিরুদ্ধে মানবপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের আহ্বান জানান। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইউরোপ প্রবাসী ভারতীয় লেখকদের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেছিলেন মুলকরাজ আনন্দ (১৯০৫–২০০৪)। ১৯৩২-১৯৩৪ সময়কালে লন্ডনপ্রবাসী কয়েকজন ভারতীয় প্রতিভাবান ছাত্র সাম্যবাদী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইউরোপীয় শিল্পী সাহিত্যিকদের অনুপ্রেরণায় ফ্যাসিবিরোধী সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলন গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৩৫ সালের শেষের দিকে কয়েকজন ছাত্র ও সাহিত্যসেবী বিভিন্ন সময়ের আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে একজন সহানুভূতিশীল চীনা রেস্তোরাঁ মালিকের সৌজন্যে তাঁর রেস্তোরায় বসে ‘সর্বভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করার আয়োজন সম্পন্ন করেন। তাঁদের মধ্যে মুলকরাজ আনন্দ, সাজ্জাদ জহির, ভবানী ভট্টাচার্য, মুহম্মদ বিন তাহের, ইকবাল সিং, রাজা রাও, মুহম্মদ আশরফ, প্রমোদরঞ্জন সেনগুপ্ত, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, যতীশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আলোচনার ভিত্তিতে একটি ইশতেহার প্রকাশিত হয়। ইংরেজিতে লিখিত ইশতেহারটির রচয়িতা ছিলেন সাজ্জাদ জহির (১৯০৫–১৯৭৩)। এবং এ ব্যাপারে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছিলেন যতীশচন্দ্র ঘোষ যাকে বলা হতো ‘ফ্রেন্ড, ফিলোসোফার অ্যান্ড গাইড’। সর্বভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের ইশতেহার থেকে তার কিছুটা ভাবগত অংশ নিম্নে উল্লেখ করা হলো : যা কিছু আমাদের নিশ্চেষ্টতা, অকর্মণ্যতা, যুক্তিহীনতার দিকে টানে, তাকে আমরা প্রগতি-বিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করি। যা কিছু আমাদের বিচারবুদ্ধিকে উদ্বুদ্ধ করে, সমাজ-ব্যবস্থাকে যুক্তিসঙ্গতভাবে পরীক্ষা করে, আমাদের কর্মিষ্ঠ, শৃঙ্খলাপটু, সমাজের রূপান্তরক্ষম করে তাকেই আমরা প্রগতিশীল বলে গ্রহণ করবো। (প্রগতির চেতনা প্রগতির পথিকেরা, সম্পাদনা–দেবাশীষ সেনগুপ্ত পৃ. ৩) ১৯৩৬ সালের প্রথম দিকে ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় প্রগতি লেখক সংঘের ইশতেহার প্রকাশিত হলে মুনশি প্রেমচান্দ (১৮৮০–১৯৩৬) তাঁর পত্রিকায় প্রগতি লেখক সংঘের আত্মপ্রকাশকে অভিনন্দন জানান। ১৯৩৬ সালের ১০ এপ্রিল লক্ষেèৗতে ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন হিন্দি ও উর্দু সাহিত্যের মুনশি প্রেমচন্দ। সম্পাদক হয়েছিলেন সাজ্জাদ জহির। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়েছিলেন শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু এবং মাওলানা হযরত মোহানী। সেখানে উপস্থিত ছিলেন উত্তর ভারতের যশপাল, সুমিত্রানন্দন পন্থ, রশিদা জহাঁ, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, সাজ্জাদ জহির, দক্ষিণ-ভারতের রামকৃষ্ণ রাও এবং বাংলা থেকে চারজন প্রতিনিধি। সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী নিজে যেতে পারেন নি। তবে বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রতিক ধারা সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ পাঠিয়েছিলেন। উহা পাঠ করা হলে ধন্য ধন্য রব ওঠে এবং পরবর্তীকালে ‘টুয়ার্ডস প্রগ্রেসিভ ক্রিটিসিজম’ নামক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন ম্যাক্সিম গোর্কি মারা যান। প্রগতি লেখক সংঘের বিভিন্ন শাখা ‘গোর্কি দিবস’ পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সংঘের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির এ ব্যাপারে বিবৃতি প্রকাশ করেন। সে বছর ১২ জুলাই নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের পক্ষ থেকে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে একটি শোকসভার আয়োজন করা হয়। সেই সভায় বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ গঠন করা হয়। সভাপতি ড. নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামীকে সম্পাদক এবং সতেন্দ্রনাথ মজুমদারকে কোষাধ্যক্ষ করা হয়। ১৮ জুলাই জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে স্পেনে ফ্যাসিবাদী অভ্যুত্থান ঘটে। গৃহযুদ্ধে সাধারণতন্ত্রীদের পক্ষে যোগ দেন দেশ-বিদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকামী বুদ্ধিজীবীর দল। শহিদ হন র্যালফ ফক্স, ক্রিস্টোফার কডওয়েল, জন জুলিয়ান বেল, ফ্রেদিকো গার্সিয়া লোরকা প্রমুখ । এসব ঘটনা ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের দারুণভাবে আলোড়িত ও প্রভাবিত করেছিল। ১৬ আগস্ট বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ কলকাতার আশুতোষ মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রগতি লেখক সংঘ শান্তি প্রতিরক্ষায় লেখকদের বিশ্ব কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। প্যারিস, ব্রাসেলস ও মাদ্রিদে এর যে অধিবেশন হয়েছিল সেখানে ভারতীয় লেখকদের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেছিলেন মুলকরাজ আনন্দ। ১৯৩৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনে বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ ভারতবর্ষের পক্ষ থেকে একটি ইশতেহার প্রেরণ করেন। সেই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, প্রমথ চৌধুরী, প্রেমচন্দ, জওহরলাল নেহেরু, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, নন্দলাল বসু প্রমুখ। বিবৃতিতে বলা হয়েছিল : ...উন্মত্ত প্রতিক্রিয়া ও জঙ্গিবাদ আজ সভ্যতার ভাগ্য নিয়ে খেলা করছে আর সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার উপক্রম করছে। এ-সময় আমাদের নীরব থাকা হবে অপরাধ। সমাজের প্রতি আমাদের যে কর্তব্য তার ঘোর ব্যত্যয় করা হবে। (নির্বাচিত প্রবন্ধ– হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, পৃ. ১৭৮) স্পেনের বৈধ সাধারণতন্ত্রী সরকারের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী নেতা ফ্রাঙ্কোর সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে ১৯৩৬ সালের ২০ নভেম্বর ফ্যাসিবাদী বর্বরতা প্রতিহত করার জন্য রোঁমা রোলাঁ বিশ্ববাসাীর কাছে আবেদন জানান। মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় তার অনুবাদ ১৯৩৭ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হলে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে ব্যাপক সাড়া জাগে। ১৯৩৭ সালের মার্চ মাসেই গঠিত হয় ফ্যাসিবাদ যুদ্ধবিরোধী লীগ-এর সর্বভারতীয় শাখা এবং তার সভাপতির পদ গ্রহণ করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। সে বছর প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে দুটি সংকলন প্রকাশিত হয়। একটি ইংরেজিতে ‘টুয়ার্ডস প্রগেসিভ লিটারেচার’ এবং অপরটি বাংলায় ‘প্রগতি’। প্রগতি সম্পাদনা করেছিলেন হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী। সে বছর প্রগতি লেখক সংঘের শাখা গঠনের জন্য ঢাকা আসেন হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী ও সাজ্জাদ জহির। এ ব্যাপারে তাঁরা সতীশ পাকড়াশী, রণেশ দাশগুপ্ত, সোমেন চন্দ প্রমুখের সাথে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন করেন। ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার আশুতোষ মেমোরিয়াল হলে। সেখানে সারা ভারত থেকে আসা প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের সমাবেশ ঘটেছিল। সম্মেলনের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ প্রেরিত বাণী পাঠ করা হয়। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন মুলকরাজ আনন্দ এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সাজ্জাদ জহির। ১৯৩৯ সালে ঢাকাতে প্রগতি লেখক সংঘের শাখা গঠনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। তার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘটে ১৯৪০ সালের মধ্যভাগে গেন্ডারিয়া হাইস্কুল মাঠে। সভাপতিত্ব করেন মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ কাজী আবদুল ওয়াদুদ (১৮৯৪–১৯৭০)। সম্পাদক ও সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন যথাক্রমে রণেশ দাশগুপ্ত ও সোমেন চন্দ। তারপর থেকে সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম প্রভৃতি জেলায় প্রগতি লেখক সংঘের শাখা গঠিত হয়। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকাতে ফ্যাসিবাদবিরোধী একটি সমাবেশে পূর্বাঞ্চলীয় রেলশ্রমিক ইউনিয়নের একটি মিছিল নিয়ে সমাবেশে আসার পথে আরএসপি গুণ্ডাদের হাতে নৃসংশভাবে নিহত হন সোমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪২)। সারা বাংলায় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। (সংক্ষেপিত) লেখক : প্রাবন্ধিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..