
একতা সাহিত্য ডেস্ক :
ভলতেয়ার (ঠড়ষঃধরৎব) নবজাগরণের এক অন্যতম পথিকৃৎ, সাহিত্যিক এবং দার্শনিক ছিলেন। ইতিহাসে ফরাসি নবজাগরণের সঙ্গে ‘ভলতেয়ারের যুগ’ কথাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে গেছে। ভলতেয়ার তাঁর দার্শনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে নাটক, কবিতা কিংবা গল্প-উপন্যাস লেখার মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লব ত্বরান্বিত হয়েছিল। অসামান্য প্রতিভাশালী ভলতেয়ার তাঁর অসাধারণ লেখনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঝড় তুলেছিলেন। প্রচলিত ভ্রান্ত সমাজব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেওয়ায় তাঁকে কারারুদ্ধ হতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে নির্মম অত্যাচার এমনকি তাঁর লেখা বইগুলি পুড়িয়েও দেওয়া হয়েছে নানা সময়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর নাগরিক অধিকার আদায়ের যজ্ঞে ভলতেয়ার আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।
১৬৯৪ সালের ২১ নভেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে এক মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া পরিবারে ভলতেয়ারের জন্ম হয়। ফ্রান্সে রাজা চতুর্দশ লুইয়ের রাজত্বকালে তাঁর পরিবার বিশেষ সুবিধাভোগী ছিল। তাঁর আসল নাম ফ্রাঁসোয়া মারি আরুয়ে (ঋৎধহপড়রং-গধৎরব অৎড়ঁবঃ)। তাঁর বাবার নাম ফ্রাঁসোয়া আরুয়ে এবং মায়ের নাম মেরি মার্গুরিয়েট দোমার্ড। তাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ ফ্রাঁসোয়া-মারি আরুয়ে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সামান্য ট্রেজারি অফিসার এবং আইনজীবী। যদিও এ প্রসঙ্গে একটি দ্বিমত আছে। ভলতেয়ার নিজে কিছু কিছু লেখায়, বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন যে ১৬৯৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম হয় এবং তিনি আসলে জনৈক অফিসার রোজব্রুন (জড়পযবনৎঁহব)-এর সন্তান। তাঁর মা সম্পর্কে খুব কমই বলেছেন তিনি। দুর্ভাগ্যক্রমে মাত্র সাত বছর বয়সেই তাঁর মা মারা যান। এই ঘটনা বাবা ও তাঁর বড় ভাইদের প্রতি ভলতেয়ারকে বিদ্রোহী করে তোলে। ভলতেয়ারের পারিবারিক ডাকনাম ছিল ‘জোজো’। ১৬৯৪ সালের ২২ নভেম্বর তাঁকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। পরিবার ত্যাগ করে ধর্মপিতা অ্যাবে’র (অননব ফব ঈযধঁঃবধঁহবঁভ) কাছে আশ্রয় নেন।
ভলতেয়ারের পড়াশোনা সম্পূর্ণ হয় প্যারিসের লুই-লে-গ্র্যাণ্ড (খড়ঁরং-ষব-এৎধহফ)-এর জেসুইট কলেজে। সেখানে তিনি সাহিত্য, থিয়েটার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এছাড়াও গ্রিক, ল্যাটিন ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষাগুলি সম্পর্কে দক্ষ হয়ে ওঠেন ভলতেয়ার এই সময়। কলেজে পড়াকালীনই তিনি লক্ষ্য করেছেন চতুর্দশ লুইয়ের সময়কালের সামরিক বিপর্যয় এবং ভয়াবহ ধর্মীয় অত্যাচারের দৃষ্টান্ত। ফলে রাজতন্ত্রের বিরূপতার বিরুদ্ধে তাঁর আদর্শকে স্থির রাখতে চেয়েছিলেন ভলতেয়ার। তাঁর স্বপ্ন ছিল একজন নাট্যকার হবেন। অথচ ধর্মপিতা অ্যাবে’র ইচ্ছে ছিল তিনি একজন সরকারী কর্মকর্তা হোন।
ধর্মপিতার চাপে পড়ে প্যারিসে নোটারি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ভলতেয়ার তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। পরে নেদারল্যাণ্ডের হেগ-এ ফরাসি দূতাবাসে সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন ভলতেয়ার। লুই চতুর্দশের মৃত্যুর পরে প্যারিসের বুদ্ধিজীবী মহলে তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এবং তাঁর ‘এপিগ্রাম’গুলি সকলের মুখে মুখে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আইনজীবি কিংবা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার বদলে তিনি সাহিত্যসাধনাতেই মনোনিবেশ করেন। তাঁর ‘রিজেন্ট’ রচনাটি ফরাসি সরকারকে উপহাস এবং ডিউক ডি অর্লিয়েন্সকে বিদ্রুপ করায় ভলতেয়ারকে প্যারিস থেকে নির্বাসিত করে বাস্তিলের কারাগারে বন্দী করে রাখা হয় এক বছর। ইতিমধ্যে তাঁর লেখা প্রথম ট্র্যাজেডি ‘ওডিপ’ (ঙবফরঢ়ব) প্রকাশিত হলে বিখ্যাত নাট্যকার জাঁ রাসিন (ঔবধহ জধপরহব)-এর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনি প্রশংসিত হতে থাকেন। ভার্জিলের গুণমুগ্ধ হয়ে সেইসময় তিনি ‘ভলতেয়ার’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। পরে এই নির্বাসনকালেই তিনি লিখে ফেলেন আরেকটি মহাকাব্য ‘হেনরিয়েড’, ফ্রান্সের জনদরদী রাজা চতুর্থ হেনরিকে নিয়ে। এই কাব্যটি তিনি ইংল্যাণ্ডের রানি ক্যারোলিনকে উৎসর্গ করেন। এই ‘হেনরিয়েড’-এর সঙ্গে যদিও অনেকে ভার্জিলের ‘ঈনিড’ কাব্যের সাদৃশ্য আবিষ্কার করেছেন। যাইহোক, ১৭২৬ সালে জনৈক ফরাসি অভিজাত ব্যক্তির সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে তাঁকে ইংল্যাণ্ডে নির্বাসনে পাঠানো হয়। প্রায় তিন বছর ইংল্যাণ্ডে থাকাকালীন ইংল্যাণ্ডের বিখ্যাত নাট্যকার ও কবি উইলিয়াম শেক্সপীয়র, দার্শনিক জন লক, অনন্য বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন, স্কটল্যাণ্ডের দার্শনিক ও নবজাগরণের পথপ্রদর্শক অ্যাডাম স্মিথ এবং ডেভিড হিউম প্রমুখদের সান্নিধ্যে আসেন এবং ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। তাছাড়া অপর আরেক ফরাসি দার্শনিক জাঁ জ্যাক রুশো’র লেখালিখি ও বক্তৃতার মাধ্যমে ভলতেয়ার অনুপ্রাণিত হন। ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে রুশোর যে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর তাতে ভলতেয়ার সহমত পোষণ করেন। প্যারিসে নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে এসে ১৭৩৪ সালে তিনি ‘ফিলোজফিক্যাল লেটারস অন ইংলিশ’ নামে একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ লেখেন যেখানে ব্রিটিশ সমাজব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেন। ব্রিটিশ সমাজব্যবস্থার ধারণা ছিল ফরাসি সমাজতন্ত্রের বিপরীত। ফলে রাজদ্রোহের অভিযোগে তাঁর বইগুলি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রবল জনরোষের কবলে পড়ে তিনি দেশ ছাড়তেও বাধ্য হন।
১৭৩৪ থেকে ১৭৩৯ সাল পর্যন্ত নির্বাসনকালে ভলতেয়ারের পড়াশোনার বিষয় ছিল প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। এইসময়কার লেখায় তাঁর নানাবিধ দার্শনিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের পরিসর খুলে যেতে থাকে। ১৭৪৯-এ তিনি পট্সডামে ‘বার্লিন অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স’-এর সভাপতিকে আক্রমণ করে লেখা প্রকাশ করেন। ফলে আবারও তিনি জনরোষানলে পড়েন। গ্রেফতার এড়াতে তিনি সেই শহর ছেড়ে চলে যান। অন্যত্র ফ্রান্সের শাসক পঞ্চদশ লুই তাঁকে প্যারিসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই অবস্থায় তিনি এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরতে থাকেন এবং একপর্যায়ে সুইজারল্যান্ডে গিয়ে আশ্রয় নেন। এই ক্রমাগত নির্বাসনের জীবনে বহু সংখ্যক বইয়ের জ্ঞান তাঁকে ক্রমশ সমৃদ্ধ করেছে। ভলতেয়ার রাষ্ট্র থেকে চার্চকে পৃথক করার আহ্বান জানিয়েছেন কারণ রাজতন্ত্রের সঙ্গে ধর্মীয় ভণ্ডামির আঁতাত গণতন্ত্রবিরোধী। ধর্ম সর্বদা রাজনীতিমুক্ত হবে এমনটাই বিশ্বাস ছিল তাঁর। ভলতেয়ারের বক্তব্য ছিল, “তোমার মতের সঙ্গে আমি হয়ত একমত নাও হতে পারি; কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে যাবো।” এই বক্তব্যই প্রমাণ করে মত প্রকাশের ব্যাপারে কতটা বদ্ধপরিকর ছিলেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন চিন্তাই পারে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি রচনা করতে। ভলতেয়ার ছিলেন কনফুসিয়াসের রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত যার কারণে তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতার সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, জনগণকে শিক্ষিত করলে কেবল জনগণেরই উপকার হবে তা নয়, রাজার জন্যও এটা প্রয়োজন।
৮৪ বছরের জীবনে ভলতেয়ার প্রায় ২ হাজার বই রচনা করেছেন, চিঠি লিখেছেন প্রায় ২০ হাজার। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে ধারাবাহিকভাবে ইতিহাসের ঘটনাবলি রচনায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর ইতিহাসভিত্তিক কাজের মধ্যে উল্লেখ করতেই হয় ‘ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ঈযধৎষবং ঢওও’, ‘ঞযব অমব ড়ভ খড়ঁরং ঢওঠ’ কিংবা ‘ঊংংধু ড়হ ঃযব ঈঁংঃড়সং ধহফ ঃযব ঝঢ়রৎরঃ ড়ভ ঃযব ঘধঃরড়হং’ (১৭৫৬)-এর মত লেখাগুলিকে। তাঁর সবথেকে বেশি পঠিত ও চর্চিত রচনা ‘কাঁদিদ’ (ঈধহফরফব)-এ তিনি গটফ্রিড উইলহ্যাম লিবনিজ-এর অতি আশাবাদী দর্শনকে কটাক্ষ করেছেন এবং অন্যদিকে গণিতবিদ ব্লেজ পাস্কাল কথিত নৈরাশ্যবাদী দর্শনেরও সমালোচনা করেছেন। ভলতেয়ার ১৭৬৪ সালে তাঁর দার্শনিক প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটান ‘ফিলোজফিক্যাল ডিকশ্নারি’ (চযরষড়ংড়ঢ়যরপধষ উরপঃরড়হধৎু) গ্রন্থে। খ্রিস্টান, ইসলাম, ইহুদীসহ সব ধর্মেরই তিনি সমালোচনা করেছেন। নাস্তিকতার বদলে তিনি একেশ্বরবাদী ছিলেন। ‘ঞৎবধঃরংব ড়হ ঞড়ষবৎধঃরড়হ’ (১৭৬৯) গ্রন্থে তিনি সব মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলেন। তিনি মনে করতেন, সকলের আরাধ্য ঈশ্বর একক তাই তাঁকে নিয়ে বিভেদ কাম্য নয়। তাঁর অন্যতম ট্র্যাজেডি নাটকগুলির মধ্যে উল্লেখ করতেই হয় ‘জাইর’ (তধরৎব), ‘মাহোমেত’ (গধযড়সবঃ) এবং ‘নানিন’ (ঘধহরহব) যেগুলি প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৭৩২, ১৭৩৬ এবং ১৭৪৯ সালে। তাঁর একটি ছোটগল্পের সংকলন ‘মাইক্রোমেগাস’ (চিন্তকমহলে খুবই চর্চিত।) পরবর্তীকালে ভলতেয়ার সামাজিক ইতিহাস এবং চারুকলায় মনোনিবেশ করেন। বিশ্ব সভ্যতার অগ্রগতির সন্ধানের জন্য তিনি একটি অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন।
১৭৭৮ সালের ৩০ মে অবিস্মরণীয় মহান দার্শনিক ও সাহিত্যিক ভলতেয়ারের মৃত্যু হয়। তৎকালীন গির্জা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করার কারণে তাঁর মৃত্যুর পর প্যারিসের কোনো চার্চে তাঁর শেষকৃত্য করতে দেওয়া হয়নি এবং গোপনে শহরের বাইরে তাঁকে সমাহিত করা হয়. তবে এর মাত্র এক যুগ পর, ১৭৯১ সালে ফরাসি বিপ্লবের সময় বিপ্লবীরা তাঁকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দেয়। তাঁর দেহাবশেষ অত্যন্ত সসম্মানে রাষ্ট্রীয় শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্যারিসের বিখ্যাত প্যান্থিয়নে পুনঃসমাহিত করা হয়।
১৯৫২ সালে গবেষক ও লেখক থিওডোর বেস্টারম্যান (ঞযবড়ফড়ৎব ইবংঃবৎসধহ) জেনেভাতে ভলতেয়ারকে উৎসর্গ করে একটি সংগ্রহশালা স্থাপন করেন। পরে তাঁর মৃত্যু হলে ১৯৭৬-এ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এই ‘ভলতেয়ার ফাউণ্ডেশন’ এর দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাঁর অন্যতম একটি উক্তি আজকের দিনে দাঁড়িয়ে খুবই সাযুজ্যপূর্ণ এবং অবশ্য স্মর্তব্য, ‘সরকার যখন অন্যায় করছে, তখন ন্যায়ের কথা বলা বিপজ্জনক’।