সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা ডেস্ক : এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের ৩২নং সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে আজ মুদ্রিত হচ্ছে তার ১৩তম কিস্তি। (১৩) সামরিক সন্ত্রাস: জনগণের বিক্ষোভের প্রকাশ (১৯৫৮ সনের অক্টোবর হইতে ১৯৬১ সনের শেষ পর্যন্ত) সামরিক সন্ত্রাস কমরেডগণ, রাজনৈতিক ক্ষমতার আস্বাদ পাইলে সামরিক নেতারা সেক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী সহ্য করে না। তাই, সামরিক শাসন জারির মাত্র ২০ দিন পর ঐ শাসন কায়েম করার চক্রান্তের অন্যতম প্রধান নেতা প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জাকে সামরিক নেতাদের হুকুমে দেশত্যাগ করিতে হইয়াছিল। সামরিক শাসন জারির পূর্বক্ষণে --- কেন্দ্রীয় কমিটি মনে করিয়াছিল যে নির্বাচন বানচাল করার জন্য প্রতিক্রিয়াশীলরা আবার প্রেসিডেন্টের শাসন প্রবর্তন করিবে। সে হুঁসিয়ারীও দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু, শাসকচক্র ও সাম্রাজ্যবাদীরা যে কত মরিয়া ও হিংস্র হইয়া উঠিয়াছিল —- এবং সেজন্য সামরিক শাসন জারির বিপদ সম্পর্কে পার্টিকে হুঁসিয়ারী দিতে পারে নাই। তাই, সামরিক শাসন জারিতে আমরা একটা অপ্রস্তুত অবস্থাতে পড়িয়াছিলাম। তবু সামরিক শাসনের সন্ত্রাসের অধীনেও পার্টি সংগঠনের একটা কাঠামো বজায় রাখা গিয়াছিল। --- পার্টির নূতন কর্মকৌশল সামরিক শাসন জারির পর কেন্দ্রীয় কমিটির প্রস্তাবে (২৮/৩/৫৯) --- করিয়া সিদ্ধান্ত করা হইয়াছিল: (ক) ঐ “সরকার হইল বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী এবং এ দেশের সামন্তবাদী ভূস্বামী ও সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী মুষ্টিমেয় বঙ্গ ধনিকের স্বার্থের ধারক ও বাহক।” --- (খ) এই সরকার “পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনসাধারণের স্বায়ত্বশাসনের সমস্ত অধিকার পদদলিত” “এক চরম স্বৈরাচারী এককেন্দ্রীক শাসন প্রতিষ্ঠা করিতেছে।” ইহার ফলে, --- “এই প্রদেশের জনসাধারণের সঙ্গে সরকারের একটা বিশেষ বিরোধের সম্ভাবনা দেখা যাইতেছে।” --- তখনকার কর্মকৌশল ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে নিম্নলিখিত তিনটি মূল কর্তব্য সে প্রস্তাবে তুলিয়া ধরা হইয়াছিল: (ক) তখন যে সমস্ত বৈধ প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়া জনগণের সহিত মোকাবেলা করার কিছুটা সুবিধাও ছিল, তাহাতেই যোগ দিয়া মেহনতী জনগণের সেবার মধ্য দিয়া জনগণের সহিত সংযোগ সাধন ও জনগণের আস্থা অর্জন করা। --- (খ) --- ঐ সব কাজের মধ্য দিয়া তখন দুইটি আশু রাজনৈতিক দাবী, যথা ‘শাসনতন্ত্র চাই’ ও ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা চাই’এর পক্ষে জনমত গড়িয়া তোলা। সঙ্গে সঙ্গে --- সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র উদঘাটন করিয়া জনগণের ভিতর ব্যাখ্যামূলক প্রচার করা। --- (গ) “কঠোর বিপ্লবী সংগ্রামের উপযোগী করিয়া পার্টি সংগঠনকে গড়িয়া তুলিতে হইবে” এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়িয়া তোলার জন্য “শ্রমিকশ্রেণীর পার্টিকে আজ উদ্যোগ নিয়া কাজে অগ্রসর হইতে হইব।” --- আইয়ুব খানের প্রতি বিপ্লবী ব্যবস্থাদি --- পার্টির বিভিন্ন দলিলে পার্টির মুখপাত্র “শিখা” ও ‘বুনিয়াদী গণতন্ত্র বনাম উলঙ্গ স্বৈরতন্ত্র’, ‘শিক্ষা সংস্কার, না শিক্ষা সংকোচ’, ‘আইয়ুব শাসনতন্ত্রের আসল ড্রপ’ ও ‘দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা’ নামীয় পুস্তকাদিতে ঐ সব ব্যবস্থার গণবিরোধী রূপ উদঘাটন করা হইয়াছিল। --- এই সময়ে, বাংলা হরফের পরিবর্তে রোমান হরফ প্রবর্তন ও উর্দু বাংলা মিশাইয়া একটি তথাকথিত ‘জাতীয় ভাষার’ সৃষ্টির আওয়াজ তুলিয়া এবং রবীন্দ্র সাহিত্যের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক প্রচার চালাইয়া সামরিক সরকার পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙ্গালী জাতির সংস্কৃতির উপর নূতন এক আক্রমণ চালাইবার ষড়যন্ত্র করিতেছিল। --- আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এইসব গণ-বিরোধী নীতি ও ব্যবস্থাসমূহ চালু করার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে পূর্বের চাইতে আরো বেশি সহযোগিতার --- এই সময়েই (জুলাই, ১৯৫৯) পেশোয়ারের নিকটবর্তী বেদাবেড়ে মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীদের একটি ঘাঁটি স্থাপন করিতে দেওয়া হইয়া ছিল, যে ঘাটি হইতে (১৯৬০ সনে) কুখ্যাত ইউ-টু মার্কিনী গোয়েন্দা বিমান গোয়েন্দাগিরির জন্য সোভিয়েট ইউনিয়নের উপর উড়িয়া গিয়াছিল। --- এই সময়েই (মে, ১৯৫৯) আইয়ুব খান পাক-ভারত যৌথ প্রতিরক্ষার প্রস্তাব করিয়াছিলেন। পার্টি ইহাকে “চীন-সোভিয়েটের বিরুদ্ধে পাক-ভারত ফ্রন্ট গঠনের জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের একটি চক্রান্ত” বলিয়া নিন্দা করিয়াছিল। ভারত এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল। আবার এই সময়েই (সেপ্টেম্বর, ১৯৬০) পশ্চিম পাকিস্তানের পানি বিরোধ নিয়া পাক-ভারতের ভিতর একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হইয়াছিল পার্টি ইহাকে অভিনন্দিত করিয়াছিল। --- জনগণের বিক্ষোভের প্রকাশ কিন্তু, মেহনতী জনগণ একেবারে চুপ করিয়া বসিয়া ছিল না। সামরিক শাসন জারির চার মাসের মধ্যে রবিবারে ছুটির দাবীতে আদমজী পাটকলের ২৫ হাজার শ্রমিকের সাহসিকতাপূর্ণ তড়িৎগতি ধর্মঘট, খাজনা ট্যাক্স আদায় নিয়া ১৯৫৯-৬০ সনে কোন কোন গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ, ১৯৬০ সনের প্রথম দিকে আইয়ুব খান কর্তৃক ‘বুনিয়াদি গণতন্ত্রীদের’ ‘আস্থাসূচক’ ভোট গ্রহণ করলে পূর্ববঙ্গে প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ২৫ হাজার ‘বুনিয়াদী গণতন্ত্রীর’ না ভোট প্রদান, ১৯৬১ সনে ফেব্রুয়ারী মাসে শহীদ দিবসে ঢাকাতে কয়েক হাজার ছাত্র ছাত্রীর শোভাযাত্রা (ইহাতে পার্টির সক্রিয় উদ্যোগ ছিল), ঐ বৎসরেই শাসনতন্ত্র কমিশনের সামনে সাক্ষ্যদানকালে প্রদেশের জনপ্রতিনিধিবর্গ কর্তৃক একবাক্যে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র, স্বায়ত্বশাসন ইত্যাদি দাবী ও ইহাতে জনগণের উল্লাস, ঐ বৎসরেই প্রতিক্রিয়াশীলদের ও সরকারের বাধা সত্ত্বেও ঢাকার সড়কে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পালন (ইহাতে পার্টির কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল), বাংলা ভাষার উপর নূতন আক্রমণের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঢাকায় বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ এবং সামরিক শাসনকে বিদ্রূপ করিয়া জাষ্টিস কায়ানীর ভাষণে বুদ্ধিজীবী মহলে আনন্দ প্রভৃতির মধ্য দিয়া সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষ ও নিজেদের অধিকারের জন্য তাঁহাদের আকঙ্খা আত্মপ্রকাশ করিতেছিল। --- স্বায়ত্বশাসনের অধিকার ও জাতিগত সমস্যা পাকিস্তানের রাজনীতিতে ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিয়া আছে। --- পূর্ব-পাকিস্তানের --- উন্নয়ন প্রভৃতির প্রতি শাসকচক্রের বিমাতা সুলভ মনোভাব এবং এখানে শিল্প-বাণিজ্যে অবাঙ্গালী বড় ধনিকদের প্রাধান্য প্রভৃতি হেতু পূর্ব-পাকিস্তানে স্বায়ত্বশাসনের দাবী আরো জোরদার হইয়াছে। --- তাই, ১৯৫৯-৬১ সনে স্বায়ত্বশাসন দাবীর অঙ্গ হিসাবে পূর্ব-পাকিস্তানকে একটি স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক ইউনিট হিসাবে গণ্য করা এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলাইয়া একটি ‘কনফেডারেশনের’ দাবী উত্থাপিত হইয়াছিল। এমনকি, ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের’ একটি চিন্তাও ১৯৫৯ সন হইতে এখানকার বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্ত মহলে দেখা যাইতেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের ঘটনাবলী ছিল আরো তাৎপর্যপূর্ণ। সামরিক শাসন জারির পর সেখানকার জাতিসমূহের উপর ‘এক ইউনিটের’ অত্যাচার আরো তীব্র হইয়া উঠিয়াছিল। সে পরিপ্রেক্ষিতে, স্বায়ত্বশাসন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার দাবী নিয়া ১৯৬০ সনে বেলুচিস্তানে সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং ১৯৬১ সনে পাঠান ভূমিতে ব্যাপক শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হইয়াছিল। [সামরিক সরকার বেলুচিস্তানে চালাইয়াছিল নৃশংস ও অমানুষিক দমননীতি। ১১ জন বেলুচ দেশপ্রেমিককে তখন ফাঁসি দেওয়া হইয়াছিল এবং শত শত বেলুচ যোদ্ধাকে বন্দীনিবাসে আটক করিয়া তাঁহাদের উপর নাজী সুলভ অত্যাচার চালান হইয়াছিল’। পাঠান ভূমিতে শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহীদের সামরিক আদালতে বিচার করিয়া তাহদের দীর্ঘকালীন সশ্রম কারাদণ্ড, জরিমানা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, এমনকি বেত্রদণ্ড পর্যন্ত প্রদান করা হইয়াছিল। --- যাহা হউক, ১৯৬০-৬১ সনের ঘটনাবলী হইতে বুঝা যাইতেছিল যে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এই প্রদেশে একটা বড় রকমের গণ-সংগ্রাম গড়িয়া তোলা যাইতে পারে- যদি গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ ঐক্যবদ্ধ হইয়া উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই পরিস্থিতিতে, ১৯৬১ সনের অক্টোবর মাসে কেন্দ্রীয় কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়াছিল যে, --- নিম্নতম কর্মসূচীর ভিত্তিতে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠনের প্রচেষ্টা চালাইতে হইবে। এই কর্মসূচী ছিল ১৯৫৬ সনে পার্টি সম্মেলনে গৃহীত নিম্নতম কর্মসূচীর অনুরূপ। ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠনের নীতিও ছিল ঐ সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ। --- কেন্দ্রীয় কমিটির ঐ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৬১ সনের শেষের দিকে পার্টির পক্ষ হইতে অন্য একটি গণতান্ত্রিক দলের সাথে আলোচনা চালান হইয়াছিল এবং তাঁহাদের নিকট পার্টির ঐ নিম্নতম কর্মসূচী পেশ করা হইয়াছিল। অন্য দলের নেতারা গণ-সংগ্রাম গড়িয়া তোলা সম্পর্কে একটু ইতস্ততঃ মনোভাব দেখাইলেও ঐ আলোচনায় কিছুটা ফল হইয়াছিল। এইভাবে, ১৯৬১ সনের শেষের দিকে পার্টি গণ-আন্দোলন গড়িয়া তোলার জন্য একটা রাজনৈতিক প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছিল। ---

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..