নারীর শিক্ষা-অধিকার আদায়ে লীলা নাগ এখনো প্রাসঙ্গিক

প্রয়াণ দিবসের সভায় নেতৃবৃন্দ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ময়মনসিংহ সংবাদদাতা : ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামী, সাংবাদিক, নারীর শিক্ষা ও আন্দোলনের নেত্রী, বিপ্লবী কমরেড লীলা নাগের ৫৬তম প্রয়াণ দিবসে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ময়মনসিংহ জেলা কমিটির নারী শাখা। গত ১১ জুন সন্ধ্যায় সিপিবি ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। নারীর শিক্ষা-অধিকার আদায় ও স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণে কমরেড লীলা নাগের লড়াই কেন এখনো প্রাসঙ্গিক তা বক্তব্যে তুলে ধরেন নারী নেতৃবৃন্দ। সভায় সভাপতিত্ব করেন সিপিবি জেলা নারী শাখার সভাপতি ফেরদৌস আরা মাহমুদা হেলেন। কমরেড লীলা নাগের সংগ্রামী জীবনের কর্মকাণ্ড, বিপ্লবী দায়িত্বসহ নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ময়মনসিংহ জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি মনিরা বেগম অনু, সিপিবি জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক লীলা রায়, সিপিবি জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য রঞ্জিত সরকার, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সাব্বির রেজা, সিপিবি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ বাহার মজুমদার প্রমুখ। আলোচনা সভার প্রারম্ভে কমরেড লীলা নাগের পারিবারিক-কর্মময় সংগ্রামী জীবন, নারী জাগরণের ক্ষেত্রে তার পথিকৃতের ভূমিকা ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে অধ্যাপক সুমন মুন্না রচিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফাহমিদা ইয়াসমিন রুনা। আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন সিপিবি নেতা ও জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফাহমিদা ইয়াসমিন রুনা। আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, কমরেড লীলা নাগ অসাধারণ কৃতী ছাত্রী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমএ ডিগ্রি অর্জনকারী। ১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রথম ছাত্রী হিসেবে ভর্তি হন এবং ১৯২৩ সালে প্রথম শ্রেণীতে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। নারীমুক্তির লক্ষ্যে ছাত্রীদের সংগঠিত করার কাজ অক্লান্তভাবে করে গেছেন। মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের জন্য নিজ উদ্যোগে ঢাকা শহরে বেশ কিছু সংখ্যক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। লীলা নাগ দীপালি ছাত্রী সংঘ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেন। সে সংগঠনের মাধ্যমে তিনি ছাত্রীদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার প্রচেষ্টা চালান। আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে তিনি মেয়েদের বিভিন্ন প্রকার শারীরিক কসরত রপ্ত করার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। মেয়েরা যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে সেজন্য সূচিশিল্পের মতো বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কাজে তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। মেয়েদের হাতে তৈরি উৎপাদন সামগ্রী বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে দেন। বক্তারা তাদের আলোচনায় তুলে ধরেন, লীলা নাগ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং পরবর্তীতে ফরোয়ার্ড ব্লকের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সহকারী হিসেবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অবদান চিরস্মরণীয়। কমরেড লীলা নাগ (পরবর্তী সময়ে লীলা রায়) ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিকন্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী এবং প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সমাজ সংস্কারক। ১৯০০ সালের ২ অক্টোবর বাবার কর্মস্থল আসামের গোয়ালপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তবে তার পৈতৃক বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে অবস্থিত। তিনি ‘অনুশীলন সমিতি’র মতো গোপন বিপ্লবী সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও বীণা দাসের মতো বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন। লবণ সত্যাগ্রহের সময় ‘ঢাকা মহিলা সত্যাগ্রহ কমিটি’ গঠন করে কারাবরণ করেন। ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীর ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি ৬ দিনে ৯০ মাইল হেঁটে ৪ শতাধিক নারীকে উদ্ধার করেছিলেন এবং ত্রাণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি বিপ্লবী অনিল রায়ের সঙ্গে বিপ্লবী সংগঠন শ্রীসংঘে যুক্ত হন। পরে ১৯৩৯ সনে বিপ্লবী অনিল রায়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জানা যায়, কমরেড লীলা নাগ ‘জয়শ্রী’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করতেন। তার সম্পাদনায় পত্রিকাটিতে নারীরাই মূলত লেখালেখি করতেন। পত্রিকায় পাতায় পাতায় নারীদের আন্দোলন-সংগ্রামের কথা উঠে আসতো। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেও তার পরিচয় ছিল। কমরেড লীলা নাগ ১৯৭০ সনের ১১ জুন প্রয়াত হন। সম্মানস্বরূপ বাংলাদেশ ও ভারতে তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। ভারতীয় পার্লামেন্টের সেন্ট্রাল হলে তার প্রতিকৃতি উন্মোচিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের একটি পরীক্ষা কেন্দ্রের নাম ‘লীলা নাগ পরীক্ষা হল’ রাখা হয়েছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..