প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭

শ্লথ অর্থনীতিতে উচ্চাভিলাষী বাজেট : বাস্তবায়নের পথে সরকারের অগ্নিপরীক্ষা

মনোয়ার মোস্তফা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আগস্ট ‘২৪’-এর অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রের নানামুখী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, ঝিমিয়ে পড়া জাতীয় অর্থনীতি, বিপর্যস্ত ব্যাংক ও আর্থিক খাত, কর্মসংস্থানহীনতা, অতিমাত্রায় ঋণনির্ভরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিজনিত সংকটের প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছে। ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট, যার মধ্যে সরকারের আয় ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ৬,১৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক অনুদানসহ সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাড়িয়েছে ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। মোটা দাগে এবং টাকার অংকে এই হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট। জাতীয় সংসদে এটা নিয়ে সপ্তাহ দুয়েক কথাবার্তা হবে এবং সামান্য দু’একটা কর প্রস্তাবের এদিক-ওদিক ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটটাই “স্বয়ংক্রিয়ভাবে” সংসদে পাস হয়ে যাবে। সংসদ সদস্যরা যতো উচ্চবাচ্যই করুন না কেন, তাতে বাজেট প্রস্তাবের ইতর-বিশেষ কিছু হবে না। কেননা খসড়া বাজেট প্রণয়ন থেকে জাতীয় সংসদে অনুমোদন- এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তেমন কোন ভূমিকা নেই। আইন-কানুন দিয়েই জনপ্রতিনিধিদের হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এটি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম “ডিফেক্ট”। যা-ই হোক, টাকার অংকে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট হলেও, অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় এবারের বাজেটের ভেতরের বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং। নানামুখী সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে জাতীয় অর্থনীতি, যা তার স্বাভাবিক গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে। স্বভাবিকভাবেই ধীরগতিসম্পন্ন কিংবা একটা ঝিমিয়ে পড়া জাতীয় অর্থনীতিতে জাতীয় বাজেট প্রণয়ন বাস্তবিক অর্থেই চ্যালেঞ্জিং। এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সরকার কীভাবে অনুধাবন করছে এবং মোকাবিলার পথ খুঁজছে- সেটাই দেখার বিষয়। বাজেট নিয়ে শুরুতেই কয়েকটি কথা আপাতঃ দৃষ্টিতে জাতীয় বাজেট হলো সরকারের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব। কিন্তু আয়-ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় কতকগুলো সুনির্দিষ্ট নীতি-কর্মসূচি ও চূড়ান্ত বিচারে ক্ষমতাসীনরা যে উন্নয়ন দর্শনে বিশ্বাস করে- তার ওপর ভিত্তি করে। সমাজের কোন শ্রেণি-গোষ্ঠীর কাছ থেকে কী হারে কতো টাকা কর হিসেবে আদায় করা হবে, সংগৃহীত সেই অর্থ কোন খাতে, কী কাজে, কোন জনগোষ্ঠীর উপকারে ব্যয় করা হবে- উল্লেখিত নীতি ও কর্মসূচির ভেতরে সেসবের প্রতিফলন থাকে। সরকারের এসব নীতি কর্মসূচির চরিত্র-বৈশিষ্ট্য চূড়ান্ত বিচারে রাজনৈতিক। ফলে জাতীয় বাজেটকে সাদা চোখে আয়-ব্যয়ের ফিরিস্তি মনে হলেও, প্রকৃত পক্ষে এটি একটি “রাজনৈতিক ব্যবস্থাপত্র”। কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাপত্রই “শ্রেণি-নিরপেক্ষ” নয়। অন্যদিকে, পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে যেহেতু বিভিন্ন অর্থনৈতিক-সামাজিক শ্রেণির স্বার্থগুলো প্রায়শই পরস্পর বিরোধী, তাই সরকারের আয় ও ব্যয় বরাদ্দের ধারাতেও এর প্রতিফলন থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। বাজেট কখনোই সমাজের সকল শ্রেণি-গোষ্ঠীকে খুশি করতে পারে না। এটা শ্রেণিবিভক্ত সমাজের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। বাজেট বিশ্লেষণের সময় মোটা দাগে এই কথাগুলো আমাদের সকলের মনে রাখা দরকার। একই সাথে কোন বিশেষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেট প্রণীত হচ্ছে- সেই প্রেক্ষিতটা বোঝাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শ্লথ অর্থনীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে রয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপর অবস্থান করছে, যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রাকে ওষ্ঠাগত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের ওঠানামা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন আমদানি খরচকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। ফলে উৎপাদনশীল খাত ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চরমভাবে বিপর্যস্ত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অভিঘাত, মুদ্রাস্ফীতি ও উচ্চ সুদ হারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা ৬.০ থেকে ৬.৫ শতাংশের কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছে। বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশের অভাব, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট, ব্যাংক ব্যবস্থার দুরাবস্থা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারা নতুন কোনো বড় বিনিয়োগে হাত দিতে সাহস পাচ্ছেন না। উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে। প্রতি বছর যে বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, তাদের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। উল্টো বিদ্যমান কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ায় সব ধরনের বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যেই অর্থনীতিকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। এরই মধ্যে গত একমাসের মধ্যে দু-দফা জ্বালানি তেল আর একদফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই এটা “মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা!” কৌশলগত পণ্য হিসেবে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। ফলে মূল্যস্ফীতির আরেক ধাপ উলম্ফন কেউ ঠেকাতে পারবে না। জাতীয় অর্থনীতির এই করুণ বাস্তবতা অর্থমন্ত্রী কতোটা অনুধাবন করতে পেরেছেন, বলা মুশকিল। কেননা এই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়েও তিনি বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনার লক্ষ্য ৭.৫ শতাংশ প্রস্তাব করেছেন। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে না এনে কেবল প্রবৃদ্ধির পেছনে ছুটলে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকে। মনে হচ্ছে, এই অশনিসংকেতটি তিনি এড়িয়ে গেছেন। রাজস্ব আদায়ের আকাশচুম্বী লক্ষ্যমাত্রা : আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতা প্রথাগত ব্যয়ের বাইরে সামাজিক সুরক্ষা খাতে নতুন কিছু স্কিম, খাল কাটা কর্মসূচিসহ বর্তমান সরকারের অনেকগুলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আছে, যেগুলো বাস্তবায়নের জন্য বাড়তি অর্থ দরকার হচ্ছে। অন্যদিকে লুটপাট-নির্ভর জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি ভর্তুকির চাপ, সুদ পরিশোধে বর্ধিত ব্যয় ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও সরকারি রাজস্বে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে বাজেটে ব্যয়ের খাত অনেক বড় হয়ে গেছে। এ কারণে সব চাপ গিয়ে পড়েছে রাজস্ব বিভাগের ওপর। সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। এর প্রধান অংশ অর্থাৎ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকাই আদায় করতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। রাজস্ব বিভাগ সব সময়ই তাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫-২০ শতাংশ কম অর্জন করে থাকে। এটাই তাদের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স। এই পারফরম্যান্স দিয়ে আর যা-ই হোক এতো বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা কোনোভাবেই সম্ভব না। এনবিআর-এর এমন কোন যাদুবিদ্যা জানা নেই যা দিয়ে সে এতো টাকা আয় করতে পারবে। প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশনের ধীরগতি, কর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও কর ফাঁকির সংস্কৃতিকে রাতারাতি পরিবর্তন না করে নতুন বাজেটে আরও বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা অবাস্তব। রাজস্ব আদায়ের এই অতি-উচ্চ চাপ শেষ পর্যন্ত সৎ করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা হিসেবে চেপে বসে। করের আওতা না বাড়িয়ে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ালে তা বিনিয়োগকে আরও নিরুৎসাহিত করবে। বাজেটের আকার নিয়ে প্রতিবছরই নানা ধরনের কথাবার্তা হয়। প্রস্তাবিত বাজেট চলতি বছরের বাজেটের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশে প্রতিবছর বাজেট বৃদ্ধির হার সাধারণত ১০-১৫ শতাংশ হয়ে থাকে। এবারে এক ধাক্কায় ১৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে! অন্যদিকে, প্রস্তাবিত বাজেট জিডিপি’র ১৩.৫%। এটা খুব বেশি নয়। বাজেট কতো বড় হবে, সেটা প্রধানতঃ নির্ভর করে রাজস্ব আয়ের ওপর, বিশেষ করে ট্যাক্স থেকে কতো অর্থ সংগ্রহ করা যাবে তার ওপর। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, ৬৮ লক্ষ কোটি (৫০০ বিলিয়ন ডলার) টাকার জিডিপি সম্বলিত একটা অর্থনীতিতে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬.৬৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় সর্বনিম্ন। এনবিআর-এর পাফরম্যান্সের এই হলো ফলাফল! দুর্নীতিগ্রস্ত এই প্রতিষ্ঠানটির বড় কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কেচ্ছা-কাহিনী আমরা সারাবছর ধরেই পত্র-পত্রিকায় দেখতে পাই। ছোট কর্মচারীরাও নিশ্চয়ই বসে থাকেন না, যদিও সেসব খবর খুব একটা পাওয়া যায় না! বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়াই আমাদের অর্থমন্ত্রী এরকম একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে আগামী বছরের জন্য ৬ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন। ঋণ পরিশোধের চড়া মাশুল এবং ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা এবারের বাজেটের অন্যতম বড় মাথাব্যথার কারণ হলো বাজেট ঘাটতি, যার পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৪৩ লক্ষ কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ দশমিক ২৭ লক্ষ কোটি ও বৈদেশিক উৎস থেকে ১ দশমিক ০৯ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের এই অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নেওয়ার প্রবণতা দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি অশনিসংকেত। রাজস্ব আদায় যদি ঠিকঠাক মতো না হয় এবং সরকার যদি তার ব্যয়ের খাতে বড় ধরনের কাটছাঁট না করে- তাহলে সরকারকে আরো বেশি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়তে হবে এবং ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাবের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে গিয়ে অর্থনীতিকে আরেক দফা চাপের মধ্যে ফেলবে। প্রস্তাবিত বাজেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে সুদ পরিশোধের জন্য, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আগামী বছরগুলোতেও এই খাতে ব্যয় কেবলই বাড়তে থাকবে। সঙ্গত কারণেই সরকার ধীরে ধীরে একটা ঋণনির্ভর বাজেটের জালে আটকা পড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ টাকা সুদ পরিশোধে চলে যাওয়ার অর্থ হলো–শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা সামাজিক সুরক্ষার মতো উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। অথচ টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য এ খাতগুলোতেই বর্ধিত হারে বিনিয়োগ দরকার। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি: উপকারভোগী নির্বাচন ও কাঠামোগত লিকেজ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নাজুক কর্মসংস্থান পরিস্থিতি ও শ্লথ অর্থনীতির এই সময়ে দেশের দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন হলো সামাজিক নিরাপত্তা সুরক্ষা বেষ্টনী। সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ই-হেলথ কার্ডের মতো কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগের কথা বললেও এই কর্মসূচির ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কীভাবে দূর করা হবে সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা বা অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ মাসিক মাত্র ৬০০ থেকে ৮০০ টাকার কাছাকাছি। ৯ থেকে ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির এই বাজারে এই সামান্য টাকা দিয়ে একজন মানুষের এক সপ্তাহের ওষুধ বা খাদ্য কেনাও সম্ভব নয়। বাজেটে বরাদ্দ টাকার অংকে সামান্য বাড়লেও প্রকৃত মূল্যের দিক থেকে তা মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক কমে গেছে। ফলে এই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আনতে পারছে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সুরক্ষা কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, রাজনৈতিকসহ (দলীয়) নানা কারণে ভুল মানুষকে সুবিধা দেওয়া এবং প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়া, যাকে অর্থনীতিতে ‘ওহপষঁংরড়হ ধহফ ঊীপষঁংরড়হ ঊৎৎড়ৎং’ বলা হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতির কারণে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিরা ভাতা পাচ্ছেন যারা প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র নন। পক্ষান্তরে, চর, হাওর বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রকৃত দুস্থরা এই তালিকার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। বাজেটে ভালো কিছু প্রস্তাব আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের রূপরেখা অস্পষ্ট দৃশ্যতঃ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। শিক্ষায় এই বরাদ্দ বৃদ্ধির হার চলতি বছরের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি, স্বাস্থ্য খাতে বিস্ময়করভাবে ১২৪ শতাংশ বেশি। সম্ভবতঃ এবারই প্রথম স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ প্রতিরক্ষা খাতের বরাদ্দকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এই বৃদ্ধি কোনোভাবেই আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানদন্ডের কাছাকাছিও যেতে পারে নি। ইউনেস্কোর (টঘঊঝঈঙ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৫ থেকে ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দীর্ঘকাল ধরে জিডিপির মাত্র ১.৫ থেকে ১.৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাস্থ্য খাতে এই হার জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। প্রস্তাবিত বাজেটে, এ দুই খাতে যে বাড়তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সেগুলো ঠিক কী কী কাজে ব্যবহার করা হবে সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের “আউট অব পকেট” ব্যয় কমাতে ও সেবার গুণগত মান বাড়াতে- এটা কীভাবে ভূমিকা রাখবে তা বোঝা যাচ্ছে না। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ওপর শুল্ক কিছুটা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, আশা করা যায় এর ফলে ওষুধের দাম কিছুটা কমবে। হার্ট, কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর জন্যও কিছু প্রস্তাব আছে এবারের বাজেটে। এগুলো ভালো প্রস্তাব। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মূল সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব না রাখলেও, এ খাতে সরকারের একটা বোধদয় ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ খাতের প্রয়োজনীয় উপকরণের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে আমদানিনির্ভরতা খানিকটা হলেও কমবে। সরকারের এই বোধদয় ঘটেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটের কারণে। কিন্তু বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের যে মূল সমস্যা- সীমাহীন লুটপাট, অন্যায্য বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, সিন্ডিকেট, ভুল নীতিমালার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা-যোগানের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি, অতি উচ্চমাত্রার ক্যাপাসিটি চার্জ ইত্যাদি–যার শক্ত ভিত্তি রচিত হয়েছিল বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে, এইসব সমস্যার সমাধানে বর্তমান সরকার নীরব রয়েছে। উপসংহার: প্রবৃদ্ধির পেছনে ছুটবো নাকি সুশাসন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে হাটবো? প্রায় ১৮ বছর পর ক্ষমতায় এলেও, বলতেই হবে বিএনপির ভাগ্য খানিকটা অপ্রসন্ন। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে “ভূমিধস” বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করার ফুসরৎ পেলো না, শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দিশেহারা হয়ে গেল সরকার। উচ্চমূল্যে তেল-এলএনজি কিনে আর শুরুতেই এক দফা তেলের দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতি খানিকটা সামাল দিতে না দিতেই ভগ্নপ্রায় অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে জাতীয় বাজেট বানাতে হলো। বাজেটটি এমন এক সময়ে পেশ করতে হলো যখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চরম একটি রূপান্তরকাল এবং সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, সরকার কি এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য তাড়া করবে নাকি আগে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে? অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, সবার আগে সরকারের উচিত হবে- বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, বন্ধ কলকারখানা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং কর ফাঁকি রোধ করে রাজস্বের ভিত্তি বাড়ানো। ৯ দশমিক ৩৮ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেট যদি কেবল ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এবং সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হবে। ফলে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই হবে এক নম্বর প্রায়োরিটি। আরেকটা বিষয় মনে রাখা দরকার, সকল স্তরে দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে সামাজিক অবকাঠামো অর্থাৎ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষায় বর্ধিত বিনিয়োগ করতে হবে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, একটি সফল বাজেট কেবল সংখ্যার অঙ্কে বড় হওয়ার মধ্যে নয়, বরং এর বাস্তবমুখী বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ও কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার ওপর নির্ভরশীল। লেখক: উন্নয়ন-অর্থনীতি বিশ্লেষক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..