রাজনীতিক কাজী নজরুল ইসলাম
আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন: ১৯১৭ সালে কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য যখন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর নবগঠিত ৪৯ নং বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যোগ দেন তখন তিনি বর্তমান পশ্চিবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার রানীগঞ্জের শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ক্রমিক নং ছিল এক। সামনে মেট্রিকুলেশান পরীক্ষা। মাস্টারমশাইদের ধারণা ছিল পরীক্ষা দিয়ে নজরুল জলপানি পাবে। আত্মীয়স্বজন, শিক্ষকবৃন্দ আর সহপাঠীদের বিস্মিত আর হতাশ করে মেধাবী ভাল ছাত্র নজরুল প্রবল দেশপ্রেমের টানে যুদ্ধবিদ্যা শিখতে চলে গেলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে। কমরেড মুজফফর আহমদ লিখেছেন ‘ বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যে-বাঙ্গালি যুবকেরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের সকলের মনে কি ছিল তা জানিনে, তবে বহু সংখ্যক লোক ভেবেছিলেন যে এটা একটা দেশপ্রেমিক কাজ। নজরুল ইসলামও এই বহুসংখ্যকের একজন ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন যে যুদ্ধে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু বাঁচলে তাঁরা যুদ্ধবিদ্যা ও নতুন নতুন অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার (অবশ্য আর্টিলারির ব্যবহার ভারতীয়দের শেখানো হতো না) আয়ত্ত করেই বাঁচবেন। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এর প্রয়োজনের কথা কে অস্বীকার করতে পারে?’ কমরেড মুজফফর আহমদ আরো লিখেছেন ‘ফৌজ হতে তরুণ সৈনিকেরা প্রায়ই উদ্দাম স্বভাব নিয়ে ফিরে আসে, কিন্তু নজরুল ইসলাম ফিরেছিল দেশপ্রেমে ভরপুর হয়ে।’ বর্তমান পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ার জেলার নৌশহরা মহকুমায় তিনি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে ৪৯ নং বেঙ্গলি রেজিমেন্ট ভেঙ্গে দেয়া পর্যন্ত পুরো সৈনিক কালটা তিনি বর্তমান পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে অবস্থান করেন।
কমরেড মুজফফর আহমদ তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি কথায় লিখেছেন ‘ফৌজ হতে ফেরার আগেই তার দু’টি গল্প আমরা (ত্রৈমাসিক) বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় ছেপেছিলাম। ১৩২৬ সালের মাঘ (জানুয়ারি ১৯২০) সংখ্যায় তো ‘ব্যাথার দান’ ছেপেছিলামই, তার আগে কার্তিক (নভেম্বর,১৯১৯) সংখ্যায় আমরা ছেপেছিলাম ‘হেনা’ নামক গল্প। এই দু’টি গল্পই সে ফৌজে থাকা অবস্থাতে লিখেছিল, এবং লিখেছিল তার হাবিলদার হওয়ার পরে। .. ব্যাথার দানের দুটি চরিত্র দারা ও সয়ফুল মুল্ক বেলুচিস্তান হতে আফগানিস্তানের সহজ ইলাকা পার হয়ে তুর্কিস্তান কিংবা ককেসাসে গিয়ে লালফৌজে যোগ দিয়েছিল এবং বিপ্লববিরোধীদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। হেনা ও ব্যাথার দান এই দুটি গল্পই প্রেমের গল্প। কিন্তু এই দু’টি গল্পের ভিতর দিয়েই অদ্ভূত দেশ-প্রেমও ফুটে উঠেছে। দু’টি গল্পেই আমরা লেখকের আন্তর্জাতিকতার পরিচয় পাই, তবে ব্যাথার দানে বেশি।’
কমরেড মুজফফর আহমদ লিখেছেন ’ভারতের ব্রিটিশ গবর্নমেন্ট লালের আতঙ্কে শঙ্কিত হয়ে চারদিক হতে আটঘাট বেঁধে ফেলেছিল যেন অক্টোবর বিপ্লবের কোনো হাওয়াই এদেশে প্রবেশ করতে না পারে। ঠিক এমন সময় একজন ভারতীয় সৈনিকের লেখা গল্পের নায়কেরা যদি লালফৌজে যোগ দেয় তা হলে তার সৈনিক-শৃঙ্খলার দিক হতেও খুব ভালো হতো না। তাই আমি নজরুলকে জিজ্ঞেস না করেই তার লালফৌজ কথা কেটে দিয়েছিলাম। তার জায়গায় মুক্তিসেবক সৈন্যদের দল লিখে দিয়েছিলাম।... কিন্তু এখন ব্যাথার দান পুস্তকের ব্যাথার দান গল্পে মুক্তিসেবক সৈন্যদের দল কথাটার জায়গায় নজরুলের গোড়ায় লেখা লালফৌজ কথাটা বসিয়ে দেওয়া একান্ত কর্তব্য (নজরুল ইন্সটিটিউট হতে প্রকাশিত নজরুলের ছোটগল্প সমগ্রে ব্যাথার দান গল্পে মুক্তিসেবক সৈন্যদের দল কথাটিই রেখে দেয়া হয়েছে- বর্তমান লেখক)।’
৪৯ নং বেঙ্গলি রেজিমেন্টের সাত হাজার সৈনিকের কাছে দু’জন ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন একজন জমাদার শম্ভু রায় এবং অপরজন হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম। শম্ভু রায় ১৯৫৭ সালের ৬ জুন তারিখে ‘কাজী নজরুল’ গ্রন্থের রচয়িতা প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়কে চিঠিতে লিখেছেন ‘নজরুল তার বন্ধুদের মধ্যে যাদের বিশ্বাস করত তাদের এক সন্ধ্যায় খাবার নিমন্ত্রণ করে... তিনি (অরগ্যান মাস্টার হাবিলদার নিত্যানন্দ দে)অরগ্যানে একটি মার্চিং গৎ বাজানোর পর নজরুল সেই দিন যে-সব গান গাইল ও প্রবন্ধ পড়ল তা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে রাশিয়ার জনগণ জারের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছে। গান বাজনা প্রবন্ধ পাঠের পর রুশ বিপ্লব সম্বন্ধে আলোচনা হয় এবং লালফৌজের দেশপ্রেম নিয়ে নজরুল খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে এবং ঠিক নাম মনে নেই সে গোপনে আমাদের একটা পত্রিকা দেখায়। ঐ পত্রিকাতে আমরাও বিশদভাবে সংবাদটি দেখে উল্লসিত হয়ে উঠি।’
১৯২০ সালের মার্চে পল্টন থেকে কোলকাতায় ফিরে কাজী নজরুল ইসলাম উঠলেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে, থাকতেন সমিতির সহকারী সাধারণ সম্পাদক ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট হওয়া প্রথম বাঙ্গালি কমরেড মুজফফর আহমদের সাথে এক ঘরে। কমরেড মুজফফর আহমদ তখন কমিউনিস্ট হওয়ার প্রস্তুতি পর্বে ছিলেন। নজরুল রাজনীতিতে যোগ দিবেন কিনা জানতে চাইলে কাজী নজরুল ইসলাম কমরেড মুজফফর আহমদকে বলেছিলেন ‘তাই যদি না দিব তবে ফৌজে গিয়েছিলেম কিসের জন্য?’ নিজেদের মত ও পথ নির্ধারণ ও প্রচারের জন্য তাঁরা একটা পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হকের আর্থিক সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯২০ সালের ১২ জুলাই প্রথম প্রকাশিত হয় সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ। কাজী নজরুল ইসলাম পত্রিকার জন্য সংবাদ লেখার পাশাপাশি সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয় লিখতেন। ১৯২০ সালে নবযুগে লেখা সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয়গুলোর বেশ কয়েকটা নিয়ে ১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে ‘যুগবানী’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। তার ভূমিকায় লেখা হয়েছিল ‘....আমাদের মুক্তি আন্দোলনের এক যুগসন্ধিক্ষণ। একদিকে সাম্রাজ্যবাদী বৈদেশিক সরকারের শোষণ ও অত্যাচারে দেশ জর্জরিত, অন্যদিকে দেশবাসী অজ্ঞতা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এই অন্যায়, অবিচার, ভীরুতা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করেছিলেন বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ‘দৈনিক নবযুগে’র সম্পাদকীয় স্তম্ভে অনেক জ্বালাময়ী ও আবেগপূর্ণ প্রবন্ধ তিনি লেখেন। তারই কতকগুলো নিয়ে এ পুস্তক প্রকাশিত হয়।’
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে লিখেন তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায় তা প্রথম ছাপা হয়। ‘ভাঙ্গার গান’ (কারার ঐ লৌহ-কবাট/ ভেঙ্গে ফেল, কররে লোপাট) রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর অথবা ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে। ১৯২২ সালের ২০ জানুয়ারি চিত্তরঞ্জন দাশ সম্পাদিত ‘বাঙ্গালার কথা’য় কবিতাটি ছাপা হয় (চিত্তরঞ্জন দাশ তখন কারাবন্দী, তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন)। ভাঙ্গার গান কবিতাটি ভারত সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল।
১৯২২ সালের ১২ আগস্ট সম্পাদক ও স্বত্বাধিকারী হিসাবে কাজী নজরুল ইসলাম অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’ প্রকাশ করেন। প্রথম সংখ্যা থেকেই কবিগুরুর আশীর্বাণী (’জাগিয়ে দে রে চমক মেরে/ আছে যারা অর্দ্ধচেতন।’) ধারণ করেই প্রকাশিত হয় ধূমকেতু। ১৯২২ সালের ১৩ অক্টোবর কাজী নজরুল ইসলাম ’ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা’ চেয়ে ধূমকেতুতে প্রবন্ধ লিখেন। তিনি লিখেন ‘ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসন-ভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লী অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না।’ ১৯২২ সালের ৮ নবেম্বর ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ ধারায় কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়। অপরাধ ধূমকেতুতে ছাপানো নজরুলের নিজের কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’(আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তির আড়ালে?/ স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাঁড়াল।/ দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,/ ভূ-ভারত আজ কসাইখানা,- আসবি কখন সর্বনাশী?) এবং এগার বৎসরের বালিকা লীলা মিত্রের লেখা ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর কাজী নজরুল ইসলামকে কুমিল্লায় গ্রেপ্তার করে বিচারের জন্য কোলকাতায় আনা হয়। বিচারকালে কোলকাতার চিফ মেজিস্ট্রেট মি. সুইনহোর আদালতে নজরুল যে জবানবন্দী দেন তা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে খ্যাত। জবানবন্দীতে তিনি বলেছিলেন ‘ রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে-রুদ্র। রাজার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য স্বার্থ, লাভ অর্থ; আমার পক্ষে যিনি তাঁর লক্ষ্য সত্য, লাভ পরমানন্দ।’ ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি মেজিস্ট্রেট মি. সুইনহো রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্য কাজী নজরুল ইসলামকে এক বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। কারাজীবনের প্রথম কয়েকমাস বিশেষ কয়েদির মর্যাদায় আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দী ছিলেন। পরে সাধারণ কয়েদির মর্যাদায় নামিয়ে তাঁকে হুগলী জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এর প্রতিবাদে নজরুল ১৯২৩ সালের মে মাসে অনশন শুরু করেন। অনশন ভঙ্গ করার আবেদন জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে টেলিগ্রাম করেছিলেন এরাব ঁঢ় যঁহমবৎ ংঃৎরশব, ড়ঁৎ ষরঃবৎধঃঁৎব পষধরসং ুড়ঁ. কিন্তু কারাকর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে কারাগারে থাকাবস্থায় টেলিগ্রামটি নজরুলের হাতে পৌঁছায়নি। ৩৯ দিন অনশনের পর কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর অনুরোধে নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন। সরকার বিশেষ কয়েদির মর্যাদা দিয়ে তাঁকে বহরমপুর জেলে স্থানান্তর করে। এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডভোগ করে ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বহরমপুর জেল থেকে মুক্তি পান নজরুল।
বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের ভ্রুন পর্যায়ে কাজী নজরুলের সংশ্লিষ্টতার বিষয় উল্লেখ করতে গিয়ে কমরেড মুজফ্্ফর আহ্মদ লিখেছেন ‘১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে নজরুল আর আমি ঠিক করি যে আমরা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে এগিয়ে যাব।’ এ অবস্থায় ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নজরুল বিদ্রোহী কবিতা রচনা করেন। ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নজরুল দীর্ঘদিনের জন্য কুমিল্লায় অবস্থান করেন। এখানে লিখেন বিখ্যাত কবিতা ‘প্রলয়োল্লাস’ (তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/ ঐ নূতনের কেতন উড়ে/ কাল বোশেখীর ঝড়)। কুমিল্লা থেকে ফিরে মাওলানা আকরম খাঁর ‘সেবক’ পত্রিকায় কিছুদিন কাজ করে নিজের সম্পাদনার অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা ধূমকেতু নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পরেন নজরুল। পরে গ্রেপ্তার হয়ে এক বছরের অধিক সময় কারান্তরালে কাটাতে হয়। তিনি যখন জেল থেকে বের হন কমরেড মুজফফর আহ্মদ তখন ‘কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা’য় (গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ১৭ মে, ১৯২৩) গ্রেপ্তার হয়ে ১৯২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কারান্তরালে ছিলেন। ফলে বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির গঠন প্রক্রিয়ার সাথে নজরুল সম্পৃক্ত থাকতে পারেননি। ১৯২৬ সালে কাজী নজরুল ইসলাম কমরেড মুজফ্্ফর আহ্মদের অনুরোধে গানটির সুর এবং স্বরলিপি সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকা স্বত্ত্বেও আমেরিকান নাট্যকার আপটন সিংক্লেয়ারের নাটক ‘হেল’ হতে প্রাপ্ত বাণী থেকে ‘কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক’ বাংলা ভাষায় প্রথম অনুবাদ করেছিলেন (জাগো জাগো অনশন-বন্দী, উঠরে যত/ জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত॥) এখন বাংলা ভাষায় যে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক গাওয়া হয় তার ভাষান্তর করেছেন মোহিত ব্যানার্জী। স্বরলিপি করেছেন সুধী প্রধান।
জেল থেকে বেরিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম হুগলিতে বসবাস শুরু করেন। ১৯২৪ সালে হুগলিতেই গান্ধীজীর সাথে সামনাসামনি পরিচয় হয় নজরুলের। গান্ধীজীর আগমন উপলক্ষ্যে তিনি গান ও কবিতা রচনা করেন। গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েও তিনি বুঝেছিলেন গান্ধীজীর অহিংস পথে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। তাই ১৯২৫ সালে কাজী নজরুল ইসলাম, কুতবুদ্দীন আহমদ, হেমন্তকুমার সরকার ও শামসুদ্দীন হুসয়ন এ চারজন উদ্যোগী হয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত লেবর স্বরাজ পার্টি গঠন করেন। এ দলের প্রথম ইশতেহার কাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল। দলের মুখপত্র হিসেবে ‘সাপ্তাহিক লাঙ্গল’ প্রকাশিত হয়। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সাপ্তাহিক লাঙ্গলের প্রধান পরিচালক। লাঙ্গলের প্রথম সংখ্যায় ‘সাম্যবাদী’ কবিতাটি ছাপা হয়েছিল। ১৯২৬ সালে কাজী নজরুল ইসলাম বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য হন।
১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে কাজী নজরুল ইসলাম হুগলি ছেড়ে কৃষ্ণনগরে বসবাস শুরু করেন। ১৯২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কৃষ্ণনগরে নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সম্মেলন হয়। সে সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুসারে নতুন দল বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দল গঠিত হয় এবং কাজী নজরুল ইসলামের দল লেবর স্বরাজ পার্টি নতুন দলের সাথে একীভূত হয়ে যায়। এ সময়কালে ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় স্বাধীনভাবে শ্রমিক ও কৃষক পার্টি গড়ে উঠে। এ সকল পার্টিগুলোকে নিয়ে ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে কোলকাতায় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নিখিল ভারত শ্রমিক ও কৃষক পার্টি (All India Workers & Peasants Party) গঠিত হয়। কাজী নজরুল ইসলাম এ পার্টিরও নেতা ছিলেন। দলের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় ‘গণবাণী’। পাশাপাশি তিনি কংগ্রেস প্রাদেশিক কমিটিরও নেতা ছিলেন। ১৯২৬ সালের ২২-২৩ মে কৃষ্ণনগরে কংগ্রেসের প্রাদেশিক বার্ষিক সম্মেলন হয়। এর সাথে অনুষ্ঠিত হয় ছাত্র ও যুবদের আলাদা সম্মেলন। তিনটি সম্মেলনেরই উদ্বোধনী সঙ্গীত রচনা করেন কাজী নজরুল ইসলাম। কংগ্রেস সম্মেলনের জন্য রচনা করেন ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার/ লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার!/ ছাত্র সম্মেলনেন জন্য রচনা করেছিলেন ‘আমরা শক্তি আমরা বল/ আমরা ছাত্রদল।/মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান,/ ঊর্র্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল/ আমরা ছাত্রদল।/ যুব সম্মেলনের জন্য রচনা করেছিলেন ‘চল্ চল্ চল্/ ঊর্ধ্বে গগনে বাজে মাদল/নি¤েœ উতালা ধরণীতল,/ অরুণ প্রাতের তরুণ দল/ চল্রে চল্রে চল॥’
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালে কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচনে ঢাকা বিভাগ ( ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ নিয়ে গঠিত) কেন্দ্রে প্রার্থী হন। মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত এ আসনে ভোটার ছিল ১৮,১১৬ এবং প্রার্থী ছিলেন পাঁচ জন। নির্বাচনে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম ভারতীয়দের মধ্যে দ্বিতীয় (প্রথম মাওলানা হসরত মোহানী) ও বাঙ্গালিদের মধ্যে প্রথম যিনি পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টির উন্মেষকালে অন্যতম প্রধান সারথি ছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম প্যান-ইসলামিক পাকিস্তান আন্দোলনবিরোধী ছিলেন। কাজী নজরুল ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্তর্জাতিকতাবাদী ছিলেন। আবু হেনা আবদুল আউয়াল তাঁর ‘নজরুলের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনীতি’ গ্রন্থে লিখেছেন জাতীয়তার ক্ষেত্রে তিনি সাম্প্রদায়িকতা, আঞ্চলিকতা বা সংকীর্ণতার বহু ঊর্ধ্বে। তাই তাঁর বাঙ্গালিত্ব, ভারতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতার মধ্যে কোনো বিরোধ বা বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়নি। তিনি একাধারে ভারতীয়, বাঙ্গালি ও আন্তর্জাতিক।’
১৯২৮ সালের পর কাজী নজরুল ব্যস্ত হয়ে পড়েন গান রচনা আর সুর করায়। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে রেকর্ডিং কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে অসংখ্য গান রচনা ও সুর করেছেন নজরুল। কেউ বলে তিন হাজার আবার কেউ বলে চার হাজার। ১৯৩০ সালের মে মাসে পুত্র বুলবুল মৃত্যু বরণ করে। ১৯৩৯ সালে নজরুল স্ত্রী প্রমিলা দেবী পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। নজরুলের অসুস্থার শুরু ১৯৪২ সালে। নজরুলের কর্মময় জীবন সংক্ষিপ্ত। মাত্র আড়াই দশক। পল্টন থেকে ফিরে আসার পর প্রথম দশক তিনি ব্যস্ত ছিলেন রাজনীতি আর সাহিত্য রচনা নিয়ে। শেষের দশকে ব্যস্ত ছিলেন গান রচনা, সুর করা, নাটক, চলচ্চিত্র নিয়ে। রাজনীতিতে তেমন আর মনোনিবেশ করতে পারেননি। একদশকের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনে তিনি ভারতবর্ষে বিশেষ করে অবিভক্ত বাংলায় সমাজবাদী রাজনীতির উন্মেষকালে যে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিলেন তা তাঁর কবি পরিচিতির আড়ালে চলে গেলেও কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়।
লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন