কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বিমল মজুমদার
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ২ সেপ্টেম্বর ১৯২০ সালে ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগোনার বেজগাঁও গ্রামে। বাবা হরেন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায় মা সুরবালা দেবীর ১১ সন্তানের (৬ পুত্র ও ৫ কন্যা) মধ্যে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দ্বিতীয়। পড়ালেখা কলকাতায় রিপন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ব্রিটিশ সরকারের শাসন-শোষণ তার মনে গভীর দাগ কাটে, যুক্ত হন স্বদেশি আন্দোলনে। রাজনৈতিকভাবে নেতা মানেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে। বিগত শতাব্দির চল্লিশের দশক ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়। সেসময় তিনি ‘যুগান্তর’ নামে সশস্ত্র বিপ্লবীদের দলে নাম লেখান।
ক্রমশ তিনি মার্ক্সবাদে আকৃষ্ট হন। কমিউনিস্ট পার্টির সাহচর্যে আসেন। মার্ক্সবাদের মূল উদ্দেশ্য শোষণ বঞ্চনার চির অবসান। মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ গঠন। এই বিশ্বাস থেকে তিনি কখনোই সরে দাঁড়াননি। যেখানেই অন্যায় দেখেছেন, অবিচার দেখেছেন তার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করেছেন । সে প্রতিবাদ কখনো কবিতায়, কখনো মিছিলে পা মিলিয়ে। অংশগ্রহণ করেছেন খাদ্য আন্দোলন, নাট্য নিয়ন্ত্রণ বিল বিরোধী আন্দোলনসহ অসংখ্য আন্দোলনে। ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মুখর হয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন জুগিয়েছেন প্রাণপণে।
প্রথম জীবনে যাদের কাছ থেকে কবিতা লেখার উৎসাহ পেয়েছেন তারা হলেন- কবি বিমল চন্দ্র ঘোষ ও কবি অরুন মিত্র। কলেজে শিক্ষক ছিলেন কবি বুদ্ধদেব বসু ও কবি বিষ্ণু দে। চল্লিশের দশকের অনেক কবি-লেখকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাদের মধ্যে কবি রাম বসু, মঙ্গলাচর চট্টোপাধ্যায়, কবি কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত উল্লেখযোগ্য। কথাসাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদার, গণসঙ্গীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাথে ছিল ঘনিষ্ঠতা। হেমাঙ্গ বিশ্বাস তার কবিতায় সুর দিয়ে গেয়েছিলেন। আরো অনেকেই তার কবিতায় সুর দিয়েছেন। কবিতায় আরো যারা সুর দিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিলেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়, বিনয় চক্রবর্তী, বিপুল চক্রবর্তী, অজিত পান্ডে, অনুপ মুখোপাধ্যায়, অসীম ভট্টাচার্য, সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিত রায়, কালিদাশ গুপ্ত, হাবুল দাস প্রমুখ গণসঙ্গীত শিল্পীবৃন্দ।
কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে কাগজের (পত্রিকার) আশীর্বাদ দরকার হয়। উনি কখনোই বড় কাগজের পেছনে ছোটেননি। লিখেছেন ছোট কাগজে। বড় কাগজওয়ালাদের অনেক উদ্দেশ্য থাকে কাউকে পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে। উনি চলেছেন নিজের বিশ্বাসে, নিজের মতে।
কাজ করেছেন ঢাকুরিয়া ব্যাংকিং করপোরেশনে, বাঘাযতীন বিদ্যালয়, টিপেরা টি করপোরেশনে। বার বার পেশা বদল করতে হয়েছে। কিন্তু কখনো ভেঙে পড়েননি।
স্ত্রী রানী চট্টোপাধ্যায় ও পাঁচ সন্তান (দুই পুত্র ও তিন কন্যা) নিয়ে ছিল তার সংসার। বার বার কর্মহীন হয়েছেন, কিন্তু ভেঙে পড়েননি। আপস করেননি আদর্শ কিংবা বিশ্বাসের সাথে। এখানেই বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষত্ব। একবুক ভালবাসা নিয়ে দাঁড়িয়েছন মানুষের পক্ষে। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অন্যায়ের বিপক্ষে। এক মুহূর্তের জন্য আপস করেননি। আমৃত্যু ছিলেন প্রতিষ্ঠান বিরোধী।
প্রথমদিকে প্রেমের কবিতা দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তার গোত্রান্তর ঘটে। তিনি হয়ে ওঠেন বিদ্রোহ, বিপ্লবের কবি। কিন্তু কবিতা তার তাতেও কবিতার মাধুর্য হারায়নি। তাইতো এমন সুন্দর কবিতার পঙক্তি তিনি লিখতে পেরেছেন-
‘‘আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে
কারা যেন আজো ভাত রাধে
ভাত বাড়ে, ভাত খায়।
আর আমরা সারারাত জেগে থাকি
আশ্চর্য ভাতের গন্ধে,
প্রার্থনায়, সারা রাত।’
তরুণ কবিরা ঘিরে থাকতো সব সময়। তরুণ কবিদের প্রতি ছিল গভীর মমত্ববোধ। ভাল কবিতা লেখার জন্য প্রেরণা দিতেন। তাদের কবিতা পাঠিয়ে দিতেন বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপার জন্য। ঝোলার ভেতরে থাকতো কবিতার বই। মন্ত্রের মতো সব লাইন। কবিতাপ্রেমীদের মুখে মুখে থাকতো কবিতার পঙক্তি, ‘মাটি তো আগুনের মতো হবেই/ যদি তুমি ফসল ফলাতে না জানো/ যদি তুমি বৃষ্টি আনার মন্ত্র ভুলে যাও/ তোমার স্বদেশ তাহলে মরুভূমি।/ যে মানুষ গান গাইতে জানে না/ যখন প্রলয় আসে, সে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়।’
বইমেলাতেও দেখা যেত, নিজের বই এবং তরুণ কবিদের বই বিক্রি করছেন। কাঁধে ঝোলা, মালকোঁচা মেরে ধুতি, পাঞ্জাবি। এই তাঁর পোশাক। ভালবাসতেন বিড়ি, সিগারেট আর চা। প্রিয় খাদ্য মুড়ি আর জিলিপি। বাঙাল ভাষায়, ঢাকাই টানে কথা বলতেন। চশমা, চটি, কলম, ছাতা হারাতেন প্রায়ই।
দেশভাগ বিখ্যাত অভিনেতা ভানু বন্দোপাধ্যায় এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের মতো কবির মনেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। আক্ষেপ করে বলতেন, ‘‘আমার জন্মভূমিকে এখন আমি স্বদেশ বলতে পারি না।’’
দরজায় দরজায় ঘুরে ঘুরে বই বিক্রি করতেন, নিজের বই এবং তরুন্দের বই। কলকাতার পোশাকি সভা সমাবেশের চেয়ে পছন্দ করতেন গ্রামের তরুণ কবি-লেখকদের আড্ডা, সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন গ্রামে।
কবিতা মাথায় এলে লিখতেন সিগারেটের প্যাকেটে, ট্রেনের টিকেট বা হাতের কাছে যা পেতেন তাতেই। এখনো দুই বাংলার যে কোনও প্রতিবাদী সভা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বীরেন চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা উচ্চারিত হয় সমান তালে, গাওয়া হয় তার গান। উল্টোরথ পুরস্কার ১৯৬১, নরসিংহ দাস স্মৃতি পুরস্কার ১৯৮১ এবং রবীন্দ্র পুরস্কার ১৯৮২ লাভ করেছেন। জন্মশতবার্ষিকীতে কবির প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন