মানবিক বাস্তবতার নিরিখে শিল্প

লুৎফর রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

প্রকৃতি, মানুষের জীবন ও সমাজ শিল্পের উৎস। মানুষ তার আবেগ দিয়ে চিরকাল প্রকৃতির বিপুল সৌন্দর্যকে নিজের মতো করে প্রকাশ করতে চেয়েছে। প্রকৃতির রূপকে সে নিজের মধ্যে নিয়ে বিমূর্ত করে। তারপর আপন মনের রঙ মিশিয়ে বাইরে এনে মূর্ত করে। তখন সেটা আর প্রকৃতির থাকে না তার নিজের হয়ে যায় এবং তা যখন সকলের হয়ে ওঠে তখনই শিল্প হয়। মানবজাতির প্রগতির ধারায় সৌন্দর্য সৃষ্টি ও ক্ষণকালের সৌন্দর্যকে চিরকালের করাই শিল্পের কাজ। শিল্পে মানুষের জীবন-বিরুদ্ধ কিছু থাকার সুযোগ নেই। মানবিকতাই শিল্পের আকর। সেটাই মানবিক যা মানুষের জীবনকে, সুললিত বৃত্তিগুলোকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে নিয়ে সমৃদ্ধ করতে সহায়ক। এমন প্রাকৃতিক-সামাজিক পরিবেশের আরেক নাম মানবিক বাস্তবতা। বর্তমান সময়ে এ বাস্তবতা যতো দুর্লভই হোক শিল্পীদের তা অনুসন্ধান করতেই হবে। সে জন্য মানব সমাজের শুরুর সময়টায় যেতে হয়। মানবসমাজের আদিতে মানুষে-মানুষে সাম্যের সম্পর্ক বিরাজ করতো এবং সেটা তাদের অস্তিত্বের খাতিরেই কারণ, তখন সমাজের বিকাশ খুব নীচের স্তরে থাকায় মানুষ ছিলো অসহায়। তখনকার সমাজে শ্রেণি বিভেদ ছিলো না। উৎপাদন ও ভোগ দুটোই ছিলো সামাজিক। মালিকানাও ছিলো সামাজিক। সে সময়ের শিল্প ও শিল্পী ছিলো মুক্ত স্বাধীন। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথে একদল মানুষ সামাজিক মালিকানাকে হটিয়ে ব্যক্তিমালিকানার রীতি চালু করে দিলে মানবিকতা হোঁচট খায়। সমাজ শোষক ও শোষিত দু ভাগে ভাগ হয়ে যায়। শোষকরা শোষিতদের দখলে নিয়ে তাদের শ্রমশক্তিকে আত্মসাৎ করা শুরু করে। তারা শিল্পকেও দখলে নেয়। তখন শিল্পীর স্বাধীনতার ব্যাঘাত হয়। লেগে যায় লড়াই। মানবিক বাস্তবতার পরিবেশ বদলে যায়। শিল্পীর স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা ও মানবিক বাস্তবতা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা, উৎপাদনের সাথে ভোগ ও বন্টকে মিলিয়ে সামাজিক করা। এখানেই শিল্প সৃষ্টিতে শিল্পীর দায়বদ্ধতা এসে পড়ে শিল্পসম্মতভাবে অবদান রাখার। এ ব্যাপারে যারা নানা তত্ত্বের উল্লেখে সমালোচনার ঝড় তোলেন তারা সত্যকে আড়াল করেন। মুক্ত সমাজ ছাড়া মুক্ত মানুষ ও শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব সম্ভব না। শিল্পী একজন ব্যক্তি। অন্যভাবে বললে সে সমষ্টিরও অংশ। একক ও সর্বজনীন। যেমন আমরা ছবি দেখেই বলি এটা শিল্পাচার্য জয়নুলের চিত্র আবার বলি আমাদের সমাজের আলেখ্য। এ ক্ষেত্রে অন্য সবার থেকে পৃথক করার উপাদানগুলো একক। আবার সবার সাথে মেলানোর উপাদানসমূহ সর্বজনীন। রূপবিলাসী রূপকার শিল্পীর শিল্পে এ দুটো বৈশিষ্ট্যই থাকে। তাই শিল্পে শিল্পীর একান্ত ভাবনা যেমন ওঠে আসবে তেমনি সমাজ ও প্রকৃতির খুঁটিনাটি উপাদানগুলোও স্থান পাবে, স্থান পাবে মানুষের সাথে। যেমন- জীবনানন্দ দাসের কবিতা : “আশ্চর্য বনের পথে অনেক হয়েছি আমি তোমাদের সাথী, ছড়ায়েছি খই ধান বহুদিন উঠানের শালিখের তরে সন্ধ্যায় পুকুর থেকে হাঁসটিরে নিয়ে আমি তোমাদের ঘরে গিয়েছি অনেকদিন,-দেখিয়াছি ধূপ জ্বাল, ধর সন্ধ্যাবাতি থোড়ের মতন শাদা ভিজে হাতে- এখুনি আসিবে কিনা রাতি বিনুনি বেঁধেছ তাই- কাঁচা পোকাটিপ তুমি কপালের পরে পরিয়াছ তারপর ঘুমায়েছ, কল্কাপাড় আঁচলটি ঝরে। পানের বাটার পরে, নোনার মতন নম্র শরীরটি পাতি নির্জন পালঙ্কে তুমি ঘুমায়েছ।” এখানে জীবনানন্দ প্রকৃতি সংলগ্নতা যেমন- বন, পথ, ধান, শালিখ, হাঁস, থোড়, কল্কা, ইত্যাদি মানুষের সাথে স্থান পেয়েছে মানবিকতায় উৎসারিত হয়ে। চিত্রকরের চিত্রে স্থান পাক বিচিত্র রঙ, ফুল, পাখি, গাছ, পাতা, ছোট পোকা থেকে শুরু করে বনের রাজা সিংহ পর্যন্ত। এসব থাকুক মানুষের কষ্টের সাথে, মেহনত, সংগ্রাম ও বিজয়ের সাথে মিলিয়ে। সবই হবে সূক্ষ্ম কারুকাজে জীবন জিজ্ঞাসায় সামগ্রিকভাবে। সামগ্রিকতাই শ্রেষ্ঠ শিল্পের পরিচায়ক। পৃথিবী জমাট ঐক্যের উদাহরণ। বস্তুজগতে কোনো কিছু থেকে কোনো কিছু বিচ্ছিন্ন না, ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ। শিল্প সৃষ্টিতে দেশে দেশে সরঞ্জামের বৈচিত্র্য মেলে। এই সরঞ্জাম ও শিল্পীদের মধ্যে বিনিময় অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের মতে দেয়া-নেয়ার প্রয়োজন, ঐক্য স্থাপন প্রয়োজন। আদান-প্রদান আবশ্যক সমৃদ্ধ শিল্পের জন্য। কাজের ধারা, শিল্প-রীতির বেলায়ও তা প্রযোজ্য সমানভাবে। শিল্পের বিরুদ্ধবাদীরা যেমন দুনিয়াব্যাপী বিরাজ করে এবং ঐক্যবদ্ধ তেমনি শিল্পীদেরও ঐক্য প্রয়োজন মানবিকতার মুক্তির জন্য। কারণ এতে শিল্পীরও মুক্তি নিহিত। শিল্পীকে আরো অনেক কিছুর সমন্বয় করে এগুতে হবে। জীবনের সজীবতা অর্থাৎ প্রাণশক্তির সাথে এর গতিধারার একটা সম্পর্ক আছে যে জায়গাটায় গরমিল হলে জীবন অসুন্দর হয়, কষ্টকর হয়। এটাকে বলা যায় জীবনের ছন্দোপতন। শিল্পী তাই জীবনের অসংগতিকে চিহ্নিত করে আঁকবেন শিল্পসম্মতভাবে। পরিবর্তনের জন্য তিনি শ্লোগান দেবেন না, মানুষ তাঁর শিল্পকর্মটি দেখেই অনুভব করবে পরিবর্তন প্রয়োজন। এটাই শৈল্পিক আবেদন। শিল্পীকে তাঁর ব্যবহৃত সরঞ্জামের সাথে শিল্পের সমন্বয় ঘটিয়ে এগুতে হবে। বিবেচিত হবে পরিবেশ ও সমাজের মানুষের মধ্যে বিরাজিত মূল দ্বন্দ্বটি। এছাড়া বিষয়বস্তু ওঠে আসবে বাস্তব থেকে যার সাথে উপস্থাপনের সংগতি থাকবে। শিল্পের বিষয়বস্তুর সাথে মিল রেখে সব উপাদানের ব্যবহার হবে যেমন- রঙ, তাল-লয়, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, ভঙ্গি, ইংগিত ও ভাষা। এটাই শিল্পের নিপুণতা। শিল্পকলাকে হতে হবে বহমান নদীর মতো বা বহু নদীর মিলিত প্রবাহের মতো। আদিকালে একদিন কোনো অজানা সময়ে মানুষের মধ্যে আবেগ জেগেছিলো নিজের মতো করে প্রকৃতির সুন্দরকে প্রকাশ করার। সেখান থেকেই শিল্প-নদীটির প্রবাহের শুরু হয়ে আজ অব্দি বহমান। আজকের আধুনিক শিল্পের উপস্থাপন হবে এই ধারাবাহিকতার ওপর নজর রেখে। যা গতিশীল তাই আধুনিক। স্থূলতার নয়, সূক্ষ্ম কারুকাজই আধুনিক শিল্পের পরিচায়ক। শিল্পে মানব-মানবীর রক্তমাংসে গড়া চেহারা ওঠে আসবে। রক্তমাংসে গড়া কথাটার ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায় কোনো শিল্পী যদি একজন শ্রমিককে আঁকতে চান তো সেখানে শ্রমিকেরই জীবনধারা ফুটে ওঠবে, কোনো মধ্যবিত্তের নয়। তা না হলে বিষয়টি কৃত্রিম হবে, নকল হবে, শিল্পীর ইচ্ছেকে চরিত্রের ওপর চাপিয়ে দেয়া হবে যা হবে বাস্তবতা বিবর্জিত, রক্তমাংসের হবে না। অর্থাৎ তার বাচনভঙ্গি, জীবনাচার, মনস্তত্ত্ব, লড়াই-সংগ্রাম শ্রমিকের হবে না। সুতরাং শিল্পীকে জীবনের তলদেশে ডুব দিয়ে খুঁজতে হবে দক্ষ ডুবুরির মতো। তবে চরিত্রটি মোটেই ফটোগ্রাফি হবে না শিল্পীর মনের রঙ মিশিয়ে সৃষ্টি হবে। তাই আধুনিক শিল্পীকে হতে হবে প্রাজ্ঞ ও সজীব অর্থাৎ প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তার হতাশ হলে চলবে না। তিনি সব পরিবেশে স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন। তাঁর ধারণায় থাকবে জগৎ গতিময়, অন্তহীন, সদা পরিবর্তনশীল। তিনি সীমার মাঝে অসীমকে ফুটিয়ে তুলবেন। তাঁর সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র পরিসরে বৃহতের আবির্ভাব ঘটবে। তিনি মূর্তকে বিমূর্ত এবং বিমূর্তকে মূর্ত করে সৃষ্টি করবেন অপরূপ সৌন্দর্য। সবশেষে বলতে চাই শিল্পীর শিল্পে মানবিক বাস্তবতার নিরিখে অবরুদ্ধ পরিবেশেও মুক্ত মানুষের অবিরাম গতিশীল জীবনপ্রবাহ ফুটে ওঠবে অবিচ্ছিন্নতায়, সামগ্রিকভাবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..