পরিবেশ বিপর্যয়, রোগের বিস্তার ও ইতিহাসের শিক্ষা

মুরশেদুল হাকিম শুভ্র

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
(১) ফ্রিজফ কাপরা তার বিখ্যাত বই ‘দ্য ওয়েব অফ লাইফ’-এ উল্লেখ করেছেন, “ঃযব বধৎঃয রং ধ ষরারহম ঃযরহম”, অর্থাৎ, পৃথিবী এক জীবন্ত সত্তা। আমরা এক ব্যাপক বিস্তৃত গভীর রহস্যময় গ্রহের প্রকৃতির (ঘধঃঁৎব, রহ ঃযব নৎড়ধফবংঃ ংবহংব, রং ঃযব হধঃঁৎধষ, ঢ়যুংরপধষ, ড়ৎ সধঃবৎরধষ ড়িৎষফ ড়ৎ ঁহরাবৎংব) অন্তর্গত সত্তা। যেখানে আমরা সবাই কানেক্টেড। “বি ধৎব ধষষ পড়হহবপঃবফ”। কাপরা বলছেন, “অরণ্যের সারি সারি বৃক্ষরাজির দিকে তাকালে মনে হবে এক গাছ আরেক গাছ থেকে কিছুটা হলেও দূরে, আলাদা বা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু মাটির নিচে সকল গাছের শিকড় কী এক নিবিড় মায়ার বন্ধনে জড়ানো!” আমরা সবাই যেন প্রাণে প্রাণে, নিবিড় বন্ধনে মাকড়শার জালের মতই একে অপরের সাথে মহাকালের মহাপৃথিবীর জন্মসূত্র থেকেই আবদ্ধ। (২) কোটি কোটি বছর ধরেই আমাদের এই গ্রহ, এই পৃথিবীর প্রকৃতি নিজেই নিজেকে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। কিন্তু কিছু মানুষের নির্বুদ্ধিতা, পরিকল্পিত এবং উপর্যুপরি হিংস্র নিষ্ঠুরতা, উন্নয়ন ও মুনাফার ব্যবসার নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে; মুক্ত বায়ু, নীল সমুদ্র, আকাশ, মাটি জলবায়ু এবং বাঁচার পরিবেশ নষ্ট করে; শোষণ দখল ধ্বংস করে আজ এমন পর্যায়ে এসেছে যে প্রকৃতির সাথে আমাদের নিবিড় বন্ধনের জাল ভেঙে পড়ছে। আমাদের গ্রহের প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলো—একটি স্ব-সংগঠিত, স্ব-নিয়ন্ত্রিত জীবমণ্ডল, যা কোটি কোটি বছর ধরে নিজ থেকেই সংগঠিত। বোধবুদ্ধিতে সীমাবদ্ধ মানুষের হস্তক্ষেপে গ্রহের সমস্ত বিবর্তন প্রক্রিয়া আজ মহাবিপর্যয়ে আক্রান্ত। মানুষের অদূরদর্শিতার কারণে পৃথিবী আজ উত্তপ্ত। সংক্রমিত রোগীর মতই ‘জ্বরে’ আক্রান্ত আমাদের পৃথিবী। ভেঙে পড়ছে সমাজিক বন্ধন, বাড়ছে দারিদ্র্য বৈষম্য। বাড়ছে রোগ, শোক ও সংক্রমণ। কর্পোরেট মুনাফার আগ্রাসনে অরণ্য ও প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রনহীন দখল ও ধ্বংসের বৈশ্বিকরনের সাথে সাথে বৈশ্বিকরণ হয়ে চলেছে আগ্রাসী রোগ-জীবাণুর আক্রমণ সংক্রমণ। প্রকৃতি আজ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছে। “উরংবধংব রং হধঃঁৎবং ৎবাবহমব ড়ভ ড়ঁৎ ফবংঃৎঁপঃরাবহবংং.” (৩) ১৮০০ শতকে পানিবাহী জীবাণু কলেরা বিশ্ব মহামারি রূপে দেখা দেয়। বাংলার সুন্দরবন অঞ্চল থেকে সারা ভারত তারপর রাশিয়া, লন্ডন, প্যারিস হয়ে নিউইয়র্ক পর্যন্ত এই জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। ভারতবর্ষ তখন শাসন করছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ধীরে ধীরে সারা ভারতবর্ষে তারা শাসন বিস্তার করতে থাকে। সেই সময় সুন্দরবন ছিলো প্রকৃতির জীব বৈচিত্র্যের এক অপরূপ লীলাক্ষেত্র। হাজার প্রজাতির প্রাণের সমাহার। মিঠা ও লবণ পানির মিলনক্ষেত্র। নদী ও সাগরের মোহনায় ভারতের আঁচল হয়ে নীরবে নিভৃতে মাথা উঁচু করে ছিল মহীয়সী সুন্দরবন। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে রেহাই পেল না সুন্দরবন। ধান চাষের নাম করে অরণ্য উজার করা এবং ব্যবসায়িক স্বার্থে রেলওয়ে নির্মাণ শুরু হলো। হাজার বছর ধরে যে কলেরা ব্যাকটেরিয়া বন-প্রকৃতির সাথে সিমবায়োটিক প্রক্রিয়ায় বা মিথষ্ক্রিয়ায় বেচে ছিল সেই জীবাণুর আক্রমণ শুরু হলো লোকালয়ে। মানুষের দেহে। “উনিশ শতকের সবচেয়ে বড় মহামারিটা শুরু হয়েছিল ১৮১৭ সালে। সেটি ছিল উনিশ শতকের প্রথম মহামারি, যাতে কয়েক লাখ ভারতীয় এবং ১০ হাজারেরও বেশি ইংরেজ সৈন্য মারা গিয়েছিল। পরে ১৮২৯ সালে দ্বিতীয় ধাপে শুরু হওয়া মহামারিটি এশিয়ার সীমান্ত পার হয়ে ইউরোপে পৌঁছে যায় এবং রাশিয়ার ভূখণ্ডে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। তৃতীয় ধাপে ১৮৪৬ সালে শুরু হওয়া মহামারিটা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পৌঁছে যায় এবং তাতেও অনেক প্রাণহানি ঘটে। খোদ আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জেমস কে পক প্রাণ হারিয়েছিলেন ওই মহামারির শেষ পর্যায়ে। ধারণা করা হয়, বিশ্বব্যাপী কলেরা মহামারির বড় একটা অংশ রপ্তানি হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে।” সেই সময় আমেরিকায় কলেরা মহামারির দায় চাপানো হতো মুসলমানদের ওপর। আইরিশদের ওপর। পূর্ব ইউরোপিয়ানদের ওপর। পেন্সিলভেনিয়ায় আইরিশ শ্রমিকদের হত্যা করা হয়েছিল। কোয়ারেইন্টাইনে থাকা অবস্থায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। (৪) আঠারো শতকে নিউইয়র্ক শহরে উঠতি রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ এই মহামারির আরো বিস্তার ঘটায়। শহরবাসীর জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিয়ে শুরু হয় রাজনীতি ও ব্যবসা। নিউইয়র্কের গভর্নর একজন ডাক্তারের দায়িত্বে একটি টিম পাঠান উত্তরে কলেরা পানি সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ করার জন্য। তারা লক্ষ্য করেন এই জীবাণু ইউরোপ থেকে আটলান্টিক হয়ে ইরি ক্যানেল দিয়ে হাডসন রিভার হয়ে নিউইয়র্কের ম্যানহাটন থেকে ডাউনটাউন পর্যন্ত চলে এসেছে। তখন আরো উত্তর থেকে বিশুদ্ধ পানি নিউইয়র্কবাসীর জন্য সরবরাহ করা যেত। কিন্তু তা করা হয়নি। তখন ম্যানহাটন কোম্পানি যারা পানি সরবরাহের দায়িত্বে ছিল তারা তা করেনি। সেই সময় ফাইভ পয়েন্ট নামে একটি বস্তি ছিল, বর্তমানে ম্যানহাটন ব্রিজ ও ব্রুকলিন ব্রিজ এলাকা সংলগ্ন। এই বস্তিটি গড়ে উঠেছিল একটি জলাশয়ের ওপর, যা ময়লা আবর্জনা দিয়ে পূর্ণ করে সেখানে বসতি স্থাপন করা হয়। খরচ বাঁচানোর জন্য ম্যানহাটন কোম্পানি নিউইয়র্কের আরো উত্তর থেকে বা কানাডা থেকে পরিষ্কার পানি না এনে ফাইভ পয়েন্টের নিচের ময়লা আবর্জনাময় জলাশয় থেকে পানি উত্তোলন করে তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শহরবাসীর জন্য পুরো ১৮ শতক ধরে সরবরাহ করে। সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে কলেরা মহামারি। যে ব্যাক্তিটি এর পেছনে ছিলেন তার নাম অ্যারন বার (অধৎড়হ নঁৎৎ)। অতিরিক্ত মুনাফার জন্য তিনি এই কাজটি করেছিলেন। কারণ, তিনি একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যার নাম ব্যাংক অব ম্যানহাটন কোম্পানি। বর্তমান নাম জে পি মরগান চেস (ঔচগড়ৎমধহ ঈযধংব), আমেরিকার সবচেয়ে বড় ব্যাংক। (৫) সারা পৃথিবীব্যাপী কলেরা সংক্রমণের ইতিহাস বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে প্রায় একইভাবে ইবোলা, ওয়েস্টনাইল, সোয়াইন, জিকা, এইচআইভি, করোনা প্রভৃতি জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীব্যাপী। গত পঞ্চাশ বছরে প্রায় তিনশো রোগ-জীবাণু হয় নতুন, না হয় পরিবর্তিত হয়ে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমান অনিয়ন্ত্রিত মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদের নয়াউদারবাদী অর্থনীতির মডেলের কর্পোরেট শাসনে উন্নয়নের নামে জল, জঙ্গল, নদী, পাহাড়, বাস্তুতন্ত্র, জলবায়ু দখল দূষিত করে, কয়লা ও মাটির নিচের তেল পুড়িয়ে, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সবুজ অরণ্য দখল করে, সবুজ পৃথিবীর জীবন্ত প্রাণসত্তাকে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে প্রাণে প্রাণে লেনদেন, বোঝাপড়া সংযোগ। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে আবির্ভূত হবে আরো শক্তিশালী প্রাণনাশক জীবাণু। বিপন্ন হবে মানবজীবন। সকল প্রাণ। আরো বিরূপ হয়ে উঠবে প্রকৃতি। বিশ্বব্যাপী সেই বিষাক্ত চক্রের বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে প্রাণসত্তা। আমাদের নীল গ্রহ আজ আক্রান্ত হয়েছে মানবশক্তি আর পৃথিবী নামক গ্রহের জীবন্ত প্রাণশক্তির এক ব্যাপক গভীর বিরূপ মনুষ্যসৃষ্ট দ্বন্দ্ব-সংঘাতে। দেশে দেশে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসছে দরিদ্র, দুর্বল, বিত্তহীন নারী-পুরুষের ওপর। পৃথিবীকে উত্তপ্ত করায় পরিবেশ বিপর্যয়ে যাদের কোনোই ভূমিকা নেই। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন আজ তাই শ্রেণিসংগ্রাম। আধুনিক সভ্যতায় মুনাফার নামে কালচার দিয়ে ন্যাচারকে নিয়ন্ত্রণ এবং ধ্বংস করার যে ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, আজ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে উঠছে দেশে দেশে। পোপ ফ্রান্সিস বলেছিলেন, “বিধাতা সবসময় ক্ষমাশীল, মানবসন্তান মাঝে মাঝে ক্ষমাশীল, কিন্তু প্রকৃতি কখনো ক্ষমা করে না। এড়ফ ধষধিুং ভড়ৎমরাবং, ঢ়বড়ঢ়ষব ংড়সবঃরসবং ভড়ৎমরাব, ঘধঃঁৎব হবাবৎ ভড়ৎমরাবং”। এই হলো ইতিহাসের শিক্ষা। লেখক : জর্জিয়া প্রবাসী ও সাবেক ছাত্রনেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..