বিপ্লবী সাহাব উদ্দিন মাস্টার

মুস্তাফিজুর রহমান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বলছিলাম একজন বিপ্লবী চরিত্রের কাহিনী। যিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। উনি বিপ্লবী সাহার উদ্দিন মাস্টার। চলনে-বলনে, কথা-বার্তায় সর্বত্র ধীরস্থির ও শান্ত স্বভাবের। কিন্তু নীতি-আর্দশে অটল। সাহাব উদ্দিন মাস্টার ১৯৪১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার রহিমার কান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উনার পিতার নাম আলী নেওয়াজ ও মাতার নাম গেদিবিবি। উনার আরেক পরিচয় উনি নরসিংদী জেলার প্রথম বিপ্লবী আব্দুর রহমান মাস্টারের ছোট ভাই। চায়ের দোকানে বসে একান্ত আপনজনের মতো সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ সমতার সমাজ এই জাতীয় আলাপ আলোচনা অতি সাধারণভাবে সহজ ভাষায় তোলে ধরে অনায়াসেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতেন। গ্রামের রাস্তা ধরে স্বুলে কিংবা বাজারে যাওয়া-আসার পথে আগে-পাছে দু-একজন নিয়ে পথচলায় রসাত্মক উপমাযোগে আলাপনের আকর্ষনীয়তা আর গ্রহণযোগ্যতা ফুটে ওঠতো বাম রাজনীতির সুমহান আর্দশ। উপনিবেশিক পাকিস্থান আমলে আইয়ুবী স্বৈরশাষনকালে কমিউনিস্ট পার্টি নামে যেকোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম যখন নিষিদ্ধ ছিল তখন বিভিন্ন গ্রামে উনার উদ্যোগে মঞ্চস্থ হয় অনেক সামাজিক ও ঐতিহাসিক নাটক। যা যুব সমাজের মাঝে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চেতনাকে দারুণভাবে শাণিত করতো। এভাবেই নরসিংদী জেলার রায়পরা-মনোহরদী-বেলাব-শিবপুরে কৃষক আন্দোলন জঙ্গিরূপ লাভ করে, যা হাট-বাজারে ইজারা প্রথা বাতিল করতে সরকারকে বাধ্য করে। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব শিল্পীসংগ্রামী সত্যেন সেন আর কৃষকনেতা কমরেড জিতেন ঘোষের সুযোগ্য নেতৃত্ব আর পদচারণায় কৃষক-শ্রমিক আর ছাত্র-যুবকদের মাঝে কৃষক সমিতি, ছাত্র ইউনিয়ন, বিভিন্ন রকমের নাট্যসংঘ, যুব সংঘ ইত্যাদি বাম ধারার প্রগতিশীল সংগঠনগুলোতে স্থানীয়ভাবে নেতৃত্ব দিতেন সাহার উদ্দিন মাস্টার, বাবর আলী মাস্টার প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ অত্যন্ত ঘনিষ্টভাবে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষগুলোর অতি আপনজন হয়ে ওঠেন উনারা। এই মানুষগুলো তাদের সংসার জীবনের বিভিন্ন রকম সুবিধা-অসুবিধা, সামাজিক-আর্থিক যাবতীয় বিষযাদি অতি কাছের নিত্য-সাথী হয়ে সবকিছু শেয়ার করতেন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে। নরসিংদী জেলার বিভিন্ন এলাকায় ‘৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-যুবাদের সংগঠিত করে ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষনে উৎসাহিত করা এবং প্রশিক্ষকদের থাকা খাওয়ার ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়ে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। অতঃপর ভারতে যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে যে সমস্ত দূরবর্তী এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা অত্র এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে চমৎকার অবদান রাখেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাদেশ কৃষক সমিতির জাতীয় সম্মেলন বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হয় নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার বেলাব বাজারে। এ সম্মেলনের প্রস্তুতি শুরু হয় ১৫ দিন আগ থেকে। সম্মেলন সার্থক ও সফল করে তোলার জন্য যারা রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন তাদের মাঝে তিনি অন্যতম। ২০০৬ সালে ২৫ জুলাই এই সমাজবিপ্লবী এদেশের কৃষক-শ্রমিক আর সর্বহারা মানুষের আশা জাগানিয়া শ্রেণিবৈষম্যমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন অধরা রেখেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আজকের ছাত্র ও যুব সমাজের মাঝে উনার আর্দশ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে আগামী দিনে সমাজ প্রগতির লড়াইকে সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে সীমাহীন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। কমরেড সাহাব উদ্দিন মাস্টার লাল সালাম। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, উদীচী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..