বাংলাদেশে ভয়াবহ হামের কারণ টিকা কর্মসূচিতে ব্যাঘাত;প্রাণহানির সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে

ঐশ্বর্য সৌরভ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
* হাম-উপসর্গ : ৪০ লাখ পথশিশু টিকার বাইরে * এ পর্যন্ত আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি * অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সরবরাহে ঘাটতি হয়েছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। প্রাণহানির সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬০। বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু টিকাদানে ঘাটতি ও নিয়মিত টিকা কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কারণে এখন দেশটি হাম রোগের ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবের মুখে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের কথা জানিয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে মোট ৯০৯ শিশুর। আর নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ১০০ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এই সময়ে মোট প্রাণহানি ঘটেছে ১,০০৯ জনের। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাতের পর থেকেই শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে। সম্প্রতি সংসদ অধিবেশনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে টিকা সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। মহামারি বিশেষজ্ঞ মাহমুদুর রহমান বলছেন, ‘‘হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে।’’ যদিও এ কথার সঙ্গে একমত নন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন প্রায় সববয়সি শিশুর মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। তাই প্রমাণভিত্তিকভাবে টিকাদানের বয়সসীমা অন্তত ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো, মাঠপর্যায়ে মাইক্রোপ্ল্যানিং জোরদার এবং কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি ছাড়া এ প্রাদুর্ভাব থামানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেছেন, ‘‘প্রথমত, বিপুল সংখ্যক শিশু আমাদের টিকাদানের বাইরে থেকে গেছে। ফলে তাদের শরীরে হার্ড ইউমিনিটি তৈরি হয়নি। দ্বিতীয়ত, আমরা দেখছি, ৬ মাসের কম বয়সি শিশুও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। তারা কেন আক্রান্ত হচ্ছে? কারণ তাদের মা হামের টিকা পায়নি। ফলে শিশুর শরীরেও হামের ইউমিনিটি তৈরি হয়নি। তারাও আক্রান্ত হচ্ছে। এটা একটা দিক। আরেকটা দিক হচ্ছে, আমাদের ৪০ লাখের মতো পথশিশু রয়েছে। তারা হামের টিকা পায়নি। আপনি যদি ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় না আনতে পারেন তাহলে শিশুদের আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়।’’ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘‘হাম নিয়ন্ত্রণের কৌশল হাসপাতাল বা আইসিইউকেন্দ্রিক না হয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে হতে হবে। কমিউনিটির সম্পৃক্ততা ছাড়া রোগী শনাক্ত, প্রতিরোধ ও আইসোলেশন কার্যকরভাবে করা সম্ভব নয়। রোগী আইসিইউতে পৌঁছানোর পর মৃত্যু কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। জরুরি পরিস্থিতিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া ঠিক হলেও দীর্ঘমেয়াদে ইপিআইয়ের প্রচলিত মাইক্রোপ্ল্যানিং পদ্ধতিতে ফিরতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি শিশুর তালিকা তৈরি করতে হবে, কে টিকা পাবে তা নির্ধারণ করতে হবে এবং তাদের বাড়ির কাছের টিকাকেন্দ্রের তথ্য আগে থেকেই জানিয়ে দিতে হবে। ছিটেফোঁটা টিকা দিয়ে কখনোই ৯৫ শতাংশ কভারেজ হবে না।’’ জাতীয় হাম ও রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কারণ সংক্রমণ এখন প্রায় সব বয়সি শিশুর মধ্যেই রয়েছে। ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর সব বয়সি শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ রয়েছে। কোথাও কোথাও সামান্য কমলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। এতে বোঝা যায়, ঘোষিত টিকাদান কভারেজ বাস্তবে কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ১০৩ শতাংশ কাভারেজের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। লক্ষ্য নির্ধারণেই অসঙ্গতি থাকলে কাভারেজের হিসাবও বিভ্রান্তিকর হতে পারে। শুধু টিকা সরবরাহ করলেই হবে না। মায়েদের শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের জ্বর হলে দ্রুত শনাক্ত ও আলাদা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে।’’ তবে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। মার্চের প্রথম দিকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর গত এপ্রিলে সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের হামের টিকাদানে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করেছিল। সেই সময় সারা দেশের অন্তত এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর জুন মাসে একই বয়সসীমার শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর কর্মসূচি শুরু হয়। তখন দেখা যায়, শিশুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ। এরপরই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়লো কিনা। যদিও প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এই ৪৬ লাখ শিশু আদৌ বাদ পড়েছে কিনা সেই প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডাব্লিউএইচও বলছে, সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। তখন কোনো এলাকায় অল্পসংখ্যক টিকা না পেলেও সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে না। এবার বাংলাদেশে যে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেটিও মূলত এই ইমিউনিটি গ্যাপের ফল বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করেছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..