‘ভাওয়াইয়া’র উৎপত্তি প্রসঙ্গে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য : এক. ‘ভাওয়াইয়া’ হিমালয় পাদদেশীয় তরাই অঞ্চলের গান। যে সীমানায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আসামের গোয়ালপাড়া, বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলা রয়েছে। এই অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ এই লোকগানকে নির্মাণ করেছে এবং এখনো নির্মাণ করে চলেছে। এই গানে গেঁথে তুলেছে উল্লিখিত অঞ্চলের গণমানুষের সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনা-হতাশা এবং প্রাকৃতিক বিন্যাসের কথা। আমরা এই ভাওয়াইয়া গান শুনে কখনো আনন্দিত হই, কখনো বেদনা বোধ করি। এই গানের কথা-সুর আমাদের অন্তরে কী যেন একটা ঘটায়, কী যেন একটা অনুভূতি জাগায় যার ব্যাখ্যা আমরা অনেক সময় খুঁজে পাই না অথবা ব্যাখ্যা করবার ভাষা পাই না অথবা ব্যাখ্যা করবার প্রয়োজন অনুভব করি না। কিন্তু খুঁজে ফিরি, ‘অধরামাধুরী’কে ধরবার চেষ্টা করি, ‘তারে ধরি ধরি সন্ধান করি’। সেই সন্ধান কি শেষ হয়? সেই সন্ধানের কি নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়ন গড়ে ওঠে? শিল্প-সংস্কৃতির কোনও একাডেমিক ব্যাখ্যা গড়ে তোলা যায়? জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় যখন গেঁথে নিলেন– ‘শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা নামে’, ‘ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল’ এইসব বাক্যের কতটুকু একাডেমিক ব্যাখ্যা হতে পারে তা বোধগম্য হয় না। শিল্প-সংস্কৃতির একাডেমিক ব্যাখ্যা করতে গিয়েই আমরা এসবকে নানা ধরনের ধান্দার মাঝে ফেলে দিই এবং নিজেরাও ধান্দার মাঝে পড়ে যাই। এই ভাওয়াইয়া গানকে এসব ধান্দার মাঝে ফেলে দিয়ে বলার চেষ্টা করি ভাওয়াইয়ার এই সময় উৎপত্তি হয়েছে– এসব নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বলার চেষ্টা করি। মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি যে মানুষ তার শ্রম, তার উৎপাদন ইত্যাদি সম্পর্কের সঙ্গে তার নান্দনিক বিষয়টিকেও সম্পর্কযুক্ত করেছে। অথবা বলা যায় তা আপনা-আপনি যুক্ত হয়ে গেছে। অনেক কষ্ট করে একটি পশু শিকার করলে সেই পশুটিকে ঘিরে তারা আনন্দ-উচ্ছ্বাস করেছে, অনেক ধরনের ধ্বনি নির্মাণ করেছে, এই ধ্বনি কিন্তু পরে সুরে পরিণত হয়েছে। সুতরাং সুরেরও নির্মাণ হয়ে ওঠার পেছনে বস্তুগত কারণ রয়েছে। যে সুর আমরা কানে শুনি তাকে ধরা যায় না ছোঁয়া যায় না, কিন্তু আমাদের অন্তরে কোথায় একটি খোঁচা মেরে দেয়, আমাদের বোধকে জাগ্রত করে দেয়, আমাদের মানবিকতাকে বিকশিত করে দেয়, আমাদের অনুভূতিকে তীব্র করে তোলে, আমাদের চেতনাকে ধারালো করে সেই সুরেরও নির্মাণ হয়ে ওঠার পেছনে বস্তুগত কারণ রয়েছে। দুই. ‘ভাওয়াইয়া’ এই নামকরণ নিয়ে নানা ধরণের মত প্রচলিত আছে। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের গান কেনো ‘ভাওয়াইয়া’ অভিধা লাভ করলো তা একটু ভেবে নেয়া যেতে পারে। তবে এটাও স্বতঃসিদ্ধ যে বিশেষ অঞ্চলের এই লোকগান প্রাকৃতিকভাবে বয়ে চলার মধ্যদিয়েই তার পরিচয়লব্ধ শিরোনামটি সংযুক্ত করে নিয়েছে। ‘ভাও’ শব্দের সঙ্গে ‘ইয়া’ প্রত্যয় নিষ্পন্ন করে ‘ভাওইয়া’ থেকে ‘ভাওয়াইয়া’ শব্দটি নির্মাণ হয়েছে এমন ধারণা অনেকেই করেছেন। ‘ভাও’ এই প্রাকৃত শব্দটি ‘ভাব’ শব্দের অর্থকেই ধারণ করছে বলে অভিমত অনেকের। বাংলা একাডেমির অভিধানে ‘ভাব’ শব্দটির অর্থ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে– মনের অবস্থা, প্রকৃতি, অভিপ্রায়, অনুভূতির গাঢ়তা (ইমশন), প্রেম, প্রীতি, প্রণয় ইত্যাদি। বিশিষ্ট সংগীত গবেষক করুণাময় গোস্বামী ‘ভাব’ থেকে ভাওয়াইয়া শব্দের উৎপত্তি এই কথাটিকে সমর্থন করে বলেছেন, ‘ভাব সমৃদ্ধ গান এই অর্থে ভাওয়াইয়া ও ভাওয়াইয়া গান কথাটি প্রচলিত হয়েছে।’ (করুণাময় গোস্বামী –সঙ্গীত কোষ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৫, পৃ: ৫৩৫) মহামোহপাধ্যায় যাদবেশ্বর তর্করত্নও এই মতের পক্ষে বলেছেন–‘বোধকরি পূর্বরাগ লইয়াই প্রথম ভাওয়াইয়া গানের সৃষ্টি হইয়াছে। সেইজন্য ‘ভাব’ শব্দের প্রাকৃত ‘ভাও’ রাজবংশী ভাষায় ভাওয়াইয়া নামের গানের নামকরণ হইয়াছে।’ (উদ্ধৃত: মোহম্মদ মনসুর উদ্দীন সম্পাদিত – হারামণি ৪র্থ খণ্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬১, পৃ: ৪২)। ধর্ম নারায়ণ সরকার, হাবিবুর রহমান সহ আরও অনেকেই এই মতকে সমর্থন করেছেন। ‘ভাওয়া’ সম্পর্কিত অভিমত দিয়েছেন সংকেত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাথান সংস্কৃতি ও ভাওয়াইয়া’ নামক লেখায়। তাঁর মতে, ‘ভাওয়া’ শব্দের অর্থ মহিষচারণ ভূমি। মৈষালেরা মহিষ চরানোর সময় ‘ভাওয়া অঞ্চলে দোতরা সহযোগে যে গান করতো তাই ভাওয়াইয়া।’ ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীন বলেছেন, ‘উদার হাওয়ার মতো এর সুরের গতি, তাই এর নাম ভাওয়াইয়া’ (উদ্ধৃত: বাংলা লোকসংগীত: ভাওয়াইয়া, ড. ওয়াকিল আহমদ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জুন ১৯৯৫, পৃ: ২১) ‘বাও’ শব্দের অর্থ বাতাস। রংপুর অঞ্চলের মানুষ ‘বাওবাতাস’ এক সঙ্গে উচ্চারণ করে শব্দ দ্বৈততা নির্মাণ করে। সুতরাং ‘বাও’ ধ্বনি পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে ‘ভাও’ হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে ‘ভাব’ শব্দের যে বহুমাত্রিক অর্থ সেই অর্থের দিকে নজর দিয়ে ‘ভাব’ থেকে ‘ভাও’ আর ‘ভাও’ থেকে ভাওয়াইয়া এই মতের প্রতি অধিকসংখ্যক গবেষকের সমর্থন আমরা দেখতে পাই। কিন্তু আবার এটাওতো মানতে হয় যে সব বাংলা গানই ভাবে ভরা, সব বাংলা গানই বাণী প্রধান। তাই নামকরণগত দিক থেকে ভাবনার অন্য রাস্তাও খোলা রাখা যায় কি না সেটাও দেখা দরকার। ভাওয়াইয়া তরাই অঞ্চলের গান এই ধারণাটি প্রায় প্রত্যেক গবেষকই করেছেন। তরাই বলতে হিমালয় পাদদেশীয় অঞ্চলকে বোঝানো হয়। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢালময় অঞ্চলই তরাই। তরাই অঞ্চলের উত্তরে অবস্থিত হিমালয়ের পাথর, নুড়ি আর ক্ষয়প্রাপ্ত মাটিতে তৈরি বনময় অঞ্চলকে বলে ‘ভাবর’ অঞ্চল। এই ‘ভাবর’ অঞ্চলের মানুষের কণ্ঠনিসৃত সুরধ্বনি ‘তরাই’ অঞ্চল হয়ে ক্রমান্বয়ে নিম্নাঞ্চলে এসে যে বাণীবদ্ধ সুর নির্মিত হয়েছে তাই কি ভাওয়াইয়া? অর্থাৎ ‘ভাবর’ অঞ্চলের গান ভাওয়াইয়া? এমনটা কি ভাবা যেতে পারে না? ভাবনার দ্বার খুলে রাখাই উচিত। দ্বাররুদ্ধ করে দেবার সময় মনে হয় এখনো আসে নি। প্রখ্যাত ভাওয়াইয়া শিল্পী ও গবেষক মুস্তাফা জামান আব্বাসী যখন আমাদের ভাবনাকে একটু নাড়িয়ে দিয়ে বলেন, “এর (ভাওয়াইয়ার) সুরের সঙ্গে মঙ্গোলিয়ার সুরের সাদৃশ্য চমকিত করে, কোনো সুদূর অতীতে মঙ্গোলিয়ার মানুষের সঙ্গে চৈনিক সংযোগে এই সুর আমাদের দেশের সুরকে আলোড়িত করেছিল হয়তো।” (‘ভাওয়াইয়া’, স্মরণিকা, আব্বাসউদ্দীন আন্তর্জাতিক ভাওয়াইয়া উৎসব ২০১৮, সম্পাদনা: ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য, প্রকাশকাল: ৮ মার্চ ২০১৮, রংপুর, বাংলাদেশ) তখন ভৌগোলিক অঞ্চলকে মাথায় রেখে এই ভাবনাটি উপস্থাপন করা যেতেই পারে যে ‘ভবর’ শব্দ থেকে ভাওয়াইয়ার উদ্ভব হয়েছে। ভাবর অঞ্চলের গান ভাওয়াইয়া। যেমন ভাটি অঞ্চলের গান ভাটিয়ালি। তিন. ‘ভাবর’ অঞ্চল থেকে ‘তরাই’ অঞ্চল হয়ে যে জনগোষ্ঠী সমতলে কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় নিজেদের থিতু করেছে তারাই সেই অঞ্চলের সকল পরিবেশ-প্রতিবেশকে তাদের সুর ও বাণীর মেলবন্ধনে গেঁথে তুলেছে। আর এ কারণেই আমাদের বলতে দ্বিধা থাকে না যে কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে ভাওয়াইয়ার যোগসূত্রটি নিবিড়। আর একারণেই বলতে চাই ‘ভাবর’ ও ‘তরাই’ অঞ্চল থেকে অনেকটা দূরবর্তী ভৌগলিক পরিবেশে এসে– প্রবহমান নদী, উদাসী বাতাস, গরু-মহিষ-হাতি, গাছপালা, ধানক্ষেত, কৃষিব্যবস্থায় বসবাসকারী মানুষের বেদনা, অভাব, শ্রেণিশোষণ, প্রেম-ভালোবাসা, বিচ্ছেদ-বেদনা, সংগ্রাম, জয়-পরাজয় সকল কিছুকে নিয়ে নির্মাণ হয়ে উঠেছে এবং উঠছে লোকসংগীতের এই অনন্য মাধ্যম ‘ভাওয়াইয়া’। চার. ভাওয়াইয়া সঙ্গীতের সুরে প্রাকৃতিক অনুসঙ্গ যুক্ত হয়েছে। এক হচ্ছে নদী, নদীর চলন, নদীর পাড় ভাঙা দ্বিতীয়টি হচ্ছে গরুর গাড়ির চলন। গরুর গাড়ির চাকা গর্তের মধ্যে পড়ে গেলে যে শরীরে ধাক্কা লাগে সেই ধাক্কার কারণেই কিন্তু গরুর গাড়ি চালাতে চালাতে যে শিল্পী গান করে তখন তার চলমান সুরেও ধাক্কা লেগে সুরটি ভেঙে যায়, এটি পরে স্থায়ী হয়ে গেছে, ভাওয়াইয়া গানের বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে। নদীর দীর্ঘ বয়ে চলার দৃশ্যটি সুরের দীর্ঘ টানের মধ্যদিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। নদীর পাড় ভাঙার আওয়াজও উঠে এসেছে সুরের মাঝে। সুতরাং সমস্ত কিছু নির্মাণ হয়ে ওঠে পরিবেশ-প্রতিবেশ থেকে। আর এসব মিলিয়েই অনেক প্রকারের ভাওয়াইয়া নির্মাণ হয়েছে। এ প্রকারভেদ সবটাই প্রকাশভঙ্গিভিত্তিক। যেমন– চিতান, ক্ষীরল, দরিয়া ও দিঘলনাসা, গড়ান, মইষালী - এ সবই এই সংগীতের প্রকাশভঙ্গিগত রূপ। এসব রূপ প্রকৃতির মধ্য থেকে স্বতোৎসারিত। এ রূপের মধ্যেই ভাওয়াইয়া গানের রচয়িতারা গেঁথে তুলেছেন নানান বিষয়কে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..