সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা
একতা ডেস্ক :
[এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের ৩২ নং সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ মুদ্রিত হচ্ছে তার ৯ম কিস্তি।]
(৯)
পার্টি তার জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই জাতীয় রাজনীতির মূল স্রোতধারার সাথে সম্পৃক্ত থেকে সেখানে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের আশু ও দূরবর্তী লক্ষ্যকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করেছে। পার্টির কংগ্রেস ও সম্মেলনগুলোতে অনুমোদিত এসব রিপোর্ট ইত্যাদি পাঠ করলে সেসব থেকে দেশের ও বিশ্বের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ, এসব ঘটনাপ্রবাহে পার্টির ভূমিকা এবং তা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও গৃহীত শিক্ষা সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। পার্টির এসব দলিল সঠিক ইতিহাস পাঠের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
পার্টির জন্মের ২০ বছর পর ১৯৬৮ সালে তার প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। (এর আগে ১৯৪৮ সাল থেকে তা পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব বঙ্গের প্রাদেশিক কমিটি হিসাবে কর্মরত ছিল)। এই কংগ্রেসে ১৯৫৬ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের পরবর্তী সময়কালের ঘটনাবলীকে ভিত্তি করে কেন্দ্রীয় কমিটি এই রিপোর্ট প্রদান ও অনুমোদন করা হয়। তার কিছু অংশ উদ্ধৃত করে আজ এখানে মুদ্রিত হলো।
॥ এক ॥
[১৯৬৮ সালে পার্টির প্রথম কংগ্রেসে গৃহীত ঘোষণা ও কর্মসূচির (রণনীতি দলিলের) কিয়দাংশ]
নতুন রাষ্ট্ররূপে পাকিস্তানের জন্ম
১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তান কায়েম হয়।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণ ও নিপীড়ন হইতে স্বাধীনতা ও মুক্তি লাভের জন্য অবিভক্ত ভারতের জনগণ দীর্ঘ দিন যাবত গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম চালাইয়াছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলির পরাজয় ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়ের ফলে ভারত উপমহাদেশে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম বিশেষ ভাবে অনুপ্রাণিত হইয়াছিল। যুদ্ধোত্তর কালে জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সহিত শ্রমিক-কৃষকের শ্রেণীগত সংগ্রাম এবং দেশীয় সশস্ত্র বাহিনীর বিদ্রোহ একত্রে মিলিত হওয়ায় ভারত উপমহাদেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম দুর্বার গতিবেগ অর্জন করিয়াছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অন্তিম দশা উপস্থিত হইয়া উপনিবেশিক দাসত্ব হইতে সমগ্র জনগণের মুক্তি আসন্ন হইয়া উঠিয়াছিল।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা পূর্ব হইতেই তাহাদের চিরাচরিত “বিভাগ কর এবং শাসন কর” নীতি অনুসরণ করিয়া ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টির দ্বারা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে বানচাল করিতে চেষ্টা করিতেছিল। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বুর্জোয়া কংগ্রেস নেতৃত্ব তাহাদের শ্রেণীগত বিভিন্ন দুর্বলতার জন্য ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতি ও ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলিকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধভাবে সমবেত করিতে ব্যর্থ হইয়াছিল।
ভারতের শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতি ও ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করিবার জন্য সঠিক কর্মপন্থা গ্রহণ করিলেও ঐ নীতির সমর্থনে ব্যাপক জনগণকে সমবেত করিবার মত শক্তি তাহাদের ছিল না।
ভারতের মুসলিম সামন্তস্বামী ও উদীয়মান মুসলিম ধনিক-বণিকের প্রতিষ্ঠান মুসলিম লীগের নেতৃত্ব নিজেদের সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত ও শ্রেণীগত স্বার্থে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের সহিত সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করিয়াছিল। তাহারা হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভাগের দাবী উত্থাপন করিয়াছিল। তাহাদের এই দাবী অবিভক্ত ভারতের ব্যাপক মুসলমান জনগণের সমর্থনও লাভ করিয়াছিল।
এইভাবে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তরকালে একদিকে যেমন অবিভক্ত ভারতের জনতার স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের তীব্রতা বৃদ্ধি ভারতে ব্রিটিশ শাসন অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছিল অপরদিকে তেমনি দেশ বিভাগের দাবীও জোরের সংগে উত্থাপিত হইয়াছিল।
এই পটভূমিকায় ভারতীয় উপমহাদেশ ত্যাগ করিবার পূর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা এই উপমহাদেশকে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ভারত এই দুইটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রে বিভক্ত করে।
তাই, ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে আমরা স্বাধীনতা লাভ করিলাম বটে কিন্তু নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিদ্যমান রহিয়া গেল। ....
॥ দুই ॥
.... পাকিস্তান সৃষ্টি হইবার পর আমাদের পার্টির প্রথম সম্মেলন হইয়াছিল ১৯৪৮ সনে। দ্বিতীয় সম্মেলন হইয়াছিল ১৯৫১ সনে এবং তৃতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল ১৯৫৬ সনে। কাজেই, বর্তমান সম্মেলন হইল পার্টির চতুর্থ সম্মেলন।
এই সম্মেলন এক প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া ইহাকে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেস হিসাবে ঘোষণা করিয়াছে। কাজেই, এখন হইতে এই সম্মেলন প্রথম কংগ্রেস হিসাবেই গণ্য হইবে।
কিন্তু, একদিকে পার্টির উপর গণ-বিরোধী সরকারের একটানা তীব্র দমননীতি, ১৯৫৮ সনের অক্টোবরে সামরিক শাসন জারি, ১৯৬৫ সনের সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধ ও সারা দেশে জরুরী অবস্থা ও দেশরক্ষা আইন জারি, অন্যদিকে পার্টির গোপন সংগঠনের দুর্বলতা, ১৯৬৩-৬৪ সন হইতে পার্টির ভিতর ‘পিকিংপন্থী’ উপদলের সৃষ্টি ও তাহাদের কার্যকলাপ পার্টির ভিতর অরাজক অবস্থা প্রভৃতি বাস্তব অবস্থার জন্য আমাদের গোপন পার্টির পক্ষে সময় মত সম্মেলন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয় নাই।
যাহা হউক, আজ আমরা পার্টির চতুর্থ সম্মেলনে মিলিত হইয়াছি। ইতিমধ্যে বিভিন্ন জেলার সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হইয়াছে এবং সে সব সম্মেলনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ এখানে উপস্থিত হইয়াছেন। আমাদের কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় ও বিশিষ্ট কমরেড এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক ও একজন সদস্য কারাগারে আটক আছেন এবং এই সম্মেলনে তাহাদের উপস্থিতি ও অবদান হইতে আমরা বঞ্চিত হইতেছি।
আজ শ্রমিক শ্রেণী ও তাহাদের পার্টিসমূহের নেতৃত্বে পরিচালিত ১৪টি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র দুনিয়াতে সগৌরবে বিরাজ করিতেছে। গত বার বৎসরে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সমর্থন ও সাহায্যে সে জাগরণের তীব্রতা ও ব্যাপকতা আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে।
এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকাতে জনগণের জাতীয় মুক্তির বিপ্লবী আন্দোলনসমূহের বিজয়ের ফলে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদীদের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা আজ দ্রুত ভাঙিয়া পড়িতেছে।
যাহা হউক, বর্তমান দুনিয়াতে একদিকে শান্তি, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের শক্তিসমূহের বিরাট অগ্রগতি ও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের অন্তিম দশা এবং অন্যদিকে, নিজেদের শোষণের ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য জনগণের প্রধান দুশমন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদীদের উন্মত্ত প্রচেষ্টা—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়াই আজিকার আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী প্রবাহিত হইয়া চলিয়াছে। এই দ্বন্দ্বে শক্তির ভারসাম্য আজ রহিয়াছে শান্তি, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের শক্তিগুলির সপক্ষে। ইহাই হইল বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মূল কথা।
(চলবে)
প্রথম পাতা
মানবিক বিশ্ব গড়তে সংগ্রাম অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার
ক্ষেতমজুররা ভিক্ষা চায় না, তারা কাজ চায়, ন্যায্য মজুরি চায়
হাওরের সমস্যা বিচিত্র ধরনের আছে সমাধানের পথও
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ
‘হামে শিশুদের মৃত্যুর দায় ইউনূস ও তার সরকারের’
‘শিশু কোটা’
হাতে হাত ধরে জোর কদমে চলো এগিয়ে যাই-কমরেড
বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির গণবিরোধী প্রস্তাব বাতিল কর : সিপিবি
তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন