মুখরক্ষাও কি করতে পারবেন ট্রাম্প?

মীর মোশাররফ হোসেন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধে গিয়ে ঘরে-বাইরে এমন তুমুল চাপের মুখে শেষ কবে কোন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পড়েছিলেন, তা বলা মুশকিল। কিন্তু ট্রাম্পকে এখন এমন এক পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, যাতে তার টেনেটুনে পাস মার্ক তোলাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন, সেখানে দুই কক্ষই হারানোর মুখে রিপাবলিকানরা। সিনেটে যদি অবস্থা বেশি খারাপ হয়, তাহলে তো অভিশংসিতই হতে হবে মুখরা প্রেসিডেন্টকে। এদিকে যে যুদ্ধ নিজেরা শুরু করার পর নিজেদেরই যুদ্ধবিরতি চাইতে হয়, সেটা ‘পরাজয়’ ছাড়া যে আর কী হতে পারে, তা সমাজবিজ্ঞানীরা ভালো বলতে পারবেন। সমাজবিজ্ঞানীরা নাকি মনোবিজ্ঞানীরা? যাহোক। পশ্চিম ইউরোপও হাতছাড়া হওয়ার পথে, এদিকে পশ্চিম এশিয়ার সুন্নি মিত্ররাও ভেতরে ভেতরে গজরাচ্ছে–এত টাকা ঢাললো, এত তেল, এরপরও যুদ্ধে ইরানের হাতে এভাবে নাস্তানাবুদ হওয়ার পর সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান কার ভালো লাগে বলেন! ইসরায়েলের কথাও বাদ; তারা তো যুদ্ধের দুই সপ্তাহের মাথায় ইরানে নামকাওয়াস্তে দৈনিক হামলায় থেকে যুদ্ধের মুখ ঘুরিয়েছে লেবাননে। তেহরানের সঙ্গে না পারি তার ছোট ভাই বৈরুতকে তো আছাড় মারা যায়। সেটাই করে যাচ্ছে তারা। কতজন হিজবুল্লাহ সদস্য মরছে, তা জানা যাচ্ছে না, কিন্তু দেদারসে বেসামরিক মেরে যাচ্ছে তারা; এতক্ষণে সম্ভবত তিন হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেও গেছে। আর মহামহিম ট্রাম্প এবার ইরানের পেছনে লেগেছেন চুক্তির জন্য। সেই চুক্তি, যা নিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগেই আলোচনা চলছিল। ওহহো, একবার নয় দুইবার। দুইবারই চুক্তি নিয়ে আলোচনা করার নামে সৈন্য-অস্ত্র জড়ো করে আচমকা হামলা। বলিহারি নৈতিক অবস্থান গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীর। রাউন্ডের পর রাউন্ড আলোচনা হয়েছে। প্রকাশ্যে ট্রাম্প আর আমেরিকা বলছে, ইরান কোনোমতেই পারমাণবিক অস্ত্রধারী হতে পারবে না। ইরান নিজেও বলছে, তারা তেমন অস্ত্র চায়ওনা। এ নিয়ে তাদের আয়াতুল্লাহ-র আদেশও আছে। কিন্তু তারা বেসামরিক কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে চায়। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী তারা তা পারেও। বিদ্যুতের জন্য লাগে পরমাণু, আরও অনেক বেসামরিক কাজেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা যায়। তেহরান দশকের পর দশক বলে গেছে, তারা শান্তিপূর্ণ উপায়েই তাদের পরমাণু কর্মসূচি চালাতে চায়। আর সেই একই সময় ধরে ইসরায়েল, বিশেষ করে নেতানিয়াহু বারবার বলেছেন, ইরান আর দুই সপ্তাহের মধ্যেই পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে ফেলতে যাচ্ছে। সেই দুই সপ্তাহ কবে শেষ হবে কে জানে, হয়তো ঈদের পর। সিআইএ-র হুইসেলব্লোয়ার জন কিরিয়াকু সম্প্রতি বলেছেন, নেতানিয়াহু তার ক্ষমতাকালের মধ্যে যত মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসেছেন সবার কাছে ইরানে হামলার আবদার নিয়ে গিয়েছিলেন, কেউই সেই বোকামিতে পা দেয়নি, একমাত্র ট্রাম্প ছাড়া। কেন ট্রাম্প পা দিলেন? তা নিয়ে নানান আলাপ আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন, ইসরায়েল তাকে ফাঁদে ফেলেছে, কেউ বলছেন ট্রাম্প মাথামোটা, কারও কারও হিসাব দেখাচ্ছে- তেল আর ডলারের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা যে হারে কমছে তাতে তার উপায় ছিল না; কেউ বলছেন, ব্রিকসকে ডান্ডা মারার এ হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট পদক্ষেপ, আবার কেউ বলছেন, ইসরায়েলই চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধে নিয়ে আসতে যেন এক পর্যায়ে ওয়াশিংটন পশ্চিম এশিয়া তেল আবিবের হাতেই ছেড়ে যায়। সে যা-ই হোক, ট্রাম্প বড়শি গিলেছেন, এখন যে কোনো মূল্যে একটা চুক্তি করে সেই বড়শি মুখ থেকে বের করতে চাইছেন। ব্যাপারটা সহজ হচ্ছে না। বলে রাখা ভালো- এই যুদ্ধ এখানেই শেষ হওয়া মানে, তা যে ধরনের চুক্তিই হোক না কেন, ইরানকে পশ্চিম এশিয়ার পরাশক্তিতে পরিণত করবে। হয়তো আগেই তারা ছিল, একটু রাখঢাক ছিল, এখন আর সেটা হবে না। যুদ্ধ তাদের শীর্ষ অনেক নেতাকে কেড়ে নিলেও হরমুজ প্রণালিকে পুরোপুরি তাদের হাতেই তুলে দিয়েছে। এখন একটা বহুধাবিভক্ত ইরানও (আইআরজিসি, সামরিক বাহিনী তো বাদ হিজবুল্লাহর সমান শক্তিধর যে কোনো গোষ্ঠীও) হরমুজকে যে কোনো মুহূর্তে যখন তখন নিজের মতো ব্যবহার করতে পারবে। এটা তো উপজাত। ট্রাম্প আর ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর সময় কী কী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল? রেজিম চেঞ্জ। যেটুকু সম্ভাবনা ছিল, সেটাকে এ যুদ্ধ গলাটিপে হত্যা করেছে- এটাও সম্ভবত সবচেয়ে কম বলা হলো। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ প্রভাবে ইরান, লিবিয়া, ইরাক তো বটেই পশ্চিম এশিয়ার সুন্নি দেশগুলোতেও এমন শাসনব্যবস্থা কায়েম হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আরেকটা লক্ষ্য ছিল- ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সীমিত করা। হয়তো ড্রোনও। কিন্তু এ জায়গায় তেহরান একধরনের এমন বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে যে এ যুদ্ধের পর রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া তো বটেই, চুক্তির বলে নিষেধাজ্ঞা যদি উঠে যায় তাহলে বিশ্বের কোণায় কোণায় সব দেশ তাদের ড্রোনের সম্ভাব্য ক্রেতা হয়ে উঠবে। এত সস্তা ড্রোন আর কে দেবে? ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কমানো? যুক্তরাষ্ট্রের নিজের গোয়েন্দা প্রতিবেদনই বলছে, যুদ্ধ মাত্র এক-তৃতীয়াংশ লঞ্চার ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস বা অকেজো করতে পেরেছে। এক তৃতীয়াংশ এখন ‘ইনট্যাক্ট’ আছে, এক তৃতীয়াংশ হয়তো মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে, যা ইরান উদ্ধার করে ফের ব্যবহার করতে পারবে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের রিপোর্ট, মানে যা তারা জানে। তাদের অজানা তো থাকতেই পারে, নাহলে ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরান একাই ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র আর তার উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিল কীভাবে? তাদের গোপন সেই মিসাইল সিটিগুলোর কী অবস্থা? সেসব ভিডিও-কে কি যুক্তরাষ্ট্র আর তার মিত্ররা কেবল প্রোপাগান্ডাই মনে করছে? আর এখন এত বেশি করে যুদ্ধবিরতি চাইছেই বা কেন তারা? বেসামরিক যেন কম মরে, সেজন্য? হা হা হা, যুদ্ধ শুরুই করেছিল তারা মিনাবে মেয়েদের স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র মেরে প্রায় দুইশ বাচ্চা মেয়েকে মেরে। পুরো যুদ্ধে নিজেদের সাফল্য তাদের দেখাতে হয়েছে গুপ্তহত্যার মাধ্যমে। আর কী? অর্থনৈতিক কারণে তারা যুদ্ধ থেকে সরতে চাইছে? এটার খানিকটা ভিত্তি থাকতেও পারে। যুদ্ধে দিনে যেখানে তাদের খরচ হচ্ছে বিলিয়ন ডলার, ইরানের সেটা হয়তো লাখও ছাড়াচ্ছে না। তাতে কী, ইরানের সক্ষমতার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা তো যোজন যোজন দূরে, থাকুক না তাদের ৪০+ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ। কিন্তু কেবল অর্থের চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্র একটি চলমান যুদ্ধ থেকে সরে এসেছে, এটা বিশ্বাস করা মুশকিল। আসল সত্য হচ্ছে- এ যুদ্ধে তার জয়ের কোনো সম্ভাবনা- তা সে নৈতিক, ভূরাজনৈতিক বা কৌশলগত- আগেও ছিল না, এখনও নেই। আফগানিস্তানে ২০ বছর যুদ্ধ করে তারা কিছুই অর্জন করতে পারেনি। এক তালেবানকে সরিয়ে আবার সেই তালেবানের হাতেই দেশটি দিয়ে আসতে হয়েছে। ইরাকে, লিবিয়ায় কোথাও দেশগুলো ধ্বংস করে দেওয়া ছাড়া তাদের কোনো লাভই হয়নি। তেলের বাজার বা ভূকৌশলগত কিছু তাৎক্ষণিক ফায়দা হলেও মোটাদাগে এশিয়ায় ক্রমশ তাদের লোকসান বেড়েছে। প্রতিনিয়ত তাদের বৈরী শক্তিগুলো লাভবান হয়েছে। চীন, উত্তর কোরিয়া থেকে শুরু করে সবাই। যারাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদেরই অর্থনৈতিক-কৌশলগত জয়জয়কার দেখা যাচ্ছে। এতদিন যেসব ছোট শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তার তুলনায় ইরান ‘জায়ান্ট’। তার জাতীয়তাবাদ (এমনকি ধর্মীয় শাসনব্যবস্থায় থাকার পরও), তার সামরিক সক্ষমতা, তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান সব মিলিয়ে অবস্থান এমন ছিল, সেখানে যুদ্ধে যেতে বিশেষজ্ঞরা বারবার নিষেধ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। ট্রাম্প তা শোনেননি। তার খেসারত হয়তো তাকে সব হারিয়েই দিতে হবে। সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রকেও। লেখক ঃ সাংবাদিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..