সরকার কেন মালিকের হয়ে শ্রমিকস্বার্থ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়?
আবু তাহের খান
এ দেশের শিক্ষিত-সচেতন মানুষদের অনেকেই ইংরেজবিরোধী ‘স্বদেশী আন্দোলনে’র কথা জানেন। তাদের অনেকে এ নিয়ে কখনো কখনো কথাও বলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেসব কথা ও আলোচনায় এ তথ্য খুব কমই ওঠে আসে যে, উক্ত স্বদেশী আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে বেশি সংগঠিত। একইভাবে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদসহ ইংরেজবিরোধী অন্যান্য আন্দোলন-সংগ্রামেও এ দেশের শ্রমিকেরা সামনের সারিতে থেকে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। কিন্তু উপমহাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতির আলোচনায় তাদের সেসব অবদানের কথা খুব সামান্যই ওঠে এসেছে। আর সে কারণেই বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশের কাছে এ বিষয়টি বলতে গেলে একেবারেই অজানা।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ন্যায় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জনসভায় যে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটেছিল, তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ছিল শ্রমিক। পার্শ্ববর্তী তেজগাঁও, নারায়ণগঞ্জ, ডেমরা, ফতুল্লা, টঙ্গী, ঘোড়াশাল প্রভৃতি অঞ্চল থেকে দুপুরের আগেই জড়ো হওয়া ঐ শ্রমিকরা যে-কারখানাগুলো থেকে এসেছিলেন, সেসব কারখানার অধিকাংশেরই মালিক ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি। কিন্তু তারপরও সে মালিকেরা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উন্মত্ত হয়ে ওঠা ওই বাঙালি শ্রমিকদের সেদিন কারখানায় আটকে রাখতে পারেননি। মালিকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এসে তারা হাজির হয়েছিলেন তিল ধারণের জায়গাবিহীন ঐ জনসভায়। লেখার শুরুতে প্রসঙ্গটির অবতারণা এ কারণে যে, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও আন্দোলনে ঐ অকুতোভয় শ্রমিকদের ওই যে অসামান্য অংশগ্রহণ ও অবদান, তার বিপরীতে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ রাষ্ট্রে তাদের ভাগ্যে যা যা জুটেছে, তার সাথে অ্যালেক্স হ্যালির (১৯২১-১৯৯২) ‘দ্য রুটস’-এর কুন্তা কিন্তেদের জীবনেরই শুধু মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
গত সাড়ে পাঁচ দশকের এ বাংলাদেশ রাষ্ট্রে প্রায় সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের জীবনেরই কমবেশি উন্নতি ঘটলেও শ্রমিকের জীবনে সেটি একেবারেই ঘটেনি। বরং সময় পেরিয়ে রাষ্ট্রের বয়স যত বেড়েছে, তাঁদের জীবনে শোষণ, বঞ্চনা ও অবহেলার মাত্রাও ততোই আরো বেশি করে যুক্ত হয়েছে, যার সর্বশেষ সংযোজন গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) ২০২৬। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক মিনিটেরও কম সময়ের আলোচনার পর বিলটি পাস হয়, যেখানে মালিকরা যা যা চেয়েছেন তার প্রায় সবই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং শ্রমিকরা যা যা দাবি করেছিলেন তার সবই উপেক্ষিত থেকেছে। কারণ একটাই- বাংলাদেশের সব সময়ের সব সরকারই সরাসরি মালিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেছে। বস্তুত ঐ মালিকরাই এ দেশের সরকার পরিচালনা করেন এবং কালেভদ্রে অ-মালিক কেউ সরকারে ঢুকে পড়লে তিনিও তখন রাতারাতি মালিকই বনে যান। অতএব গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে শ্রমিকস্বার্থবিরোধী যে বিল পাস হলো, তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা, যে দেশে এই মালিকেরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হয়ে যান, সেদেশে রাষ্ট্রের শ্রম আইন মালিকেরা তাদের নিজস্বার্থের অনুগামী করে প্রণয়ন করবেন, সেটাই স্বাভাবিক।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কী কী রয়েছে এ নতুন শ্রম আইনে এবং এ নিয়ে কেন এত উদ্বেগ? প্রথমত কোনো শ্রমিক বা শ্রমিক প্রতিনিধির সাথে আলোচনা ছাড়াই পূর্বের অধ্যাদেশ থেকে জন্ম নেয়া এ আইনটি সংসদে উত্থাপিত হয়েছে, যা শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যকার ত্রিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতার সরাসরি বরখেলাপ। যুক্তি মানলে উল্লিখিত তিনপক্ষের সমন্বয়ে ইতোপূর্বে যে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি) গঠিত হয়েছিল, সেখানে বিলটি নিয়ে আলোচনা করেই অতঃপর এটি সংসদে যাওয়া উচিত ছিল। তদুপরি এটি যাওয়া উচিত ছিল শ্রম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও। কিন্তু সেসবের কিছুই এ ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি এ নিয়ে আলোচনা হয়নি সংসদেও। তার মানে, মালিক সমন্বয়ে গড়া জাতীয় সংসদে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে তারাই সর্বেসর্বা। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এতদসংক্রান্ত ১৪৪নং কনভেনশনে স্পষ্টতই বলা আছে যে, এ ধরনের প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়ে সরকারকে নিয়োগকর্তা ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে পরামর্শ করতে হবে। কিন্তু সরকার কি এটি করেছে? সরকার তো এ নিয়ে মালিক বা শ্রমিক কারো সাথেই পরামর্শ করেনি। অবশ্য মালিকের সাথে পরামর্শ না করলেও তাদের চলে এ কারণে যে, সরকার নিজেই মালিক-স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে। কিন্তু শ্রমিক-স্বার্থের বিষয়গুলো তাদের সাথে আলোচনা ছাড়াই চূড়ান্ত হলো কেমন করে? নাকি সরকার মনে করে যে, সরকারকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা ছাড়া শ্রমিকের আর কোনো কাজ বা এখতিয়ার নেই?
শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া, মালিকদের বিভিন্ন অভিমত ও সরকারের দ্যুতিয়ালিমূলক নানা বক্তব্য ইত্যাদি নিয়ে গত কয়েকবছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে আলোচনা চলে আসছিল এবং সেসব আলোচনার সূত্র ধরে বেশকিছু ক্ষেত্রে মোটামুটি ধরনের সমঝোতাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ করেই সে প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে এসে সরকার একা-একাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, যা শুধু গণতান্ত্রিক রীতিনীতিরই পরিপন্থি নয়- শ্রমিকস্বার্থেরও চরম লঙ্ঘন। নতুন শ্রম আইনে শ্রমিকদের এত ব্যাপক হারে বঞ্চিত করা হয়েছে যে, সংসদের বাইরে খোদ মালিকরা সিদ্ধান্ত নিলেও বোধকরি তাদের এতোটা ঠকানো হতো না। কারণ, মুনাফার লিপ্সা মালিকদের মধ্যে যত প্রচণ্ডভাবেই থাকুক না কেন, দিনশেষে শ্রমিকদের দিয়েইতো উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হয়। ফলে আত্মস্বার্থে হলেও শ্রমিকদের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি মালিকদের দেখাতেই হয়। কিন্তু মালিকদের প্রতি তোষামোদিতার মাত্রা বাড়াতে গিয়ে সরকারের ভেতরকার আমলাতন্ত্র ও সংশ্লিষ্ট অন্যরা সম্প্রতি এখানে যা যা ঘটিয়েছেন, তার সাথে শুধু ঔপনিবেশিক কালের নিয়ন্ত্রণ ও শোষণেরই মিল খুঁজে পাওয়া যায়। একটি নবনির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে এমন একটি সিদ্ধান্ত কিছুতেই কাম্য ছিল না। বিশেষত সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে এ ধরনের একটি শ্রমিকস্বার্থবিরোধী আইন সংসদে পাস হওয়ার বিষয়টি জনগণকে প্রচণ্ডভাবে আহত করেছে।
সদ্য পাস হওয়া এ আইনে অন্তর্ভুক্ত একাধিক আর্থিক বঞ্চনার মধ্য থেকে নমুনা হিসেবে ভবিষ্য তহবিলের (প্রভিডেন্ট ফান্ড) প্রসঙ্গটির কথাই উল্লেখ করা যাক। আগের অধ্যাদেশে বলা ছিল যে, কোনো কারখানায় ন্যূনতম ১০০ শ্রমিক থাকলেই মালিকপক্ষের জন্য সেখানে ভবিষ্য তহবিল গঠন করা বাধ্যতামূলক এবং উক্ত শ্রমিকদের মধ্যে যারা জাতীয় পেনশন স্কিম ‘প্রগতি’তে অংশগ্রহণ করতে চাইবেন, তাদের জন্য মালিকপক্ষকে তা বাধ্যতামূলকভাবে চালু করতে হবে। কিন্তু নতুন আইনে একটিকে শিথিল করে বলা হয়েছে, যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের দুই-তৃতীয়াংশ কর্মী জাতীয় পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আবেদন করেন, তাহলে ঐ প্রতিষ্ঠানকে আর ভবিষ্য তহবিল গঠন করতে হবে না। এ অবস্থায় ঐ আইন প্রণেতাদের বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করি, কোনো কারখানার দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিক যদি জাতীয় পেনশন স্কিমে যোগদান করতে চায় এবং অবশিষ্টরা তা না চায়, তাহলে কি ঐ অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশের ভবিষ্য তহবিল ব্যবস্থায় থাকার অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যায়? মোটেও না। বরং মালিকের স্বার্থ রক্ষার্থে নবপ্রণীত আইনে অন্তর্ভুক্ত এ ধারা স্পষ্টতই সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত ধারাসমূহের পরিপন্থি এবং যে কেউ আইনের আশ্রয় নিলে এটি একেবারেই টিকবে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন অসহায় দরিদ্র শ্রমিককে কি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিয়ে টিকে থাকতে হবে? এই তাহলে নাগরিকের প্রতি এ রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি? এবং বাস্তব কথা হচ্ছে, এরূপ মামলা লড়ার সামর্থ্য ঐ শ্রমিকদের একেবারেই নেই এবং তারা তা লড়বেনও না। তাহলে এর মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, এ রাষ্ট্র আসলে মালিকদের একচেটিয়া মুনাফা ও স্বার্থকেই সুরক্ষা দিতে চায়, ঐ দুঃখী শ্রমিকদের পথে বসিয়ে হলেও। এই সুবাদে, আমলাতন্ত্রের যে সদস্যরা আড়ালে থেকে শ্রমিকস্বার্থবিরোধী এই আইন প্রণয়নে আইনসভার সদস্যদের সহযোগিতা যুগিয়েছেন তাদের কাছে জিজ্ঞেস করি- শ্রম আইনের উল্লিখিত ধারার সাথে মিল রেখে আপনাদের পেনশন, গ্রাচ্যুইটি, ভবিষ্য তহবিল ইত্যাদির ক্ষেত্রে যদি অনুরূপ সুবিধা কর্তনের প্রসঙ্গ আসতো, তাহলে কি আপনারা তা খুশিমনে মেনে নিতেন? মোটেও না। এর মানে হচ্ছে, আপনারা উপরতলার কর্মচারী হওয়ার কারণে নিজেদের যেসব সুবিধা আপনারা কর্তিত হতে দিতে চাচ্ছেন না, বেসরকারি খাতের দরিদ্র শ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সেটাই আপনারা আইন করে তাদের ওপর প্রয়োগ করতে চাচ্ছেন। শোষণমূলক রাষ্ট্রকাঠামোর সাজানো নাটকের আওতায় কি অমানবিক প্রতারণা!
জাতীয় সংসদে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও বিরোধী দলও সেখানে নেহায়েত দুর্বল নয়। আর তাই মাঝে মাঝেই তাদের সেখানে নানা দলীয় ও জোটগত বিষয় নিয়ে সরব হতে দেখা যায়। কিন্তু তাদের চোখের সামনেই যে এরূপ একটি শ্রমিকস্বার্থবিরোধী আইন সংসদে পাস হয়ে গেল, কই সে বিষয়ে তারাতো একটি টু’ শব্দও করলেন না! তার মানে, মালিক-তোষণ ও পুঁজি-শোষণের নীতিতে দু’পক্ষেরই আসলে এক ও অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং সেক্ষেত্রে তারা প্রচণ্ডভাবে ঐক্যবদ্ধও। আর সে কারণেই ঐ অসহায় শ্রমিকদের শেষ পর্যন্ত হয়তো এটিই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে হবে যে, বাংলাদেশের শ্রম আইন দিনে দিনে আরো বেশি করে শ্রমিকস্বার্থের পরিপন্থি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আইএলও কনভেনশনের ১৪৪ ধারা কিংবা টিসিসির সমঝোতা সেখানে আলঙ্করিক রূপকাঠামো মাত্র। এবং অধিকতর হতাশার সঙ্গে এ আশঙ্কাই বার সামনে ওঠে আসছে যে, এসব বৈষম্যমূলক আইনকে আশ্রয় করেই নিকট ভবিষ্যতের বৈষম্য ও পীড়ন দুই-ই আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় অতিকষ্টের সঙ্গে জিজ্ঞেস করি, এরকম একটি বৈষম্যপীড়িত ও পীড়নপূর্ণ রাষ্ট্রকাঠামোতে নিজেদের এরূপ অসহায় ভঙ্গিতে সপে দেয়ার জন্যই কি এদেশের শ্রমিক সমাজ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও তৎপূর্ববর্তী মুক্তিসংগ্রামে নিজেদের শ্রম, ঘাম ও রক্ত অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিল? দেশের অগ্রসর চিন্তার রাজনীতিক, পেশাজীবী এবং অন্য শ্রেণিপেশার মানুষেরা কি বিষয়টি নিয়ে ভাববেন?
লেখক : আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষক
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন