ইতিহাসে কিংবদন্তী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা ফিচার : ভারতের প্রথম শহীদ নারী বিপ্লবী ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তিনি ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের (বর্তমানে বাংলাদেশে) পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামের এক মধ্যবিত্ত বৈদ্যব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ‘ওয়াদ্দেদার’ ছিল পরিবারের একজন পূর্বপুরুষ প্রদত্ত একটি উপাধি, তবে তাদের মূল উপাধি ছিল দাশগুপ্ত। প্রীতিলতার বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার একজন কেরানি এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী ছিলেন একজন গৃহিণী। তাদের ছয় সন্তান ছিল মধুসূদন, প্রীতিলতা, কনকলতা, শান্তিলতা, আশালতা এবং সন্তোষ। প্রীতিলতার ডাকনাম ছিল রানী। অগ্নিকন্যা প্রীতিলতার প্রাথমিক ছাত্রজীবন কাটে ঢাকায় এবং পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতায় শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পিতা জগবন্ধু তাদের সন্তানদের জন্য সর্বোত্তম শিক্ষালাভের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি প্রীতিলতাকে চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। প্রীতিলতা ছিলেন মেধাবী ছাত্রী। স্কুলজীবনে তাঁর প্রিয় শিক্ষিকা ঊষা দি রানি লক্ষ্মীবাইয়ের গল্পগুলির মাধ্যমে ছাত্রদের মধ্যে জাতীয়তাবাদকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছিলেন। প্রীতিলতা ১৯২৮ সাল অবধি স্বাধীনতা সংগ্রামী সেনানী ড. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে শিল্প ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশুনা করেন এবং ১৯২৯ সালে ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায়, তিনি ঢাকা বোর্ড থেকে ওই বছরের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি লীলা নাগের নেতৃত্বে সংগঠিত দল ‘শ্রী সংঘে’ যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য প্রীতিলতা কলকাতায় যান এবং সেখানকার বেথুন কলেজে ভর্তি হন। দুই বছর পর, তিনি কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁর ডিগ্রি আটকে রেখে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে, তাঁকে মরণোত্তর মেধার প্রশংসাপত্র প্রদান করা হয়। কলকাতায় শিক্ষাজীবন শেষ করে প্রীতিলতা চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। তার বাবা চাকুরি হারালে সংসারে দেখা দেয় টানাপোড়ন। তখন চট্টগ্রামে বসবাসকারী এক বিশিষ্ট দানশীল ব্যক্তি অপর্ণাচরণ দে নন্দনকাননে প্রতিষ্ঠিত নন্দনকানন উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় নামে একটি স্থানীয় ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে প্রীতিলতাকে চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি সেই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রীতিলতার এক নিকট-আত্মীয় পূর্ণেন্দু দস্তিদার ছিলেন বিপ্লবী দলের কর্মী। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত কিছু গোপন বই তিনি বোন প্রীতিলতার কাছে রেখে দেন। সেইসময় তিনি মাত্র দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে বইগুলি পড়তেন। “দেশের কথা”, “বাঘা যতীন”, “ক্ষুদিরাম”, “কানাইলাল”; বাজেয়াপ্ত করা এসব গ্রন্থ প্রীতিলতাকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করেছিল। প্রীতিলতা তাঁর দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে বিপ্লবী সংগঠনগুলিতে যোগদান করার নিবিড় ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত বিপ্লবী সংগঠনে কোনো নারী যোগদান করেনি। কিন্তু প্রীতিলতা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদানের অটল সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৩ জুন ১৯৩২ সালে, প্রীতিলতা তাদের ধলঘাট ক্যাম্পে সূর্য সেন এবং নির্মল সেনের সাথে দেখা করেন। কিন্তু সমসাময়িক একজন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী নারীদের তাদের দলে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি করেছিলেন। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত প্রীতিলতাকে দলে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কারণ বিপ্লবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে অস্ত্র পরিবহনকারী নারীরা এতটা সন্দেহভাজন হবে না। সূর্য সেন এবং তাঁর বিপ্লবী দল চট্টগ্রামের মহাপরিদর্শক ক্রেগকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই কাজের জন্য বিল্পবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাস এবং কালীপদ চক্রবর্তীকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৩০ সালে ২ ডিসেম্বর আক্রমণের তারিখ ঠিক করা হয়। কিন্তু তারা ভুল করে ক্রেগের পরিবর্তে চাঁদপুরের এসপি এবং তারিণী মুখার্জিকে হত্যা করে। রামকৃষ্ণ বিশ্বাস এবং কালীপদ চক্রবর্তীকে সেই রাতেই গ্রেফতার করা হয়। বিচারের পর রামকৃষ্ণ বিশ্বাসকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়ার এবং চক্রবর্তীকে সেলুলার জেলে নির্বাসনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ফাঁসির রায় ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত কলকাতার আলিপুর জেলে রাখা হয়েছিল ধৃত বিপ্লবীদের। সেসময় চট্টগ্রাম থেকে কলকাতার আলিপুর জেলে যাতায়াতের জন্য পরিবার ও বন্ধুদের প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব ছিল। প্রীতিলতা কলকাতায় থাকায় তাঁকে আলিপুর জেলে গিয়ে রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দেওয়া হয়, কারণ তখন বিপ্লবী হিসেবে ব্রিটিশদের সন্দেহ মেয়েদের ওপর ছিল না, বিশেষত যুবক বয়সীরা ছিল পুলিশের চোখে সবচেয়ে সন্দেহভাজন। প্রীতিলতা বোন হিসেবে পরিচয় দিয়ে রামকৃষ্ণের বিশ্বাসের সাথে প্রায় ৪০ বারের মত দেখা করেন। সূর্য সেনের বিপ্লবী দলের সাথে, প্রীতিলতা টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিসে আক্রমণ এবং রিজার্ভ পুলিশ লাইন দখলের মতো অনেক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। প্রীতিলতা জালালাবাদ যুদ্ধে বিপ্লবীদের বিস্ফোরক সরবরাহের দায়িত্ব নেন। ১৯৩২ সালে, সূর্য সেন পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিলেন যেখানে একটি সাইনবোর্ড ছিল যাতে লেখা ছিল ‘কুকুর এবং ভারতীয়দের অনুমতি নেই’। সূর্য সেন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার জন্য একজন নারী নেত্রী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। আক্রমণের সাত দিন আগে কল্পনা দত্তকে গ্রেফতার করা হয়। এই কারণে, প্রীতিলতাকে আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রীতিলতা অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য কোতোয়ালী সমুদ্রতীরে যান এবং সেখানে তাদের আক্রমণের পরিকল্পনা করেন সাথে নিজেকেও প্রস্তুত করেন। তারা ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরে ক্লাব আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রুপের সদস্যদের পটাসিয়াম সায়ানাইড দেওয়া হয়েছিল এবং ধরা পড়লে তা গিলে ফেলতে বলা হয়েছিল। হামলার দিন, প্রীতিলতা পাঞ্জাবি পুরুষের পোশাক পরে ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন। তাঁর সহযোগী কালীশঙ্কর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী ধুতি ও শার্ট পরেন। মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে এবং পান্না সেন লুঙ্গি ও শার্ট পরেছিলেন। রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে তারা ক্লাবে পৌঁছে আক্রমণ চালায়। তখন ক্লাবের ভেতরে প্রায় ৪০ জন লোক ছিল। আক্রমণের জন্য বিপ্লবীরা নিজেদের তিনটি পৃথক দলে বিভক্ত করেছিল; তারা গুলি শুরু করার আগেই ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ক্লাবে উপস্থিত কয়েকজন পুলিশ অফিসারের হাতে রিভলবার ছিল এবং তারা সাথে সাথে সেখানে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। সেখানে প্রীতিলতাও একটি বুলেটে আহত হন। পুলিশ রিপোর্ট অনুসারে, সেই হামলায়, সুলিভান নামের একজন নারী মারা যান এবং চারজন পুরুষ ও সাতজন নারী আহত হন। পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত প্রীতিলতা ঔপনিবেশিক পুলিশের হাতে আটকা পড়ে যান। গ্রেফতারি এড়াতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গিলে ফেলেন। ময়নাতদন্তের সময় দেখা যায় যে বুলেটের আঘাত খুব গুরুতর ছিল না কিন্তু সায়ানাইডের বিষক্রিয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ। মৃত্যুবরণের পূর্বে বীরকন্যা প্রীতিলতা মায়ের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যা তার সহযোগী বিপ্লবীদের মাধ্যমে সূর্য সেনের কাছে পৌঁছায়। বিপ্লবী সূর্য সেন প্রীতিলতার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের কাছে চিঠিখানি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে কিংবদন্তী বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার আজও বেঁচে আছেন কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে। মাত্র ২১ বছর বয়সে অগ্নিকন্যা প্রীতিলতার স্বাধীনতার জন্য অসীম ত্যাগ, দেশপ্রেম, আদর্শ মানুষ আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..