ধানতো গেছেই এখন দোকানের বাকি নিয়ে চিন্তায় আহাদুল্লাহরা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

নেত্রকোনা সংবাদদাতা : ডিঙ্গাপোতা হাওরে পাঁচ কাঠা জমিতে ধান চাষ করেছিলে মোহনগঞ্জ উপজেলার সুয়াইর ইউনিয়নের হাঁটনাইয়া গ্রামের আহাদুল্লাহ। বৃষ্টির পানিতে তাঁর সব ধান তলিয়ে গেছে। একমুঠো ধানও তিনি বাড়িতে আনতে পারেননি। ফলে সারাবছর চাল কিনে চালাতে হবে চারজনের সংসার। সেই চিন্তার সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে চায়ের দোকানের বাকি কীভাবে তুলবেন তিনি। আহাদুল্লার বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে চা আর পানের দোকান রয়েছে। খুবই সল্প পুঁজির এই দোকান থেকে গ্রামের লোকজন বাকিতে খেয়েছে প্রায় সাত হাজার টাকা। কথা ছিলো ধান বিক্রি করে এই টাকা পরিশোধ করবে গ্রামের লোকজন। এখন ধান তলিয়ে যাওয়ায় এই টাকা চাওয়ারও উপায় নেই আহাদুল্লাহর। আহাদুল্লাহ বলেন, ‘গ্রামে আমার মতো অনেক মাইনষ্যেই একমুইঠ ধান ঘরে তুলতে পারেনি। তাদের মধ্যে অনেকেই আমার দোকান থেকে চা-পান-বিস্কুট বাকি খাইছে। আমার যা অবস্থা তারারও হুমান (সমান) অবস্থা। এহন মাথাত বারি দিলে ট্যাহা দেব? না মাথাত বারি দেওন যাইবো?” এ অবস্থা শুধু আহাদুল্লাহ’র একার নয়। হাওর পারের গ্রামে গ্রামে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর। গত ৬ মে নেত্রকোনার বিভিন্ন হাওরের গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে চা-পান বিস্কুটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চিন্তিত মুখ করে বসে আছেন। একেতো হাওরের এই দুর্যোগের কারণে দোকানে কোনো ক্রেতা নেই। অন্যদিকে আপাতত বাকির টাকা পাওয়ারও কোনো আশা নেই। দুর্গম হাওর এলাকায় সচারচর কোনো বাজার নেই। সামান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে তাদের অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়। যে কারণে গ্রামের মধ্যেই অনেকে সল্প পুঁজিতে চা-পান বিস্কুটের দোকান দিয়ে থাকেন। এমনি আরেকটি চা-পানের দোকান মদন উপজেলার বাড়ুরি গ্রামের মেনু মিয়ার। তাঁর অবস্থা আরও করুণ। তার চাষবাসের কোনো জমি নেই। ধারদেনা করে চা-পানের এই দোকান দিয়েছেন তিনি। আশা ছিলো ধান উঠলে বাকির টাকা উঠে যাবে। কিন্তু হাওরের ধান তলিয়ে যাওয়ায় দুই চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি। মেনু মিয়া বলেন, ‘আওরের (হাওরে) পারের মানুষ আমরা। এমনিতে সারাবছর দোহানদারি করতে পারি না। বাইষ্যা (বর্ষাকাল) মাস আইলেই দোহানের যায়গায় হানি (পানি) উঠব। তখনে আর দোহান করন যাইতো না। বাকির টেহা এই মাসেই ধান বেইচ্চা কাস্টমারদের দেয়ার কথা। এহনতো বাকি চাওনেই যাইতো না। আর দোহান যহন থাকতো না ট্যাহা দিব ক্যাডা?’ ঘুরতে ঘুরতে কথা হয় খালিজুড়ি উপজেলার খলাপাড়া গ্রামের হাজেরার সাথে। পান-বিড়ির এই দোকানটি চালান তার স্বামী কুতুব আলী মিয়া। দোকানে বেচা-কেনা না থাকায় হাওরে কাঠা হিসাবে পানিতে ডুবে যাওয়া ধান কাটতে গেছেন তিনি। রোজ পাবেন ১৮০০ টাকা। তাই দোকানে বসে অলস সময় পার করছেন হাজেরা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আওর (হাওর) সাত কাডা (কাঠা) আধি ক্ষেত করছিলাম। ফাইন্নে (পানিতে) নিচেগা। এহন ছ্যাড়ার (ছেলে) বাপ গেছে রোজের কামলা দিতো। আমি দোহানডাত বইছি। যদি কয়েক ট্যাহা বেছন যায়। দোকানে বাকি আছে কিনা জানতে চাইলে-বিরক্তির স্বরে হাজেরা বলেন, ‘এহন মাইনষ্যের ঘরে খাওনেই নাই। আফনে আইছুইন বাহির ট্যাহা লইয়া। এরপর চুপ হয়ে যান তিনি। দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল নেমেছে। ক্ষণিকের মধ্যেই পশ্চিমের আকাশে জমেছে কালো মেঘ। হাওরের মানুষেরা তখন দ্বিগবিদ্বিক হয়ে ছুটছে খলায় শুকাতে দেওয়া ভেজা সামান্য ধানগুলো তুলে আনতে। বিচিত্র হাওর মুহূর্তেই রুদ্র রূপ ধারণ করেছে। বৃষ্টির সঙ্গে বইছে ঝড়ো হাওয়া। বাধ্য হয়েই আশ্রয় নিতে হয়েছে বল্লি গ্রামের একটি চায়ের দোকানে। অনেকেই সেখানে বসে চা পান করতে করতে গল্প-গুজব করছে। কথা হচ্ছে হাওরে তলিয়ে যাওয়া ধান নিয়ে। কার চেয়ে বেশি কার ক্ষতি হয়েছে তারই ফিরিস্তি গাইছে সবাই। এর মধ্যে চায়ের দোকানদার একটি মাত্র কথাই বলছে, ‘তোরাতো ব্যাডা ছিডাফোডা অইলেও ক্ষতিপূরণ পাইবে। আমার দোহানডা যে বন্ধ করতে অইব। তার ক্ষতিপূরণ দিব কেডা?’ এরপর আর তাকে প্রশ্ন করে বিরক্ত করার সাহস হয়নি। জানা হয়নি কী নাম সেই চা-পান বিক্রেতার!

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..