হাওরে চাষির হাহাকার থামবে কবে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বাংলাদেশে হাওরাঞ্চল কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং এটি পৃথিবীর প্রাকৃতিক স্বাদুপানির জলাভূমির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন প্রণালী কৃষিনির্ভর। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলাজুড়ে বিস্তৃত এ জলাভূমি দেশের প্রাণবৈচিত্র্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম স্তম্ভ। বিশাল অঞ্চলটি বর্ষায় এক অভ্যন্তরীণ সমুদ্রে রূপ নেয় এবং শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় দেশের অন্যতম প্রধান শস্যভাণ্ডারে। পাশাপাশি এটি দেশীয় মৎস্য সম্পদেরও এক প্রাকৃতিক আধার। বিশেষ করে বোরো ধান উৎপাদনে হাওরের অবদান জাতীয় অর্থনীতিতে এক অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করে। তবে এখানকার কৃষিব্যবস্থা পুরোপুরি প্রকৃতি-নির্ভর, যা কৃষকদের বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। হাওরের এই প্রতিবেশগত বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত সংবেদনশীল, যেখানে প্রতিটি জীবের জীবনচক্র একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে হাওরের এই চিরকালীন বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে উঁচু ও স্থায়ী রাস্তা, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, বিল ভরাটের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রাণ-প্রতিবেশের জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানির স্বাভাবিক স্রোত বাধা পাওয়ায় কৃষিজমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং জলজ আগাছা জন্মে জমিকে অনাবাদি করে ফেলে। এছাড়া বিচরণ ক্ষেত্র কমে গিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির মাছেরা হারিয়ে যাচ্ছে। কেবল মানবসৃষ্ট কারণেই নয়, বরং বৈশ্বিক প্রাকৃতিক পরিবর্তনও হাওরের সংকটকে ঘনীভূত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন ও পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা বদলে যাচ্ছে। প্রায় প্রতিবছরই অকাল বন্যা বা ‘হড়কা বান’ কৃষকদের সারা বছরের পরিশ্রমকে এক নিমিষেই ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা। এ কৃষকরা শ্রমিকের অভাব, উচ্চ মজুরি এবং ফসলের উপযুক্ত বাজার মূল্যের অভাবে প্রায়ই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। তার মধ্যে কষ্টের ফসল নষ্ট হলে বছরজুড়ে কৃষকের কষ্টের সীমা থাকে না। হাওরজুড়ে পাকা-আধপাকা ধান নষ্ট হওয়ায় কৃষকের এ হাহাকার কেবল একটি ফসলের ক্ষতি নয়, বরং একটি জনপদের মানবিক ও আর্থিক নিরাপত্তার সংকট। বিশেষজ্ঞরা হাওরের এই সংকটগুলোকে স্থানীয়, রাষ্ট্রীয় ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় এ তিনভাগে ভাগ করে চিহ্নিত করেছেন। স্থানীয় সংকটের মধ্যে আছে সীমানা-দ্বন্দ্ব, অন্যায় ইজারা, দখল-বাণিজ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচিতে ক্ষমতা ও স্বজনপ্রীতি। দ্বিতীয় সংকটটি রাষ্ট্রীয় নীতি, আইন ও ব্যবস্থাপনাগত। প্রতিবেশবিনাশী উন্নয়ন, করপোরেট বাজার ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ঘিরে রাষ্ট্রীয় আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব হাওরাঞ্চলকে বহুমুখী বিপদের খাদে দাঁড় করিয়েছে। হাওরের তৃতীয় সংকটটি আন্তঃরাষ্ট্রিক, উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যে বনভূমি বিনাশ, বহুজাতিক খনন, বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অভিন্ন নদীপ্রবাহের জুলুমের সঙ্গে সম্পর্কিত। অমীমাংসিত কাঠামোগত বৈষম্য, বৈশ্বিক নয়া উদারবাদ এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের ভেতর এই ত্রিমুখী সংকট প্রতিনিয়ত আরও আগ্রাসী ও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। হাওরের এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন। এখানকার উন্নয়নমূলক যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং যারা হাওরের প্রতিবেশ ও পানিপ্রবাহ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন, সেই বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় অভিজ্ঞ মানুষদের মতামতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাওরকে জয় করার মানসিকতা ত্যাগ করে প্রকৃতির সাথে মিতালি করে বাঁচার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হবে এর স্থায়ী সমাধানের মূল পথ। এ অঞ্চলের প্রকৃত উন্নয়ন হওয়া উচিত এর প্রাণ-প্রতিবেশ এবং কৃষকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..