লড়াকু নারী নেত্রী কমরেড ভানু দেবী
এস এ রশীদ
কমরেড ভানু চ্যাটার্জি খুলনা অঞ্চলের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নারী নেত্রী। শুধু নারী অধিকার আন্দোলন নয়, খুলনা অঞ্চলের মানুষের শান্তিতে-সংকটে, লড়াই-সংগ্রামে তিনি ছিলেন অদম্য সাহসী অসীম ত্যাগী একজন নেত্রী। তাইতো তিনি সূর্যের দেবী বা ভানু দেবী নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। জন্ম ১৯০৭ সালে খুলনা সদর থানার খানকার জমিদার পরিবারে। যে পরিবার তৎকালীন খুলনার শিল্প সংস্কৃতি ক্রীড়া রাজনীতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করতো। পিতা ছিলেন গৌরীনাথ চট্টোপাধ্যায়, বড় দাদা নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়, ছোট ভাই বলরাম চট্টোপাধ্যায়, কাকাতো ভাই প্রখ্যাত কমিউনিস্ট বিপ্লবী বিষ্ণু চ্যাটার্জি, পরিবারের অন্যান্য ভাই রমা প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
ভানু চ্যাটার্জির কাকা পঞ্চানন চট্টোপাধ্যায় বিপ্লবী দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। তারই প্রভাবে ছোটবেলা থেকে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের একে একে অনেকেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ভানু দেবী তাদের মধ্যে অন্যতম। পরিবারের অনেকেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও ফরোয়ার্ড ব্লক দলের নেতৃস্থানীয় জায়গায় ছিলেন। নেতাজী সুভাস চন্দ্র বোস পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ১৯২২ সালে নদীয়া জেলার এক রক্ষণশীল পরিবারে তার বিবাহ হয়। পরিবারের ধরাবাঁধা নিয়মে তাকে বেশিদিন আটকে রাখা যায়নি। চলে আসেন ভাইদের পরিবারে। ভাইয়েরা তখন যশোর খুলনা যুব সংঘ নামে সশস্ত্র পথে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের জোরেশোরে কাজ করছেন। নিজের শিশুকন্যা সাবিত্রীকে মেজোভাই কানাই লাল চট্টোপাধ্যায়ের কাছে লালন পালনের দায়িত্ব দিয়ে লড়াই-সংগ্রামের কাজে ঝাপিয়ে পড়েন।
নতুন করে শুরু করেন সংগ্রামী জীবন। পার্টি নেতৃবৃন্দকে গোপন কাজে সহযোগিতা, নেতৃবৃন্দকে আত্মগোপনে রাখা, আগ্নেয়াস্ত্র সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজ দিয়েই শুরু হয় তাঁর কর্মকাণ্ড। ১৯৩০ সালে লবণ আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয় তখন ভানু দেবী বিচিত্রা দেবী নাম ধারণ করে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। এই আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি অনেক নারী কর্মীকে সংগঠনে সম্পৃক্ত করেন। এই আন্দোলনে ভীষণ দমন-পীড়ন শুরু হলে পার্টির নির্দেশে আত্মগোপনে চলে যান। তখন পুরবীতে গিয়ে জুনিয়র পাশের জন্য নারীশিক্ষা মন্দিরে ভর্তি হন।
কিছুদিন বাদে ফিরে এলেন নিজ গ্রাম খানকায়। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাকে সাহস যোগালেন, গড়ে তুললেন মহিলা বান্ধব সমিতি। দরিদ্র নারীদের হাতের কাজ, চরকায় সুতা কাটা, তাঁত বোনা, নার্সিং শিখানো হতো সমিতিতে। সমিতির উদ্যোগে রুপসার দেবীপুর, নৈহাটি, সামান্ত সেনায় তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়। যুব সংঘের নেতৃবৃন্দ একে একে মার্কসবাদে দীক্ষিত হন। ১৯৩৮ সালে বিপ্লবী ননী গোপাল বসুর দীক্ষায় ভানু দেবী কমিউনিস্ট পার্টি সদস্যপদ লাভ করেন। শুরু হয় নতুন জীবন সারা দিন স্কুলে শিক্ষাকতা করা সন্ধ্যায় গ্রামে গ্রামে কৃষকদের সংগঠিত করা। তার অক্লান্ত পরিশ্রমে দাকোপের সুন্দরবন ঘেষা ঢাংমারী থেকে ফুলতলা, পাইকগাছার কাঠি পাড়া থেকে মোল্লা হাটের কালশিরা পর্যন্ত সংগঠন গড়ে তোলেন।
১৯৪৩ সালে (বাংলা ১৩৫০) এলো বীভৎস মন্বন্তর। মহিলা সমিতির কর্মীদের নিয়ে তখন তিনি শুরু করেন রিলিফ আন্দোলন। নঙ্গরখানা খুলে মাষুকে রান্না করা খাবার খাওয়ানোসহ নানাভাবে সহায়তা করা হয়।
১৯৪১ সালে বিশ্বযুদ্ধের সময় কোলকাতায় জাপান বোমা হামলা চালায়। সেই পটভূমিতে বাংলার মহিলাদের আত্মরক্ষার জন্য পার্টির পক্ষ থেকে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গঠন করা হয়। খুলনা শহরে চারুলতা ঘোষ, ভানু দেবী, অনু সেনের প্রচেষ্টায় মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের প্রাদেশিক কমিটির নেত্রী রেনু চক্রবর্তী বক্তব্য রাখেন। সম্মেলনে সরলা ঘোষ সভানেত্রী, চারুলতা ঘোষ ও অনু সেনকে সহ-সভানেত্রী, ভানু চ্যাটার্জিকে সাধারণ সম্পাদক ও রেবা ঘোষকে সহ-সম্পাদক করা হয়।
মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির কর্মকাণ্ডের ঢেউ খুলনা শহরের পাড়া-মহল্লা ছাড়িয়ে বিভিন্ন থানায় গিয়ে পড়ে। দ্রুত থানায় থানায় কমিটি গঠন করা। ভানু চ্যাটার্জির অক্লান্ত পরিশ্রমে পাঁচ বছরে তিনবার জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে প্রাদেশিক কমিটির নেত্রী মনি কুন্তলা সেন, জুঁইফুল রায় উপস্থিত ছিলেন। সমিতির উদ্যোগে গ্রামে গ্রামে মুষ্টি চাল, ধান সংগ্রহ করে দুস্থ মহিলাদের সাহায্য করা, শিশুদের দুধ কিনে দেওয়া, বয়স্কদের শিক্ষা প্রদান, প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনাসহ সমাজ সচেতনতামূলক কাজ পরিচালনা করা।
১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষণা করা হয়। গোপন পার্টি টিকিয়ে রাখতে তিনি দায়িত্ব নিয়ে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে গোপনে ছোটাছুটি করতে থাকেন। ১৯৪৮ সালের ৭ মে রুপসার মূলঘর রেলস্টেশন থেকে তিনি গ্রেপ্তার হন। কমরেড ভানু দেবীর ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন, ফলে তার স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে। এসময় তাকে বার বার রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম জেলা স্থানান্তরিত করা হয়। জেলখানায় মহীয়সী কমরেড ইলা মিত্রের সাথে একসঙ্গে অনেক দিন ছিলেন। ইলা মিত্রের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা তখন সংকটাপন্ন। কমরেড ভানু দেবী তাকে উৎসাহিত করেছিলেন আদালতে গিয়ে তার ওপর যে পাশবিক নির্যাতন হয়েছিল তার বিশদভাবে বর্ণনা দিতে।
কমরেড ভানু দেবীর স্বাস্থ্যের চরম অবনতি জন্য ১৯৫৩ সালে সরকার বিনা শর্তে মুক্তি দেয়। তাকে চিকিৎসার জন্য কোলকাতায় পাঠানো হয়। তখন তিনি কোলকাতার বিজয় গড়ে ভাইয়ের বাড়িতে ওঠেন। তারপর থেকে দীর্ঘ পয়ত্রিশ বছর এখানে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় কাটিয়েছেন। অসুস্থ হয়েও তার মতাদর্শ মনোবল ছিল অটুট। জমিদার পরিবারের জন্মগ্রহণ করা এবং জমিদার পরিবারের সুযোগ সুবিধা ত্যাগ করে মেহনতি মানুষের সাথে মিশে থাকা এই মহান কমিউনিস্ট নারী নেত্রী কমরেড ভানু দেবী (ভানু চ্যাটার্জি) ১৯৮৯ সালে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। বিপ্লবী কমরেড ভানু দেবী লাল সালাম।
লেখক : সিপিবি, প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন