সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা
একতা ডেস্ক :
এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের ৩২নং সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে আজ মুদ্রিত হচ্ছে তার ১৪তম কিস্তি।
(১৪)
গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জোয়ার:
ছাত্র আন্দোলনে গুরুতর বিভেদ : পার্টিতে বিভেদের আশংকা
ছাত্রদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম
কমরেডগণ, ১৯৬১ সনের শেষের দিকে গণ-আন্দোলন গড়িয়া তোলার যে পরিকল্পনা আমরা করিয়াছিলাম, ১৯৬২ সনের প্রারম্ভে তাহা বাস্তবায়িত হইয়াছিল। --- ১৯৬২ সনের ২১শে ফেব্রুয়ারীর শহীদ দিবস হইতে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হইবে বলিয়াও স্থির হইয়াছিল।
কিন্তু শহীদ দিবসের পূর্বেই ১৯৬২ সনের ৩০শে জানুয়ারী করাচীতে সোহরাওয়ার্দ্দী সাহেবের গ্রেপ্তার উপলক্ষ করিয়া সে আন্দোলন শুরু হইয়া গিয়াছিল। ---
বেগতিক দেখিয়া কর্তৃপক্ষ ৬ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করিয়া দিয়াছিল। ইহাতে ছাত্র বিক্ষোভ আরো তীব্ররূপ ধারণ করিয়াছিল। ---
ইতোমধ্যে সরকার সেনাবাহিনী তলব করিয়াছিল। কিন্তু ৭ই ফেব্রুয়ারীও শোভাযাত্রা হইয়াছিল এবং ঢাকার গরীব জনতা ইহাতে যোগদান করিয়াছিলেন। ঐদিন ১০/১২ হাজার ছাত্র-জনতার মিছিল সেনাবাহিনী ও ই.পি.আর এর কাঁদানে গ্যাস ও লাঠির আক্রমণ প্রতিহত করিয়া ঢাকার পথে পথে এক অসম সাহসিক সংগ্রামে লিপ্ত হইয়াছিলেন। ---
সাহসীকতা ও জঙ্গীপনা ছিল ঐ মিছিল ও গোটা সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য। মিছিলগুলির দিনে ঢাকার দোকান পাটও বন্ধ ছিল। ---
ঢাকা নগরীতে ছাত্রদের ঐ সংগ্রামের পর ছাত্র আন্দোলন সারা পূর্ববঙ্গের প্রায় সমস্ত শহরে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল এবং ৭ই ফেব্রুয়ারী হইতে রাজবন্দীদের মুক্তির দাবীর সঙ্গে সঙ্গে ‘সামরিক শাসন ও আইয়ুবশাহীর’ অবসান ‘গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র রচনা’ ‘পূর্ণ ব্যক্তিস্বাধীনতা’ ও ‘পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্তশাসন’ প্রভৃতি জাতীয় রাজনৈতিক দাবীগুলি ঐ আন্দোলনের মৌল আওয়াজ হইয়াছিল। ---
কিন্তু, সামরিক একনায়কত্বের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক দাবীসমূহের জন্য এরূপ একটা গৌরবময় সংগ্রামের সময়েও বিভিন্ন বিরোধী দলের যে সব নেতা জেলের বাইরে ছিলেন তাঁহারা দীর্ঘকাল চুপ করিয়াছিলেন। আড়াই মাস যাবত আন্দোলন চলার পর তাঁহারা আন্দোলনের সমর্থনে একটা বিবৃতি (১৪ই এপ্রিল) দিয়া তাঁহাদের কর্তব্য শেষ করিয়াছিলেন। ---
তথাপি --- সামরিক শাসনের পর পূর্ববঙ্গে গণআন্দোলনে যে স্তব্ধতা বিরাজ করিতেছিল, ঐ বিবৃতি তাহা ভাঙ্গিয়া দিয়া গণ-আন্দোলনের দ্বার খুলিয়া দিয়াছিল। পশ্চিম পাকিস্তানে এবং লন্ডনে অবস্থানরত পাকিস্তানী ছাত্রদের ভিতরেও ঐ আন্দোলন সাড়া জাগাইয়াছিল। ---
পরিশেষে, পার্টি গৌরববোধ করিতে পারে যে ছাত্রদের ঐ সংগ্রামের সমস্ত পর্যায়ে পার্টি উদ্যোগী ও অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিল।
এন, ডি, এফ ও পার্টির নীতি
ছাত্রদের সংগ্রাম চলাকালীন অবস্থাতেই প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬২ সনের ১লা মার্চ তারিখে তাঁহার অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসনতন্ত্র ঘোষণা করিয়াছিলেন।
ঐ শাসনতন্ত্র ঘোষণার কিছুদিন পরে ঐ শাসনতন্ত্র অনুযায়ী, ১৯৬৫ সনে ‘নির্বাচিত’ ‘মৌলিক গণতন্ত্রীদের’ ভোটে ক্ষমতাহীন জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন যথাক্রমে এপ্রিল ও মে মাসে অনুষ্ঠিত হইয়াছিল।
ছাত্র সংগ্রামের তদানীন্তন পটভূমিতে আমাদের পার্টি ঐ জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন বয়কট করিয়াছিল। --- একমাত্র আমাদের পার্টি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সহিত নির্বাচন বয়কটের নীতি অনুসরণ করিয়াছিল। --- নির্বাচন বয়কট সফল হয় নাই। পরবর্তীতে বুঝা গিয়াছিল যে সেই সময়ে নির্বাচন বয়কট করার নীতি গ্রহণ করা পার্টির পক্ষে সঠিক ছিল না। ---
এই পরিস্থিতিতে, --- বিভিন্ন বিরোধী দলের নয়জন নেতা (২৫শে জুন) একটি প্রকাশ্য বিবৃতি দ্বারা আইয়ুবী শাসনতন্ত্রের নাকচ ও একটি নূতন গণপরিষদ মারফত পার্লামেন্টারী শাসন, স্বায়ত্তশাসন, জনগণের মৌলিক অধিকারসমূহের স্বীকৃতি প্রভৃতির ভিত্তিতে একটি নূতন শাসনতন্ত্র রচনার দাবী উত্থাপন করিয়াছিলেন। ---
১৯৬২ সনের সেপ্টেম্বরে জেল হইতে মুক্ত হইয়া সোহরাওয়ার্দী ‘নয় নেতার ঐক্যজোটে’ পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন নেতাকে শামিল করিয়া উহাকে ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ (এন-ডি-এফ) নাম দিয়াছিলেন। ---
কিছুদিন পরেই কিছু সংখ্যক কমরেড দাবী করিতেছিলেন যে, --- আমাদের এন-ডি-এফ পরিত্যাগ করতঃ ন্যাপের পুনরুজ্জীবন ঘটাইয়া স্বাধীনভাবে কাজ করা উচিত।
অন্যদিকে, কোন কোন কমরেডের মত ছিল যে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যের স্বার্থে আমাদের স্বাধীন কর্মোদ্যোগ এখন স্থগিত রাখিয়া পুরাপুরিভাবে এন-ডি-এফ’এ কাজ করা দরকার। --- এই উভয় মতই ছিল ভুল। ---
শিক্ষা সংকোচনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের সফল সংগ্রাম
এন-ডি-এফ গঠনের সময়ে পূর্ববঙ্গের ছাত্র সমাজ আবার প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। ---
সামরিক সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল ‘শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট’ বাতিলের দাবিকে সামনে রাখিয়া জুলাই মাস হইতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র লীগ সম্মিলিতভাবে তা সংগঠিতভাবে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়। --- পূর্ব বঙ্গের --- ঢাকা নগরী হইতে সুদূর গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়া তা ছাত্র সমাজের এক ঐক্যবদ্ধ ব্যাপকতম গণসংগ্রামের রূপ ধারণ করিয়াছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের কোন কোন শহরেও এই আন্দোলণ জাগিয়া উঠিয়াছিল।
১৯৬২ সনের ফেব্রুয়ারীর ছাত্র আন্দোলনের দাবীগুলি ছিল মূলতঃ রাজনৈতিক। কাজেই, সে আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করিয়াছিল সাধারণতঃ ছাত্র সমাজের অপেক্ষাকৃত অগ্রসর অংশ।
পক্ষান্তরে, সেপ্টেম্বরের আন্দোলন ছিল ছাত্রদের নিজস্ব শিক্ষাগত দাবী দাওয়ার ভিত্তিতে। তাই, এই আন্দোলনে সাধারণ ছাত্ররাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে আগাইয়া আসিয়াছিলেন, ছাত্রীদের ব্যাপক অংশও ইহাতে অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং অভিভাবকরাও ইহার প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন ছিলেন। ফলে, এই আন্দোলন ফেব্রুয়ারী আন্দোলন হইতে অনেক ব্যাপক হইয়াছিল।
এই আন্দোলনের নেতৃত্ব তাহাদের দাবীর সমর্থনে ১৭ই সেপ্টেম্বর ছাত্র ধর্মঘটসহ সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করিয়াছিলেন। --- চট্টগ্রামের শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এবং ঢাকার কোন কোন শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকগণের একটি অংশ এই ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। --- আন্দোলন আরো জঙ্গীরূপ ধারণ করিতে ছিল। --- সরকার শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের কতগুলো অংশ বাতিল ও অন্যান্য অংশ স্থগিত --- ঘোষণা করিয়াছিল। --- আইউব শাহীকে পরাজয় স্বীকার করিতে হইয়াছিল।
ছাত্রদের এই গৌরবময় সংগ্রামের সর্বস্তরে আমাদের পার্টি সক্রিয় ও উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিল। ---
সেই সময়ে টঙ্গীর সূতাকল শ্রমিকগণ নিজেদের দাবী দাওয়ার জন্য ধর্মঘট করিয়াছিলেন। ধর্মঘটি শ্রমিকদের এক মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালাইয়াছিল এবং সুন্দর আলী নামে একজন শ্রমিক নিহত হইয়াছিলেন। ---
পার্টির ভিতর অন্তর্বিরোধের সূচনা
অন্যদিকে, ১৯৬২ সনের শেষের দিকের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনা, যথা (ক) চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ এবং (খ) সমাজতান্ত্রিক কিউবার উপর সশস্ত্র হামলা চালাইবার জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র পূর্ববঙ্গের তথা সারা পাকিস্তানের রাজনীতিতে এবং আমাদের পার্টির ভিতরে কতকগুলি বিশেষ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করিয়াছিল।
চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের সময়ে পাকিস্তান সরকার --- ভারতে অস্ত্র সাহায্যের জন্য মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ক্ষোভ জানাইতেছিল। সরকারের ইঙ্গিতে সরকার সমর্থক সংবাদপত্রগুলিও ঐ উপলক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রচার করিতেছিল।
চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের সময়ে পাকিস্তান সরকারের ভূমিকা দেখিয়া চীনের নেতারা পাকিস্তান সরকারের দিকে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করিয়াছিলেন এবং সরকারও উহা গ্রহণ করিয়াছিল। তাই, এই সময় হইতে পাক-চীন বন্ধুত্বের সূত্রপাত হইয়াছিল এবং চীনের নেতারা পাকিস্তানের স্বৈরাচারী সরকারের প্রতি একটা সমর্থনমূলক নীতি গ্রহণ করিতে শুরু করিয়াছিলেন।
এই সব ঘটনাবলীর ফলে তখন পাক-মার্কিন ‘বন্ধুত্বে’ একটা ফাটল পরিস্ফুট হইয়াছিল এবং আমাদের পার্টি সভ্যদের একটি অংশের মধ্যে স্বৈরাচারী সরকারের প্রতি সমর্থনের একটা মনোভাব দেখা যাইতেছিল। প্রসঙ্গতঃ, চীন-ভারত সংঘর্ষ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রস্তাব, যাহাতে ঐ সংঘর্ষের জন্য ভারত সরকারকে দায়ী করিয়া চীনের কতকগুলি ভুলেরও সমালোচনা করা হইয়াছিল, তাহা নিয়াও পার্টিতে দ্বিমত দেখা যাইতেছিল।
দ্বিতীয়তঃ, কিউবা সংকটের সময়ে একদিকে কিউবার সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অন্যদিকে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা তথা একটা বিশ্বযুদ্ধ এড়াইবার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন যে নীতি ও কার্যপন্থা গ্রহণ করেছিল --- ইহার প্রভাবে আমাদের পার্টির কিছু সভ্য সোভিয়েত বিরোধী হইয়া উঠিয়া কিউবা সংকট সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টির নীতি ও কর্মপন্থা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রস্তাবের বিরোধিতা করিতেছিলেন।
তাই, তখন ঐ আন্তর্জাতিক প্রশ্নে পার্টির ভিতর একটা মতবিরোধ সৃষ্টি হইয়াছিল।
পার্টির ভিতর ঐ অন্তর্দ্বন্দ্বের মূল উৎস ছিল বিশ্ব-কমিউনিস্ট আন্দোলনে মতভেদ। --- ১৯৫৭ সনে ১২টি সমাজতান্ত্রিক দেশের সম্মেলনে গৃহীত ‘মস্কো ইস্তাহার’ এবং ১৯৬০ সনে দুনিয়ার ৮১টি কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টির (আমাদের পার্টিও ইহার ভিতর ছিল) মহা-সম্মেলনে গৃহীত ‘মস্কো ঘোষণা’ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে মতভেদ দূর হয় নাই, বরং দিন দিন সুতীব্ররূপ ধারণ করিয়াছিল, ---
পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি প্রথম দিকে ঐ আন্তর্জাতিক বিতর্কে কোন মত প্রকাশ হইতে বিরত ছিল। ১৯৬০ সনের ‘মস্কো ঘোষণা’ গৃহীত হওয়ার পর উহা সমর্থন ও কেন্দ্রীয় কমিটি ঐ দলিল কিভাবে বুঝিয়াছে তাহা ব্যাখ্যা করিয়া একটি প্রস্তাব (২৪/১০/৬১) গ্রহণ করতঃ তাহা পার্টির ভিতর প্রচার করিয়াছিল। ইতিপূর্বে আন্তর্জাতিক বিতর্ক সম্পর্কে সোভিয়েত ও চীন পার্টির কতকগুলি দলিল এবং ‘মস্কো ইস্তাহার’ ও ‘মস্কো ঘোষণা’ পার্টির ভিতর প্রচারিত হইয়াছিল। ‘মস্কো ঘোষণা’ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রস্তাব সমস্ত পার্টি গ্রহণ করিয়াছিল।
কিন্তু, ১৯৬২ সনের শেষের দিকে --- পার্টি সভ্যদের এক অংশ ‘মস্কো ঘোষণা’ ও সে সম্পর্কে সোভিয়েত পার্টির ব্যাখ্যা সমর্থন করিতেছিলেন, আবার কিছু সংখ্যক পার্টি সভ্য নিজেদের ‘পিকিং লাইনের অনুসারী’ বলিয়া ঘোষণা করিতেছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিতর্কের বিষয়গুলি সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির পরিষ্কার ও বিশদ অভিমত সমস্ত পার্টিকে জানাইয়া পার্টির ভিতরকার ঐ বিতর্ক সুষ্ঠু পথে পরিচালনা করার --- উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় কমিটি “বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে মতভেদ সম্পর্কে আমাদের অভিমত” নামে একটি দলিল (৫ই মার্চ, ১৯৬৩) গ্রহণ করিয়া আলোচনার জন্য উহা পার্টির ভিতর প্রচার করিয়াছিল। ---
পার্টির বহু সভ্য কেন্দ্রীয় কমিটির ঐ ‘অভিমত’ সমর্থন করিয়াছিলেন। কিন্তু, ‘পিকিংপন্থী’ পার্টি সভ্যগণ উহা গ্রহণ করেন নাই। ইহাতে দোষের কিছু ছিল না, --- কিন্তু, ইহার বদলে তাঁহারা নিজেদের মত এলোপাথাড়িভাবে এবং সংবাদপত্র মারফত প্রচার করিয়া পার্টির ভিতর বিভেদ সৃষ্টি করিয়া দিতেছিলেন।
পরে, ১৯৬৬ সনের শেষের দিকে পার্টির ‘পিকিংপন্থী’ সভ্যরা পার্টি পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন।
পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় কমিটি চীনের ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের’ সমালোচনা করিয়া একটি প্রস্তাব (ডিসেম্বর, ১৯৬৬) গ্রহণ করিয়াছিল ও উহা পার্টির ভিতর প্রচারিত হইয়াছিল। ---
তাই, একদিকে সামরিক শাসন জারির তিন বৎসর পর আবার গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নূতন জাগরণ এবং অন্যদিকে পার্টির ভিতর এক মারাত্মক অন্তর্দ্বন্দ্বের সূচনা-পার্টির সম্মুখে এই উভয়বিধ পরিস্থিতি নিয়া ১৯৬২ সন শেষ হইয়াছিল।
শ্রমিকশ্রেণীর ভিতর জাগরণ
১৯৬৩ সনের প্রারম্ভ হইতে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল নিম্নরূপ :
শ্রমিক ও মেহনতী জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ ছিল। গ্রামে গ্রামে ‘বুনিয়াদি গণতন্ত্রীদের’ জুলুম ও দুর্নীতি, খাজনা-ট্যাক্স বৃদ্ধি, জোতদারদের শোষণ প্রভৃতি কৃষক সমাজের ভিতর অসন্তোষ সৃষ্টি করিতেছিল। দমননীতি, গণতন্ত্রের অভাব, স্বায়ত্ত্বশাসনের অভাব প্রভৃতি রাজনৈতিক জুলুমও পূর্ব বাংলার সমগ্র জনগণকে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট করিয়া তুলিয়াছিল। ১৯৬২ সনে ছাত্রদের দুই দুইটি প্রত্যক্ষ সংগ্রাম পূর্ববঙ্গের জনগণকে অনুপ্রাণিতও করিয়া তুলিয়াছিল ---
কিন্তু, এন-ডি-এফ-এর বুর্জোয়া ও পেটি বুর্জোয়া নেতৃত্ব, তাঁহাদের কাপুরুষোচিত মনোভাব ও আপোষপন্থী রাজনীতির জন্য সভা প্রভৃতি অনুষ্ঠান মারফত আইয়ুব খানের উপর চাপ দিয়া আপোষে কয়েকটি দাবী আদায় করার পথ নিয়াছিলেন। --- উল্লেখযোগ্য যে, ন্যাপ সভাপতি মওলানা ভাসানী ১৯৬২ সনের শেষভাগে মুক্তি পাইয়াছিলেন। কিন্তু তিনি এনডিএফ এ যোগ দেন নাই এবং বিশেষ সক্রিয়ও ছিলেন না। ---
১৯৬৩ সনের এপ্রিল মাস হইতে রেল (রেল শ্রমিকগণ ধর্মঘটের নোটিশ দিয়াছিলেন), টঙ্গীর সূতাকল, চট্টগ্রামে চটকল ও পোর্ট, কর্ণফুলী কাগজ কল, সিলেটের চা বাগান ইত্যাদির শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধি প্রভৃতি দাবীতে আন্দোলন ও ধর্মঘট একের পর এক ঘটিয়া গিয়াছিল। ---
গণবিরোধী সরকারের যে মানবিকতাবোধও ছিল না তাহাও এই সময়ের আরও একটি ঘটনায় জনসমক্ষে প্রতিভাত হইয়াছিল। ১৯৬৩ সনের অক্টোবর মাসে এক প্রবল ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে চট্টগ্রামে, নোয়াখালী ও বরিশাল জেলার উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে হাজার হাজার লোক মারা গিয়াছিল এবং লক্ষ লক্ষ লোক সর্বস্ব হারাইয়াছিল। জনগণের এই সমূহ বিপর্যয়ে সরকার রিলিফের উপযুক্ত ব্যবস্থা তো করেই নাই, বরং রাজনৈতিক দল ও গণ-প্রতিষ্ঠানগুলির পক্ষ হইতে বে-সরকারী রিলিফ কাজে নানাভাবে বাধা দিয়াছিল।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা
এই পরিস্থিতিতে, গণ-মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীলদের চিরাচরিত পন্থা অনুসরণ করত: ভারত-বিরোধী জিগীর তুলিয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্ররোচনা দানের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল। আসাম হইতে উচ্ছেদকৃত মোহাজেরদের পূর্ববঙ্গে আগমন কেন্দ্র করিয়া শাসকচক্র ১৯৬৩ সনের শেষভাগ হইতে ঐ প্রচেষ্টা করিতেছিল এবং কাশ্মীরের হজরতবাল মসজিদ হইতে পবিত্র স্মৃতি চিহ্ন অপহরণকে উপলক্ষ করিয়া ১৯৬৪ সনের ১লা জানুয়ারী প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের বেতার ভাষণে ঐ প্ররোচনা দান চরমে পৌঁছিয়াছিল।
ঐ বেতার ভাষণের ৩ দিন পরেই সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ও বৃহৎ পুঁজিপতিদের সক্রিয় সাহায্যে খুলনায় দাঙ্গা শুরু হইয়াছিল। ---
১৯৬৪ সনের জানুয়ারী মাসের দাঙ্গার সময়ে একটি বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল যে, পূর্ববঙ্গের গণতান্ত্রিক মহল, বিশেষ করিয়া মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রগণ ঐ দাঙ্গার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে রুখিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। পার্টির উদ্যোগে ঢাকার একদল ছাত্র-ছাত্রী দাঙ্গা প্রতিরোধে অগ্রসর হইয়াছিলেন। বিভিন্ন দলের নেতাদের সমন্বয়ে ঢাকায় একটি ‘দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি’ গঠিত হইয়াছিল এবং ঐ কমিটি ‘পূর্ববঙ্গ রুখিয়া দাঁড়াও’ শীর্ষক এক আবেদনে জনগণকে দাঙ্গা প্রতিরোধের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাইয়াছিলেন। ---
বলা বাহুল্য যে পার্টি কর্মীরা সর্বত্র দাঙ্গা বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় ও উদ্যোগী অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন। ---
জাতিগত বিদ্বেষ
ঐ দাঙ্গার সময়ে এখানে জনগণের ভিতর আর একটি ভুল চিন্তাধারারও বিশেষ প্রকাশ ঘটিয়াছিল। জনগণের ভিতর বিভেদ সৃষ্টির জন্য শাসকচক্র ও বৃহৎ পুঁজিপতিরা শুধু সাম্প্রদায়িক উস্কানিই নয়, দীর্ঘদিন যাবত বাঙালী-অবাঙালী এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান বিদ্বেষও উস্কাইতেছিল।
(চলবে)
প্রথম পাতা
বিশ্বকাপে ফিফাকে ভক্তদের দুয়ো
প্রাথমিকে পরীক্ষার ফি বাতিল এবং সঙ্গীত-চারু-কারুকলার শিক্ষক নিয়োগের দাবি
বাজেটের শ্রেণি চরিত্র
ফুসফুসের জটিলতা নিয়ে চিকিৎসাধীন কমরেড সেলিম
‘আষাঢ়ের গর্জনে নবযাত্রার ডাক বৈষম্য বিনাশে মানুষ জেগে থাক’
হাম ও উপসর্গে প্রাণহানি থামছে না
বাজেটে বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কল-কারখানা চালু করার বরাদ্দ দিতে হবে
‘মিরাকল প্রতিমন্ত্রী’
মানুষের মুক্তির জন্য বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আনতে হবে
‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে’ স্লোগানে বর্ষা উৎসব
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন