জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭

নতুন সরকারের নতুনত্ব কোথায়?

আহমেদ মিঠু

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি চরম মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দেশ শাসন করা পতিত আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় সব রকম সূচক ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখালেও তাদের শাসনামলের শেষ দিকে অর্থনীতির দৈন্যদশা স্পষ্ট হয়ে উঠে। মেগা প্রকল্পের নামে লাগামহীন দুর্নীতি, ব্যাংক ও শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা লুট এবং সেই টাকা বিদেশে পাচার অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলে। এতে একদিকে ব্যয় মেটাতে সরকারের ঋণ করার প্রবণতা বেড়ে যায়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থনীতির সেই নিম্নমুখী অবস্থায় গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শুরুতে অনেকেই আশা করেছিলেন, এই সরকার দায়িত্ব নিয়ে অরাজক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দেশে সুশাসনের ধারা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবে। দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধ করে অর্থনীতিতে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে। কিন্তু মানুষের সেই আশার গুড়ে বালি দিয়ে ড. ইউনূসের সরকার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো উদ্যোগই নেয়নি। দেড় বছরের শাসনামলে বার বার সংস্কারের কথা বলা হলেও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন, রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল খাতের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কার্যকর কোনো পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ দেখা যায়নি। উল্টো দেশীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের চাপে রেখে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। দেশি-বিদেশি নানামুখী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র পাশ কাটিয়ে এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরমধ্য দিয়ে একদিকে অনির্বাচিত সরকারের দেড় বছরের শাসনের অবসান ঘটে, অন্যদিকে দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। নির্বাচনে শরিকদের তিনটিসহ ২১২টি আসন জিতে বিএনপি সরকার গঠন করে। প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান। নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল, তারা মব সন্ত্রাস বন্ধ করে দেশের মানুষের মনে স্বস্তি ফেরাবে এবং অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্কট দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। নতুন বাজেট ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকার আর্থ-সামাজিক এসব টানাপোড়েন থেকে মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখাবে- এমনটাই আশা করেছিলেন অনেকে। তবে গত ১১ জুন নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট ঘোষণা করেছেন তা মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ আমলে অর্থনীতিতে ব্যাপক লুটপাটের জের এবং ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা ও অমনোযোগিতার কারণে এমনিতেই বাজেট ঘাটতি বিশাল আকার ধারণ করেছে। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তারপরও আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল ব্যয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভূক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায়’ শিরোনামের এই বাজেটে রেকর্ড ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকারের ঋণ নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। আর এই ঋণের বড় অংশ আসবে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে। এতে ঋণের জন্য বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকার ঋণ করে বাজেট ব্যয় সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় মুদ্রাস্ফীতি আরো বাড়বে। বাজার থেকে টাকা তুলে নেওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও প্রকৃত আয় কমবে। এর ফলে বাজারে চরম সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে। ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় পণ্য বিক্রি ও সঞ্চয় কমে যাবে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ছে না। বিপরীতে বাড়ছে ব্যয়ের বোঝা। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আগুনে উত্তাপ বাড়ছে মধ্যবিত্তের সংসারে। ফ্যামিলি কার্ডসহ সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নিম্নবিত্ত কিছু পরিবার সহযোগিতা পেলেও মধ্যবিত্তের ভাগ্যে তা জোটে না। আবার লোকলজ্জার ভয়ে তারা কারো কাছে হাত পাততেও পারে না। ফলে বাজেটের প্রভাবে মূলস্ফীতি বেড়ে গেলে এই শ্রেণির মানুষের জীবনে আরো নাভিশ্বাস উঠবে। আর্থিক খাতে গত কয়েক বছর ধরেই অস্থিরতা বিরাজ করে। আওয়ামী লীগ আমলে তো বটেই, ইউনূস সরকারও হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপের লুটের টাকা উদ্ধার করতে পারেনি। ঋণখেলাপিদের নানা সুবিধা দেয়া হলেও ঋণের টাকা ফেরত আসছে না। উল্টো অনেকগুলো ব্যাংক নাজুক অবস্থায় রয়েছে। আর্থিক খাতের আরেক অঙ্গ পুঁজিবাজারে ধারাবাহিকভাবে মন্দা বিরাজ করছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নতুন বাজেটে নেই। বাজেটে কৌশলগতভাবে খাদ্য, কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফকে খুশি করতে আগের সরকারগুলোর এই নীতি অব্যাহত রাখা হলে সরকারের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি কিছুটা কমলেও সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির সঙ্কট বাড়বে বৈ কমবে না। গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনই বাড়বে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ব্যয়। এসব কিছুর সামগ্রিক ফলও গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য, যাতায়াত খরচসহ জীবন-যাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। ফলে অর্থনৈতিক মন্দার চরম পরিণতি ভোগ করবে সাধারণ মানুষ। নতুনের বারতা দিয়ে ক্ষমতায় এলে তারেক রহমান সরকারের প্রথম বাজেটে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই। বিশাল ঘাটতির এসব বাজেটে দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে কিছু পদক্ষেপ থাকলেও তারচেয়ে বেশি দেখা গেছে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সরকারি চাকরিজীবী এবং সমাজের সুবিধাভোগী নানা অংশকে খুশি করার প্রচেষ্টা। আওয়ামী লীগ এবং ইউনূস সরকারের মতোই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য মুক্তবাজার, বিরাষ্ট্রীয়করণ, ব্যক্তিখাত নির্ভরতা এবং কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা শক্তিশালী করে অর্থনীতিতে ধনিক শ্রেণির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘকাল ধরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই নীতি চলে আসায় দেশে আয় ও সম্পদ বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। যতো সম্পদ তৈরি হচ্ছে তার প্রায় পুরোটাই চলে যাচ্ছে উপরের দিকের ৫ শতাংশ ধনীর কাছে। বৈষম্য পরিস্থিতি নির্ধারণ করতে যে সূচকটি ব্যবহার করা হয় তার নাম জিনি অনুপাত। এই সূচক ০.৫০ অতিক্রম করলে বৈষম্য পরিস্থিতি মারাত্মক বলে ধরে নেয়া হয়। বাংলাদেশে ২০১৬ সালে এই অনুপাত ছিল ০.৪৮২। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ০.৪৯৯। মারাত্মক বিষয় হলো, শহরাঞ্চলে বৈষম্যের এই হার ইতোমধ্যেই ০.৫৩৯-এ দাঁড়িয়েছে। ধনী-দরিদ্রের এই বৈষম্য কমাতে না পারলে দেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি প্রকট রূপ ধারণ করবে। আয়বৈষম্য ও ভোগবৈষম্য দূর করতে এবারো বাজেটে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বৈষম্য কমাতে সরকারের হাতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার কর ব্যবস্থাপনা। যার সম্পদ ও আয় বেশি, সে বেশি কর দেবে- এটাই হলো ন্যায়বিচার। ধনীদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর আদায় করে সরকার এমনভাবে তা বিনিয়োগ করবে- যেন সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কর ব্যবস্থাপনায় ধনী-গরিবের কোনো ব্যবধান নেই। ধনীদের বেশি না ঘাটিয়ে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভর করে সরকার। এবারো বাজেটে মোট কর রাজস্বের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ আসবে পরোক্ষ কর থেকে। আর প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর থেকে আসবে ৩৬ শতাংশ ৪ শতাংশ। অবশ্য ধনীদের পাশাপাশি এবার মধ্যবিত্তের জন্যও আয়করে ছাড় দিয়েছে সরকার। আগে কারো বার্ষিক আয় সাড়ে তিন লাখ টাকা হলেই কর দিতে হতো। আগামী অর্থবছরে সেই সীমা পৌণে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। এতে তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের ওপর প্রত্যক্ষ করের চাপ সামান্য কমবে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণার আগে প্রায় সব মানুষের একমাত্র প্রশ্ন ছিল– দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অর্থমন্ত্রী কী পদক্ষেপ নেবেন? কিন্ত মূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর অথচ কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নেননি তিনি। শুধু আগের বছরগুলো গৃহীত গতানুগতিক এবং অকার্যকর পদক্ষেপগুলোই বহাল রাখা হয়েছে। এরমধ্যে আছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্য আমদানিতে শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার। সরকারি উদ্যোগে চাল আমদানি, সুনির্দিষ্ট টার্গেট গ্রুপকে খাদ্য পৌঁছে দেয়ার জন্য বাজার বহির্ভূত চ্যানেল সৃষ্টি এবং দরিদ্রজনদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট প্রকল্প বাজেটে গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের ফলে দরিদ্র মানুষের একাংশ কিছুদিনের জন্য খাদ্যের নিশ্চয়তা পেলেও সামগ্রিকভাবে দ্রব্যমূল্য কমাতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে কি না–সন্দেহ। একটি সুপরিকল্পিত সামগ্রিক খাদ্য-গণবণ্টন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন করা ছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়- এতো দিনে তা প্রমাণিত হয়েছে। বাজেটে অর্থায়ন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংস্কারমূলক কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত এগুলো বাস্তবায়িত হবে কি না–সে বিষয়ে সংশয় রয়ে গেছে। কারণ, গত দেড় বছর ধরে মুখে সংস্কারের কথা বলা হলেও বাস্তবে আমলাতান্ত্রিক সরকার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বদলে একটি গণমুখী ও কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কোনো চেষ্টাই করা হয়নি। ফলে বিদ্যমান ব্যবস্থা আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে বহাল থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজেটে জনগণের জন্য ইতিবাচক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রকাঠামো ও প্রশাসনে যে ধরনের দক্ষতা ও কর্মস্পৃহা জরুরি–বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্রে তা পুরোপুরি অনুপস্থিত। ফলে এবারের বাজেটের বাস্তবায়ন পরিস্থিতিও আগের মতো একই বৃত্তে ঘুরপাক খাবে। তাছাড়া বাজেটে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে দাতারা কতোটুকু সাড়া দেবে–তার ওপর এ বাজেটের অর্থায়নের দিকটি অনেকাংশে নির্ভরশীল। সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও, তাদের দেওয়া বাজেটে তেমন কোনো নতুনত্ব নেই। মুক্তবাজার ব্যবস্থার ধারক কোনো সরকারের কাছ থেকে সেটা আশাও করা যায় না। লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..