লেনিনবাদের দার্শনিক পটভূমি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ডা. মনোজ দাশ : লেনিনবাদের উদ্ভব ও বিকাশের প্রশ্নটির একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রেক্ষাপট আছে। রাশিয়ার তীব্র সামাজিক-রাজনৈতিক-দার্শনিক সংকট ও দ্বন্দ্বের মধ্যে মার্কসবাদ বিরোধী বিভিন্ন দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে লেনিনবাদের দার্শনিক দিকগুলির বিকাশ ঘটেছে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে রাশিয়াতে নারোদবাদ বিশেষ প্রাধান্য বিস্তার করে। নারোদবাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-দার্শনিক চিন্তার বিরুদ্ধে মতাদর্শিক সংগ্রামে প্রথম কলম ধরেছিলেন প্লেখানভ। এ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৮৯০ সালের পরে রাশিয়াতে প্লেখানভের প্রচেষ্টায় মার্কসবাদের যাত্রা শুরু হয়। ১৮৯৩-৯৪ সালে রাশিয়াতে মার্কসবাদ অনেক বিস্তৃতি লাভ করে। এ সময়ে লেনিন ছিলেন কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। প্লেখানভের প্রতিষ্ঠিত শ্রমিকশ্রেণির মুক্তি সংস্থার সংস্পর্শে আসেন লেনিন। সেন্ট পিটার্সবুর্গে এই সংগঠনের হয়ে প্রচারকাজে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিতে শুরু করেন। নারোদবাদ ও উদারনৈতিক মার্কসবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শিক সংগ্রামের দায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ লেনিনের ওপর। ১৮৯৪ সালে লেনিন রচনা করেন “জনগণের বন্ধুরা আসলে কী”। এ রচনায় লেনিন ব্যাখ্যা করে দেখান কৃষককেন্দ্রিক নরোদবাদ রাশিয়াতে বিপ্লবের পথ চিহ্নিত করতে পারেনি, কেবলমাত্র শ্রমিকশ্রেণিই শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী বন্ধনের মাধ্যমে রাশিয়াতে জারতন্ত্র উচ্ছেদ করে প্রকৃত বিপ্লব সম্পন্ন করতে পারে। তার জন্য প্রয়োজন মার্কসবাদী আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক পার্টি গঠন। উদারনৈতিক মার্কসবাদের বিরুদ্ধেও লেনিন সংগ্রামের সূত্রপাত করেন। উদারনৈতিক মার্কসবাদের মধ্যে তখন নেতৃত্বের পর্যায়ে ছিলেন পি.স্ত্রুভে। জার্মানিতে নয়া কান্টবাদের প্রবক্তা লাঙ্গের চিন্তা অনুসরণ করে রাশিয়ার উদারনৈতিক মার্কসবাদীরা এটা ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেন যে, মার্কসীয় ইতিহাস ব্যাখ্যা হল এক ধরনের যান্ত্রিক বস্তুবাদী বিশ্লেষণ, যা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উপাদানের মাধ্যমে ইতিহাস ব্যাখ্যার চেষ্টা করে। এদের বক্তব্য ছিল, শেষ বিচারে ব্যক্তি হল স্বাধীন ও তাঁর স্বাধীন চেতনাকে কোনো তথাকথিত নিয়মের মধ্যে বাঁধা সম্ভবপর নয়। ব্যক্তিচেতনা অনেকাংশেই স্বয়ম্ভু। চৈতন্যের বিকাশ অনেকাংশই বাস্তব জগতের প্রথামত নিয়ন্ত্রিত হয় না। ১৮৯৫ সালে এসব উদারনৈতিক মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধে মতাদর্শিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে লেনিন রচনা করেন ‘নারোদবাদের অর্থনৈতিক মর্মবস্তু’ নামক রচনা। এই রচনার মধ্য দিয়ে লেনিন দেখান নারোদবাদী নেতৃত্বের একাংশ, নারোদবাদের অন্তঃসারশূন্যতাকে উপলব্ধি করে তার বিকল্প হিসেবে মার্কসবাদ ও উদারনীতিবাদের সমন্বয়ে এক নতুন রাজনৈতিক মতাদর্শের সন্ধান করছেন। লেনিন এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণ করেন, মার্কসবাদ ও উদারনীতিবাদ পরস্পরবিরোধী ও উভয়ের সমন্বয়ের মানে রাশিয়াতে পুঁজিবাদকে সুরক্ষিত করা। ১৯০৫ সালের ব্যর্থ রুশ বিপ্লবের পরে যখন জারতন্ত্র প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিপ্লবের শক্তিকে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর, অষ্ট্রিয়ার নয়াকান্টীয় পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক ই.মাখ্ এবং আর. আভেনারিয়ুসের প্রভাবে রাশিয়াতে দর্শনের জগতে বগদানভের নেতৃত্বে একটি নতুন ধারার সৃষ্টি হয়, যেটি প্রত্যক্ষ-বিচারবাদ নামে পরিচিত। এই দর্শনের আক্রমণের মূল বিষয়বস্তু ছিল মার্কসবাদ। এ দর্শনের উদ্দেশ্যে ছিল বিপ্লববিরোধী শক্তিগুলিকে মদত দেয়া। প্রত্যক্ষ-বিচারবাদের বিরোধিতা করতেই ১৯০৯ সালে লেনিন রচনা করেন তাঁর ‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ-বিচারবাদ’ নামে বিখ্যাত গ্রন্থ। ই.মাখ্ এবং আর. আভেনারিয়ুস তাদের অনুসরণ করে বগদানভদের প্রথম বক্তব্য ছিল, ‘জ্ঞানের উৎস বস্তুজগতের বাস্তব উপস্থিতি নয়। তার উৎস হল ব্যক্তির সংবেদন। সংবেদন সার্বভৌম।’ বগদানভদের দ্বিতীয় বক্তব্য ছিল, ‘বস্তুজগৎ সম্পর্কে ব্যক্তির জ্ঞান যেহেতু সংবেদননির্ভর, সেহেতু জ্ঞান কখনই বিষয়গত হতে পারে না।’ বগদানভদের এসব বক্তব্য বস্তুবাদ বিরোধী। কারণ সংবেদন আছে, কিন্তু তা নিছক সংবেদন; তাকে কোনো কিছুর সংবেদন বলা যাবে না, কোনো বাহ্যবস্তুর সংবেদন বলা যাবে না, সে সংবেদন থেকে কোনো বহিঃস্থ বস্তুরই নির্দেশ পাওয়া যাবে না, এ জাতীয় কথা বস্তুবাদী দৃষ্টিতে নেহাতই অসংসগতিপূর্ণ। এজন্য লেনিন ‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ-বিচারবাদ’-এ বললেন- ‘অভিজ্ঞতা বা সংবেদনই সমস্ত জ্ঞানের উৎস। কথাটা ঠিকই। কিন্তু প্রশ্ন হল, অভিজ্ঞতা বা সংবেদনের মধ্যে কি বহিঃস্থ সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়, অর্থাৎ বহিঃস্থ সত্তাই কি সংবেদনের উৎস? উত্তরে আপনি যদি বলেন ‘হ্যাঁ’, তাহলে আপনি হলেন বস্তুবাদী। উত্তরে যদি আপনি বলেন ‘না’, তাহলে আপনি অসংলগ্নতার দোষ্টে দুষ্ট হবেন এবং শেষ পর্যন্ত উপনীত হবেন আধ্যাত্মবাদে (ভাববাদে)।’ প্রত্যক্ষ-বিচারবাদী দর্শন মোকাবিলায় মার্কসীয় দর্শনে লেনিন যোগ করলেন প্রতিফলন তত্ত্ব। ‘সংবেদনের নিজস্ব কোনো সার্বভৌম সত্তা নেই, তার উৎস বস্তুজগৎ এবং আমাদের চেতনায় সংবেদনের মাধ্যমে বস্তুজগতের যথাযথ প্রতিফলন হয়’- লেনিনের এই বক্তব্য সধারণভাবে ‘প্রতিফলন তত্ত্ব’ নামে খ্যাত। প্রত্যক্ষ-বিচারবাদীদের মতে, চেতনার সক্রিয়তাকে একেবারে চরম অর্থে বা সম্পূর্ণ বিনা শর্তে বুঝতে হবে। তাদের কাছে চেতনা যেন কোনো এক সর্বশক্তিমান স্রষ্টা, পুরো দুনিয়ার অস্তিত্বই বুঝি তার ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে লেনিন বস্তুবাদী ডায়ালেকটিকস ব্যাখ্যা করে দেখালেন বিষয়টি মোটেই তা নয়। চেতনার সক্রিয়তা বস্তু জগতের জ্ঞানসাপেক্ষ। বস্তুজগতের নির্ভুল জ্ঞান দিতে পারে বলেই চেতনা সক্রিয়ভাবে বহির্জগৎ পরিবর্তনে সমর্থ হয়। যত নির্ভুলভাবে আমাদের চেতনার বহির্জগৎ প্রতিবিম্বিত হয়, ততোই সার্থকভাবে আমাদের চেতনা বহির্জগৎ পরিবর্তনের সামর্থ অর্জন করে। প্রত্যক্ষ-বিচারবাদীরা দেখাতে চেয়েছিলেন- জ্ঞান আপেক্ষিক ও সংবেদন নির্ভর বলে বস্তুজগৎ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানলাভ করার প্রশ্নটি অবান্তর এবং বস্তুজগৎকে পরিবর্তন করার প্রশ্নটিও তার ফলে অপ্রাসঙ্গিক। ১৯০৫ সালের রুশ বিপ্লবের পরে শাসক শ্রেণির সামনে যে সংকট দেখা দেয়, প্রত্যক্ষ-বিচারবাদীদের বক্তব্য বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে অপরিবর্তনীয় রাখতে শাসকশ্রেণির মতাদর্শগত অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। লেনিন প্রতিবিম্ব তত্ত্বের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ-বিচারবাদীদের বক্তব্য খণ্ডনের মাধ্যমে প্রমাণ করেন- ‘বস্তু জগতের বিষয়গত অস্তিত্ব মানুষের চেতনা নিরপেক্ষ। বস্তুজগৎ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানলাভ করা সম্ভব। জ্ঞানের উৎস যেমন কোনও বিমূর্ত সংবেদনপুঞ্জ নয় ও বস্তুজগৎই যেমন জ্ঞানের উৎস, তেমনি প্রকৃত ও সঠিক জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়ায় মানবচৈতন্যের ভূমিকাও অত্যন্ত সক্রিয়, যার ফলে বস্তুজগৎ সম্পর্কে ধারণা ও তার পরিবর্তন সাধন করা যায়।’ লেনিনের এই তত্ত্বের তাৎপর্য ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও সুগভীর। লেনিন প্রতিবিম্ব তত্ত্বের সাহায্যে দেখাতে সমর্থ হন যে, ব্যক্তির সমাজচেতনা সমাজজীবন থেকে উৎসারিত হয় ও এই চেতনা সমাজজীবনের সঠিক প্রতিবিম্বেরই ফলশ্রুতি। সমাজজীবন সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানলাভের ফলে সমাজ পরিবর্তন সম্পর্কেও ব্যক্তি সচেতন হয় ও সেখান থেকে সৃষ্টি হয় বিপ্লব। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই লেনিন শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী প্রক্রিয়ার স্বতঃস্ফূর্ততার বিপরীতে পার্টির সক্রিয় সচেতন ভূমিকার গুরুত্বকে প্রথম থেকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্বে ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ক্রিয়াক্ষেত্র আবিষ্কারের পর প্রত্যক্ষ-বিচারবাদীরা মার্কসবাদের ওপর আরেকবার আক্রমণ করেছিলেন। পরমাণু (ধঃড়স) আবিষ্কৃত হবার পরে পদার্থবিদ্যার জগতে এই ধারণা জন্মেছিল যে, এটিই হল পদার্থের চূড়ান্ত ও শেষ রূপ। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্বে ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক ক্রিয়াক্ষেত্র আবিষ্কারের ফলে পদার্থবিদ্যার এই ধারণা প্রচন্ড আঘাত পায়। দেখা গেল যে, পরমাণুই পদার্থের শেষ কথা নয়। বরং পদার্থের মানে এমন এক জগৎ, যেখানে পজিটিভ নিউক্লিয়াসকে নেগেটিভ ইলেকট্রন কণা আবর্তন করছে। ফলে এল. উলভিন প্রমুখ পদার্থবিদরা বলে বসলেন যে, পদার্থ বলে তবে আর কিছুই রইল না এবং পদার্থেরও অবলুপ্তি ঘটেছে। প্রত্যক্ষ-বিচারবাদীরা তাতে উৎসাহিত হয়ে বললেন যে, বস্তুর যেহেতু বিলুপ্তি ঘটেছে, সেহেতু মার্কসীয় দর্শনে বস্তুজগতের যে প্রাধান্য দেয়া হয়, তাও অচল হয়ে পড়েছে। এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ খণ্ডন করে লেনিন তাঁর ‘বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ-বিচারবাদ’ গ্রন্থে দেখালেন যে, ইলেকট্রনের আবিষ্কার পদার্থবিদ্যার জগতে সংকট সৃষ্টি না করে বরং এটাই প্রমাণ করেছে যে বস্তুজগৎ চলমান, গতিশীল ও এই বস্তুজগৎ সম্পর্কে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়া অনন্তকাল ধরে চলবে। লেনিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইলেকট্রনের আবিষ্কারের ফলে বস্তুর মৃত্যু ঘোষিত হল না, বস্তুজগতের সীমানা সম্পর্কে পূর্বের জ্ঞানের বিস্তৃতি ঘটল মাত্র। তার অর্থ, মার্কসীয় জ্ঞানতত্ত্বের ভিত্তিই এর ফলে শক্তিশালী হল, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের মূল কথাটিই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হল যে, বস্তুর অস্তিত্ব চেতনা-নিরপেক্ষ এবং বস্তুজগৎ চলমান, অনন্ত ও অফুরন্ত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দিনগুলোতে সুইজারল্যান্ডে স্বেচ্ছানির্বাসনের সময়ে লেনিন সমকালীন রুশ দর্শন গভীরভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে আসন্ন রুশ বিপ্লবে দ্বন্দ্বতত্ত্বের গুরুত্বকে তুলে ধরেন। এ সময়ে রচিত লেনিনের নোটগুলি পরবর্তীকালে Philosophical Notebooks নামে প্রকাশিত হয়। লেনিনের এই খসড়া রচনাগুলিতে ১৬ টি পয়েন্টের ভিত্তিতে দ্বন্দ্বতত্ত্বের বিশ্লেষণ সংক্রান্ত মোট তিন ধরনের বিষয়ের উল্লেখ আছে। প্রথমত লেনিন এসব রচনায় দ্বন্দ্বতত্ত্বের বিশ্লেষণ করেন। দ্বিতীয়ত লেনিন এসব রচনায় দ্বন্দ্বতত্ত্ব মার্কসীয় যুক্তিতত্ত্ব ও জ্ঞানতত্ত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ঐক্য বিষয়ক আলোচনা করেন। তৃতীয়ত লেনিন সমাজ পরিবর্তনের প্রশ্নে দ্বন্দ্বতত্ত্বের দার্শনিক তাৎপর্যের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। Philosophical Notebooks -এর রচনাগুলির মাধ্যমে মার্কসীয় জ্ঞানতত্ত্বে নতুন মাত্রা যোগ করেন লেনিন। জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণে দর্শনের দুটি প্রধান ধারাকে নাকোচ করেছেন লেনিন। দেকার্ত, লাইবনিৎজ্ (Leibnity) প্রমুখেরা জ্ঞানকে সংবেদন-নিরপেক্ষ একটি কল্পনাশ্রয়ী বিষয় মনে করেন। তাঁদের বক্তব্যকে লেনিন বর্জন করেছেন। আবার একই সাথে সাবেকি বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের (empiricism) প্রবক্তারূপে লক, কাঁদিলাক্, ফয়েরবাখ প্রমুখেরা সংবেদনকেই জ্ঞানের একমাত্র উৎস মনে করে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাকেও লেনিন গ্রহণ করেননি। লেনিন দেখিয়েছেন, জ্ঞান প্রক্রিয়া দুটি স্তরে বিভক্ত। প্রথম পর্যায়ে সংবেদনের মাধ্যমে বস্তুজগৎ সম্পর্কে ব্যক্তি সচেতন হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অভিধা চয়নের মাধ্যমে ব্যক্তি বস্তুজগৎ সম্পর্কে তাত্ত্বিক ধারণায় উপনীত হয়। এই সমগ্র প্রক্রিয়াটি হল ব্যক্তির চেতনার জগতে বস্তুজগতের সক্রিয় প্রতিফলনের পরিণতি। লেনিনবাদের বিকাশের ক্ষেত্রে তাঁর দার্শনিক রচনাগুলির অবদান ও তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। লেনিনের দার্শনিক রচনাবলি কোনো অর্থেই রাজনীতি-নিরপেক্ষ ছিল না। লেনিনের কাছে দর্শন বিপ্লব-নিরপেক্ষ কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। দর্শনের জগতের সংগ্রামে লেনিনের প্রতিপক্ষ শক্তিগুলো পুরোনো ব্যবস্থাকেই খানিকটা নতুন আকৃতি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। অন্যদিকে লেনিন তাঁর রাজনৈতিক রচনাগুলির মধ্যে যেমন ক্ষয়িষ্ণু এক সমাজব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধনের পদ্ধতিগত দিকগুলি বিশ্লেষণ করেছেন, তেমনি তাঁর দার্শনিক রচনাগুলির মাধ্যমেও লেনিন মার্কসবাদবিরোধী নারদনিক, প্রত্যক্ষ-বিচারবাদীসহ অন্যদের যথার্থভাবে মোকাবিলা করেছেন। সে কারণেই লেনিনবাদের বিকাশের বৈপ্লবিক তাৎপর্যকে উপলব্ধি করার জন্য লেনিনের রাজনৈতিক ও দার্শনিক উভয় সংগ্রামের যোগসূত্রটি অনুধাবন করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। লেখক : সভাপতি, খুলনা জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..