মেহনতি মানুষের গীতিকার সত্যেন সেন
গোলাম মোহাম্মদ ইদু: সত্যেন সেন, মেহনতি মানুষের সুহৃদ। তাঁর চিন্তা চেতনায় তা বিরাজ করতে শুরু করে তাঁর জ্ঞান হবার পর থেকেই। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসন-শোষণে ভারতবর্ষের মানুষ যখন চরমভাবে নির্যাতিত, নিজের দেশে পরবাসী জীবন কাটাচ্ছিলো, তখন দেশে শাসক শোষকদের বিরুদ্ধে তারা ব্যাপক সংখ্যায় সংগঠিত হচ্ছিলো। গোপন দল অনুশীলন এবং অন্যান্য সংগঠনে সংগঠিত হচ্ছিলো তারা। তাদেরই একজন ছিলেন সত্যেন সেন।
১৯৩০ সালে বিপ্লবীদের কাছে লেখা একটি চিরকুটে সত্যেন সেনের নাম পাওয়ার পর পুলিশ সেই তথাকথিত অপরাধে তাঁকে জেলে ভরে। যুবক সত্যেন সেনের সেটি ছিলো জীবনের প্রথম জেলে যাওয়া। জেলে গিয়ে জাঁদরেল সব বন্দি নেতাদের সাথে সত্যেন সেনের পরিচয় হলো, বন্ধুত্ব হলো। তাঁদের মাথায় তখন শুধু ভারতের স্বাধীনতা নয়, স্বাধীন হবার পর দেশ কেমনভাবে চলবে, মানুষের জীবন কোনভাবে চলবে, পেটভরে খাবার, সবার জন্য শিক্ষা-চিকিৎসা, মাথা গোঁজার ঠাঁই অর্থাৎ সার্বিক মুক্তি হবে কিনা এই ভাবনাটিও শুরু হয়ে গিয়েছিলো। জেলে বসেই বন্দিদের ছোট একটি দল সমাজতন্ত্রের পথ অনুসরণের জন্য নিজেদেরকে তৈরি করতে থাকলো। এর একজন হলেন সত্যেন সেন।
মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সত্যেন সেন সেই মতবাদে অবিচল ছিলেন। শিক্ষা-দীক্ষায় তখনকার সময়েই উন্নত বিক্রমপুরের সোনারং গ্রামের এক শিক্ষিত সেন পরিবারে ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন সত্যেন সেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি দেখাশোনার জন্য থাকতেন সত্যেন সেনের জন্মের পূর্ব থেকে তাদের ভাই-বোন সবাইকে লালন-পালনকারী এলাহাবাদের পাহাড়ি সরলপ্রাণ এক আপনজন মহাঙ্গু বানিয়া বা বাউ। সত্যেন সেন এই বাউ-এর কথা অতি স্নেহের সাথে তুলে ধরেছেন। ১৯৩৮ সালে ঢাকায় আসার পর থেকেই সত্যেন সেন কৃষক-শ্রমিক তথা দুঃখী মানুষের মধ্যে পড়ে থেকে তাদের নিয়ে শোষণমুক্তির আন্দোলন সংগঠিত করার প্রয়াস চালান। জানা যায়, মূলত কৃষকদের নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে তিনি আগ্রহী ছিলেন।
কৃষক সমিতি গড়ে তুলতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন সত্যেন সেন। হাটে-মাঠে-ঘাটে, কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অতিথি হয়েছেন, কৃষক গিন্নির হাতে রান্না করা খাবার খেয়েছেন, কৃষকদের সন্তানদের নিয়ে শিক্ষা শিক্ষা খেলেছেন, তাদের অক্ষর জ্ঞান দিয়েছেন। বিভিন্নভাবে তাদেরকে অবলোকন করেছেন, তাদের মধ্য থেকে চিন্তার খোরাক যোগাড় করতে অনেক কসরত করেছেন- “গ্রাম বাংলার পথে পথে” বইতে তার কিছু লিপিবদ্ধও আছে। ঢাকা জেলার গাঁও গ্রাম তার নখদর্পণে যেন। কৃষকদের ওপর জোতদার-জমিদারের শোষণ-অত্যাচার, কৃষকদের সরলতার সুযোগ নিয়ে গ্রামের লুটেরা টাউট বাটপারদের ষড়যন্ত্র তুলে ধরায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন সত্যেন সেন। এভাবে পথে পথে ঘুরে কৃষক আন্দোলন গড়ার সাথে সাথে নিজের লেখারও উপাদানও সংগ্রহ হয়ে যেতো।
মার্কসবাদী তত্ত্বের দুটি মূখ্য উপাদান কৃষক ও শ্রমিক। দু’দিকেই সত্যেনদা’র আগ্রহ। মনে হয়, এ কারণেই জিতেন ঘোষের সহায়তায় মূলতঃ কৃষক সমিতিতে কাজ করা এবং সুনীল রায়ের সঙ্গে মিলে শ্রমিক ইউনিয়নে কাজ করতে যাওয়া। দুটি অঙ্গেই তিনি সফল। মোহিনী সুতাকল, ঢাকেশ্বরী মিলের শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে সম্ভবত তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, মেহনতি যারা- এদেশের শোষণমুক্তির আন্দোলন গড়ে তুলতে হলে তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চর্চা অপরিহার্য। এই চর্চার মাধ্যমেই তাদেরকে সচেতন করে তোলা সহজ।
জেলে বসে তিনি অনেক বই লিখেছেন, সময়কে তিনি বৃথা যেতে দেননি। জেলে তার কোনো অবসর ছিলো না, সময়ই তার নিকট হার মেনেছে। কবিতাও সেখানে বসে লেখেন। তার লেখা বই’র সংখ্যা ৪২টি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই ‘আলবেরুণী’, ‘মানব সভ্যতার ঊষা লগ্নে’, ‘মহা বিদ্রোহের কাহিনী’, ‘রুদ্ধদ্বার মুক্ত প্রাণ’, ‘অভিযাত্রী’, ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’, ‘প্রাচীন ভারতের স্বর্ণযুগ’, ‘প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম’, ‘মেহনতি মানুষ’, ‘ইতিহাস ও বিজ্ঞান’, ‘এটমের কথা’, ‘বিকিরণ’, ‘আইসোটপ’, ‘শহরের ইতিকথা’, ‘ইতিহাস ও বিজ্ঞান’ (৫টি বই)। তাঁর লেখা বইগুলো এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে।
তাঁর লিখিত বইয়ের জন্য বাংলা একাডেমী তাঁকে পুরস্কৃত করে ১৯৭০ সালে। এর পূর্বে তিনি আদমজী পুরস্কারে ভূষিত হন। সরকার তাঁকে ‘একুশে পদক’ দান করে তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৮৬ সালে। ১৯৮১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৪৮ সালে সুতাকল শ্রমিকদের নিয়ে তিনি ‘কবিগানের দল’ নামে একটি দল গঠন করেন। সেটি বেশিদিন চলেনি, কিন্তু তার চেষ্টা অব্যাহত ছিলো। সম্ভবত তিনি জেলে বসেই দলের জন্য কিছু গান লেখারও চেষ্টা করেছিলেন। সত্যেন দা’র লেখা কিছু গান পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শ্রদ্ধেয় হাতেম আলি খান প্রকাশিত ‘চাষির গান’ সংকলনে রয়েছে। উদীচী তার গঠন সময়ে (১৯৬৮) সত্যেন দা’র লেখা গানগুলি সুযোগ মত গাঁওগ্রামের স্কুল ও মাঠে পরিবেশন করার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে একটি জারি গান হলো- “হায় দুঃখ সয় না প্রাণে রে, হায় হায় রে, আমাদের এই সোনার দেশ কি দশা তার হইল”। এ জারি গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলো। তাঁর লেখা আরেকটি গান হলো- “মারো জোয়ান হাঁইয়ো মারো কসে টান, তালে তালে ফেল বৈঠা নদীতে উজান”।
সত্যেন সেনের প্রতিটি গানেই শ্রমিক-কৃষকের চূড়ান্ত মুক্তি যে সমাজতন্ত্রে নিহিত তা তিনি অকপটেই লিখে গেছেন। শ্রমিক-কৃষকের বিরাট শক্তির উপর সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পথ হলেও এ নিষ্ক্রিয়তার উপর আক্ষেপ করে তিনি লিখেছেন- “ভাইরে বুঝবি কি আর মলে, দিনেই যদি হোস রে কানা, কী হবে আর রাত্রি হলে”। পাকিস্তানি আমলে সরকার কৃষকদের স্বার্থবিরোধী আইন করেছিলো, যার ফলে চাষিরা অত্যাচারিত হচ্ছিলো। এর প্রতিবাদে সত্যেন দা’র কলম তীক্ষèধার হয়ে ওঠে। তিনি লিখেন- “আজব কাণ্ড ঘটছে রে ভাই মনের দুঃখ কই কারে, চাষা-পেষা কল বানাইছে সরকারে”।
সমাজে মানুষের প্রতি শোষক মানুষের শোষণ নির্যাতন সত্যেন সেন মনের অন্তঃস্থল থেকে দেখেছেন এবং আন্তরিকভাবে তা দূর করার জন্য গানের মাধ্যমে তা প্রকাশ করেছেন। সত্যেন দা হচ্ছেন মূলত চারণ লেখক। তাঁর প্রতিটি রচনায় এর ইঙ্গিত পাই আমরা। তাঁর লেখার মাধ্যমগুলোর একটি হলো সঙ্গীত। এর মাধ্যমে আমরা সহজেই তাঁকে চিনতে পারি। সত্যেন সেন লিখিত একটি বিখ্যাত গানে সুর সংযোজন করেছেন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক প্রয়াত অজিত রায়। গানটি হলো- “আজি সপ্ত সাগর উঠে উচ্ছলিয়া, তোরা শুনতে কি পাস, দিকে দিকে জাগে বিদ্রোহী জনতা, উন্মাদ গর্জনে প্রাণো উল্লাস”।
আমরা বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা আন্দোলনের মন্ত্রণা পাই একুশে আন্দোলনের চেতনা থেকে। আমাদের ভাষা রক্ষা তথা বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই একুশের চেতনা নিয়ে পাকিস্তানি উপনিবেশবাদী স্বৈরাচারীদের সাথে যুদ্ধ হয়। আমরা জয়ী হই। সত্যেন দা তাঁর লেখার মাধ্যমে জানিয়েছেন ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর চেতনা। এ গানটিতে সুর দিয়েছেন শ্রদ্ধেয় একজন সুরকার, আমার শিক্ষক শেখ লুৎফর রহমান- “আগুন নিভাইবো কে রে, এ আগুন নেভে নেভে নেভে না”।
’৭০ এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক চেতনায় নতুন একটি দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের দেশেও ব্যাপকভাবে এর ধাক্কা লাগে। তখন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জীবনপণ লড়াইকারী বন্ধুরা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়েন। অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা তখন প্রত্যক্ষ করেছেন সত্যেন সেন। ’৬৪ তে তাঁর লেখা একটি গানে কিছুটা উল্লেখ করেছেন মিনতি সহকারে- “ও আমার দেশের ভাই দেশের ভাই, আমার মিনতি শোন শোন”।
সত্যেন সেনের ভাবনা ছিলো মানুষকে নিয়ে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ, অসহায় নারী তারাই তাঁর সাহিত্য জীবনের আধার। তাঁর সমস্ত লেখালেখিতে তারাই ধরা দিয়েছে বেশি। যারা শোষিত নির্যাতিত তাদের নিকট থেকেই তাদের দুর্দশা চূড়ান্তভাবে নিঃশেষ করার পন্থা বার করার লেনিনীয় বিচার ভাবনানুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করেছেন সত্যেন দা। তাঁর লেখা একটি গানে এর কিছু নমুনাও পাওয়া যাবে- “মানুষেরে ভালোবাসি এই মোর অপরাধ, হাসিমুখে তাই মাথা পেতে নেই দুঃখের আশীর্বাদ। মানুষের কাছে পেয়েছি যে বাণী, তাই দিয়ে রচি গান, মানুষের লাগি ঢেলে দিয়ে যাবো, মানুষের দেয়া প্রাণ”। সারাটি জীবন এই নির্যাতিত মানুষের মাঝে থেকেই তিনি দিনাতিপাত করেছেন।
এখন একটি গানের কথা উল্লেখ করতে চাই। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক বলে দুনিয়ার বিভিন্ন ভাষায় যে গানটি গাওয়া হয়, তার আদলে অনেকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে গানটি লিখেছেন। আমাদের বাংলা ভাষায় প্রখ্যাত কবি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও তা লিখেছেন। যা অন্তর-ন্যাশনাল বলে খ্যাত। কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের ভাষা বিশ্বব্যাপী ভিন্ন থাকলেও সুর একই। সত্যেন সেনও সেই ভাবধারায় এই গানটি লিখেছেন- “ওরে ও রে বঞ্চিত সর্বহারা দল, শোষণের দিন হয়ে এলো ক্ষীণ, নবযুগ আসে চঞ্চল”।
লেখক : বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সাবেক সভাপতি।
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন