‘আস্তিকতা’, ‘নাস্তিকতা’ ও ‘অজ্ঞেয়বাদ’ ‘ইসলাম’, ‘ইসলামী মৌলবাদ’, ‘রাজনৈতিক ইসলাম’
এ আর খান আসাদ
‘ইসলাম’, ‘ইসলামী মৌলবাদ’, ‘রাজনৈতিক ইসলাম’– এই পার্থক্য শুধু শব্দের নয়। এই পার্থক্য রাজনৈতিক বোধের, মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা ও ধর্মসন্ত্রাসের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই পার্থক্য যদি করতে না পারেন, তাহলে আপনি নিজেই সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের সহায়ক। হতে পারে আপনি আস্তিক বা নাস্তিক।
‘মুসলমান’ বলেও বাস্তবে কিছু নেই। আছে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী মুসলমান, আছে উদারনীতিক সেক্যুলার মুসলমান, আছে আধ্যাত্মিক সুফি মুসলমান, আছে কালচারাল মুসলমান। এই পার্থক্য যদি না বুঝেন, সেটা আপনার অজ্ঞতা। সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী মুসলমানের ধর্মান্ধতা ও ধর্মসন্ত্রাসের জন্য আপনি অন্য মুসলমানদের যখন দায়ী করেন, তখন সেটা আপনার অজ্ঞতা নাহয় আপনি সাম্প্রদায়িক।
শব্দ বদলান, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে। আপনি নিজেও সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত হবেন।
বিজ্ঞানচেতনার ও মুক্তচিন্তার সাথে ‘আস্তিকতা’, ‘নাস্তিকতা’ ও ‘অজ্ঞেয়বাদের’ পার্থক্য আছে। আস্তিকতা প্রধানত পারিবারিক বা সামাজিক ‘ধর্ম’ বিশ্বাস। যে পরিবারে বা সমাজে জন্মায়, সেই পরিবার বা সমাজের কাছ থেকে শৈশব থেকেই শেখে যে অতীন্দ্রিয় অলৌকিক পরমসত্তা আছে। সৃষ্টিকর্তা কোনো শক্তি বা সত্তা আছে। এই অলৌকিক সত্তায় বিশ্বাস, আস্তিকতা।
নাস্তিকতা ঠিক আস্তিকতার বিপরীত। বিশ্বাস বা ধারণা যে, কোনো অলৌকিক, অতীন্দ্রিয়, শক্তি বা সত্তা বলে কিছু নেই, এই ধারণা মানুষ নিজে তৈরি করেছে, যুগ যুগ ধরে তা বিবর্তিত হয়েছে, এবং সুদূর অতীতের সর্বপ্রাণবাদ বা প্রকৃতিপূজা থেকে, বহুদেবতা এবং আধুনিক কালে একেশ্বরবাদ এসেছে। সবটাই মানুষের কল্পনা। নাস্তিকতাও একটি ধারনা, যা আস্তিকতাকে ভুল বা অসত্য মনে করে।
অজ্ঞেয়বাদ ধারণাটি মনে করে, মানুষ সবকিছু জানতে পারেনা, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। ঈশ্বর, আদিশক্তি, পরমসত্তা ইত্যাদি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের ব্যাপার, প্রমাণ যোগ্য জ্ঞানের নয়। ফলে, এরা আস্তিক ও নাস্তিক দুই ধরনের অবস্থানের বিপক্ষে।
বিজ্ঞানচেতনা বা বিজ্ঞানচিন্তা আগাম কোন কিছু বলে দিতে নারাজ যে, কি আছে (আস্তিকতা), কি নাই (নাস্তিকতা), আর কি জানা সম্ভব না (অজ্ঞেয়বাদ)।
বিজ্ঞানচিন্তা হয়ত অনুমান করে (হাইপোথেসিস), কিন্তু কোন কিছু আছে বা নেই এই ‘সত্য’ নির্ভর করে কেবল ‘যুক্তির’ উপর নয়, পরীক্ষা নিরীক্ষা লব্ধ প্রমাণের উপর, যে প্রমাণ আবার সর্বজনীন। (বিজ্ঞানের জ্ঞান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ আছে, অজ্ঞ, মূর্খ ও ধান্দাবাজদের। যেমন পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে পুঁজিবাদী ধান্দাবাজ বুদ্ধিজীবীদের প্রচুর ত্যানাপ্যাঁচানো কথাবার্তা আছে)।
আপনি আস্তিক, নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী হোন, আমার সমস্যা নেই। সমস্যা আপনার বিশ্বাসের কারণে সহিংস আচরণ, যা মূলত রাজনীতি। ধর্মের নামে সহিংসতা একটি রাজনীতি। যেমন, সাম্প্রদায়িক আত্মপরিচয়ের রাজনীতি, মৌলবাদী জঙ্গিবাদের রাজনীতি। ধর্ম দিয়ে এই রাজনীতি আড়াল করা একটি ফাঁদ। ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে আলাদা করে বুঝতে না শিখলে আপনিও এই ফাঁদে আটকে যাবেন।
লেখক : অ্যাক্টিভিস্ট
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন