রোকেয়ার সাহিত্যে আধুনিকতা আর বিজ্ঞানমনস্কতা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা ফিচার : পদ্মরাগ, মতিচূর, অবরোধবাসিনী এবং সুলতানার স্বপ্ন– মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেনের অনবদ্য সৃষ্টি। আজ থেকে দেড়শত বছর আগে কীভাবে এই কিংবদন্তি নারী এমন এক অন্ধকার ও বৈরী পরিবেশে নিজে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং শিক্ষাকে রপ্ত করে আবার সাহিত্য ও সমাজ বিনির্মাণে অবদান রাখেন, তা ভাবলেই অবাক হতে হয়। সম্প্রতি রোকেয়া দিবস পার হলো। তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তার সাহিত্যে আধুনিক চিন্তা চেতনা ও বিজ্ঞানমনস্কতা দিয়ে আলোকপাত করার প্রয়াস। রোকেয়া যে সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তখন সমাজে মুসলিম নারী শিক্ষার কোনো প্রচলন ছিল না। নারীসমাজ ছিলো কঠোর অবরোধ প্রথার শৃঙ্খলে বন্দি। রোকেয়া বালিকা বয়সেই বুঝতে পেরেছিলেন, যে সমাজে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সে সমাজ তার জন্য কোনো মঙ্গল আর কল্যাণের বারতা নিয়ে আসবে না। তাই তিনি চুপি চুপি বড় বোন করিমুন্নেছা ও বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় বাংলা এবং ইংরেজি শিক্ষার পাঠ নিয়েছিলেন। শিক্ষায় রপ্ত হয়ে তিনি ব্রত গ্রহণ করেছিলেন, কীভাবে সমাজের এই কূপমণ্ডূকতা ও কুসংস্কার দূর করা যায়। তিনি লক্ষ করেছেন, পুরো সমাজ নারীদের নানা বাধা ও বেড়াজালের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রেখে তাদের এগিয়ে চলার পথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তিনি দেখেছেন, যত বাধা, যত সংস্কার কেবল নারীদের জন্য। একটি ছোট্ট বালিকার শিশুমনে সমাজের যাবতীয় অনিয়ম ও অন্যায়ের দর্পণ অত্যন্ত শক্ত প্রতিবাদের সুর ও হাতিয়ার হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল বলেই নারীসমাজ সেই বেড়াজাল থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল। রোকেয়াও ইতিহাসে মুসলিম নারী সমাজের জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে কালজয়ী হয়ে গেলেন। সমাজের অন্যায় ও কঠোরতার চিত্র বেগম রোকেয়ার সাহিত্যকর্মের পরতে পরতে উদ্ভাসিত। তিনি তার ‘অবরোধবাসিনী’ গ্রন্থে সমকালীন সমাজের কিছু ঐতিহাসিক ও চাক্ষুষ হাসিকান্নার চিত্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের ছলে তুলে ধরেছেন। এটি রোকেয়ার একটি উল্লেখযোগ্য গদ্যগ্রন্থ। চিত্রধর্মী এই ছোটো ছোটো রচনাগুলোর মধ্যে সমাজের অবরুদ্ধ নারীর মর্মান্তিক জীবনকথা অত্যন্ত সাহিত্যমণ্ডিত হয়ে ফুটে উঠেছে। রোকেয়া এই গ্রন্থে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, লাহোর, দিল্লি ও আলীগড়ের অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত মুসলিম নারীদের কঠোর পর্দা প্রথার নামে অবরোধের ৪৭টি অমানবিক ঘটনার চিত্র অঙ্কন করেন। গ্রন্থ প্রকাশের আগে তার রচনাগুলো কলকাতার মাসিক মোহাম্মদী ও নবনূর পত্রিকায় ছাপানো হতো। ‘অবরোধবাসিনী’ গ্রন্থের কয়েকটি চিত্র যদি তুলে ধরি, তাহলে বোঝা যাবে নারীরা রোকেয়ার সমকালে কী পরিমাণ কষ্ট আর দুর্ভোগের শিকার হতেন। ১. একটি ঘটনায় লিখেছেন, এক বুড়ি তার নাতি-নাতনিদের নিয়ে শহর দেখতে বের হলেন। একটি গরুর গাড়িতে চেপে বুড়ি সারাদিন শহরে ঘুরলেন বটে, সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলে স্বজনরা জিজ্ঞেস করেন, শহর কেমন দেখলেন? বুড়ির উত্তর– কিছুই দেখলাম না, যেহেতেু পর্দার অন্তরালে ছিলাম। ২. আরেক ঘটনায় আছে, বিয়ের কনেকে স্নান করাবে নদীতে। পালকিতে ৭ পরতের আবরণে মুড়িয়ে পালকিসমেত ভেতরে থাকা কনেকে নদীতে চুবানো হলো। ঘরে এসে দেখলেন, সেই কনের আর প্রাণবায়ু নেই। অবরোধের কারণে নদীর জলেই কনের প্রাণ বিসর্জন হলো। এই ধরনের মোট ৪৭টি চিত্র আমরা তার অবরোধবাসিনীতে পাই, যেগুলোর সাহিত্যিক মূল্য অপরিসীম। চিত্রগুলোর ফলে সমাজের দুরবস্থা বুঝতে আর পাঠকের বাকি থাকে না। রোকেয়া সুলতানার স্বপ্ন ইংরেজি ‘সুলতানাস ড্রিম’-এর অনুবাদ গ্রন্থ। এটি ১৯০৫ সালে প্রকাশিত হয়। এটি রচনার প্রধান লক্ষ্য ছিলো সমাজে পুরুষের কর্তৃত্বকে খর্ব করা। কারণ পুরুষের শাসনে বন্দি থাকার ফলে নারী জাতি মানবজাতির কোনো কল্যাণে আসতে পারছে না। রোকেয়া বুঝতে পেরেছিলেন এই শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এলেই নারীমুক্তি সম্ভব। তিনি এই আদর্শ বা ইউটোপিয়ান মুক্তিটি এনেছিলেন তার কল্পনায়, তবে পুরোপুরি ভবিষ্যতের বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে। এই গ্রন্থে রোকেয়া স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি নারী রাজ্যের। স্বপ্নে দেখতেন তার বোন সারাহর মতো অপরিচিত এক নারীর সঙ্গে তিনি অন্তঃপুর ত্যাগ করে নতুন এক স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করছেন। সেই রাজ্য নারী পরিচালিত। সেখানে পুরুষরা গৃহবন্দি। তাদেরকে পর্দার আড়ালে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ওরা লাজুক, ভালো কিছু করতে পারেনা। কিন্তু সময়মতো রান্না করে। এবং ঘরদোর পরিষ্কার করে। ফলে দেশে কোনো অপরাধ নেই। শিক্ষা ও বিজ্ঞান সব সমস্যার সমাধান করতে পারে বলে বিশ্বাসী রানির আদেশেই দেশে অনেক স্কুল ও ২টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। একটিতে সূর্যালোক ও সূর্যতাপের গবেষণা অন্যটিতে নতুন যন্ত্র আবিষ্কার করে ঘরবাড়ি আলোকিত ও রান্নার কাজে সহযোগিতা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি পানি বেলুন নির্মাণ করে আকাশ থেকে পানি সংগ্রহ ও সঞ্চিত করে প্রয়োজনে দেশকে খরার কবল থেকে রক্ষা করে দেশে ফলন বাড়িয়ে তুললেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান চালিকাশক্তি এখানে নারী। তারা কৃষি কাজও করছেন। এখানে কোনো অপরাধ নেই। রাজ্যের প্রচলিত ধর্ম সত্য বলা, প্রেম আর ভালোবাসা। এই তিনের চাদরে মোড়ানো এ যেন এক রূপকথার স্বপ্নরাজ্য। আর এই রাজ্যে তিনি কি দেখেছেন, এই রাজ্যের সবকিছুই যেন এগিয়ে একশত থেকে দেড়শত বছর। এখানে তিনি দেখছেন, নারীরা কৃষিকাজে আধুনিক লাঙ্গল ব্যবহার করছে। সৌর বিদ্যুৎতের কথা বলেছে, আকাশে উড়ছে উড়ন্ত যান, সুইচ টিপেই সেই যান আকাশে উড়ে যাচ্ছে। এসব উদ্ভাবন কিন্তু নারীরাই করেছেন। তবে এই রাজ্যে পুরুষদের বন্দি করা হয়েছিল বল প্রয়োগ করে নয়, বুদ্ধি দিয়ে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ দেখা দিলে কৌশলের পরিবর্তে ক্ষমতার অধিকারী পুরুষরা অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করে দেশকে সক্ষম পুরুষ শূন্য করে দিল। তখন মেয়েরাই এগিয়ে আসে। তবে ওরা যেহেতেু পুরুষের সামনে আসবে না, তাই এদের ঘরে বন্দি করে ফেলা হলো। এরপর মহিলা বিজ্ঞানীরা তখন ঘনীভূত সূর্যালোককে শত্রুর উপর বর্ষণ করলে ওরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে গেল। অথচ একটি প্রাণও সংহার হলোনা। সেই যে নারীস্থানে পুরুষরা অন্দরমহলে ঠাঁই নিল, আর বাইরে আসতে পারল না। তার সাহিত্যে যে আধুনিকতা ও বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় আমরা পাই, তা তো তার কোনো অভিজ্ঞতা থেকে নয়। তিনি তার প্রখর কল্পনা শক্তি দিয়ে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে দিয়েছেন দেড়শত বছর আগে। তার সবকটি কল্পচিত্রের সার্থক প্রয়োগ আমরা আজ বিশ্বব্যাপী পরিলক্ষিত করি। তার সমকালে তিনি পুরুষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে নারী জগৎ কল্পনা করে সাহিত্য রচনা করেছিলেন, এই যুগের আধুনিক বিশ্বের পুরুষ জাতি, তার এই আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক সাহিত্যকে কীভাবে গ্রহণ করতেন? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের যেসব কল্পনা তিনি তার সাহিত্যে ব্যবহার করেছেন, এর কিছুই কিন্তু তিনি স্বচক্ষে দেখেননি। ভারতবর্ষের কোনো বিজ্ঞানীর সঙ্গে তার কোনো সাক্ষাৎ ঘটার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে প্রশ্ন জাগে কোথা থেকে এই নারী এই চিত্রকল্প তৈরি করেছিলেন। আমরা জানি, রোকেয়ার শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চায় ভাই ও বোনের পরে তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের অবদান অনস্বীকার্য। তার স্বামী কৃষিবিজ্ঞানে বিলাত থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ফলে স্বামীর অর্জিত জ্ঞান থেকেই রোকেয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞান আহরণ করে তা তার কল্পনার জগতে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন। ফলে গভীর দূরদৃষ্টি এবং প্রখর কল্পনাশক্তির বলে তার সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম আমাদেরকে এগিয়ে দেয় শত বছরের বেশি সময়। এ যেন আমাদের সাহিত্য অঙ্গনে এক মহাপ্রাপ্তি। রোকেয়া জীয়ন্তে স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় আরোহণকারী নারী ছিলেন না। তিনি এসব নিষ্ঠুর প্রথা ও আচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন বহু আগেই।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..