অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় চীন কেন সফল হবে
মনির তালুকদার: বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন সাম্প্রতিক সময়ে শ্লথগতিতে চলছে। এ নিয়ে চীনের চেয়ে অন্যান্য দেশের উদ্বেগই প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে। এখন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে অবস্থান করছে চীন। তাদের অনেকে বলছে চীনা অর্থনীতিতে ধসের সৃষ্টি হয়েছে। শিগগিরই দেশটির অবস্থা নাজুক হয়ে পড়বে। তবে চীন কিন্তু এ নিয়ে এখনো কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। বরং দেশটি বলছে, এই মন্থরতা তাদের জন্যে কল্যাণকরই। জরিপে দেখা গেছে, ইউয়ান দুর্বল হওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যে প্রভাব পড়ছে তাতে বেশিরভাগ চীনা প্রতিষ্ঠানই সন্তুষ্ঠ। জানুয়ারিতে এম এন আই সূচকে দেখা গেছে, চীনের সামগ্রিক ব্যবসায় আস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। এছাড়া ভোক্তা আস্থা সূচকও ইতিবাচক থাকায় চীনা অর্থনীতি নিয়ে যতটা উদ্বেগ বিরাজ করছে, তার হয়তো প্রয়োজন নেই।
চীনা অর্থনীতি নিয়ে সবচেয় বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করছে প্রধানত মার্কিন মিত্রদেশগুলো। এসব দেশের অনেকে বলছে, চীন তার অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক সম্পর্কে যথাযথ তথ্য দিচ্ছে না। সম্প্রতি দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউ ইএফ) সম্মেলনে অংশ নিয়ে ফরাসি অর্থমন্ত্রী বলেন, আমার বিশ্বাস চীন সরকারিভাবে যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে বাস্তবের চেয়ে জিডিপি অনেক বাড়িয়ে বলা হয়েছে। বেইজিং যতটা বলছে, চীনা অর্থনীতির বাস্তবতা তার চেয়েও ভয়াবহ। বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় এটি আরো গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সমস্যা এ সংকট আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
এদিকে অতিসম্প্রতি চীন অর্থনৈতিক কৌশলের আলোকে তার ১৩তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং ২০১৬-২০২০ মেয়াদের উচ্চাভিলাষ চূড়ান্ত করেছে। এতে ২০১০ সালের মাত্রার চেয়ে তাদের জিডিপি এবং গড় পল্লী ও নগর পারিবারিক আয় দ্বিগুণ করার কথা বলা হয়েছে।
এসব লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী ৫ বছর চীনের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অন্তত ৬.৫ শতাংশ করতে হবে। ১৯৭৯ সাল থেকে দেশটি গড়ে যে, ৯.৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে যাচ্ছিল, তা থেকে এই হার অনেক কম হলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি। তবে ২০১০ সালের শুরু থেকে প্রতি কোয়ার্টারে প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে থাকায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে কি না।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয় প্রযুক্তগত অগ্রগতি এবং শিল্পোন্নয়নের কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে। উচ্চ আয়ের দেশগুলো তাদের উৎপাদনশীলতার সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছে যাওয়ার পর প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক সাফল্যের মাধ্যমেই কেবল তাদের আয় বাড়াতে পারে। ওইসব দেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধি হার প্রায় ৩ শতাংশ। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর কাাছ থেকে প্রযুক্তি ধার করে উৎাদশীলতা এবং সেই সাথে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ তারা বিলম্বে আসার সুবিধাটি কাজে লাগাতে পারে, যেমনটি চীন করেছে।
প্রশ্ন হলো, ৩৬ বছর ধরে অগ্রযাত্রার পর চীন আর কতদিন এই প্রক্রিয়া থেকে উপকৃত হতে পারবে? অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চীন তার সীমার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসনের সংগৃহিত ঐতিহাসিক উপাত্ত ব্যবহার করে তারা দেখাচ্ছেন, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো কিভাবে ১৯৯০ সালের মার্কিন ডলার মূল্যে ক্রয়-ক্ষমতা-সাম্যের পরিভাষায় অপরিবর্তনীয় ১১ হাজার ডলার বিংবা ২০০৫ সালের মার্কিন ডলার মূল্যে ১৭ হাজার ডলারে তাদের জাতীয় মাথাপিছু জিডিপি পৌঁছার পর প্রবৃদ্ধি হ্রাসের মুখোমুখি হলো।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ওই পর্যায়ে পৌঁছার পাঁচ বছর পর জাপানে গড় বার্সিক হার ৩.৬ শতাংশে নেমে আসে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৪.৮ শতাংশে। হংকংয়ে দাঁড়ায় ৫.৮ শতাংশে। চীন চলতি বছরের কোনো এক সময় একই অবস্থায় পড়বে এমন পূর্বাভাস দিয়ে অনেকে বিশ্বাস করে, আগামী পাঁচ বছরে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে নেমে আসবে।
এই মতের সাথে একমত হওয়া যায় না। ওই সব বিশেষজ্ঞ যে জিনিস মাথায় রাখেনি তা হলো, উন্নত দেশগুলো অলসভাবে বসে থাকে না। তারা প্রযুক্তিগত প্রবৃদ্ধি ও অগ্রযাত্রা লাভ করেই যায়। আর এটাই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যে অব্যাহতভাবে শেখার সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে।
যারা চীনা অর্থনীতির মন্থরাত নিয়ে ভবিষ্যদ্বানী করছেন, তারা দেশটির মাথাপিছু আয়ের আলোকে ঠিক কথাই বলছেন বলে মনে হচ্ছে। কারণ জিডিপিতেই দেশের গড় শ্রম উৎপাদশীলতা এবং তার মাধ্যমে তার কারিগরি ও শিল্প অগ্রগতির মাত্রা প্রতিফলিত হয়। তবে মনে রাখতে হবে, চীনের প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনা তার মাথাপিছু জিডিপি’র আলোকে যথাযথভাবে নির্ধারণ করার সুযোগ নেই। কারণ চীন ও বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু জিডিপির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এইদিক থেকে চীনের অগ্রগতির অনেক অবকাশ রয়েছে।
জাপানের ১৯৭২ সালের ১১ হাজার ডলারের সাফল্য অতিক্রম করার সময় তার জিডিপি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ৭২ শতাংশের মাত্রায়। ১৯৯২ সালে তাইওয়ান সাফল্য অতিক্রমের সময় তার মাথাপিছু জিডিপি ছিল আমেরিকার ৪৮ শতাংশ। এই তুলনায় চীন আজ মাত্র ২৯ শতাংশে রয়েছে। ২০০৮ সালে ম্যাডিসিন যে চিত্র উপস্থাপন করেছিলেন, তাতে দেখা যায়, চীনের মাথাপিছু জিডিপি ছিল মার্কিন মাত্রার ২১ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পূর্ব এশিয়ার জন্যে দেশগুলোর অবস্থান মিলিয়ে দেখলে আমরা বুঝতে পারব, চীনের প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা কতটুকু।
জাপানের মাথাপিছু জিডিপি ছিল আমেরিকার ১৯৫১ সালের ২১ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ বছরে তা গড়ে ৯.২ শতাংশ হারে বাড়তে থাকে। ১৯৬৭ সালে সিঙ্গাপুর ওই মাত্রায় পৌঁছার দুই দশক পর তার গড় প্রবৃদ্ধি হয় ৮.৬ শতাংশ। তাইওয়ান, হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে কাহিনি একই রকম। তাদের মাথাপিছু জিডিপি যুক্তরাষ্ট্রের মাত্রার ২১ শতাংশে পৌঁছার পর তারা ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। ফলে চীন ২০১৮ সাল পর্যন্ত একই অবস্থায় যেতে না পারার কোনো কারণ নেই।
চীনা অর্থনীতির বর্তমান মন্থরতা কোনো সহজাত সীমার জন্যে নয়, বরং বাইরের এবং চক্রক্রমিক কারণে ঘটেছে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকট এবং রফতানি চাহিদা দ্রুত কমে যাওয়াজনিত সমস্যায় পড়েছে চীন। ১৯৭৯ সাল থেকে ২৩০১৩ সাল পর্যন্ত চীনের বার্ষিক রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল গড়ে ১৬.৮ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে হয় ৬.১ শতাংশ। ২০১৫ সালে আরো কমে হয় ১.৮ শতাংশ।
এই আন্তর্জাতিক জটিলতা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ উন্নত দেশগুলোর রাজনীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আবার চাঙ্গা করার জন্যে বেতন কমানো, সামাজিক সুবিধা হ্রাস আর্থিক সুবিধা কমানো এবং বাজেট ঘাটতি সংহতকরণের মতো কাঠামোগত সংস্কারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। বস্তুত, ১৯৯১ সালের জাপানের মতো উন্নত বিশ্বের বেশির ভাগই কয়েক দশক হারানোর ঝুঁকিতে থাকে।
প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য অর্জনের জন্যে চীনকে বিনিয়োগ ও ভোগসহ তার অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে আশার কথা হলো, উভয় ক্ষেত্রেই চীনের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নত দেশগুলোর বিপরীতে চীন অবকাঠামো, নগরায়ন প্রয়াস, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, হাইটেক শিল্পে অগ্রগতির উদ্যোগ নিতে পারে আর প্রতিদ্বন্দ্বী উন্নত দেশগুলোর বিপরীতে এ ধরনের বিনিয়োগের জন্যে চীনের রয়েছে বিপুল রাজস্ববিষয়ক সুযোগ, পারিবারিক সঞ্চয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে।
বিনিয়োগের ফলে সৃষ্টি হবে চাকরি, পারিবারিক আয় এবং ভোগ। এ কারণে বৈদেশিক পরিস্থিতির উন্নতি না ও হয়, ৬.৫ শতাংশ বা এর বেশি বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতে চীন পৌঁছাতে পারবে। এক্ষেত্রে, চীন অব্যাহতভাবে বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক ইঞ্জিন হিসেবে বিরাজ করবে, অন্তত ২০২০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ৩০ শতাংশ করে অবদান রাখতে থাকবে। এসব কারণে চীনা অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা যতটা প্রকাশ করা হচ্ছে বাস্তবতা ঠিক সে রকম নয়।
লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট
Login to comment..








প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন