তারুণ্যের পদধ্বনি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মনীষা চক্রবর্তী : ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। বিশ্বজুড়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রতিবাদে পালিত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিক্ষোভ। সমগ্র বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বিভিন্ন দেশে এই বিক্ষোভে অংশ নেয়। এই উত্তাল আন্দোলনে সমগ্র বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়ে বিক্ষোভের অগ্নিমশাল হয়ে যে দুরন্ত কিশোরী অপ্রতিরোধ্য গতিতে সেদিন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যার নাম বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তিনি সুইডিস ষোড়শী গ্রেটা থানবার্গ। এই আপসহীন সংগ্রামী নেত্রী সেদিন পুঁজিবাদী বিশ্বের মোড়ল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখের ওপর পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে যে জ্বালাময়ী বক্তব্য উপস্থাপন করে পরিবেশ সচেতনতার ৫২ হাজার ডলার সম্মানী পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ইতিহাসের পাতায় তা লেখা হয়ে থাকবে। যেমন লেখা হয়েছিল সেই ব্রিটিশ আমলে জালিয়ানওয়ালাবাগ নৃশংস হত্যকাণ্ডের পর কবি-সম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রিটিশ সরকারের দেয়া নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যান। এভাবেই যুগে যুগে ধরিত্রীকে মানবতাকে বাঁচাতে গিয়ে মহামানবদের আবির্ভাব ঘটে। গ্রেটার বক্তব্য ছিল- ‘মানুষ যত বেশি বিজ্ঞানের কথা শুনবে ততই পরিবেশ সুস্থ স্বাভাবিক থাকবে’। পুরস্কার নিয়ে সচেতনতা আনা যায় না। এ পুরস্কার নিতে তার আপত্তির কারণ ব্যাখ্যা ছিল এরকম- “অর্থ নয় পুরস্কার নয়- একমাত্র বিজ্ঞানের কথা শুনলে উন্নত হবে বিশ্ব পরিবেশ, জলবায়ু”। নরওয়েবাসীর সমালোচনায়ও তিনি মুখর ছিল– “নরওয়েবাসী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কথা যতটা শুনেন ততটা তারা পরিবেশ-জলবায়ু নিয়ে ভাবেন না।” গ্রেটা এই ষোল বছর বয়সেই সুইডিস পার্লামেন্টের সামনে প্রতি শুক্রবার ধর্না দিয়ে থাকেন। এভাবেই তিনি পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। থানবার্গের কথা ছিল- ‘আগুনে পুড়ছে আমাদের বাড়ি। আর আমরা বসে বসে তা প্রত্যক্ষ করতে পারি না’। এ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হাজার হাজার ছাত্র জনতা রাস্তায় নেমেছিল। একটা অতি পুনোনো আধমরা গাছের ডালে যদি কখনও নতুন সবুজ পাতা গজায় তা দেখে যেমন মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়, উল্লাস হয় ঠিক তেমনই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে সারা বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে। এ প্রজন্মের তরুণ সম্প্রদায়ের উপস্থিতিতে সেই আন্দোলন আরও গতিশীল, আরও প্রানবন্ত ও অর্থবহ হবে। এবার থলের বেড়াল বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবেই হবে। নিয়মের বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা আর সম্ভব হবে না। কেবলমাত্র সুমধুর কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে বক্তব্য সাজিয়ে জনগণকে আর ধোকা দেয়া যাবে না। কারণ এই আন্দোলন এখন চলে আসতে শুরু করেছে একান্তই তরুণ প্রজন্মের হাতে। এই আন্দোলনে দৃঢ়তার সাথে স্লোগান উঠেছে- “আমরা ডুবে যাচ্ছি না, আমরা লড়াই করছি”। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে মারাত্মকভাবে অশান্ত হয়ে উঠেছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল। সে দেশের নাগরিক সমাজ আর ঘরে বসে নেই, আন্দোলনের ময়দানে সামিল হয়েছে। আন্দোলন করছে– অস্ট্রেলিয়ার সাড়ে তিন লাখ মানুষ। এমনকি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাও পর্যন্ত। শ্রমিক-কর্মচারী সকলেই এসে এই আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকায় সর্বত্র গণআন্দোলন গড়ে উঠেছে। ঘানায় শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে রাজধানী আক্রায়। ভারত, থাইল্যান্ড, জার্মান, যুক্তরাজ্য সর্বত্র এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। অস্তিত্বের সংকটে মানুষ এখন দিশেহারা। আগে জানতাম নরখেকো হিংস্র জানোয়ারের গল্প, এখন দেখি ধরিত্রীকে গিলে খাবার জন্য হা করে এগিয়ে আসছে মানুষরূপী জানোয়ারেরা। ধরিত্রীর বুক চিরে খনিজসম্পদ আহরণ করে বিশাল পুঁজির পাহাড় গড়ে তুলছে। এই দুনিয়াটাকে ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য– মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী সদা তৎপর। এদিকে বিশাল জনগোষ্ঠী জীবন যন্ত্রণায় দিশেহারা। পরিশ্রমভোগী আরামপ্রিয় ভোগবাদীদের দৌরাত্ম্যে শুধু ধরিত্রী নয় সাধারণ জনগণও দুর্ভোগের জ্বালায় জ্বলছে নিত্যদিন। ধরিত্রী তার আপন গতিতে চলতে পারছে না, প্রতিনিয়ত স্বার্থান্বেষী চক্র তাদের লাভের অংক মুনাফার দিক বিবেচনা করে প্রকৃতির ওপরে কর্তৃত্ব বজায় রাখছে। যার ফলশ্রুতিতে এক নিদারুণ ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে চলছে বিশ্ব। সেইসঙ্গে এই গ্রহের সাড়ে ৭০০ কোটি মানবসমাজ ও সকল প্রাণিজগত ও বিশ্ব প্রকৃতির জীব বৈচিত্র্য। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর একজন রোগী যখন খুবই দুর্বল হয়ে যায় তখন তার দেহে নানা উপসর্গ একসাথে বৃদ্ধি পায়, যেটা তার আসন্ন মৃত্যুর কারণ বলে মনে হয়। আমাদের ধরিত্রীর মাঝে সেই বিপর্যয়গুলো ঘনীভূত হয়ে আসছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসছে। মনুষ্যসৃষ্ট এই গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রাকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য সৃষ্ট জলবায়ুর কারণে হিমালয়সহ বিশ্বের বরফের আধারগুলো গলতে শুরু করেছে, অবশ্য তা গলছে অনেক আগে থেকেই। যার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে সমান পাল্লা দিয়ে। ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের মতো ব-দ্বীপগুলো। ভূমিকম্প, ঝড়, বৃষ্টি, খড়া, বন্যা, মরুকরণ, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, বজ্রপাত প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে অস্থির আজ এই ধরিত্রী। এ সকল বিষয়ে বহু তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। তারপরও শেষ পর্বে এসে বলতে চাই, প্রকৃতির ওপর আধিপত্যবাদ কর্তৃত্ববাদ এই সবুজ সুজলা সুফলা সর্বংসহা ধরিত্রীকে করেছে বিষাক্ত, বিবর্ণ। মানবসমাজকে করেছে খণ্ড-বিখণ্ড। তার মূলে এই ভূসম্পদই প্রধান কারণ। সেই অতি প্রাচীনকালে আদিম সাম্যবাদী সমাজের মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীকে গৃহবন্দি করার প্রধান শর্তই ছিল সম্পদের ব্যক্তি মালিকানা। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে প্রথম বিভাজন হয় লিঙ্গভিত্তিক, মানুষের স্বীকৃতি থেকে নারী-পুরুষ দুই শিবিরে চলে যায়। অনেকাংশে নারীসমাজকে গৃহপালিত পশুর সাথে তুলনা করা হতো তখন। তার সাথেই চলে আসে সম্পদের বিচারে পুরুষের মধ্যে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি। এই শর্তে সেই থেকে যে ভূমিদখলদাররা কর্তৃত্ব নিয়েছিল অদ্যাবধি তা বলবৎ। মানবসমাজে তখন থেকেই তৈরি হলো দুটি শ্রেণি- শোষক আর শোষিত। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়েছে এই ধরিত্রীর নতুন প্রজন্মের লাঠির সামনে। কবির ভাষায়- “এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”। সমগ্র বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে গেছে তারুণ্যের কাফেলা, সমুদ্রের তলদেশে সুনামি আর পৃথিবীপৃষ্ঠে তারুণ্যের উত্তাল আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য আজ। ওদের হাতেই এখন বিজয় পতাকা পত পত করে উড়ছে, উড়বে। পুরাতন জরাজীর্ণ তোষামোদপ্রিয়তা চাটুকার, প্রতারক দাম্ভিকতার অবসান সুনিশ্চিত। মানুষ মানুষের জন্য, সুন্দর ধরিত্রীর জন্য - শান্তি প্রগতির লড়াইয়ে সকলে ঐক্যবদ্ধ। লেখক : সভাপতি, চাঁদপুর জেলা কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..